শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


—: শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য :—

একাদশ অধ্যায় : শ্রীশ্রীকোলদ্বীপ, শ্রীসমুদ্রগড়, শ্রীচম্পাহট্ট ও শ্রীজয়দেব-কথা বর্ণনা

(শ্রীশ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর রচিত)

 

জয় জয় শ্রীচৈতন্য জয় নিত্যানন্দ ।
জয়াদ্বৈত শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ ॥
জয় জয় গৌড় ভূমি সর্ব্বভূমি সার ।
যথা নাম সহ শ্রীচৈতন্য অবতার ॥
নিত্যানন্দপ্রভু বলে শুন সর্ব্বজন ।
পঞ্চবেণী রূপে গঙ্গা হেথায় মিলন ॥
মন্দাকিনী অলকা সহিত ভাগীরথী ।
গুপ্তভাবে হেথায় আছেন সরস্বতী ॥
পশ্চিমে যমুনা সহ আইসে ভোগবতী ।
তাহাতে মানস গঙ্গা মহা বেগবতী ॥
মহা মহা প্রয়াগ বলিয়া ঋষিগণে ।
কোটী কোটী যজ্ঞ হেথা কৈল ব্রহ্মা সনে ॥
ব্রহ্মসত্র স্থান এই মহিমা অপার ।
হেথা স্নান করিলে জনম নহে আর ॥
ইহার মহিমা কেবা বর্ণিবারে পারে ।
শুষ্কধারাসম কোন তীর্থ হইতে নারে ॥
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে ত্যজিয়া জীবন ।
সর্ব্বজীব পায় শ্রীগোলোক বৃন্দাবন ॥
কুলিয়াপাহাড় বলি খ্যাত এই স্থান ।
গঙ্গাতীরে উচ্চভূমি পর্ব্বত সমান ॥
কোলদ্বীপ নাম শাস্ত্রে আছয় বর্ণন ।
সত্যযুগ কথা এক শুন সর্ব্বজন ॥
বাসুদেব নামে এক ব্রাহ্মণ কুমার ।
বরাহ দেবের সেবা করে বারবার ॥
শ্রীবরাহমূর্ত্তি পূজি করে উপাসনা ।
সর্ব্বদা বরাহ দেবের করয় প্রার্থনা ॥
প্রভু মোরে কৃপা করি দেহ দরশন ।
সফল হউক মোর নয়ন জীবন ॥
এই বলি কাঁদে বিপ্র গড়াগড়ি যায় ।
প্রভু নাহি দেখা দিলে জীবন বৃথায় ॥
কতদিনে শ্রীবরাহ অনুকম্পা করি ।
দেখা দিলা বাসুদেবে কোলরূপ ধরি ॥
নানারত্ন ভূষণে ভূষিত কলেবর ।
পদ গ্রীবা নাসা মুখ চক্ষু মনোহর ॥
পর্ব্বত সমান উচ্চ শরীর তাঁহার ।
দেখি বিপ্র নিজে ধন্য মানে বারবার ॥
ভূমে পড়ি বিপ্র প্রণমিয়া প্রভুপায় ।
কাঁদিয়া আকুল হৈল গড়াগড়ি যায় ॥
বিপ্রের ভকতি দেখি বরাহ তখন ।
কহিলেন বাসুদেবে মধুর বচন ॥
ওহে বাসুদেব তুমি ভকত আমার ।
বড় তুষ্ট হৈনু পূজা পাইয়া তোমার ॥
এই নবদ্বীপে মোর প্রকট বিহার ।
কলি আগমনে হবে শুন বাক্য সার ॥
নবদ্বীপ সম ধাম নাহি ত্রিভুবনে ।
অতি প্রিয়ধাম মোর আছে সংগোপনে ॥
ব্রহ্মাবর্ত্ত সহ আছে পুণ্য তীর্থ যত ।
সে সব আছয়ে হেথা শাস্ত্রের সম্মত ॥
যে স্থানে ব্রহ্মার যজ্ঞে প্রকাশ হইয়া ।
নাশিলাম হিরণ্যাক্ষ দন্তে বিদারিয়া ॥
সেই স্থান পুণ্যভূমি এই স্থানে রয় ।
যথায় আমার এবে হইল উদয় ॥
নবদ্বীপ সেবি সর্ব্ব তীর্থ বিরাজয় ।
নবদ্বীপ বাসে সর্ব্ব তীর্থ বাস হয় ॥
ধন্য তুমি নবদ্বীপে সেবিলে আমায় ।
শ্রীগৌর প্রকটকালে জন্মিবে হেথায় ॥
অনায়াসে দেখিবে সে মহাসঙ্কীর্ত্তন ।
অপূর্ব্ব গৌরাঙ্গরূপ পাবে দরশন ॥
এতবলি শ্রীবরাহ হৈল অন্তর্দ্ধান ।
দৈববাণী হৈল বিপ্রে বুঝিতে সন্ধান ॥
পরম পণ্ডিত বাসুদেব মহাশয় ।
সর্ব্ব শাস্ত্র বিচারিয়া জানিল নিশ্চয় ॥
বৈবস্বত মন্বন্তরে কলির সন্ধ্যায় ।
শ্রীগৌরাঙ্গপ্রভু লীলা হবে নদীয়ায় ॥
ঋষিগণ সেই তত্ত্ব রাখিল গোপনে ।
ইঙ্গিতে কহিল সব বুঝে বিজ্ঞজনে ॥
প্রকট হইলে লীলা হইবে প্রকাশ ।
এবে গোপ্য এই তত্ত্ব পাইল আভাস ॥
পরম আনন্দে বিপ্র করে সঙ্কীর্ত্তন ।
গৌর নাম গায় মনে মনে সর্ব্বক্ষণ ॥
পর্ব্বত প্রমাণ কোলদেবের শরীর ।
দেখি বাসুদেব মনে বিচারিল ধীর ॥
কোলদ্বীপ পর্ব্বতাখ্য এই স্থান হয় ।
সেই হইতে পর্ব্বতাখ্য হৈল পরিচয় ॥
ওহে জীব নিত্যলীলাময় বৃন্দাবনে ।
গিরিগোবর্দ্ধন এই জানে ভক্তজনে ॥
শ্রীবহুলবান দেখ ইহার উত্তরে ।
রূপের ছটায় সর্ব্বদিক্ শোভা করে ॥
বৃন্দাবনে যে যে ক্রমে দ্বাদশ কানন ।
সে ক্রম নাহিক হেথা বল্লভ নন্দন ॥
প্রভু ইচ্ছামতে হেথা ক্রম বিপর্য্যয় ।
ইহার তাৎপর্য্য জানে প্রভু ইচ্ছাময় ॥
যেইরূপ আছে হেথা দেখ সেইরূপ ।
বিপর্য্যয়ে প্রেমবৃদ্ধি এই অপরূপ ॥
কিছু দূর গিয়া প্রভু বলেন বচন ।
এই যে সমুদ্রগড়ি কর দরশন ॥
সাক্ষাৎ দ্বারকাপুরী শ্রীগঙ্গাসাগর ।
দুই তীর্থ আছে হেথা দেখ বিজ্ঞবর ॥
শ্রীসমুদ্রসেন রাজা ছিল এই স্থানে ।
বড় কৃষ্ণভক্ত কৃষ্ণবিনা নাহি জানে ॥
যবে ভীমসেন আইল নিজ সৈন্য লয়ে ।
ঘেরিল সমুদ্রগড়ি বঙ্গদিগ্বিজয়ে ॥
রাজা জানে কৃষ্ণ এক পাণ্ডবের গতি ।
পাণ্ডব বিপদে পৈলে আইসে যদুপতি ॥
যদি আমি পারি ভীমে দেখাইতে ভয় ।
ভীম আর্ত্তনাদে হরি হবে দয়াময় ॥
দয়া করি আসিবেন এদাসের দেশে ।
দেখিবে সে শ্যামমূর্ত্তি চক্ষে অনায়াসে ॥
এতভাবি নিজ সৈন্য সাজাইল রায় ।
গজবাজি পদাতিক লয়ে যুদ্ধে যায় ॥
শ্রীকৃষ্ণ স্মরিয়া রাজা বাণ নিক্ষেপয় ।
বাণে জর জর ভীম পাইল বড় ভয় ॥
মনে মনে ডাকে কৃষ্ণ বিপদ দেখিয়া ।
রক্ষা কর ভীমে নাথ শ্রীচরণ দিয়া ॥
সমুদ্রসেনের সহ যুঝিতে না পারি ।
ভঙ্গ দিলে বড় লজ্জা তাহা সৈতে নারি ॥
পাণ্ডবের নাথ কৃষ্ণ পাই পরাজয় ।
বড়ই লজ্জার কথা ওহে দয়াময় ॥
ভীমের করুণানাদ শুনি দয়াময় ।
সেই যুদ্ধস্থলে কৃষ্ণ হইল উদয় ॥
না দেখে সে রূপ কেহ অপূর্ব্ব ঘটনা ।
শ্রীসমুদ্রসেন মাত্র দেখে একজনা ॥
নবজলধর রূপ কৈশোর মূরতি ।
গলে দোলে বনমালা মুকুতার ভাতি ॥
সর্ব্ব অঙ্গে অলঙ্কার অতি সুশোভন ।
পীতবস্ত্র পরিধান অপূর্ব্ব গঠন ॥
সেরূপ দেখিয়া রাজা প্রেমে মূর্চ্ছা যায় ।
মূর্চ্ছা সম্বরিয়া কৃষ্ণে প্রার্থনা জানায় ॥
তুমি কৃষ্ণ জগন্নাথ পতিতপাবান ।
পতিত দেখিয়া মোরে তব আগমন ॥
তব লীলা জগজ্জন করয় কীর্ত্তন ।
শুনি দেখিবার ইচ্ছা হইল কখন ॥
কিন্তু মোর ব্রত ছিল ওহে দয়াময় ।
এই নবদ্বীপে তব হইবে উদয় ॥
হেথায় দেখিব তব রূপ মনোহর ।
নবদ্বীপ ছাড়িবারে না হয় অন্তর ॥
সেই ব্রত রক্ষা মোর করি দয়াময় ।
নবদ্বীপে কৃষ্ণরূপে হইলে উদয় ॥
তথাপি আমার ইচ্ছা অতি গূঢ়তর ।
গৌরাঙ্গ হউন মোর অক্ষির গোচর ॥
দেখিতে দেখিতে রাজা সম্মুখে দেখিল ।
রাধাকৃষ্ণ-লীলারূপ মাধুর্য্য অতুল ॥
শ্রীকুমুদবনে কৃষ্ণ সখীগণ সনে ।
অপরাহ্নে করে লীলা গিয়া গোচারণে ॥
ক্ষণেকে হইল সেই লীলা অদর্শন ।
শ্রীগৌরাঙ্গ রূপ হেরে ভরিয়া নয়ন ॥
মহাসঙ্কীর্ত্তনবেশ সঙ্গে ভক্তগণ ।
নাচিয়া নাচিয়া প্রভু করেন কীর্ত্তন ॥
পুরট সুন্দর কান্তি অতি মনোহর ।
নয়ন মাতায় অতি কাঁপায় অন্তর ॥
সেইরূপ হেরি রাজা নিজে ধন্য মানে ।
বহু স্তব করে তবে গৌরাঙ্গ চরণে ॥
কত ক্ষণে সে সকল হৈল অদর্শন ।
কাঁদিতে লাগিল রাজা হয়ে অন্য মন ॥
ভীমসেন এই পর্ব্ব না দেখে নয়নে ।
ভাবে রাজা যুদ্ধে ভীত হৈল এতক্ষণে ॥
অত্যন্ত বিক্রম করে পাণ্ডুর নন্দন ।
রাজা তুষ্ট হয়ে কর যাচে ততক্ষণ ॥
কর পেয়ে ভীমসেন অন্য স্থানে যায় ।
ভীম দিগ্বিজয় সর্ব্ব জগতেতে গায় ॥
এই সে সমুদ্রগড়ি নবদ্বীপ সীমা ।
ব্রহ্মা নাহি জানে এই স্থানের মহিমা ॥
সমুদ্র আসিয়া হেথা জাহ্ণবী আশ্রয়ে ।
প্রভুপদ সেবা করে ভক্ত ভাব লয়ে ॥
জাহ্ণবী বলেন সিন্ধু অতি অল্প দিনে ।
তব তীরে প্রভু মোর রহিবে বিপিনে ॥
সিন্ধু বলে শুন দেবি আমার বচন ।
নবদ্বীপ নাহি ছাড়ে শচীর নন্দন ॥
যদ্যপিও কিছুদিন রহে মম তীরে ।
অপ্রতক্ষে রহে তবু নদীয়া ভিতরে ॥
নিত্যধাম নবদ্বীপ প্রভুর হেথায় ।
প্রকট ও অপ্রকট লীলা বেদে গায় ॥
হেথা তবাশ্রয়ে আমি রহিব সুন্দরী ।
সেবিব শ্রীনবদ্বীপে শ্রীগৌরাঙ্গ হরি ॥
এই বলি পয়োনিধি নবদ্বীপে রয় ।
গৌরাঙ্গের নিত্যলীলা সতত চিন্তয় ॥
তবে নিত্যানন্দ আইলা চম্পাহট্ট গ্রাম ।
বাণীনাথ গৃহে তথা করিল বিশ্রাম ॥
অপরাহ্নে চম্পাহট্ট করয় ভ্রমণ ।
নিত্যানন্দ বলে শুন বল্লভনন্দন ॥
এই স্থানে ছিল পূর্ব্বে চম্পক কানন ।
খদির বনের অংশ সুন্দর দর্শন ॥
চম্পলতা সখী নিত্য চম্পক লইয়া ।
মালা গাঁথি রাধাকৃষ্ণ সেবিতেন গিয়া ॥
কলি বৃদ্ধি হৈলে সেই চম্পক-কাননে ।
মালীগণ ফুল লয় অতি হৃষ্টমনে ॥
হট্ট করি চম্পককুসুম লয়ে বসি ।
বিক্রয় করয় লয় যত গ্রামবাসী ॥
সেই হৈতে শ্রীচম্পকহট্ট হৈল নাম ।
চাঁপাহাটি সবে বলে মনোহর ধাম ॥
যেকাল লক্ষ্মণসেন নদীয়ার রাজা ।
জয়দেব নবদ্বীপে হন তাঁর প্রজা ॥
বল্লালদীর্ঘিকাকূলে বাঁধিয়া কুটীর ।
পদ্মাসহ বৈসে তথা জয়দেব ধীর ॥
দশ অবতার স্তব রচিল তথায় ।
সেই স্তব লক্ষ্মণের হস্তে কভু যায় ॥
পরম আনন্দে স্তব করিল পঠন ।
জিজ্ঞাসিল রাজা স্তব কৈল কোন জন ॥
গোবর্দ্ধন আচার্য্য রাজারে তবে কয় ।
মহাকবি জয়দেব রচয়িতা হয় ॥
কোথা জয়দেব কবি জিজ্ঞাসে ভূপতি ।
গোবর্দ্ধন বলে এই নবদ্বীপে স্থিতি ॥
শুনিয়া গোপনে রাজা করিয়া সন্ধান ।
রাত্রযোগে আইল তবে জয়দেব স্থান ॥
বৈষ্ণব বেশেতে রাজা কুটীরে প্রবেশে ।
জয়দেবে নতি করি বৈসে এক দেশে ॥
জয়দেব জানিলেন ভূপতি এজন ।
বৈষ্ণব বেশেতে আইল হয়ে অকিঞ্চন ॥
অল্পক্ষণে রাজা তবে দেয় পরিচয় ।
জয়দেবে যাচে যাইতে আপন আলয় ॥
অত্যন্ত বিরক্ত জয়দেব মহামতি ।
বিষয়ি গৃহেতে যেতে না করে সম্মতি ॥
কৃষ্ণভক্ত জয়দেব বলিল তখন ।
তব দেশ ছাড়ি আমি করিব গমন ॥
বিষয়ি সংসর্গ কভু না দেয় মঙ্গল ।
গঙ্গা পার হয়ে যাব যথা নীলাচল ॥
রাজা বলে শুন প্রভু আমার বচন ।
নবদ্বীপ ত্যাগ নাহি কর কদাচন ॥
তব বাক্য সত্য হবে মোর ইচ্ছা রবে ।
হেন কার্য্য কর দেব মোরে কৃপা যবে ॥
গঙ্গা পারে চম্পহট্ট* স্থান মনোহর ।
[*“তথা চম্পাং সমাসাদ্য ভাগীরথ্যাং কৃতোদকঃ ।” মহাভারত ।]
সেই স্থানে থাক তুমি দু এক বৎসর ॥
মম ইচ্ছামতে স্বামি তথা না যাইব ।
তব ইচ্ছা হলে তব চরণ হেরিব ॥
রাজার বচন শুনি মহা কবিবর ।
সম্মত হইয়া বলে বচন সত্ত্বর ॥
যদ্যপি বিষয়ী তুমি এরাজ্য তোমার ।
কৃষ্ণভক্ত তুমি তব নাহিক সংসার ॥
পরীক্ষা করিতে আমি বিষয়ী বলিয়া ।
সম্ভাষিনু তবু তুমি সহিলে শুনিয়া ॥
অতএব জানিলাম তুমি কৃষ্ণভক্ত ।
বিষয় লইয়া ফির হয়ে অনাসক্ত ॥
চম্পকহট্টেতে আমি কিছু দিন রব ।
গোপনে আসিবে তুমি ছাড়িয়া বৈভব ॥
হৃষ্টচিত্ত হয়ে রাজা অমাত্য দ্বারায় ।
চম্পকহট্টেতে গৃহ নির্ম্মাণ করায় ॥
তথা জয়দেব কবি রহে দিন কত ।
শ্রীকৃষ্ণ ভজন করে রাগমার্গ মত ॥
পদ্মাবতী দেবী আনে চম্পকের ভার ।
জয়দেব পূজে কৃষ্ণ নন্দেরকুমার ॥
মহাপ্রেমে জয়দেব করয় পূজন ।
দেখিল শ্রীকৃষ্ণ হৈল চম্পক বরণ ॥
পুরট সুন্দর কান্তি অতি মনোহর ।
কোটি চন্দ্র নিন্দি মুখ পরম সুন্দর ॥
চাঁচর চিকুর শোভা গলে ফুলমালা ।
দীর্ঘবাহু রূপে আল করে পর্ণশালা ॥
দেখিয়া গৌরাঙ্গরূপ মহাকবিবর ।
প্রেমে মুর্চ্ছা যায় চক্ষে অশ্রু ঝর ঝর ॥
পদ্মাবতী দেবী সেই রূপ নিরখিয়া ।
হইল চৈতন্যহীন ভূমেতে পড়িয়া ॥
পদ্মহস্ত দিয়া প্রভু তোলে দুই জনে ।
কৃপাকরি বলে তবে অমিয়-বচনে ॥
তুমি দোঁহে মম ভক্ত পরম উদার ।
দরশন দিতে ইচ্ছা হইল আমার ॥
অতি অল্পদিনে এই নদীয়ানগরে ।
জনম লইব আমি শচীর উদরে ॥
সর্ব্ব অবতারের সকল ভক্ত সনে ।
শ্রীকৃষ্ণ কীর্ত্তনে বিতরিব প্রেম ধনে ॥
চব্বিশ বৎসরে আমি করিয়া সন্ন্যাস ।
করিব অবশ্য নীলাচলেতে নিবাস ॥
তথা ভক্তগণ সঙ্গে মহাপ্রেমাবেশে ।
শ্রীগীতগোবিন্দ আস্বাদিব অবশেষে ॥
তব বিরচিত গীতগোবিন্দ আমার ।
অতিশয় প্রিয়বস্তু কহিলাম সার ॥
এই নবদ্বীপধাম পরম চিন্ময় ।
দেহান্তে আসিবে হেথা কহিনু নিশ্চয় ॥
এবে তুমি দোঁহে যাও যথা নীলাচল ।
জগন্নাথে সেব গিয়া পাবে প্রেমবল ॥
এতবলি গৌরচন্দ্র হৈল অদর্শন ।
প্রভুর বিচ্ছেদে মুর্চ্ছা হয় দুই জন ॥
মূর্চ্ছাশেষে অনর্গল কাঁদিতে লাগিল ।
কাঁদিতে কাঁদিতে সব নিবেদন কৈল ॥
হায় কিবা রূপ মোরা দেখিনু নয়নে ।
কেমনে বাঁচিবে এবে তার অদর্শনে ॥
নদীয়া ছাড়িতে প্রভু কেন আজ্ঞা কৈল ।
বুঝি এই ধামে কিছু অপরাধ হৈল ॥
এই নবদ্বীপধাম পরম চিন্ময় ।
ছাড়িতে মানস এবে বিকলিত হয় ॥
ভাল হৈত নবদ্বীপে পশু পক্ষী হয়ে ।
থাকিতাম চিরদিন ধাম চিন্তালয়ে ॥
পরাণ ছাড়িতে পারি তবু এই ধাম ।
ছাড়িতে না পারি এই গূঢ় মনস্কাম ॥
ওহে প্রভু শ্রীগৌরাঙ্গ কৃপা বিতরিয়া ।
রাখ আমা দোঁহে হেথা শ্রীচরণ দিয়া ॥
বলিতে বলিতে দোঁহে কাঁদে উচ্চরায় ।
দৈববাণী সেইক্ষণে শুনিবারে পায় ॥
দুঃখ নাহি কর দোঁহে যাও নীলাচল ।
দুই কথা হবে চিত্ত না কর চঞ্চল ॥
কিছুদিন পূর্ব্বে দোঁহে করিলে মানস ।
নীলাচলে বাস করি কতকদিবস ॥
সেই বাঞ্ছা জগবন্ধু পূরাইল তব ।
জগন্নাথ চাহে তব দর্শন সম্ভব ॥
জগন্নাথে তুষি পুন ছাড়িয়া শরীর ।
নবদ্বীপে দুইজনে নিত্য হবে স্থির ॥
দৈববাণী শুনি দোঁহে চলে ততক্ষণ ।
পাছে ফিরি নবদ্বীপ করেন দর্শন ॥
ছল ছল করে নেত্র জলধারা বহে ।
নবদ্বীপবাসিগণে দৈন্যবাক্য কহে ॥
তোমরা করিয়া কৃপা এই দুই জনে ।
অপরাধ করিয়াছি করহ মার্জ্জনে ॥
অষ্টদল পদ্ম সম নবদ্বীপ ভায় ।
দেখিতে দেখিতে দোঁহে কতদূরে যায় ॥
দূরে গিয়া নবদ্বীপ নাহি দেখে আর ।
কাঁদিতে কাঁদিতে গৌড়ভূমি হয় পার ॥
কতদিনে নীলাচলে পৌঁছিয়া দুজনে ।
জগন্নাথ দরশন কৈল হৃষ্ট মনে ॥
ওহে জীব এই জয়দেব স্থান হয় ।
উচ্চভূমি মাত্র আছে বৃদ্ধলোকে কয় ॥
জয়দেব স্থান দেখি শ্রীজীব তখন ।
প্রেমে গড়াগড়ি যায় করয় রোদন ॥
ধন্য জয়দেব কবি ধন্য পদ্মাবতী ।
শ্রীগীতগোবিন্দ ধন্য ধন্য কৃষ্ণরতি ॥
জয়দেব ভোগ কৈল যেই প্রেমসিন্ধু ।
কৃপাকরি দেহ মোরে তার একবিন্দু ॥
এই কথা বলি জীব ধরণী লোটায় ।
নিত্যানন্দ শ্রীচরণে গড়াগড়ি যায় ॥
সেই রাত্র সবে রয় বাণীনাথ ঘরে ।
বংশ সহ বাণী নিত্যানন্দ সেবা করে ॥
নিতাই জাহ্নবা পদ ছায়া আশ যার ।
নদীয়া মাহাত্ম্য গায় অকিঞ্চন ছার ॥

 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 


শ্রীনবদ্বীপধাম
মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


এইগ্রন্থশিরোমণি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্য এবং তাঁর শ্রীচরণের তৃপ্তির জন্য তাঁর অহৈতুক কৃপায় শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ হইতে প্রকাশিত হয় শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শুভার্বিভাব তিথিতে শ্রীগৌরাব্দ ৫৩৪, বঙ্গাব্দ ১৪২৬, খৃষ্টাব্দ মার্চ্চ ২০২০ ।


সূচীপত্র:

শ্রীগৌরধাম ও শ্রীভক্তিবিনোদ

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য
(১) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের সাধারণ মাহাত্ম্য কথন
(২) শ্রীশ্রীগৌড়মণ্ডল ও শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের বাহ্যস্বরূপ ও পরিমাণ
(৩) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমার সাধারণ বিধি
(৪) শ্রীজীবের আগমন ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁহাকে শ্রীনবদ্বীপতত্ত্ব বলেন
(৫) শ্রীমায়াপুর ও শ্রীঅন্তর্দ্বীপের কথা
(৬) শ্রীগঙ্গানগর, শ্রীপৃথুকুণ্ড, শ্রীসীমন্তদ্বীপ, শ্রীবিশ্রামস্থানাদি দর্শন
(৭) শ্রীসুবর্ণবিহার ও শ্রীদেবপল্লী বর্ণন
(৮) শ্রীহরিহরক্ষেত্র, শ্রীমহাবারাণসী ও শ্রীশ্রীগোদ্রুমদ্বীপ বর্ণন
(৯) শ্রীমধ্যদ্বীপ ও নৈমিষ বর্ণন
(১০) শ্রীব্রাহ্মণপুষ্কর, শ্রীউচ্চহট্টাদি দর্শন ও পরিক্রমা-ক্রম বর্ণন
(১১) শ্রীশ্রীকোলদ্বীপ, শ্রীসমুদ্রগড়, শ্রীচম্পাহট্ট ও শ্রীজয়দেব-কথা বর্ণনা
(১২) শ্রীশ্রীঋতুদ্বীপ ও শ্রীরাধাকুণ্ড বর্ণন

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজনকুটির (স্বানন্দ-সুখদা-কুঞ্জ)
শ্রীনৃসিংহপল্লী
শ্রীকোলদ্বীপ


বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥