শ্রীপুরীধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা : সাক্ষীগোপাল

 

কটকনগরে এসে মহাপ্রভু সাক্ষী গোপালের দর্শন করার পর নিত্যানন্দ প্রভুর শ্রীমুখে গোপালের কথা শুনেছিলেন ।

আগের যুগে একজন বিদ্যানগরের বাসিন্দা কুলীন ব্রাহ্মণ বানপ্রস্থ হয়ে বড় ছেলেকে সব ভার দিয়ে তীর্থযাত্রা করতে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন । তীর্থ ভ্রমণ করতে করতে বৃন্দাবনে পৌঁছে তাঁর আর একজন ব্রাহ্মণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল—এই ব্রাহ্মণটা নিচু জাতির যুবাবিপ্র ছিলেন ।

বৃদ্ধবিপ্রকে দেখা মাত্রই যুবাবিপ্র বললেন, “আমি কি আপনাকে একটু সাহায্য করতে পারি ? আপনি এত বড় বস্তা নিয়ে তীর্থ ভ্রমণ করছেন । আপনি এইসব নিয়ে কি করে বইবেন ?” বৃদ্ধবিপ্র রাজি হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, যদি সাহায্য করবে, ভালই হবে ।”

তখন তাঁরা একসঙ্গে সব তীর্থস্থান ঘুরিয়ে দেখলেন আর যুবাবিপ্র বড় জ্ঞানী না হয়েও তবু তাঁর সেবার দ্বারা বৃদ্ধবিপ্র খুব সন্তুষ্ট ছিলেন ।

খুশি হয়ে তিনি যুবাবিপ্রকে বললেন, “এখন আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি, তুমিও বাড়ি যাবে, কিন্তু তোমার উপকার আমি ভুলব না । আমার একমাত্র কন্যা আছে, আমি ওকে তোমাকে দিতে চাই ।”

“না, না, সেটা কি করে হয় ? আপনি তো কুলীন ব্রাহ্মণ আর আমি নিচু জাতির ব্রাহ্মণ । আপনার বাড়িতে ছেলে, স্ত্রী, পরিবার আছে—এরা কি মেনে নেবে ? আপনার অসুবিধা দেখলে আমার কোন লাভ নেই । আমি আপনার মেয়ে পাওয়ার জন্য আপনাকে তীর্থে সাহায্য করি নি । আমি নিজের মঙ্গলের জন্য আপনাকে তীর্থ ভ্রমণ করতে সাহায্য করেছি, আপনার কাছে তার পরিবর্তে আমি কিছু চাই না ।”

“চিন্তা কর না । আমার মেয়ে, আমিই দেব । কেউ বারণ করবে না । তুমি কথা স্বীকার কর ।”

“ঠিক আছে, যা ইচ্ছা তাই করুন তবে যদি আপনি এটা সত্যই করতে ঠিক করেছেন, তাহলে গোপালের সামনে কথা দিন ।”

বৃদ্ধবিপ্র গোপালের সামনে গিয়ে বললেন, “প্রভু, আমার মেয়েকে আমি ওকে দিব । কেউ যদি আপত্তি করবে, তুমি সেখানে গিয়ে সাক্ষী দেবে ।”

তারপর তারা নিজে নিজে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন ।

বয়স্ক ব্রাহ্মণকে স্বাগত জানাবার জন্য সব আত্মীয়স্বজন মিলে তার বাড়ীতে গিয়েছিলেন । ব্রাহ্মণ স্বজনকে খুলে বললেন, “আমি তীর্থ ভ্রমণ করে কথা দিয়েছি যে, আমার মেয়েটাকে যুবাবিপ্রকে দিয়ে দেব । ও আমাকে খুব সহযোগিতা করেছেন ।”

কথা শুনে তাঁর স্ত্রী রেগে গেলেন, “সে কী ? আমাকে জিজ্ঞেস না করে তুমি আমার মেয়েকে ছোট নিচু জাতের ছেলেকে দিতে চাইছ ? যে পর্যন্ত আমি জীবিত আছি, সে পর্যন্ত এটা হবে না, আমি অনুমতি দেব না ! আমি বরং তোমাকে ছেড়ে দেব !” বড় ছেলেও বললেন, “ঠিকই বলছ, মা । আমিও বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাব ! বাবা, তুমি কি করে কুলীন ব্রাহ্মণ হয়ে একজনকে যে লেখাপড়াও জানে না আমাদের প্রিয় বোনকে দেবে ? এটা অসম্ভব । তুমি কথা ফিরিয়ে নাও !”

তারপর দুমাস কেটে গেল । দুমাস পরে বিয়ে করবার জন্য প্রস্তুতি করে ছোট বিপ্র বয়স্ক ব্রাহ্মণের বাড়ি এসে বললেন, “নমস্কার, প্রভু । তীর্থযাত্রা করতে করতে আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, আপনার কন্যাকে আমাকে দেবেন । আপনি গোপালকেও সাক্ষী রেখেছিলেন ।” বৃদ্ধবিপ্র কিছু বললেন না । ছোট বিপ্র জিজ্ঞেস করলেন, “মনে আছে ? আপনি চুপ করে আছেন কেন ? কী হয়েছে, প্রভু ?” কথা শুনে বিপ্রের বড় ছেলেটি লাঠি নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়ে ছোট বিপ্রকে বললেন, “তুমি বামন হয়ে আকাশের চাঁদ ধরতে এসেছ ?! যাও এখান থেকে !”

ছোট ব্রাহ্মণ তখন গ্রামের নেতার কাছে গিয়ে বললেন, “হুজুর, দেখুন, তীর্থে গিয়ে এই ব্রাহ্মণ কথা দিয়েছেন, গোপালও সাক্ষী আছে । আমি অনেক তীর্থ দর্শন করেয়েছি, তাঁর মেয়ের জন্য নয় কিন্তু যদি তিনি কথা রাখতে পারবেন না, তাঁরই পাপ হচ্ছে, সেই জন্য আমি আপনাদের কাছে এসেছি ।”

গ্রামের নেতা ব্যাপারটা বুঝে উত্তরে বললেন, “ঠিক আছে, চিন্তা কর না, আমরা গ্রামে বিচার করব ।”

একটু পরে বিচার হল এইরকম । বিপ্রের ছেলেটি নাস্তিক হয়ে ভাবলেন, “ও বলছে গোপাল সাক্ষী, কিন্তু গোপাল কি করে সাক্ষী দিতে পারে ? তাই ওকে বলা হল যে, গোপাল যদি নিজে এসে সাক্ষী দেবে, তখন মেয়েটাকে আমরা ওকে দেব ।” গ্রামের নেতা ছোট বিপ্রকে তাই বলেছেন । শুনে বৃদ্ধবিপ্র রেগে গেল । তিনি গোপালকে প্রার্থনা করলেন, “গোপাল, তুমি নিশ্চয় সাক্ষী দিতে পারবে । কৃপা করে আমার কথা রাখতে সাহায্য কর ।”

ছোট ব্রাহ্মণ তখন বৃন্দাবনে ফিরে গেলেন আর গোপালের কাছে আবার এসে বললেন, “হে গোপাল, তুমি তো সব জান । চল, তোমায় সাক্ষী দিতে হবে ।”

গোপাল প্রথম বললেন, “এটা কি করে হবে ? আমি তো বিগ্রহ, আমি কি করে যাব ?”

“কথা বলতে পারলে, সাক্ষীও দিতে পারবে !”

“ঠিক আছে, যাব । কিন্তু মনে রাখ—প্রথম তুমি আমার জন্য এক সের চাল রান্না করবে (আমার হাঁটতে হাঁটতে ক্ষিদে পেয়ে যাবে ), খেয়ে আমি তোমার পিছনে পিছনে যাব আর তুমি পিছন দিকে তাকাবে না—তাকালে, আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ব ।”

বিপ্র গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি করে বুঝব যে, তুমি পিছনে আসছ ?”

গোপাল বললেন, “তুমি আমার নূপুরের ধ্বনি শুনতে পেয়ে সেটা বুঝবে ।”

তখন ভোগ লাগিয়ে দিয়ে ছোট ব্রাহ্মণ গোপালকে নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলেন । যেতে যেতে বিপ্র নূপুরের ধ্বনি শুনতে পেলেন কিন্তু বিদ্যানগরের নিকটে প্রায় আগমন করে বিপ্রটি কৌতূহলী হয়ে ভাবলেন, “গোপাল আসছে কি না ?” তখন ঘুরে তিনি পিছন দিকে তাকালেন আর দেখতে পেলেন যে, হঠাৎ করে গোপাল বিগ্রহ হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে হাসছেন, “আমি সাক্ষী দিতে এসেছি ।”

ছোট বিপ্র বিদ্যানগর গ্রামে গিয়ে সবাইকে ডেকে বললেন, “এস, গোপাল সাক্ষী দিতে এসেছেন ! তিনি গ্রামের পাশেই আছেন ।”

গ্রামের নেতা, বৃদ্ধবিপ্র, তাঁর স্ত্রী-পুত্রাদি সবাই চলে এলেন আর দেখলেন যে, গোপাল সত্যই ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন । সেই ভাবে গোপাল তাঁর ভক্তের জন্য সাক্ষী দিতে এসেছিলেন । একটু পরে ছোট বিপ্র বৃদ্ধবিপ্রের কন্যাকে বিয়ে করলেন, কেউ আর কোন আপত্তি করতে পারলেন না ।

পরে এক সময় উড়িষ্যার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তামিলনাড়ু জয় করলেন আর সাক্ষী গোপালকে বিদ্যানগর থেকে এখানে ভুবনেশ্বরের পাশে নিয়ে এসেছিলেন । তিনি যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গোপালের কাছে গিয়ে বললেন, “গোপাল, এই সোনা, ধন, টাকা-পয়সা যে আমি পেয়েছি, সেটা সব তোমার । আমি তোমাকে আমার রাজ্যে নিতে এসেছি ।” কিন্তু গোপাল তাঁকে বললেন, “আগে তুমি আমার জন্য মন্দির কর, তারপর আমি যাব ।” তাই রাজা গোপালের জন্য বিরাট মন্দির তৈরি করেছিলেন ।

আপনারা সবাই জানেন যে, বাঙ্গালী মেয়েরা যেমন শাঁখা-সিঁদুর পরে বিবাহিত মনে হয়, তেমন উড়িষ্যায় মেয়েরা নাকের নথ পরে বিবাহিত মনে হয় আর যার নথ নাই সে অবিবাহিত বা বিধবা । তাই, যখন রাজা মন্দির তৈরি করলেন আর গোপাল সেখানে চলে এসেছিলেন, তখন তিনি বিরাট উৎসব করেছিলেন । সাক্ষী গোপালের দর্শন করার সময় রাজার স্ত্রী গুন্দিচারাণী গিয়ে বললেন, “যদি ঠাকুরের নাকে ছিদ্র থাকত, আমি নিজের নথটা খুলে পরিয়ে দিতাম । ঠাকুর তো আমার স্বামী ।” তাই ঠাকুরের নথ পরতে ইচ্ছা হল । উৎসব শেষ হল আর যখন সেই দিন রাত্রে রাণী ঘুমিয়ে পড়লেন তখন গোপাল স্বপ্নে তাঁর কাছে এসে বললেন, “রাণী মা ! আমার মা শিশুকালে আমার নাকের ছিদ্র করেছিল, আমি নথ পড়েছিলাম কিন্তু বিরাট ছিদ্র যে আছে তুমি দেখতে পেলে না । তুমি যদি নথটা বানিয়ে দাও, খুব ভাল হবে ।” পরের দিন রাণী উঠে এক কেজি সোনা দিয়ে বিরাট করে নথ বানাতে আদেশ দিলেন আর নথটা পরিয়ে দিয়ে আবার বিরাট উৎসবের আয়োজন করেছিলেন ।

এই ভাবে ভগবান তাঁর ভক্তের কাছ থেকে সব কিছু গ্রহণ করেন । “ভক্তের অধীন ভগবান”—ভক্তের ইচ্ছায় ভগবান চলেন ।

ভক্তের হৃদয়ে সদা গোবিন্দ-বিশ্রাম ।
গোবিন্দ কহেন—মম বৈষ্ণব পরাণ ॥

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই সব সাক্ষী গোপালের লীলা শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কাছ থেকে শুনেছিলেন । শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তার আগে এখানে শ্রীলমাধবেন্দ্রপুরীর সঙ্গে এসেছিলেন । সাক্ষী গোপাল দর্শন করবার পর মহাপ্রভু ভক্তগণকে নিয়ে আগে গিয়ে ভুবনেশ্বরে চলে গিয়েছিলেন ।

জয় শ্রীসাক্ষীগোপাল কি জয় ।

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


সূচীপত্র:

সূচনা : শ্রীজগন্নাথদেব
মহাপ্রভুর ইচ্ছা ও পুরীতে যাত্রার আরম্ভ
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা : শান্তিপুর
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা : রেমুণা
মহাপ্রভুর পুরীতে যাত্রা : সাক্ষীগোপাল
রামানন্দ রায়ের পুনর্মিলন ও প্রকৃতি
গঙ্গা মাতা গোস্বামিণী

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥