শাশ্বত সুখনিকেতন


দ্বিতীয় অধ্যায়
সুখনিকেতন

 

যেখানে আছে আমাদের নিজেদের বাড়ী , আমাদের সুখনিকেতন, সেখানেই আছে আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমস্ত রকমের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম । সব কিছুই সেখানে আছে । এ এমন এক জায়গা যেখানে সহজতঃই বিশ্বাস, ভালবাসা, স্নেহপ্রীতির স্বতঃস্ফূর্ত্ত আদানপ্রদান রয়েছে । সেখানে যে সুখশান্তি, নিরাপত্তা, সৌন্দর্য্য প্রেম ইত্যাদি আছে তা আমাদের পক্ষে অচিন্ত্যনীয় । তাই উপনিষদ আমাদের এই উপদেশ দেন,“সেই অচিন্তনীয় ভূমিকে তোমরা যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা কোর না । সেই চিন্ময় জগতের অস্তিত্ব তোমাদের চিন্তাশক্তির বাইরে । সেই জগৎ অন্য নিয়মে চলে । তোমাদের এই জগতের অঙ্কের মাপজোক হিসেব নিকেশের দ্বারা তোমরা কেবল ঘনবস্তু ও বিন্দু ও রেখার সঙ্গে পরিচিত আছে । বর্ত্তমানে তোমরা এই ঘনবস্তুর জগতের জীব, আর রেখা ও বিন্দুর সঙ্গেও তোমাদের একটা সীমিত যোগাযোগ আছে, অস্পষ্ট ভাবে । সুতরাং সেই চিন্ময় বস্তু, যার সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান বা ধারণা নেই, তাকে তোমরা কেমন করে মেপে নেবে ? সেই জগতের রীতিনীতি , সেখানকার জীবনযাত্রা সবই তোমাদের কাছে সম্পূর্ন অজানা, তাই তা নিয়ে তোমরা বিতর্ক করতে পার না । সেই জগতের প্রকৃতি একেবারে অন্যরকম ।"

যদি আমাদের ধারণা সীমাবদ্ধ থাকে জলের প্রকৃতি সম্বন্ধে তবে তাঁর দ্বারা আমরা হাওয়ার সম্বন্ধে কি ধারণা করতে পারি ? আর যদি হাওয়ার প্রকৃতি সম্বন্ধে কিছু জানা থাকে তবে কি তাঁর দ্বারা আমরা আকাশের পরিমাপ করতে পরি ? “তাই তোমাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার গবেষণাগারে এমন সব বস্তু আমদানি করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পোড়ো না, যার প্রকৃতি তোমাদের চিন্তাশক্তির আওতায় আসে না । সেটা কেবল মূর্খতা ।”

উচ্চতর বস্তুর, চিন্ময় বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু এ জগতের সাধারণ লোকের সে সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই । আমাদের জ্ঞান আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ । এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু জ্ঞান আমাদের নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু সেই জ্ঞানের মান ও পরিমাণ খুব সামান্য । যা আমাদের নাগালের বাইরে তার পরিমাপ করার প্রচেষ্টা আমরা করতে পারি না । কিন্তু যাঁদের সেইসব বস্তু সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা যদি আমাদের কাছে সে সম্বন্ধে কিছু বলেন তাহলে আমাদের খানিকটা ধারণা হতে পারে এবং আমরা সে সম্বন্ধে একটা তুলনামূলক বিচারও করতে পারি । যেমন, একজন গবেষক, যাঁর আকাশ সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান আছে , তিনি একরকম বলেছেন । অন্য একজন গবেষক—তাঁরও আকাশ সম্বন্ধে জ্ঞান আছে,—তিনি এ সম্বন্ধে আরও অন্য কিছু বলেছেন । এইভাবে তাঁদের গবেষণা ও তাঁদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থেকে আমাদেরও কিছু ধারণা হতে পারে ।

যাঁরা তাঁদের গবেষণার টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন আমরা তাঁদের গবেষণা সম্বন্ধে একটা একটা তুলনামূলক বিচার করতে পারি । আমরা দেখব যে একজন গবেষক তাঁর টেলিস্কোপ ব্যবহার করে একরকমের গবেষণা করেছেন ও আর একজন তাঁর টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আর একরকমের গবেষণা করেছেন । এ সম্বন্ধে যে জ্ঞান আমাদের হল তার থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে হয়ত কোন বিশেষ টেলিস্কোপ কোন বিশেষ গবেষণার ক্ষেত্রে অন্য টেলিস্কোপ থেকে বেশী ক্ষমতাশালী । সুতরাং আমাদের নিজেদের টেলিস্কোপ না থাকলেও আমাদের একটা সীমিত ক্ষমতা আছে, যা আমাদের দৃষ্টিশক্তির বাইরে, যার দ্বারা টেলিস্কোপে যা আবিস্কার করা হয়েছে , সে সম্বন্ধে একটা তুলনামূলক বিচার করাও সম্ভব ।

সেইরকম সেই চিন্ময় বস্তু যাকে হৃদয়ের “টেলিস্কোপ” বা আত্মার “টেলিস্কোপ” দিয়ে দেখা যায়, শাস্ত্র থেকে আমরা তাঁর সম্বন্ধেই জানতে পারি । সাধুরা এই বিষয় সম্বন্ধে অবগত আছেন আর সেই চিন্ময় ভূমিতে প্রবেশ করতে গেলে আমাদের তাঁদেরই সাহায্য নিতে হবে । বর্ত্তমানে আমাদের সেই চিন্ময় জগৎ সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই । কিন্তু ক্রমে ক্রমে সাধু ও শাস্ত্রের আনুগত্যে তাঁদের সাহায্য নিয়ে, আমরাও সেইরকম “টেলিস্কোপ” পেতে পারি যার দ্বারা সেই উচ্চতর, চিন্ময় অভিজ্ঞতা আমাদের হতে পারে ।

স্বে স্বেঽধিকারে যা নিষ্ঠা স গুণঃ পরিকীর্ত্তিতঃ ।

শ্রীমদ্ভাগবতম্ (১১/২১/২)

অর্থাৎ “যার যেখানে অধিকার আছে তাঁর সেখানে নিষ্ঠা থাকাই তার গুণ ।” সুতরাং যে বিষয়ে অধিকার জম্মায়নি , সে বিষয়ে তর্ক বিতর্ক করা উচিত নয় ।

“অচিন্ত্যা খলু যে ভাবা ন তাংস্তর্কেন যোজয়েৎ” অর্থাৎ অচিন্ত্য ভাবে তর্ক যোজনা করবে না, প্রাচীন পন্ডেতগণ এই উপদেশ দিয়েছেন, যেহেতু অচিন্ত্য বিষয়ে তর্ক কখনই প্রমাণরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে না ।

সুতরাং একটা তর্কের প্রবণতা এসে যেন অন্য সবকিছুকে ঢেকে না দেয় । তর্কই সব নয়, এমন নয় যে সমস্ত রকমের বিশ্বাস কেবল যুক্তি তর্ককেই আশ্রয় করে থাকবে । চিন্ময় জগৎ হল অচিন্ত্য , ধারণার অতীত, তবুও আমাদের নিজের নিজের ক্ষমতা , বিশ্বাস ও উপলব্ধি অনুযায়ী তাকে আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে । সবার উপরে এই ধারণাটা আমাদের মনের মধ্যে রাখতে হবে যে মাধুর্য্য হল মধুর আর সত্য হল সত্য আর সেখানে আমরা তারই পরম পরাকাষ্ঠা দেখছি । কিন্তু এখানকার কোন মাপকাঠি নিয়ে আমরা সেই চিন্ময় জগতের পরিমাপ করতে পারি না ।

যদি একজনের চোখ থাকে আর একজনের না থাকে, তাহলে যে অন্ধ সে নিশ্চয়ই যার চোখ আছে, তাঁর সাহায্য নেবে । আমাদের ভিতরে কি আছে সে সম্বন্ধে আমরাও নিশ্চয়ই অন্ধ তা না হলে আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিই কেন ? আমরা যা দেখতে পাই না চিকিৎসক তা দেখতে পান; তিনি প্রথমে আমাদের রোগনির্ণয় করবেন তারপর আমাদের চিকিৎসা শুরু হবে । স্বভাবতঃই তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকবে এবং তাঁর সাহায্যের জন্যে তাঁকে আমরা কিছু দক্ষিণাও দেব—এ তো খুবই যুক্তিযুক্ত ।

সেইরকম গুরুদেব হলেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক । তাঁর যোগ্যতাও আমরা তখনই বুঝতে পারব যখন আমরা দেখব তিনি যা বলছেন সে সবই সত্য, তা কাল্পনিক নয় । এইরকমের দর্শনও নির্ভর করবে আমাদের চোখের দৃষ্টি কতখানি খুলেছে তাঁর উপর । যিনি অন্ধ, কোন সুযোগ্য চিকিৎসক যদি তাঁর চিকিৎসা করেন, তবে তিনিও ক্রমশঃ ক্রমশঃ দেখবেন যে “হ্যাঁ আমি কিছু কিছু দেখতে পাচ্ছি, আমার এখন কিছু চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ঘটছে ।” এই ঘটনার পর থেকে তিনি আর অন্য অন্ধ লোকেরা যেসব কল্পনাপ্রসূত মতামত জাহির করে, তার কোন দাম দেবেন না । কারণ তিনি তো এখন নিজের চোখেই সব দেখতে পাচ্ছেন । এই দৃষ্টিশক্তি পাওয়ার ফলেই তিনি বুঝবেন যে তিনি যে ঔষধ ব্যবহার করেছেন তাতেই সত্যিকারের কাজ হয় ।

বৈজ্ঞানিক বিষয়কেও আমরা এইভাবেই বুঝি । প্রথমদিকে মাইকেল ফ্যারাডে যখন ইলেকট্রিসিটি বা বিদ্যুতের নিয়মকানুন আবিস্কার করছিলেন তখন অনেকেই তা শুনে উপহাস করেছিল । “এটা কি ব্যাপার ? এটা একটা ছেলেমানুষী কৌতূহল মাত্র । এই ইলেকট্রিসিটি আমাদের কি কাজে লাগবে ?” যখন ফ্যারাডে তাঁর গবেষণার ফল প্রদর্শন করছিলেন তার একটা বিবরণ আমি কোথাও পড়েছিলাম । তিনি একটা যন্ত্রের সাহায্যে বিদ্যুৎপ্রবাহ সৃষ্টি করলেন । তারপর দেখালেন যে কতকগুলো ছোট ছোট কাগজের টুকরো সেই বিদ্যুৎতরঙ্গ দ্বারা চালিত হয়ে এদিক ওদিক নড়ছে । অনেকেই তাঁর এই আবিস্কার দেখে সন্তুষ্ট হলেন । কিন্তু একজন ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, “কিন্তু এত কান্ডের পর, মিষ্টার ফ্যারাডে, আপনার এই বিলাসিতার খেলা থেকে কারো কি সত্যিকারের উপকার হবে ?” তখন ফ্যারাডে বললেন, “আপনি কি বলতে পারেন, একটি নবজাত শিশুই বা আমাদের কি কাজে লাগে ?” তাঁর বক্তব্য ছিল এই যে একটি শিশু যখন ভূমিষ্ট হয় তখন অন্য সকলে তার দেখাশোনা করে, কিন্তু সেই শিশু যখন বড় হয়, প্রাপ্তবয়স্ক হয় তখন তার শক্তি, তার দক্ষতার দ্বারা অনেক কাজ হবে । সেইরকম অনেকে মনে করেন যে ভগবৎচিন্তা একটি বিলাসিতা বা ফ্যাশন বা ছেলেখেলা—এর কোন সত্যিকারের উপযোগিতা নেই । কিন্তু সেই ভগবৎচিন্তাই যখন খুব প্রগাঢ় ও ঐকান্তিক হয়ে ওঠে, তখন সেই অভিজ্ঞতা যাঁদের হয় তাঁদের কাছে এ জগতের অন্যসব কাজকর্ম্ম—তা যতই জরুরী হোক না কেন, তা মূল্যহীন মনে হয় । কেন না আমাদের চরম আকাঙ্খা হল এই যে আমরা বাঁচতে চাই । মরতে আমরা কখনই চাই না । আমাদের সকলের মধ্যেই এই বাঁচার ইচ্ছে সবচেয়ে প্রবল, এই বাঁচার তাগিদই সবচেয়ে বড় জিনিস । এটা কেউই অস্বীকার করতে পারে না যে তারা সকলেই বাঁচতে চায়, শুধু তাই নয়, বাঁচার মত বাঁচতে চায়, সুখী হয়ে, সচেতন হয়ে বাঁচতে চায় । সমস্ত রকমের দুঃখকষ্ট থেকেও আমরা মুক্তি চাই ।

যখন কারোর ভিতরে ভগবৎচেতনা জেগে ওঠে তখন সে খুব পরিস্কারভাবেই বুঝতে পারে যে এই জগতের সমস্যাটা কি ; তখন তার মনে হয়, “কেন এই জড়জগতে সবাই এক অলীক জিনিসের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে ? সকলেই এ জগতে সুখ চায়, কিন্তু সকলেই এখানে এক কাল্পনিক, অলীক সুখের পিছনে ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে ।”

জড় জিনিসে, মর্ত্ত জিনিসে কখনও সুখ থাকতে পারে না । আমরা এই নশ্বর, জড় জগতের সঙ্গে একটা লেনদেন করছি, একটা ব্যবসা করছি, কিন্তু এর থেকে কখনই আমাদের সত্যিকারের সুখ বা সন্তোষ আসতে পারে না । এখানকার এই সুখের প্রচেষ্টায় কেবল আমাদের শক্তিই ক্ষয় হবে । একদিক থেকে আমরা সংগ্রহ করব, আর একদিক থেকে তা ক্ষয় হয়ে যাবে । কোন বিচক্ষণ মানুষ কখনও এই ধরণের শক্তিক্ষয়কে, এইধরণের অপচেষ্টাকে তাঁর জীবনের লক্ষ্য বলে মেনে নিতে পারেন না । যিনি বিচক্ষণ তিনি বুঝবেন যে এছাড়াও অন্য একস্তরের জীবনযাত্রা নিশ্চয়ই আছে । তিনি বুঝবেন যে এই নশ্বর সংসারে যে জীবন মৃত্যুর খেলা চলছে তিনি সেই খেলা আর খেলতে চান না । এই নশ্বর লেনদেনের অংশীদার তিনি আর হতে চান না । তাঁর এই উপলব্ধি হবে যে, “আমি তো অমৃতের সন্তান ! আমি তো সেই চিন্ময় জগতেরই বাসিন্দা । তবুও কেমন করে জানিনা আমি এই নশ্বর অস্তিত্বের বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেছি । এখন কোনরকমে যদি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে যেতে পারি, তবেই আমি আমার স্বস্থানে ফিরে যেতে পারব ।” তিনি বুঝবেন যে তাঁর যে স্বরূপ, তাঁর যে আত্মা,—যে কিনা চেতনা ও অনুভূতির আধার—সে এক অন্য জগতের বাসিন্দা । কিন্তু আপাততঃ তিনি এই নশ্বর ও ক্লেশকর জড় জগতে বন্দী হয়ে আছেন । আর এই জগৎ বড় দুঃখময় । তাঁর এই উপলব্ধির জোরেই তিনি চিন্ময় জগতের দিকে যাত্রা করার শক্তি পাবেন । এই উপলব্ধিই তাঁর প্রগতির পথে সহায় হবে ।

যতই আমাদের জীবনে চিন্ময় উপলব্ধি আসবে, যতই আমরা তাঁর অপ্রাকৃত প্রমাণ দেখবো, ততই আমাদের মনে হবে যে “হ্যাঁ, এখন আমি যা দেখছি, যা শুনছি ,যে অভিজ্ঞতা আমার হচ্ছে, তা আমার কাছে আমার চারপাশের জগৎ থেকে অনেক বেশী বাস্তব,অনেক বেশী সত্য । বরং এই জগতকেই আমার অস্পষ্ট, কুহেলিকাময় মনে হচ্ছে । কিন্তু এই চিন্ময় জীবনের পথে আমি যা দেখছি ও শুনছি তাঁর মধ্যে কোন কুহেলিকা নেই, তা সবই সন্দেহাতীত ভাবে সত্য ।”

আত্মার সঙ্গে, শ্রী ভগবানের সঙ্গে , শ্রীভগবানের দিব্যধামের সঙ্গে একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হওয়া খুবই সম্ভব । বরং আমরা এখন যেখানে আছি সেখানকারই সব যোগাযোগ হল পরোক্ষ । এই জগতের সঙ্গে কোন অভিজ্ঞতা হওয়ার আগে প্রথমে আমাদের ইন্দ্রিয়দ্বারা, চোখ, কান ইত্যাদি দ্বারা অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে হবে, তারপর সেই অভিজ্ঞতা যাবে মনের কাছে, যাতে মন তাঁর বিশ্লেষণ করতে পারে । কিন্তু আত্মার জগতে আমরা সবকিছু প্রত্যক্ষ ভাবে উপলব্ধি ও অনুভব করতে পারি, অন্য কোন যন্ত্রের (যেমন ইন্দ্রিয়ের) সাহায্য ছাড়াই ।

অনুবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে আমরা এক জিনিস দেখি আর খালি চোখে আর এক জিনিস দেখি । দুটোর মধ্যে তফাৎ আছে । চোখ, কান ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমাদের এ জগৎ সম্বন্ধে একরকমের অভিজ্ঞতা হয় । কিন্তু যখন আমরা আত্মার জগতে প্রবেশ করি তখন এই নেতিবাচক জড়জগতে আমাদের যে তথাকথিত উন্নতি বা সমৃদ্ধি হয়েছে তার থেকে যদি আমরা নিজেদের সরিয়ে ফেলতে পারি, তবেই আমাদের এক নতুন উপলব্ধি হবে । তখন আমরা অনুভব করব, “ও, এই হল আমার আত্মার স্বরূপ !” তখন আমি প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয়াদি যন্ত্র বা কোনরকমের বাহ্যিক সাহায্য ছাড়াই, উপলব্ধি করব যে কে আমি ।

আত্মা নিজেকে দেখতে পারে, নিজের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে ও আত্মদর্শনের দ্বারা নিজের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারে । অন্য কোন যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই, কেবলমাত্র আত্মদর্শনের দ্বারাই আত্মার নিজের সম্বন্ধে সর্ব্বরকমের তত্ত্বের সম্যক ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হতে পারে । তখন সে বুঝবে তাঁর প্রকৃত বাসভূমি কোথায় । তখন সেই চিন্ময় জগৎ সম্বন্ধে তাঁর একটা উপলব্ধি হবে । আর চিন্ময় জগতের সেই অমৃতময় স্বাদ পেয়ে সে আবিস্কার করবে,“আমার মৃত্যু নেই ।”

এই জড়জগৎ হল ভুল ধারণার জায়গা যেখানে প্রকৃত তত্ত্ব বিকৃত হয়ে যায় । কিন্তু সেই উচ্চতর জগতে এই রকমের ভুল ধারণার কোন সম্ভাবনা নেই । একবার সেখানে প্রবেশ করলে আমাদের ধ্যান ধারণা—তা যতই সীমাবদ্ধ হোক না কেন, খুব স্পষ্ট হবে ও তা কেবল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে । সেই অভিজ্ঞতা যারই হবে তারই শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস খুব দৃঢ় হবে এবং সে চাইবে সুদৃঢ় সঙ্কল্পের সঙ্গে সেই পথে এগিয়ে যেতে ।

সক্রেটিস বুঝতে পেরেছিলেন যে আত্মার মৃত্যু নেই । তাঁর এই উপলব্ধি এত প্রগাঢ় ছিল যে তিনি এই পৃথিবীতে তাঁর বেঁচে থাকার কোন মূল্য আছে বলে মনে করেননি । তিনি এই জগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগকে খুব অবহেলার সঙ্গে ছিন্ন করে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আত্মা হল মৃত্যুহীন । যীশুখ্রীষ্টেরও ভগবানের উপর, তাঁর প্রভুর উপর এত গভীর বিশ্বাস ছিল যে তিনি এ জগতের সুখ দুঃখ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন । এ জগতের সব সুখ দুঃখকে তিনি খুব অবহেলার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ।

অনেক কিছুই, যা এই রক্তমাংসের চোখে অদৃশ্য, তা জ্ঞান-উম্মিলীত চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় । আমরা এই সিদ্ধান্ত সহজেই নিতে পারি যে জ্ঞানের দৃষ্টিতে যা দেখা সম্ভব, তা রক্তমাংসের দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব নয় । ঠিক সেইরকম আর গভীর নিগূঢ় দৃষ্টি আছে যার দ্বারা আমরা সব কিছু অন্যভাবে, এক নতুন আলোকে, এক আশাপ্রদ, আশ্বাসময় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি । সেই চিন্ময় জগতের চিন্ময় দৃষ্টি যেন আমাদের ডাক দিয়ে বলছে, “এসো, দেখো এই অভাবনীয়, অচিন্ত্যনীয় বস্তু !” যে চোখে ছানি পড়েছে সে চোখ দেখতে পায় না, কিন্তু চোখের ছানি কাটিয়ে নিলেই সে দেখতে পায় । অজ্ঞানতা হল চোখের ছানির মত, তা আমাদের অন্ধ করে রাখে । এমনিতে আমাদের দৃষ্টি খুব অগভীর, কিন্তু অন্য এক গভীর দৃষ্টির দ্বারা আমরা অনেক কিছুই দেখতে পাই । এই চোখের পিছনে যখন জ্ঞান চক্ষু সংযোজিত হয়, তখন অনেক কিছুই আমাদের দৃশ্যগোচর হয় এবং উত্তরোত্তর গভীর হয় সেই দৃষ্টি ।

সর্ব্বদা আমরা যা দেখছি সেই বাহ্যিক দৃষ্টির কোন মূল্য নেই । যাঁর দৃষ্টিশক্তির গভীরতা আছে তাঁরই দর্শনের মূল্য আছে । সকলেই বা সবকিছু সমানও নয় । যাঁরা জ্ঞানী বিচক্ষণ ও সত্যদ্রষ্টা তাঁদের মধ্যেও কনিষ্ঠ, মধ্যম ও উত্তমের ভেদ আছে । উপলব্ধিরও তারতম্য আছে এবং প্রত্যেকের দর্শন তাঁর নিজের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী হবে ।

এটা আমরা খুব সহজেই দেখতে পাচ্ছি যে বর্ত্তমানে আমরা এই মৃত্যুময় জগতের বাসিন্দা । কিন্তু কিসের দ্বারা আমরা তাঁর সঙ্গে জড়িত ? আমাদের এই দেহটাই এই জগতের বাসিন্দা । যদি আমরা এই দেহের স্তরের উপরে উঠতে পারি তখন আমরা মনের স্তরে পৌঁছাব, সেখান থেকে আমরা বুদ্ধির স্তরে যেতে পারি । তারপরে আমরা আত্মার স্তরে পৌঁছাব । তখন আমরা দেখব যে, যে ভুমিতে আত্মা বাস করে তা হল নিত্য, এবং আত্মাও নিত্য । সেখান থেকে আমরা পরমাত্মার সন্ধানে যেতে পারি যিনি আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনার উৎস । পরমাত্মা হলেন সূর্যের মত, যে সূর্য সব আলোকরশ্মির উৎস । একবার সূর্যের কোন আলোকরশ্মিকে দেখতে পেলে তাকে ধরে আমরা সেই সূর্যের দিকে এগোতে পারি, যে সূর্য সব আলোকরশ্মির উৎস । তেমনি যখন আমাদের নিজেদের স্বরূপ সম্বন্ধে একটা ধারণা হবে, যখন আমরা নিজেদের অনুচেতনা বলে জানব, তখনই আমরা পূর্ণচেতনার সন্ধানে যেতে পারি, যে পূর্ণচেতনার ভূমিতে সবকিছু অনন্ত ও সৎচিদানন্দময় । এইভাবে আমরা, যিনি অনাদি ও সর্ব্বকারণের কারণ, তাঁর দিকে এগোতে পারি । কিন্তু শুধু নিজেদের ইচ্ছা ও স্বাধীনতার জোরেই সেখানে আমরা যেতে পারি না । সেই চিন্ময় ভূমি থেকেও কোনও সাহায্য আমাদের অবশ্যই দরকার । সেই সাহায্য আসবে গুরুদেবের মাধ্যমে, বৈষ্ণবের মাধ্যমে । তাঁদের সাহায্য নিলেই আমাদের লক্ষ্যসাধনের পথে সত্যিকারের উন্নতি হবে । বর্ত্তমানে আমরা মনে করি যে আমাদের চারপাশে যা দেখছি সে সবকিছুরই আমরা প্রভু বা মালিক । কিন্তু আমরা যা দেখছি সে সবই তো ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর । আর সে সব কিছু থেকেই আমাদের জীবনে একটা প্রতিক্রিয়া বা কর্ম্মফল আসবে । এখানকার সব কিছু খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখব যে এখানে সবকিছুরই একটা প্রতিক্রিয়া আছে । আজ এখানে যা সুখের, কাল এখানে তা দুঃখের হয়ে যাবে । তাই আমাদের অন্য কোথাও একটা মঙ্গলময় অবস্থান খুঁজে নিতে হবে, যে শুভ মঙ্গলময় ক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে আমাদের আপন গৃহ তৈরী করতে পারি ।সেই মঙ্গলময় ভূমির সন্ধানে যখন বেরোব, তখন দেখব যে আমাদের সেই আপন গৃহের, সেই পরম আনন্দময় সুখনিকেতনের অস্তিত্ব রয়েছে আর সেই সুখনিকেতন হল নিখুঁত ও সর্ব্বাঙ্গসুন্দর । “এসো, এবার তোমরা নিজেদের বাড়ীতে ফিরে এসো, শ্রীভগবানের কাছে ফিরে এসো, তোমাদের সুন্দর মধুর সুখনিকেতনে ফিরে এসো ।” এই ধরণের একটা আহ্বান, একটা অনুভূতি আমরা নিজেদের ভিতরে উপলব্ধি করব তখনই, যখন সেই চিন্ময় জগতের প্রতিনিধি হয়ে যাঁরা এসেছেন তাঁদের কৃপা পাওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হবে । তাঁরা আমাদের হাত ধরে সেই জগতের দিকে নিয়ে যাবেন । তখন আমাদের আপন বাসভূমি কেমন সে সম্বন্ধে আমাদের একটা স্পষ্ট ধারণা হবে, সেই জগতের সঙ্গে আমরা একটা ঘনিষ্ঠতা অনুভব করব ।

প্রথম প্রথম আমাদের মনে হতে পারে যে আমরা একটা অজানা, অচেনা জায়গায় যাচ্ছি । আমার বর্ত্তমান পরিবেশে চারিদিকে কত অসংখ্য মানুষ, কত প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে । কিন্তু যেখানে আমি যেতে চাইছি সে জায়গাটা কেমন আমি জানি না । আমার কাছে সে জায়গাটা যেন কাল্পনিক, ধোঁয়াটে বলে মনে হচ্ছে । কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি আমরা সেইদিকের যাত্রা শুরু করি, তাহলে ক্রমশঃ দেখবো যে সবকিছুর প্রকৃত অস্তিত্ব সেই দিকেই আছে, যে দিকে সবকিছু সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত । তখন আমরা বুঝব যে এই জড়জগৎ খুবই ক্ষুদ্র ও সীমিত এবং সত্যের কণামাত্র এখানে পাওয়া যায় ।

এখানে বাস করে আমরা মনে করতে পারি যে বেশীর ভাগ জীবের অস্তিত্ব এখানেই আছে, কেবল বিশেষ কয়েকজন, যেমন সক্রেটিস, মহম্মদ বা বুদ্ধ প্রমুখ ব্যক্তিরা সেই মৃত্যুহীন জগতে যান । কিন্তু ক্রমশঃ আমাদের এই উপলব্ধি হবে যে জড়জগতকে আমরা দেখছি তার চেয়ে চিন্ময় জগৎ যে শুধু বৃহত্তর তাই নয়, সে জগৎ অসীম, অনন্ত । ক্রমশঃ আমরা বুঝব যে যেমন কোন দেশে স্বল্পসংখ্যক লোক হাসপাতালে বা জেলখানায় কষ্ট পাচ্ছে, সেইরকম স্বল্প সংখ্যক জীবই দন্ডিত হয়ে এ জগতে কষ্ট পেতে আসে । এই ধারণা যতই স্পষ্ট হবে ততই আমরা সেইদিকে যাত্রা করার উৎসাহ পাবো । নিজেদের বাড়ীর দিকে ছুটে চলার গতিও ততই দ্রুত হবে—“চল এবার বাড়ী যাই, আর দেরী করা নয় ।” আর বাড়ী যতই কাছে আসবে ততই আরও জোরে ছুটব, “এই যে এসে গেছে আমার নিজের দেশ !”

বর্ত্তমানে আমরা বহির্জগতে আছি আর আমাদের মনও বহির্মুখী হয়ে আছে । অসহায়ের মত আমরা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি । শ্রীভগবানের প্রতিনিধিদের কৃপাই আমাদের একমাত্র আশাভরসা । তাঁরা এসে পতিত আমাদের তুলে ধরেন আর সাবধান করে দেন, “কি করছ তোমরা ? এদিকে যেও না, এ দেশ বিপদের দেশ, মৃত্যুর দেশ । এসো আমার সঙ্গে, আমি তোমাকে অমৃতের দেশে নিয়ে যাবো ।” ভগবানের এই প্রতিনিধিরা আসেন আমাদের ঘুম থেকে তুলে দেওয়ার জন্যে, আমাদের তামসিক উন্মত্ততার ঘোর কাটিয়ে দেওয়ার জন্যে । তাঁরাই হলেন বৈষ্ণব আর শাস্ত্রও তাঁরাই দিয়েছেন, যে শাস্ত্র সেই অন্য জগতের কিছু ইতিহাস, কিছু বিবরণ আমাদের দিয়েছে আর যে সাধুরা সেখানে গেছেন তাঁদের কথাও বলেছে । শাস্ত্রের সাহায্যে আমাদের শ্রদ্ধা আরও উন্নত হবে এবং আমরা আরও বেশী সাধুসঙ্গে থাকবো । এইভাবে আমাদের দ্রুত উন্নতি হবে ।

সত্যিকারের উন্নতি হচ্ছে কি না হচ্ছে তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পন্থা হচ্ছে নিজেরই “হৃদয়েনাভ্যনুজ্ঞাতো”—সাধক নিজের হৃদয় থেকেই এই সমর্থন পাবেন যে, হ্যাঁ তাঁর সত্যিকারের উন্নতি হচ্ছে । তা নাহলে তো যে কোন মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে যে কোনদিকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে আর পরিণামে কিছুদিন পরে তাঁকে পস্তাতে হবে । কিন্তু সেইরকমের একটা লেনদেনের মধ্যে কোন যথার্থতা নেই, তা হল অসত্য, ফাঁকি, ধাপ্পাবাজি । ধর্ম্মের নামে এইরকম কত কিনা চলে এ যেন একটা ব্যবসা । কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রকৃত সত্যের উপলব্ধি বলে কিছু নেই, প্রকৃত মুক্তি বলে কিছু নেই । “হৃদয়েনাভ্যনুজ্ঞাতো”—সেই হল চরম প্রমাণ যখন নিজের হৃদয় থেকে সমর্থন আসবে যে, “হ্যাঁ, এই হল সেই সত্য বস্তু যা আমি চাই । আমার হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে এর জন্য উল্লসিত সমর্থন আসছে । আর আমার হৃদয় আনন্দে নৃত্য করছে এই ভেবে যে এমন উজ্জ্বল, অমৃতময় সম্ভাবনা আমার আছে ।”

 


 

← ১. শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন ৩. যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা →

 

সূচীপত্র:
মুখবন্ধ
১. শোষণ, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন
২. সুখনিকেতন
৩. যথার্থ জিজ্ঞাসা ও যথার্থ প্রচেষ্টা
৪. সুবর্ণ সুযোগ
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥