শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


দামোদর পণ্ডিতের বিদায়

 

আপনারা সব জানেন যে, সন্ন্যাসীরা কখনও বাচ্চাদের কোলে নেন না, খেলা করেন না । কেন করেন না ? কারণটা বাচ্চাদের আদর করলে সংসার বাসনা জন্মায় । গুরুমহারাজ এটা দেখতেই পারতেন না । কাউকে অপমান করতে আমরা চাই না, কিন্তু গুরুকে অসন্তুষ্ট করতে আমরা পারি না ।

মহাপ্রভু জানতেন কে ১০% ভক্ত, কে ২০% ভক্ত, কে ৫০% ভক্ত আর কে সত্যিকারের ১০০% ভক্ত । তিনি সব পার্ষদগণকে সহজে বুঝতে পারতেন । তিনি জানতেন যে, দামোদর পণ্ডিত খুব সরল ভক্ত ছিল আর এক দিন তিনি তাঁকে পরীক্ষা করলেন, “আমি যদি কিছু অন্যায় করব, ও আমাকে কিছু বলবে কি না ?”

পুরীতে এক বাচ্চা ছেলে ছিল যে মাঝে মাঝে মহাপ্রভুর কাছে যেতে পছন্দ করত । মহাপ্রভু ওকে কিছু মিষ্টি দিয়ে, প্রসাদ দিয়ে আদর করতে লাগলেন আর দামোদর পণ্ডিতকে নজর করে দেখলেন—তিনি কী করবেন ?

দামোদর পণ্ডিত এটা দেখে মোটেই পছন্দ করতেন না, “মহাপ্রভু সব সময় সবাইকে নিজের আচরণ দিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন আর এটা দেখে লোক কী বলবে ?”

এক দিন দামোদর পণ্ডিত ছেলেকে ডেকে বললেন, “শুন, তুমি এখানে কিসের জন্য এসেছ ? কাল থেকে আসবে না !”

বাচ্চাটা ভয় পেয়ে মহাপ্রভুর কাছে গিয়ে নালিশ করলেন, “প্রভু, এই কাকা সব সময় আমাকে গালাগালি দিয়ে আসতে বারণ করেন ।”

মহাপ্রভু সব বুঝতে পারলেন—তিনি জানলেন কেন দামোদর পণ্ডিত সেটা করলেন কিন্তু মহাপ্রভু এখনো কিছু বললেন না আর ছেলেকে আসতে বারণ করলেন না ।

কিছু দিন পরে দামোদর পণ্ডিত আর সহ্য করতে না পেরে মহাপ্রভুর সামনে গিয়ে খুলে বললেন, “প্রভু, আমার অপরাধ নেবেন না । আপনি সব সময় ওই ছেলেকে আদর করেন, আমি তো জানি এটা করলে কিছু অন্যায় নেই কিন্তু লোকের মুখ কি করে থামবে ? যদি লোক আপনার নিন্দা করে, তারাই অধঃপতন যাবে । আপনি কাল থেকে ছেলেটাকে আসতে বারণ করবেন । ছেলেটা ভাল ছেলে, কিন্তু আপনি জানেন যে, ওর মা আছে—বিধবা এবং সুন্দরী মেয়ে । লোকের মন খারাপ দিকে যাবে—মহাপ্রভু ছেলেটাকে আদর করে কেন ? নিশ্চয়ই মায়ের সঙ্গে কিছু ভাব আছে ।”

মহাপ্রভু মনে মনে করলেন, “এটা কী ? আমি তো সন্ন্যাসী আর ও ব্রহ্মচারী—ব্রহ্মচারী হয়ে সন্ন্যাসিকে শিক্ষা দিচ্ছে ?” আর দামোদর পণ্ডিতকে উত্তরে বললেন, “ঠিক বলছ । তুমি তো আমার একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি ! আমার তোমার জন্য একটা সেবা আছে । তুমি জগন্নাথ প্রসাদ ও নতুন কাপড় মায়ের জন্য নিয়ে মায়াপুরে যাও । আমি এখন পর্যন্ত তাঁর জন্য কিছু পাঠিয়ে দেই নি, তাই তুমি ওখানে যেতে পার । আমি আর কাকে বিশ্বাস করতে পারি ?”

“উপযুক্ত ব্যক্তি” কেন তিনি বললেন ? আমি এক দিন গুরু মহারাজকে প্রশ্ন করেছিলাম আর গুরু মহারাজ বুঝিয়ে দিলেন যে, মায়াপুরে গিয়ে কি একমাত্র শচীমাতা ছিলেন ? আর কে তাঁর বাড়িতে ছিলেন ? বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী । তিনি একটি যুবতী মেয়ে, তাঁর কাছে একটা বিশ্বস্ত লোক না পাঠালে চলে ? সেইজন্য মহাপ্রভু সেখানে দামোদর পণ্ডিতকে পাঠিয়ে দিলেন ।

এসব মহাপ্রভুর শিক্ষা—এই শিক্ষাগুলো আমাদের গ্রহণ করতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা :
শান্তিপুর
রেমুণা
সাক্ষীগোপাল
ভুবনেশ্বর
ভুবনেশ্বর শ্রীলিঙ্গরাজ
আঠারনালা
শ্রীপুরীধামে :
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সথে মিলন
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের শিক্ষা
কাশী মিশ্রের কথা
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
ভক্তদের সহিত শ্রীক্ষেত্রে বার্ষিক মিলন
রাজা প্রতাপরুদ্রের প্রতি কৃপা
গোবিন্দ প্রভুর শিক্ষা
দর্শনের আর্ত্তি
শ্রীআলালনাথের কথা
কালিদাসের ব্যতিক্রম
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের প্রসাদে রুচি
“ষাঠী বিধবা হয়ে যাক !”
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী
শ্রীগোপাল গুরুর কথা
শ্রীজগদানন্দ পণ্ডিতের প্রেম
শ্রীলসনাতন গোস্বামীর সঙ্গ
রামচন্দ্র পুরীর কথা
শ্রীপরমানন্দ পুরীর ভক্তিকূপ
দামোদর পণ্ডিতের বিদায়
ছোট হরিদাসের শাস্তি
গুণ্ডিচা-মার্জ্জন লীলা
শ্রীনারায়ণ ছাতায়
চটকপর্ব্বতের কথা
গম্ভীরা—বিরহের জ্বলন্ত ঘর
শ্রীল হরিদাসঠাকুর : নামাচার্য্য শিরোমণি
শ্রীগদাধর পণ্ডিত : মহাপ্রভুর ছায়া
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপুরীধামে আগমন ও ভজন
পরিশেষ

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥