শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


—: শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য :—

পঞ্চম অধ্যায :
শ্রীমায়াপুর ও শ্রীঅন্তর্দ্বীপের কথা

(শ্রীশ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর রচিত)

 

জয় জয় শ্রীচেতন্য শচীর নন্দন ।
জয় জয় নিত্যানন্দ জাহ্ণবী জীবন ॥
জয় নবদ্বীপধাম সর্ব্ব ধাম সার ।
যথা কলিযুগে হৈল গৌর অবতার ॥
নিত্যানন্দপ্রভু বলে শুনহ বচন ।
ষোল ক্রোশ নবদ্বীপ যথা বৃন্দাবন ॥
এই ষোল ক্রোশ মধ্যে দ্বীপ হয় নয় ।
অষ্টদল পদ্ম যেন জলেতে ভাসয় ॥
অষ্টদল অষ্টদ্বীপ মধ্যে অন্তর্দ্বীপ ।
তার মাঝে মায়াপুর মধ্যবিন্দুটীপ ॥
মায়াপুর যোগপীঠ সদা গোলাকার ।
তথা নিত্য চৈতন্যের বিবিধ বিহার ॥
ত্রিসহস্রধনু তার পরিধি প্রমাণ ।
সহস্রেকধনু তার ব্যাসের বিধান ॥
এই যোগপীঠ মাঝে বৈসে পঞ্চতত্ত্ব ।
অন্যস্থান হৈতে যোগ পীঠের মহত্ত্ব ॥
অতি শীঘ্র গুপ্ত হবে প্রভুর ইচ্ছায় ।
ভাগীরথী জলে হবে সংগোপিত প্রায় ॥
কভু পুন প্রভু ইচ্ছা হবে বলবান ।
প্রকাশ হইবে ধাম হবে দীপ্তমান ॥
নিত্যধাম কভু কালে লোপ নাহি হয় ।
গুপ্ত হয়ে পুনর্ব্বার হয়ত উদয় ॥
ভাগীরথী পূর্ব্ব তীরে হয় মায়াপুর ।
মায়াপুরে নিত্য আছেন আমার ঠাকুর ॥
লোক দৃষ্টে সন্ন্যাসী হইয়া বিশ্বম্ভর ।
ছাড়ি নবদ্বীপ ফিরে দেশ দেশান্তর ॥
বস্তুত গৌরাঙ্গ মোর নবদ্বীপধাম ।
ছাড়িয়া না যায় কভু মায়াপুর গ্রাম ॥
দৈনন্দিন লীলা তাঁর দেখে ভক্তগণ ।
তুমিও দেখহ জীব গৌরাঙ্গ নর্ত্তন ॥
মায়াপুর অন্তে অন্তর্দ্বীপ শোভা পায় ।
গৌরাঙ্গ দর্শন ব্রহ্মা পাইল যথায় ॥
ওহে জীব চাহ যদি দেখিতে সকল ।
পরিক্রমা কর তুমি হইবে সফল ॥
প্রভুবাক্য শুনি জীব সজলনয়নে ।
দণ্ডবৎ হয়ে পড়ে প্রভুর চরণে ॥
কৃপা যদি কর প্রভু এই অকিঞ্চনে ।
সঙ্গে লয়ে পরিক্রমা করাও আপনে ॥
জীবের প্রার্থনা শুনি নিত্যানন্দরায় ।
তথাস্তু বলিয়া নিজ মানস জানায় ॥
প্রভু বলে ওহে জীব অদ্য মায়াপুর ।
করহ দর্শন কল্য ভ্রমিব প্রচুর ॥
এত-বলি নিত্যানন্দ উঠিল তখন ।
পাছে পাছে উঠে জীব প্রফুল্লিত মন ॥
চলে নিত্যানন্দরায় মন্দ মন্দ গতি ।
গৌরাঙ্গ-প্রেমেতে দেহ সুবিহ্বল অতি ॥
মোহন মুরতি প্রভু ভাবে ঢলঢল ।
অলঙ্কার সর্ব্বদেহে করে ঝলমল ॥
যে চরণ ব্রহ্মা শিব ধ্যানে নাহি পায় ।
শ্রীজীবে করিয়া কৃপা সে পদ বাড়ায় ॥
পাছে থাকি জীব লয় পদাঙ্কের ধূলি ।
সর্ব্ব অঙ্গে মাখে চলে বড় কুতূহলী ॥
জগন্নাথ মিশ্র গৃহে করিল প্রবেশ ।
শচীমাতা শ্রীচরণে জানায় বিশেষ ॥
শুনগো জননী এই জীব মহামতী ।
শ্রীগৌরাঙ্গ-প্রিয়দাস ভাগ্যবান অতি ॥
বলিতে বলিতে জীব আছাড়িয়া পড়ে ।
ছিন্ন মূল তরু যেন বড় বড় ঝড়ে ॥
শচীর চরণে পড়ি যায় গড়াগড়ি ।
সাত্ত্বিক বিকার দেহে করে হুড়াহুড়ি ॥
কৃপা করি শচীদেবী কৈল আশীর্ব্বাদ ।
সেই দিন সেই গৃহে পাইল প্রসাদ ॥
বিষ্ণুপ্রিয়া শচীদেবী আজ্ঞা যবে পাইল ।
নানা অন্ন ব্যঞ্জনাদি রন্ধন করিল ॥
শ্রীবংশীবদনানন্দ প্রভু কতক্ষণে ।
শ্রীগৌরাঙ্গে ভোগ নিবেদিল সযতনে ॥
ঈশান ঠাকুর স্থান করি অতঃপর ।
নিত্যানন্দে ভুঞ্জাইল হরিষ অন্তর ॥
পুত্র স্নেহে শচীদেবী নিত্যানন্দে বলে ।
খাও বাছা নিত্যানন্দ জননীর স্থলে ॥
এই আমি গৌরচন্দ্রে ভুঞ্জানু গোপনে ।
তুমি খাইলে বড় সুখী হই আমি মনে ॥
জননীর বাক্যে প্রভু নিত্যানন্দরায় ।
ভুঞ্জিল আনন্দে জীব অবশিষ্ট পায় ॥
জীব বলে ধন্য আমি মহাপ্রভু ঘরে ।
পাইনু প্রসাদ অন্ন এই মায়াপুরে ॥
ভোজন করিয়া তবে নিত্যানন্দরায় ।
শচীদেবী শ্রীচরণে হইল বিদায় ॥
যাইবার কালে সঙ্গে বংশীকে লইল ।
শ্রীজীব বংশীর পদে প্রণতি করিল ॥
জীব প্রতি বলে প্রভু এ বংশীবদন ।
শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়বংশী জানে ভক্তজন ॥
ইহার কৃপায় জীব হয় কৃষ্ণাকৃষ্ট ।
মহারাস লভে সবে হইয়া সতৃষ্ণ ॥
দেখ জীব এই গৃহে চৈতন্যঠাকুর ।
আমা সবা লয়ে লীলা করিল প্রচুর ॥
এই দেখ জগন্নাথ মিশ্রের মন্দির ।
বিষ্ণু পূজা নিত্য যথা করিতেন ধীর ॥
এই গৃহে করিতেন অতিথি সেবন ।
তুলসীমণ্ডপ এই করহ দর্শন ॥
শ্রীগৌরাঙ্গচন্দ্র গৃহে ছিলা যত কাল ।
পিতার আচার পালিতেন ভক্তপাল ॥
এবে সব বংশীঠাকুরের তত্ত্বাধীনে ।
ঈশান নির্ব্বাহ করে প্রতি দিনে দিনে ॥
এই স্থানে ছিল এক নিম্ব বৃক্ষবর ।
প্রভুর পরশে বৃক্ষ হইল অগোচর ॥
যত কাঁদে নিত্যানন্দ করিয়া বর্ণন ।
জীব বংশী দুঁহে তত করেন ক্রন্দন ॥
দেখিতে দেখিতে তথা আইল শ্রীবাস ।
চারি জনে চলে ছাড়ি জগন্নাথ বাস ॥
শত ধনু উত্তরেতে শ্রীবাসঅঙ্গন ।
জীবে দেখাইল প্রভু আনন্দিত মন ॥
শ্রীবাসঅঙ্গনে জীব যায় গড়াগড়ি ।
স্মরিয়া প্রভুর লীলা প্রেম হুড়াহুড়ি ॥
শ্রীজীব উঠিবামাত্র দেখে এক রঙ্গ ।
নাচিছে গৌরাঙ্গ লয়ে ভক্ত অন্তরঙ্গ ॥
মহাসঙ্কীর্ত্তন দেখে বল্লভ নন্দন ।
সর্ব্ব ভক্ত মাঝে প্রভুর অপূর্ব্ব নর্ত্তন ॥
নাচিছে অদ্বৈত প্রভু নিত্যানন্দরায় ।
গদাধর হরিদাস নাচে আর গায় ॥
শুক্লাম্বর নাচে আর শতশত জন ।
দেখিয়া প্রেমেতে জীব হৈল অচেতন ॥
চেতন পাইলে আর সে রঙ্গ না ভায় ।
কাঁদি জীবগোস্বামী করেন হায় হায় ॥
কেন মোর কিছু পূর্ব্বে জনম নহিল ।
এমন কীর্ত্তনানন্দ ভাগ্যে না ঘটিল ॥
প্রভু নিত্যানন্দ কৃপা অসীম অনন্ত ।
সেই বলে ক্ষণকাল হৈনু ভাগ্যবন্ত ॥
ইচ্ছা হয় মায়াপুরে থাকি চিরকাল ।
ঘুচিবে সম্পূর্ণ রূপে মায়ার জঞ্জাল ॥
দাসের বাসনা হৈতে প্রভু আজ্ঞা বড় ।
মায়াপুর ছাড়িতে অন্তর ধড়ফড় ॥
তথাহৈতে নিত্যানন্দ জীবে লয়ে যায় ।
দশ ধনু উত্তরে অদ্বৈত গৃহ পায় ॥
প্রভু বলে দেখ জীব সীতানাথালয় ।
হেথা বৈষ্ণবের গোষ্ঠী সদাই মিলয় ॥
হেথা সীতানাথ কৈল কৃষ্ণের পূজন ।
হুঙ্কারে আনিল মোর শ্রীগৌরাঙ্গ ধন ॥
তথা গড়াগড়ি দিয়া চলে চারিজন ।
পঞ্চধনু পূর্ব্বে গদাধরের ভবন ॥
তথা হৈতে দেখাইল নিত্যানন্দরায় ।
সর্ব্ব পারিষদ গৃহ যথায় তথায় ॥
ব্রাহ্মণ মণ্ডলী গৃহ করিয়া দর্শন ।
তবে চলে গঙ্গাতীরে হর্ষে চারিজন ॥
মায়াপুর সীমা শেষে বৃদ্ধ শিবালয় ।
জাহ্ণবীর তটে দেখে জীব মহাশয় ॥
প্রভু বলে মায়াপুরে ইনি ক্ষেত্রপাল ।
প্রৌঢ়ামায়া শক্তি অধিষ্ঠান নিত্যকাল ॥
প্রভু যবে অপ্রকট হইবে তখন ।
তাঁহার ইচ্ছায় গঙ্গা হইবে বর্দ্ধন ॥
মায়াপুর প্রায় গঙ্গা আচ্ছাদিবে জলে ।
শতবর্ষ রাখি পুন ছাড়িবেন বলে ॥
স্থান মাত্র জাগিবেক গৃহ না রহিবে ।
বাসহীন হয়ে কতকাল স্থিত হবে ॥
পুন কভু প্রভু ইচ্ছা হবে বলবান ।
হবে মায়াপুরে এইরূপ বাসস্থান ॥
এইসব ঘাট গঙ্গাতীরে পুন হবে ।
প্রভুর মন্দির করিবেন ভক্ত সবে ॥
অদ্ভুত মন্দির এক হইবে প্রকাশ ।
গৌরাঙ্গের নিত্যসেবা হইবে বিকাশ ॥
প্রৌঢ়ামায়া বৃদ্ধশিব আসি পুনরায় ।
নিজ কার্য্য সাধিবেক প্রভুর ইচ্ছায় ॥
এত শুনি জীব তবে করযোড় করি ।
প্রভুরে জিজ্ঞাসে বার্ত্তা পদযুগ ধরি ॥
ওহে প্রভু তুমি শেষ তত্ত্বের নিদান ।
ধামরূপ নামতত্ত্ব তোমারি বিধান ॥
যদিও প্রভুর ইচ্ছামতে কর্ম্ম কর ।
তবু জীব গুরু তুমি সর্ব্ব শক্তি ধর ॥
গৌরাঙ্গে তোমাতে ভেদ যেই জন করে ।
পাষণ্ডী মধ্যেতে তারে বিজ্ঞজনে ধরে ॥
সর্ব্বজ্ঞ পুরুষ তুমি লীলা অবতার ।
সংশয় জাগিল এক হৃদয়ে আমার ॥
যে সময় গঙ্গা লুকাইবে মায়াপুর ।
কোথা যাবে শিব শক্তি বলহ ঠাকুর ॥
নিত্যানন্দ বলে জীব শুনহ বচন ।
গঙ্গার পশ্চিম ভূমি করহ দর্শন ॥
ঐ উচ্চ চড়া দেখ পারডাঙ্গা নাম ।
তথা আছে বিপ্রমণ্ডলীর এক গ্রাম ॥
তাহার উত্তরে আছে জাহ্ণবী পুলিন ।
ছিন্নডেঙ্গা বলি তারে জানেন প্রবীণ ॥
এইত পুলিনে এক নগর বসিবে ।
তথা শিব শক্তি কিছু দিবস রহিবে ॥
ও পুলিন মাহাত্ম্য কে কহিবারে পারে ।
রাসস্থলী আছে যথা জাহ্ণবীর ধারে ॥
বালুময় ভূমি বটে চর্ম্ম চক্ষে ভায় ।
রত্নময় নিত্যধাম দিব্য লীলা তায় ॥
মায়াপুর হয় শ্রীগোকুল মহাবন ।
পারডাঙ্গা সট্টীকার স্বরূপ গণন ॥
তথা আছে বৃন্দাবন শ্রীরাসমণ্ডল ।
কালে ঐ স্থানে হবে গান কোলাহল ॥
মায়াপুর শ্রীপুলিন মধ্যে ভাগীরথী ।
সব লয়ে গৌরধাম জান মহামতি ॥
পঞ্চ ক্রোশ ধাম যেবা করিবে ভ্রমণ ।
মায়াপুর শ্রীপুলিন করিবে দর্শন ॥
ফাল্গুনী পূর্ণিমা দিনে যে করে ভ্রমন ।
পঞ্চক্রোশ ভক্তসহ পায় নিত্যধন ॥
ওহে জীব গূঢ় কথা শুনহ আমার ।
শ্রীগৌরাঙ্গ মূর্ত্তি শোভে শ্রীবিষ্ণপ্রিয়ার ॥
ঐ কালে মিশ্রবংশোদ্ভব বিপ্রগণ ।
সট্টীকার ধামে লবে শ্রীমূর্ত্তিরতন ॥
চারিশত বর্ষ গৌর জন্ম দিন ধরি ।
হইলে শ্রীমুর্ত্তি সেবা হবে সর্ব্বোপরি ॥
এই সব কথা এবে রাখ অপ্রকাশ ।
পরিক্রমা কর হয়ে অন্তরে উল্লাস ॥
বৃদ্ধশিব ঘাট হৈতে ত্রিধনু উত্তর ।
গৌরাঙ্গের নিজঘাট দেখ বিজ্ঞবর ॥
এই স্থানে বাল্যলীলা ছলে গৌরহরি ।
ভাগীরথী ক্রীড়া করিলেন চিত্ত ভরি ॥
যমুনার ভাগ্য দেখি হিমাদ্রি-নন্দিনী ।
বহুতপ কৈল হৈতে লীলার সঙ্গিনী ॥
কৃষ্ণ কৃপা করি বলে দিয়া দরশন ।
গৌর রূপে তব জলে করিব ক্রীড়ন ॥
সেই লীলা কৈল হেথা ত্রিভুবনরায় ।
ভাগ্যবান জীব দেখি বড় সুখ পায় ॥
পঞ্চদশধনু যেই ঘাট তদুত্তরে ।
মাধাইয়ের ঘাট বলি ব্যক্ত চরাচরে ॥
তার পাঁচধনুর উত্তরে ঘাট শোভা ।
নাগরীয়া জনের সর্ব্বদা মনোলোভা ॥
বারকোণা ঘাট এই অতীব সুন্দর ।
বিশ্বকর্ম্মা নির্ম্মিলেন প্রভু আজ্ঞাধর ॥
এই ঘাটে দেখ জীব পঞ্চশিবালয় ।
পঞ্চতীর্থ লিঙ্গ পঞ্চ সদা জ্যোতির্ম্ময় ॥
এই চারি ঘাট মায়াপুর শোভাকরে ।
যথায় করিলে স্নান সর্ব্ব দুঃখ হরে ॥
মায়াপুর পূর্ব্ব দিকে আছে যেই স্থান ।
অন্তর্দ্বীপ বলি তার নাম বিদ্যমান ॥
এবে প্রভু ইচ্ছামতে লোক বাস হীন ।
এই রূপ স্থিতি রহে আরো কত দিন ॥
কতকালে পুন হেথা লোক বাস হবে ।
প্রকাশ হইবে স্থান নদীয়াগৌরবে ॥
ওহে জীব অদ্য তুমি রহ মায়াপুরে ।
কল্য লয়ে যাব আমি সীমান্ত নগরে ॥
এত শুনি জীব তবে বলেন বচন ।
সংশয় উঠিল এক করহ শ্রবণ ॥
যাবে গঙ্গাদেবী মায়াপুর আচ্ছাদন ।
উঠাইয়া লইবেন না রবে গোপন ॥
সেই কালে ভক্তগণ কোন চিহ্ণ ধরি ।
প্রকাশিবে গুপ্তস্থান বল ব্যক্ত করি ॥
জীবের বচন শুনি নিত্যানন্দরায় ।
বলিলা উত্তর তবে অমৃতের প্রায় ॥
শুন জীব গঙ্গা যবে আচ্ছাদিবে স্থান ।
মায়াপুর এক কোণ রবে বিদ্যমান ॥
তথায় যবন বাস হইবে প্রচুর ।
তথাপি রহিবে নাম তার মায়াপুর ॥
অবশিষ্ট স্থানের পশ্চিম দক্ষিণেতে ।
পঞ্চশতধনু পারে পাইবে দেখিতে ॥
কিছু উচ্চ স্থান সদা তৃণ আবরণ ।
সেই স্থান জগন্নাথমিশ্রের ভবন ॥
তথা হৈতে পঞ্চধনু বৃদ্ধ শিবালয় ।
এই পরিমাণ ধরি করিবে নির্ণয় ॥
শিবডোবা বলি খাত দেখিতে পাইবে ।
সেই খাত গঙ্গাতীরে বলিয়া জানিবে ॥
ভক্তগণ এইরূপে প্রভুর ইচ্ছায় ।
প্রকাশিবে লুপ্ত স্থান জানহ নিশ্চয় ॥
প্রভুর শতাব্দী চতুষ্টয় অন্ত যবে ।
লুপ্ত তীর্থ উদ্ধারের যত্ন হবে তবে ॥
শ্রীজীব বলেন প্রভু বলহ এখন ।
অন্তর্দ্বীপ নামের যে যথার্থ করণ ॥
প্রভু বলে এই স্থানে দ্বাপরের শেষে ।
তপস্যা করিল ব্রহ্মা গৌরকৃপা আশে ॥
গোবৎস গোপাল সব করিয়া হরণ ।
ছলিল করিয়া মায়া গোবিন্দের মন ॥
নিজ মায়া পরাজয় দেখি চতুর্ম্মুখ ।
নিজকার্য্য দোষে বড় পাইল অসুখ ॥
বহুস্তব করি কৃষ্ণে করিল মিনতি ।
ক্ষমিল তাহার দোষ বৃন্দবনপতি ॥
তবু ব্রহ্মা মনে মনে করিল বিচার ।
ব্রহ্মবুদ্ধি মোর হয় অতিশয় ছার ॥
এই বুদ্ধি দোষে কৃষ্ণপ্রেমেতে রহিত ।
ব্রজলীলা রস ভোগে হইনু বঞ্চিত ॥
গোপাল হইয়া জন্ম পাইতাম আমি ।
সেবিতাম অনায়াসে গোপিকার স্বামী ॥
সে লীলা রসেতে মোর না হইল গতি ।
এবে শ্রীগৌরাঙ্গে মোর না হয় কুমতি ॥
এইবলি বহুকাল অন্তর্দ্বীপ স্থানে ।
তপস্যা করিয়া ব্রহ্মা রহিল ধেয়ানে ॥
কতদিনে গৌরচন্দ্র করুণা করিয়া ।
চতুর্ম্মুখ সন্নিধানে কহেন আসিয়া ॥
ওহে ব্রহ্মা তব তপে তুষ্ট হয়ে আমি ।
আসিলাম দিতে যাহা আশা কর তুমি ॥
নয়ন মেলিয়া ব্রহ্মা দেখি গৌররায় ।
অজ্ঞান হইয়া ভূমে পড়িল তথায় ॥
ব্রহ্মার মস্তকে প্রভু ধরিল চরণ ।
দিব্যজ্ঞান পেয়ে ব্রহ্মা করয় স্তবন ॥
আমি দীন হীন অতি অভিমান বশে ।
পাসরিয়া তব পদ ফিরি জড় রসে ॥
আমি পঞ্চানন ইন্দ্র আদি দেবগণ ।
অধিকৃত দাস তব শাস্ত্রের লিখন ॥
শুদ্ধ দাস হৈতে আমাদের ভাগ্য নয় ।
অতএব মায়া মোহ জাল বিস্তারয় ॥
প্রথম পরার্দ্ধ মোর কাটিল জীবন ।
এবেত চরম চিন্তা করয়ে পেষণ ॥
দ্বিতীয় পরার্দ্ধ মোর কাটিবে কেমনে ।
বহির্ম্মুখ হইলে যাতনা বড় মনে ॥
এইমাত্র তব পদে প্রার্থনা আমার ।
প্রকট লীলায় যেন হই পরিবার ॥
ব্রহ্মবুদ্ধি দূরে যায় হেন জন্ম পাই ।
তোমার সঙ্গেতে থাকি তবগুণ গাই ॥
ব্রহ্মার পার্থনা শুনি গৌর ভগবান্ ।
তথাস্ত বলিয়া বর করিলেন দান ॥
যে সময় মম লীলা প্রকট হইবে ।
যবনের গৃহে তুমি জনম লভিবে ॥
আপনাকে হীন বলি হইবে গেয়ান ।
হরিদাস হবে তুমি শূন্য অভিমান ॥
তিন লক্ষ হরিনাম জিহ্বাগ্রে নাচিবে ।
নির্যাণ সময়ে তুমি আমাকে দেখিবে ॥
এই ত সাধন বালে দ্বিপরার্দ্ধ শেষে ।
পাবে নবদ্বীপধাম মজি নিত্যরসে ॥
ওহে ব্রহ্মা শুন মোর অন্তরের কথা ।
ব্যক্ত কভু না করিবে শাস্ত্রে যথা তথা ॥
ভক্তভাব লয়ে ভক্তিরস আস্বাদিব ।
পরম দুর্ল্লভ সঙ্কীর্ত্তন প্রকাশিব ॥
অন্য অন্য অবতার কালে ভক্ত যত ।
ব্রজরসে সবে মাতাইব করি রত ॥
শ্রীরাধিকা প্রেমবদ্ধ আমার হৃদয় ।
তাঁর ভাব কান্তি লয়ে হইব উদয় ॥
কিবা সুখ রাধা পায় আমারে সেবিয়া ।
সেই সুখ আস্বাদিব রাধা ভাব লৈয়া ॥
আজি হৈতে তুমি মোর শিষ্যতা লভিবে ।
হরিদাস রূপে মোরে সতত সেবিবে ॥
এত বলি মহাপ্রভু হৈল অন্তর্দ্ধান ।
আছাড়িয়া পড়ে ব্রহ্মা হইয়া অজ্ঞান ॥
হা গৌরাঙ্গ দীনবন্ধু ভকত বৎসল ।
কবে বা পাইব তব চরণ কমল ॥
এই মত কত দিন কাঁদিতে কাঁদিতে ।
ব্রহ্মলোকে গেলা ব্রহ্মা কার্য্য সম্পাদিতে ॥
নিতাই জাহ্ণবা পদে আশা মাত্র যার ।
নদীয়া মাহাত্ম্য গায় দীন হীন ছার ॥


 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 


শ্রীনবদ্বীপধাম
মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


এইগ্রন্থশিরোমণি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্য এবং তাঁর শ্রীচরণের তৃপ্তির জন্য তাঁর অহৈতুক কৃপায় শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ হইতে প্রকাশিত হয় শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শুভার্বিভাব তিথিতে শ্রীগৌরাব্দ ৫৩৪, বঙ্গাব্দ ১৪২৬, খৃষ্টাব্দ মার্চ্চ ২০২০ ।


সূচীপত্র:

শ্রীগৌরধাম ও শ্রীভক্তিবিনোদ

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য
(১) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের সাধারণ মাহাত্ম্য কথন
(২) শ্রীশ্রীগৌড়মণ্ডল ও শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের বাহ্যস্বরূপ ও পরিমাণ
(৩) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমার সাধারণ বিধি
(৪) শ্রীজীবের আগমন ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁহাকে শ্রীনবদ্বীপতত্ত্ব বলেন
(৫) শ্রীমায়াপুর ও শ্রীঅন্তর্দ্বীপের কথা
(৬) শ্রীগঙ্গানগর, শ্রীপৃথুকুণ্ড, শ্রীসীমন্তদ্বীপ, শ্রীবিশ্রামস্থানাদি দর্শন

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা
শ্রীনৃসিংহপল্লী
শ্রীকোলদ্বীপ


বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥