—পণ্ডিত শ্রীগদাধর গোস্বামী—

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর গোস্বামী মহারাজ ।

 

শ্রীগৌরাঙ্গের প্রিয় পার্ষদগণের মধ্যে শ্রীগদাধর গোস্বামী সর্ব্বোত্তম । মধুর কৃষ্ণলীলায় শ্রীরাধিকার স্থান যেরূপ অবিসংবাদিতরূপে তুলনামূলে সর্ব্বোত্তম, সেইরূপ উদার-কৃষ্ণ গৌর-লীলায় উদারমধুররসসেবায় তুলনামূলে শ্রীপণ্ডিত গোস্বামী চরিত্রে ঔদার্য্যময় মধুররসবিশেষ শ্রীগৌরাঙ্গের সর্ব্বাধিক আকর্ষণের বিষয় । মহাজনগণ পণ্ডিত গদাধরে শ্রীরাধাতত্ত্ব সন্দর্শন করেন ।

গ্রীষ্মকালে জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যায় পণ্ডিত গদাধরের আবির্ভাব এবং একমাস পরে আষাঢ়ী অমাবস্যায় তিরোভাব-তিথি । পণ্ডিত গোস্বামী চরিত্র নিজ প্রিয়তমের উদ্দেশ্যে একটী নীরব পূর্ণ-আত্মোৎসর্গময় উপটোকন বিশেষ । লক্ষ্মীদেবীর স্কন্ধ ভিক্ষার ঝুলি দর্শনে যাঁহারা বিরোধালঙ্কারের চমৎকারিতা হৃদয়ঙ্গমে যে অপূর্ব্ব সুখাস্বাদনে সমর্থ, তাঁহারাই শ্রীমৎ পণ্ডিত গোস্বামী অপূর্ব্ব ব্যক্তিত্বের অসাধারণ মহিমা অনুভবের অধিকারী । তিনি শিশুকাল হইতেই অতি সরল, নিরীহ, অনাড়ম্বর ও সৌজন্যপূর্ণ, দেব-দ্বিজে ভক্তিমান্ এবং বন্ধুজনে প্রীতিবান্ । তিনি সুশীল হইয়াও সশঙ্ক, নিবেদিতাত্ম হইয়াও অপরাধীবৎ, পূর্ণপ্রজ্ঞ হইয়াও অনভিজ্ঞবৎ, অধিনায়ক হইয়াও অনুগত ভৃত্যবৎ । নিজ প্রভু শ্রীগৌরাঙ্গে তাঁর নিষ্ঠা—গৌরসুন্দরের সাধারণ অনুচরগণের কটাক্ষেও তাঁহাকে সঙ্কুচিত ও সশঙ্ক করায় । তাঁর শ্রীগুরুগৌরে উন্মাদনাময় তন্ময়তা তাঁর অর্চ্চনমন্ত্রের বিস্মরণ ঘটায় । শ্রীগৌরাঙ্গে স্বল্পশ্রদ্ধও তাঁর হৃদয় এতদূর আকর্ষণ করে যে তাঁর প্রতিস্নেহপ্রকাশে তিরস্কার পরস্কার ভূষণ করিয়া লন । শ্রীপণ্ডিত গোস্বামী চরিত্র এককথায়—নিজ সর্ব্বসম্পদ দান করিয়া স্বেচ্ছায় ভিক্ষুকবেশ পরিগ্রহের অবহেলিত মুর্ত্তবিগ্রহ ।

শ্রীগদাধরের সম্পদ—তাহা হরিশ্চন্দ্রের রাজ্য বা শিবি দধিচীর দেহ-বেসর্জ্জনবৎ বাহ্য-সম্পদ নহে । তাহা ধাত্রীপান্নার প্রণাধিক পুত্র বা পদ্মিনী প্রভৃতির সতীদেহোৎসর্গ মাত্র নহে । এমন কি তাহা সক্রেটিশের আত্মানুভূতি বিতরণের নিমিও বা যীশুখৃষ্টের জগদুদ্ধারের জন্য দেহোৎসর্গ মাত্রও নহে । উচ্চস্তরে অবস্থিত আত্মবিৎগণের দেহত্যাগ আতি সামান্য কথা । আভ্যস্তরীণ দেহগত বা স্বরূপগত সম্পদ পরিত্যাগ অধিকতর দুঃসাধ্য । যদি মুক্তাত্মার ভক্তিসম্পদের তথা তদূর্দ্ধে প্রেমাস্পদের স্বরূপ আমরা হৃদয়ঙ্গমে সমর্থ হই, তবেই শ্রীপণ্ডিত গোস্বামীর অসমোর্দ্ধ হৃদয়সম্পদ দানের হৃদয়বত্ত্বা আমরা হৃদয়ঙ্গম করিব এবং উহা বোধগম্য হওয়া একমাত্র তাঁহার বা তাঁহার নিজজনের অনুকম্পার দ্বারাই সম্ভব । এইসব দুরূহ বিষয় সহসা সাধারণের উপলব্ধির বিষয় হওয়া সম্ভব নয়, তথাপি আবশ্যকরোধে দিদ্গর্শন করা হইতেছে ।

পুনশ্চ দেয় পদার্থের তারতম্য বিচারে যেরূপ মর্য্যাদা নির্ণয় কর্ত্তব্য, তদ্রূপ আবার দানের পাত্রের যোগ্যতার তারতম্যে দানের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় অবশ্য বোদ্ধব্য । যত উচ্চাধিকারী ব্যক্তি দানের গ্রাহক হইবেন, দাতার দানের মহিমা ও ফল তত উচ্চ হইবে । সে বিচারে শ্রীপণ্ডিত গোস্বামীর আত্মদানের বস্তুগত ও পাত্রগত শ্রেষ্ঠতার কোন তুলনা নাই । যেহেতু শ্রীরাধাপ্রেম-সম্পদ সর্ব্বোত্তম বস্তু এবং দ্বিজসুত শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দানপাত্র । এই কথা আলোচনা করিতে আমাদের শ্রীযাজ্ঞবল্ক্যের উপাখ্যান স্মরণ হইতেছে । পর পর উচ্চতর আত্মজ্ঞানের কথা জিজ্ঞাসিত হইয়া চরম কথার অবতারণার পরেও জিজ্ঞাসুর আরও অধিকতর উচ্চ তত্ত্ব জিজ্ঞাসার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য ঋযি কৌতূহল চরিতার্থতার সীমা গুরুতর ভাবে নির্দ্দেশ করিয়া দিলেন ।

আমরা শ্রীপণ্ডিত গোস্বামীর মাহাত্ম্য হৃদয়ঙ্গম করিতে অসমর্থ হইলেও মহাজনগণ তাঁহাদের দিব্যজ্ঞানলব্ধ গদাধরের পরিচয় আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন । কুন্তু আমরা দুরদৃষ্ট বশতঃ তাহাতে বিশ্বাস স্থাপন করিতে অক্ষম হইয়া অশ্রদ্ধধানের অপরাধে আত্মনিমজ্জন ঘটাই । আবার কেহ কেহ শ্রীরাধাস্বরূপসম্পদ নিত্যানন্দ-বলদেবের স্কন্ধে কেহ বা দাস গদাধরের স্কন্ধে চাপাইয়া নিজেদের মনোধর্ম্মের ধ্বজা উড়াইয়া সম্বন্ধতত্ত্বে অপরাধী হই এবং নিজেদের স্বরূপসিদ্ধির দ্বার অর্গলবদ্ধ করি । কেহ বা গদাধরের গৌরকৃষ্ণোপাসনা পদ্ধতি বুঝিতে অক্ষম হইয়া বিষ্ণুপ্রিয়াপতি গৌরনারায়ণে ভোগবুদ্ধিবশে সম্ভোগ আহ্বানে নারায়ণকে নাগর সাজাইয়া বসি । শ্রীকৃষ্ণ রাধাভাবযুক্ত হইলেই শ্রীগৌর, এবং রাধামুক্ত হইলেই শ্রীকৃষ্ণ । শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র মধুরাদি সর্ব্বরসের উপাস্য । শ্রীরামাদি ভগবত্তত্ত্ব সেই প্রকার নহেন । দ্বিজসুত শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর বা ন্যাশ্বীশ্বর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব কখনও নাগরভাব অবলম্বনে পরস্ত্রী সম্ভাষণাদি করেন নাই বা করেন না । সে আদর্শে পারকীয় সম্ভোগদর্শন রসাভাস—অপরাধ—মহাজনবিরোধী—পাষণ্ড মতবাদমাত্র । শ্রীচৈতন্য ভাগবত বা শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত প্রভৃতি প্রামাণিক মহাজন গ্রন্থে এইপ্রকার গৌর-নাগর-বাদের কোন ঘটনা বা সিদ্ধান্তের উল্লেখ আদৌ নাই বা থাকিতে পারে না । নিজ পতি দেবোপাসনায় রত থাকাকালে পতিব্রতা পত্নী যেমন উপাসনারত পতির উপাসনা চেষ্টার আনুকূল্য করিয়া পতিসেবা করেন, পরন্তু সেকালে দাম্পত্যচিত রসালাপ দ্বারা পতির দেবোপাসনার ব্যাঘাত করেন না, তদ্রূপ শ্রীরাধাভাবে শ্রীকৃষ্ণসাধনাপর চিন্তাসক্ত কৃষ্ণচন্দ্রের অর্থাৎ তদুচিত্ত স্বরূপ শ্রীগৌরাঙ্গের শ্রীকৃষ্ণারাধনা লীলায় শ্রীরাধিকাস্বরূপ শ্রীগদাধর আরাধনাপর প্রভুর আরাধনা বিষয়ে আনুকূল্যময় জীবন প্রকাশ করেন ; অর্থাৎ এইরূপই গদাধরে নিত্য প্রকাশিত । শ্রীরাধাকৃষ্ণ নিত্য ব্রজবিলাসময়, আর শ্রীগদাই-গৌরাঙ্গ নিত্য নবদ্বীপস্থিত ঔদার্য্যময় ; ব্রজমাধুর্য্যে যাহা শ্রীরাধাকৃষ্ণ—নবদ্বীপ ঔদার্য্যে তাহাই শ্রীগদাধর-গৌরাঙ্গ । অন্য প্রকার ভাবনায় উভয়ের একত্ত্ব বিঘাতক । সাধকগণের সাধারণ মতবাদ পরিত্যাগ ও মহাজন পথই আশ্রয়নীয় ।

শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেম-দেবতা । শ্রীকৃষ্ণ প্রেম-দেবতা হইয়াও সম্ভোগ-প্রধানহেতু সকল অধিকারে প্রেমদেবরূপে প্রতিভাত হন না । কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গ বিপ্রলম্ভ বা ঔদার্য্য রসাশ্রয়ে শ্রদ্ধাবান্ বদ্ধজীবসাধারণের নিকটও প্রেম-দেবতা । শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সেই প্রেমদেবতাকে আপামরে দান করিতে ব্যাকুল ভাবে জীবের দ্বারে দ্বারে ভ্রমণরত শ্রীগুরুদেবতা-স্বরূপ । আর শ্রীঅদ্বৈতপ্রভু সেই প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের পৃথিবীতে আবাহনকারী ও আনয়নকারী বর্ত্মপ্রদর্শক পরম মঙ্গলময় দেবতা । শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভৃতি সেই প্রেমদেব শ্রীগৌরাঙ্গের সংকীর্ত্তন লীলার পীঠদেবতারূপে শ্রীগৌরলীলায় সহায় সম্পদ । শ্রীস্বরূপ-রূপ-সনাতন-রঘুনাথ-জীবাদি প্রেম প্রস্রবণের অমৃতময়ী ধারাসমূহ সর্ব্ববিশ্ব সঞ্জীবিত করিতেছে । (এ পামর দুরাশাবশে একবিন্দু অমৃতের লুব্ধ ভিক্ষুক ; শ্রীগুরুবৈষ্ণব কৃপাই একমাত্র ভরসা ) ।

প্রেমদেবতা শ্রীগৌরাঙ্গ—শ্রীকৃষ্ণ প্রেমতত্ত্বের জয়গান কতিতেই এই বিগ্রহ ধারণ করিয়াছেন । প্রমধনের সর্ব্বোত্তম আস্পদ নিজ প্রিয়তমার ভাব অঙ্গীকারেই উহা সম্ভব বুঝিয়া তাহা শ্রীরাধার নিকট হইতে আহরণ করিলেন । শ্রীকৃষ্ণ একান্তভাবে শ্রীরাধার আরাধনা করিবেন—করিলেনও তাই । কিন্তু ভক্তজনের নিকট শ্রীকৃষ্ণের গৌরলীলাতেও তাঁর শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ অর্থাৎ গোপী-প্রীতি তথা শ্রীরাধা বশ্যতা সুপরিস্ফুট হইয়াছে । গৌরের গদাধর প্রীতি অনন্যসাধারণ । কিন্তু এই প্রীতির রূপ পালটাইয়া গিয়াছে । কৃষ্ণ রাধার ভাব-সাজ পরিলেন—শ্রীরাধা রিক্তভাবে দাঁড়াইলেন, ইহাই শ্রীগদাধরমূর্ত্তি । গৌরের রাধাভাবে কৃষ্ণারাধনার অন্তরালে শ্রীগদাধরের প্রিয়তমে সর্ব্বস্ব অর্পণের পর নগ্ন মহিমাময়মূর্ত্তি নিরীক্ষণে লুব্ধ নয়ন, অন্তরঙ্গ জনের সুরীক্ষ্ণ প্রেমলুব্ধ পিপাসু-দৃষ্টিতে প্রতিফলিত হইল । উপাস্য উপাসক সাজিলেন । উপাসক উপাসনার উপায়নের উৎস পর্য্যন্ত উপাসকরূপ উপাস্যের সমীপে অর্পণ করিয়া সর্ব্বাত্মার্পণের ধন্য মূর্ত্তিতে দাঁড়াইলেন । তাহাতে উপাস্যের উপাসকের প্রতি যে আকর্ষণ বা প্রীতি, সেই অমূল্যধন লাভের আশায় গৌরজন গদাধরের আনুগত্যে শ্রীগৌরাঙ্গভজনরূপ অপূর্ব্বভজন পন্থা ও ভজন ফলের আবিষ্কার করিলেন । শ্রীরাধার বিপ্রলম্ভরস অধিকতর উন্নতভাবে গদাধর জনের আস্বাদনের বিষয় হইল ।

গদাই-গৌরাঙ্গ জয় জাহ্ণবা জীবন ।
সীতাপতি জয় শ্রীবাসাদিভক্তগণ ॥

 


শ্রীগৌড়ীয়-দর্শন, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা
২১শে শ্রীধর, ২৭শে শ্রাবণ, ১২ই আগষ্ট, রবিবার, গৌরাব্দ ৪৭০, বঙ্গাব্দ ১৩৬৩, ইং ১৯৫৬


 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥