শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


শ্রীনৃসিংহপল্লী

 

আমাদের পরিক্রমার এই দিনে শেষ জায়গা হচ্ছে শ্রীনৃসিংহপল্লী মন্দির । শ্রীল গুরুদেবের কৃপায়, শ্রীনৃসিংহদেবের কৃপায় এবং শ্রীল প্রহ্লাদ মহারাজের কৃপায় আমরা এখানে একটা ছোটা জায়গা পেয়েছি এবং প্রতি বছর এখান থেকে শ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমা করতে সুযোগ পাই ।

শ্রীনৃসিংহদেব ও প্রহ্লাদ মহারাজের কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা, আপনাদের এই কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে হবে এবং সব সময় মনে রাখতে হবে ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাঁদের নাম জয় ও বিজয় । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী ঘরে বিশ্রাম করছিলেন, তখন জয় ও বিজয় পাহারা দিচ্ছিলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মার চারজন পুত্র উলঙ্গ অবস্থায় সেখানে এসে গিয়েছিলেন । জয় ও বিজয় তাঁদেরকে তাচ্ছিল্য করলেন, “নারায়ণ এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, তোমাদের এখন যাওয়া হবে না ।” তাঁরা যে ব্রহ্মার পুত্রগণ ছিলেন না জেনে জয় ও বিজয় শিশুদেরকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন কিন্তু শিশুর মধ্যে একজন তাঁদেরকে বললেন, “তোমাদের আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের এই মর্ত্যে আসতে হবে আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় ও বিজয় অবাক হয়ে প্রায় মূর্চ্ছা হয়ে পড়লেন—“কী ? এরা কি করেছেন ? অভিশাপ দিয়ে দিলেন ?”

ওই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচিটা শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞাসা করলেন কী হয়েছে । জয় ও বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক—এই ছেলেগুলো আমাদেরকে আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বলল আর আমরা যেহেতু রাজি হয়ে গেলাম না, তাঁরা সেহেতু আমাদেরকে অভিশাপ দিয়েছে ।”

নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! তাই হবে ।”

“সে কী ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” (সব কিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয়েছে ।) তখন নারায়ণ তাঁদের এক শর্ত দিলেন, “যদি তোমরা মর্ত্যে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা করবে, আমার পূজা ও সেবা করবে, তাহলে তোমাদের ফিরে যাওয়ার জন্য সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা করবে, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?”

“প্রভু, আপনার কাছে তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য আমরা শত্রুই থাকব !”

তখন তাঁরা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ ও কুম্ভকর্ণ এবং দ্বাপরযুগে হলেন শিশুপাল ও দন্তবক্র—তাঁরা সব সময় কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ঘৃণা করতেন ।

তাই, তাঁরা হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই হলেন । সেই অসুর দুই ভাই সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । কত ভীষণ অত্যাচার তাঁরা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা তাঁদের উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পালিয়ে গেলেন । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরও বেশী অত্যাচার করতে লাগলেন, তখন ভগবান রেগে গিয়ে শূকররূপ ধারণ করে (বরাহ অবতার) হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন ।

যখন হিরণ্যকশিপু খবর পেয়েছিলেন যে, তাঁর ভাই মরে গিয়েছিলেন, ভীষণ রেগে গিয়ে তিনি তখন জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার তপ করতে লাগলেন । না খেয়ে তিনি হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন (এমন ভাবে তপ করেছে যে তাঁর শরীর থেকে সমস্ত মাংসগুলো পর্যন্ত চলে গিয়েছে—শুধু হাড়টা রয়েছে) । তখন এক দিন ব্রহ্মা তাঁর তপে খুব খুশি হয়ে তাঁর কাছে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “বল তুমি কী বর চাও ?”

“আমি অমরতা চাই । এই বর আমাকে দাও যেন আমাকে কেউ মারতে না পারবে ।”

“এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু বেশী কিন্তু আমাকেও এক দিন এই দেহ ছেড়ে দিতে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?”

তখন হিরণ্যকশিপু তাঁর অসুরের চাতুরতা প্রকাশ করতে মনে করলেন । তিনি বললেন, “তখন আমি চাই, যেন আমি দিনেও মরব না রাত্রেও মরব না ।”

ব্রহ্মা বললেন, “ঠিক আছে ।”

“আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীবের দ্বারা মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে । তুমি যে বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বরটা দিয়ে দিলাম ।”

ইতিমধ্যে, জঙ্গলে চলে যাওয়ার আগে হিরণ্যকশিপু তাঁর স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন—তাঁর নাম ছিল কয়াধু । যখন হিরণ্যাক্ষকে ভগবান্ বধ করেছিলেন, দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে এলেন । এক দিন তাঁরা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে তাঁর বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করে দিলেন । কয়াধুকে একা দেখে তাঁরা ওঁকে হত্যা করবার জন্য মনে করলে ওঁকে নিয়ে চলে গেলেন । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হল ।

নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো ? মহিলার স্বামী এখন ব্রহ্মার তপ করতে জঙ্গলে গিয়েছেন আর তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছো ?”

“একে মেরে ফেলতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এই সন্তান যদি জন্ম গ্রহণ করবে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !”

নারদ তাঁদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এর গর্ভ থেকে যে সন্তান হবে, সে মহান্ ভক্ত হবে—ও তোমাদেরকে রক্ষা করবে । কাজ কর, বরং মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই, কয়াধু নারদের সঙ্গে তাঁর আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সেবা, পূজা, ইত্যাদি করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্্ পাঠ করতেন, তখন প্রতি দিন কয়াধু ওঁর মুখে হরিকথা শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দেওয়া হয়, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সে শিক্ষাগুলা শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি তাঁর বাবা ও স্কুলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিয়েছেন ।

এক দিন নারদ মুনি কয়াধুকে বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কী বর চাও ? বল ।” কয়াধু বললেন, “আমার স্বামী বনে চলে গিয়েছে ব্রহ্মার স্তপ করতে । অসুর হলেও সে তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দিন : স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান যেন প্রসব না হয় ।” নারদ রাজি হয়ে তাঁকে ওই বর দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে এলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড অবস্থায়—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার দিলেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ??!” একজন তাঁকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে তাঁকে নিয়ে গেলেন, আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে চলে এলেন । তখন তাঁর সন্তান প্রসব হলেন । তাঁরা তাঁকে নাম রাখলেন প্রহ্লাদ ।

আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগল । অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, তাঁর দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেকে তাঁদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সব শিক্ষাগুলো তাঁকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” তাঁরা সেটাই করতেন কিন্তু যত ষণ্ড-অমর্ক প্রহ্লাদকে শিক্ষা দিচ্ছে, ওই সব তাঁর কানে যাচ্ছে না ।

এক দিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলে কী শিখেছে ? ওকে একবার নিয়ে চলে এস !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাঁকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, মাথায় তেল দিয়ে, ইত্যাদি বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । বাবা ছেলেকে কোলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, তুমি এই স্কুলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছ ? তুমি যেটা ভালো শিখেছ, তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী ? বল ।”

প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

এটা শুনলে হিরণ্যকশিপু তাঁকে একবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে রে !! আমার গণে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্কে ডেকে বললেন, “ওই রে ! আমার ছেলেকে তোমরা কি শিখিয়েছ ?!”

ষণ্ড-অমর্ক উত্তরে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন, এসব শিক্ষা আমরা ওকে কোন দিন দিই নি ! কোথা থেকে ও এটা পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।”

হিরণ্যকশিপু তখন তাঁদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখ : বোধ হয় তোমাদের স্কুলে অন্য কেউ এসে একে এটা শিখিয়ে দেয় !”

“ঠিক আছে । আমরা দেখব ।”

আর প্রহ্লাদ কী করলেন ? যে স্কুলে অসুররা ছিল, তারা সবাই প্রহ্লাদ মহারাজের দলে এসেছিলেন—স্কুলের মাস্টরমশাইটা যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন ।

কিছু দিন পরে হিরণ্যকশিপু আবার প্রহ্লাদকে বাড়িতে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “বল, কী ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? মাস্টরমশাই কী তোকে শিখিয়েছে ?”

প্রহ্লাদ তখন বললেন, “শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কী ??! এসব কী বলছিস  !?”

একেবারে হিরণ্যকশিপু রেগে গেলেন ! হুংকার দিয়ে বললেন, “ওই রে ! কুলাঙ্গার !” আর নিজে মনে করলেন, “এর যে অবস্থা হয়েছে, একে বধ করতে হবে !”

ছেলেকে মেরে ফেলতে হিরণ্যকশিপু নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, মত্ত হস্তির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, ইত্যাদি, বিভিন্ন উপায় চেষ্টা করলে—কিছুতেই তাঁকে মারতে পারলেন না—সব চেষ্টা বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তাঁর লোকজনকে ডেকে বললেন, “তোমাদের দ্বারা কিছু হল না, আমার কাছে ওকে নিয়ে চলে এস ! আমি ওকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তাঁর পাশে এসে বসলেন ।

হিরণ্যকশিপু গর্জন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন বলে দাও—তুই এই সব শিক্ষাগুলো কোথা থেকে পেয়েছিস ?”

প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বললেন, “বাবা, যাঁর এটা শিক্ষা, তিনিই এটা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“মাস্টরমশাইও বলছে এটা ওর শিক্ষা নয় !” বলে হিরণ্যকশিপু ভাবলেন, “ওরা ওকে মারতে পারল না, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আর আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল, তুই এই বলটা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম, তুই মরলি না ! বল ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?”

“হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বর পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছি । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন, ব্রহ্মা তাঁর সমস্ত শক্তি হরির কাছ থেকে পেয়েছেন আর আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন, আপনি বরটা কোত্থেকে পেয়েছেন । সব বর হরির কাছ থেকে এসে যায় ।”

“আঃ ! বারবার ‘হরি’, ‘হরি’ বলছিস ! তোর হরি কোথায় আছে ?”

“কৃষ্ণ সর্বত্রই আছেন ।”

“তাই না কি ? তোর হরি কোথায় থাকে ?”

“হরি কোথায় না থাকেন ?”

“সর্ব্বত্রই আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?”

“হ্যাঁ, এখানেও আছেন ।”

“এখানে আছে তোর হরি ??!”

তখন হিরণ্যকশিপু ঐ স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার শোনা হল—অসুরের সামনে স্বয়ং ভগবান্ আবির্ভূত হয়েছিলেন ! তাঁর চিৎকার শুনে দেবতারাও ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বললেন, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !” লক্ষ্মীদেবী বললেন, “আমি পারব না, আমি ঠাণ্ডা নারায়ণের সেবা করি আর প্রভু এখন এমন রেগে গিয়েছেন আমি যাব না ।”

এই খুঁটি থেকে নৃসিংহদেব (আধা নর, আধা সিংহ) আবির্ভুত হয়েছিলেন । তাঁকে দেখলে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে গেলেন আর অসুরকে দেখলে নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্ত হয়ে গেলেন । ভগবান আগে জয় আর বিজয়কে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” সে লড়াইয়ের কথা তাঁকে এখন মনে পড়ল আর তিনি লড়াই করতে নিজেকে প্রস্তুত করলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই হয়েছিল । ওই ভীষণ যুদ্ধের দৃশ্য দেখে সব দেবতারা বললেন, “হায় হায় কী হবে ? আমার প্রভু বোধ হয় এক্ষুণি হেরে যাবে ! যদি ভগবান্ হেরে যান…” কিন্তু ভগবান্ হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে আবার তাঁকে হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু বোধ হয় পারবে না ? প্রভু লড়াইরে হেরে যাচ্ছ ?!” তারপর হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন—এই সময় নৃসিংহদেব তাঁকে আর একবার ধরে তুলে নিয়ে নিজের ঊরুর মধ্যে রাখলেন (ব্রহ্মা তাঁকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতেও মরবেন না, আকাশেও মরবেন না, পাতালেও মরবেন না, কোন অস্ত্র দ্বারাও মরবেন না, ইত্যাদি) । তখন আর দেরি না করে ভগবান্ নখ দিয়ে হিরণ্যকশিপুর বুকটাকে চিঁড়ে ফেললেন আর নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে নিজের গলায় ঝুলিয়ে দিলেন !

এরপর প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখলে এবং হঠাৎ করে স্থির হয়ে নৃসিংহদেব খুব আনন্দ পেলেন ।

তিনি বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”

প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু, আমি আর কী বর চাইব ? আপনি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছেন—প্রভু, আমার এইটা যথেষ্ট । আমি আর কিছু চাই না…”

“না, কিছু নিতে হবে ।”

“তাহলে আমার বাবা আপনার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন—কৃপা কর ওঁকে উদ্ধার করে দিন ।”

“সেটা কিন্তু বর নয় । তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে বৈকুন্ঠে চলে যাবে—আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে । সে রাগের ঠেলায় করুন বা মারামারি ঠেলায় করুন, সে তো আমাকে স্পর্শ করেছে তাই সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়েছে । সেইজন্য এটা বর নয় । বল আর কী বর চাও ? কী বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লাদ বললেন, “আর কী চাইব ? আপনার যদি কিছু দিতে হয়, তাহলে এই বর আমি চাই, আমার যেন সমস্ত চাওয়ার বাসনা কেটে যায় । এই বরটা আমাকে দিন, প্রভু ।”

এইটা হচ্ছে মূল শিক্ষা এখানে । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানের কাছ থেকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই—এইটা বন্ধ করতে হবে । প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেব লীলার অর্থ হচ্ছে যে, লোক নৃসিংহদেবের কাছে এসে সব সময় বলেন, “আমার ছেলে চাকরি হোক,” “মেয়ের বিয়ে হোক,” “শরীর ভালো হোক,” “টাকা-পয়সা হোক” ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান্, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি, যেন আমার শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার কৃপায় তোমার জন্য চিরন্তন আমি সেবা করতে পারি । ভক্তির বিনাশ না হয় তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ কর ! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার ভক্তিতে বিনষ্ট না হয়, সেইরকম তুমি একবার কৃপা দাও । সেরকম বরটা আমি চাই—নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমি কিছু চাই না !”

প্রহ্লাদকে রক্ষা করবার জন্য, শুদ্ধভক্তির বিঘ্নকে বিনাশ করবার জন্য নৃসিংহদেব এই জগতে এসেছিলেন এবং এই গোদ্রুমধামের লগ্নে বিশ্রাম নিয়েছিলেন—হিরণ্যকশিপুরকে বধ করবার পরে এই পুকুরের মধ্যে যা মন্দিরের পাশে আছে, তিনি তাতে হাত ধুয়ে ওখানে বিশ্রম নিয়েছিলেন । পরে ভগবান্ নৃসিংহদেব বিগ্রহ-রূপ ধারণ করে এখানে সেবা গ্রহণ করবার জন্য নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন । সেই ভগবান্ নৃসিংহদেবের বিগ্রহের সেবা নবদ্বীপধামে সত্য-যুগ থেকে চলছে ।

ভক্তের লাঞ্ছনা, ভক্তের কষ্ট ভগবান সহ্য করতে না পেরে ভক্তকে রক্ষা করবার জন্য তিনি এই নরসিংহ-রূপ ধারণ করেছিলেন । এটা আপনাদের সব সময় মনে রাখতে হবে এবং আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে যে আমি শ্রীল গুরুমহারাজের শ্রীমুখে শুনেছি । এই কথা সবাইকে হৃদয় দিয়ে শুনতে হবে এবং সব সময় মনে রাখতে হবে । সাধারণ বুদ্ধিতে (বিষয়-আসক্তি বুদ্ধি, ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি, ধর্ম্ম-অর্থ-কাম-মক্ষার বুদ্ধি দিয়ে) নৃসিংহদেবের শিক্ষা বোঝা যাবে না । শুদ্ধ ভক্তি লাগে, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ লাগে ।

এক দিন একজন ভক্ত নৃসিংহদেবের তাবিজ গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছেন । তাবিজটাকে লক্ষ্য করলে শ্রীল গুরুদেব ওই ভক্তকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কী ?”

উনি উত্তর দিলেন, “নৃসিংহদেবের তাবিজ ।”

গুরুদেব তখন প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি নৃসিংহদেবকে নিজের কাজে ব্যবহার করছেন না নৃসিংহদেবের সেবা করছেন ।”

নৃসিংহদেবকে নিজের স্বার্থে লাগাছেন না নৃসিংহদেবকে সেবা করবেন ? কোনটা করা উচিত ? সিদ্ধান্ত বলুন ।”

উনি বরিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন । আমি গুরুমহারাজের প্রশ্ন শুনলে অবাক হয়ে গেলাম—চুপ করে বসে থাকলাম । শ্রীল গুরু মহারাজ তখন বললেন, “আপনি নৃসিংহদেবকে নিজের কাজে লাগাছেন কিন্তু নৃসিংহদেব শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশকারী— নৃসিংহদেব আপনার বিঘ্ন-বিনাশকারী নন ! নৃসিংহদেবকে ব্যবহার করবেন না— নৃসিংহদেবকে সেবা করবেন ।”

তার অর্থটা কী ? সবাই বলে, “হে নৃসিংহদেব, আমার বিঘ্ন বিনাশ করে দাও”, “আমার এই করে দাও,” “সেই করে দাও” কিন্তু তারা নৃসিংহদেবকে ব্যবহার করেন—আমরা নৃসিংহদেবের কাছে যাই নৃসিংহদেবের সেবা করবার জন্য, নৃসিংহদেবকে প্রণাম করবার জন্য, নিজের কাজে নৃসিংহদেবকে ব্যবহার করবার জন্য নয় । আপনারা নৃসিংহদেবকে স্মরণ করতে পারেন, কিন্তু নৃসিংহদেবকে আপনার শরীরের জন্য, আপনার দেহের জন্য, আপনের মনের জন্য আপনারা ব্যবহার করবেন না । এটা হচ্ছে আমাদের গুরুমহারাজের কথা ।

যে শিক্ষা শ্রীল গুরুদেব আমাকে দিয়েছেন, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা । যে কথাটা তিনি বলেছেন, সেটা আমি এখনও মনে রাখি এবং আপনাদের মঙ্গল প্রদান করবার জন্য এখন বলে দিচ্ছি । আপনারা নৃসিংহদেবের সেবা করতে পারেন কিন্তু আপনাদের বিঘ্ন বিনাশ করবার জন্য আপনারা নৃসিংহদেবকে ব্যবহার করতে পারেন না । কত সুন্দর কথা শ্রীল গুরুদের বলেছেন ।

আমি যখন নৃসিংহপল্লীর পাশ দিয়ে যাই, তখন রাস্তায় প্রণাম করে আসি । গাড়ি সামনে থামিয়ে মন্দিরে এসে প্রণাম করি আর মাঝে মাঝে ওখানে বেশি ভিড় আছে, তখন আমি দূর থেকেও প্রণাম করে আসি । আসলে নৃসিংহদেবের দর্শন করবার জন্য আমাদের চোখ নেই—আমি সেখানে এসে যাই আর আমি কী দেখতে পাই, কী দেখতে না পাই, সেটা আমার ব্যপার নয়—নৃসিংহদেব সেটা ভালো করেই জানেন । আমি যে তাঁর কাছে এসেছি, সেটা নৃসিংহদেব দেখতে পেলেই ভালো । আমি যে, নৃসিংহদেবকে দেখব, সেই চোখটা আমার নেই ।

অন্ধীভূত চক্ষু যার বিষয ধূলিতে ।
কিরূপে সে পরতত্ত্ব পাইবে দেখিতে ॥

সেই জন্য, নৃসিংহদেবকে সেবা করতে হবে, নৃসিংহদেবকে ব্যবহার করবেন না । নৃসিংহদেবের তাবিজ অনেক জায়গায় বিক্রি করা হয়—লোকগুলো নৃসিংহদেবকে নিয়ে ব্যবসা করে, নৃসিংহদেবকে বিক্রি করে, ওরা নৃসিংহদেবের সেবা করে না । সেরকম উদ্দেশ্যে আমরা নৃসিংহদেবের কাছে যাই না । নৃসিংহদেবকে পায়াস ভোগ দেব, পরমান্ন ভোগ দেব, দুধ সেবায় লাগাব, চাল সেবায় লাগাব, চিনি সেবায় লাগাব, ফল সেবায় লাগাব—সেটা হচ্ছে নৃসিংহদেবের সেবা । এই বুদ্ধি নিয়ে সব সময় থাকতে হবে  ।

সুতরাং, যা ওই দিন হয়েছিল (যখন ওই ভক্ত তাবিজ গলায় পড়ে শ্রীল গুরুদেবের সামনে হাজির হলেন), সেটা আমি আপনাদেরকে ভাল ভাবে বলে দিলাম । আর একটা কথা আছে এই তো : যে শিক্ষা বা কথা প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে শুনিছিলেন, সেই কথাগুলা ভাগবতে লেখা আছে । সেই কথাগুলা তিনি নারদ মুনি থেকে শুনিছেলেন । নারদ মুনির প্রধান শিক্ষা হচ্ছে যে, যা কিছু হয়, সব কিছু ভগবানের কাছ থেকে এসে যায় ।

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

(ব্রহ্মসংহিতা, ৫/১)

অর্থ বলুন, ধর্ম্ম বলুন, কাম বলুন, মোক্ষ বলুন—এটা সব সাময়িক (temporary) কিন্তু ভক্তি দিয়ে যদি ভগবানকে লাভ করা যায়, সেটা চিরস্থায়ী (permanent) । সেইজন্য সমস্ত ধর্মধ্বজী—ধর্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ—বাদ দিয়ে আমাদের ভক্তি অনুশীলন করতে হবে ।

ভক্তির মধ্যে বিভিন্ন রস বা ভাব আছে—শান্তরস, দাস্যরস, সখ্যরস, বাৎসল্যরস ও মধুররস । শান্তভক্তের অধিকারী হচ্ছেন প্রহ্লাদ মহারাজ । খুব অল্প বয়সে (৫ বছর বয়সে) হয়েও ভগবানকে শান্তরসে আরাধনা করে প্রহ্লাদ মহারাজ ভগবানকে লাভ করেছিলেন আর শুধু তাই নয়—যেমন বলি মহারাজ তাঁর গুরুকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, যেমন ভরত মহারাজ তাঁর মাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, তেমন ভগবানকে পাওয়ার জন্য প্রহ্লাদ মহারাজও তাঁর পিতাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন । যখন বলি মহারাজের গুরু তাঁকে খারাপ উপদেশ দিয়েছিলেন (সেই উপদেশ তার ভাল লাগলে না কারণ ওই উপদেশ অনুসরণ করলে ভগবানের সেবার বিঘ্ন হত, তাই বলি মহারাজ তাঁর গুরুর কথা না মেনে গুরুকে ত্যাগ করে দিয়েছিলেন) । আর বাবাকে ত্যাগ করার পর প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর জন্য ভগবানের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন—সেটা হচ্ছে নির্মৎসর । প্রহ্লাদ মহারাজের ভক্তি হচ্ছে নির্মৎসর ও নিষ্কাম । ওঁর ভক্তি সকাম ভক্তি নয় ।

যখন আমরা নৃসিংহপল্লীতে গিয়ে নিজের মন সম্পূর্ণ করবার জন্য—গাছের সঙ্গে একটা পুঁতি বেঁধে দিয়ে চলে আসি, সেটা শুদ্ধ ভক্তি নয় । ভক্তের মধ্য ভাগ আছে—সকাম ভক্তি ও নিষ্কাম ভক্তি । সকাম ভক্তি মানে ভক্তির বিনিময়ে আমরা কিছু চাই,—“ভগবানের সেবা করব আর তার বিনিময়ে কিছু চাই ।” প্রহ্লাদ মহারাজের ভক্তি ছিল নিষ্কাম ভক্তি । তিনি বললেন, “হে ভগবান্, আমি তোমার সেবা করব আর তার বিনিময়ে কিছু চাই না । বরং তুমি আমার এমন বর দাও, যেন আমার চাওয়ার বাসনা চলে যায় ।” এটা হচ্ছে প্রধান শিক্ষা ।

আমি বলেছি যে, ধর্ম্ম বলুন, অর্থ বলুন, কাম বলুন, মোক্ষ বলুন—এগুলা ক্ষণস্থায়ী । চিরস্থায়ী কী হবে ? ভক্তি অনুশীলন করলে, কৃষ্ণ অনুশীলন করলে, ভগবানকে পাবেন ।

তাই আমাদের শ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমা করতে করতে আমরা শ্রীনৃসিংহপল্লী এসেছি । এই কথাগুলা আমাদের সব সময় হৃদয়ে রাখতে হবে । সাধু সাবধান !

জয় শ্রীশ্রীলক্ষ্মী-নৃসিংহদেব কি জয়
জয় প্রহ্লাদ মহারাজ কি জয়
জয় শ্রীশ্রী গৌরনিত্যানন্দ প্রভু কি জয়
শ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমা কি জয়
শ্রীগোদ্রুমদ্বীপ কি জয়

 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥