শ্রীশ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতম্


তৃতীয়োঽধ্যাঃ

শ্রীভক্তবচনামৃতম্
আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পঃ

 

 

কৃষ্ণকার্ষ্ণগ-সদ্ভক্তি-প্রপন্নত্বানুকূলকে ।
কৃত্যত্ব-নিশ্চয়শ্চানুকূল্যসঙ্কল্প উচ্যতে ॥১॥

শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁহার ভক্তের সেবার এবং শরণাগত ভাবের অনুকূল বিষয় সমূহ কর্ত্তব্য বলিয়া নিশ্চয়কে ‘আনুকূল্যের সঙ্কল্প’ বলা যায় ॥১॥

শ্রীকৃষ্ণসঙ্কীর্ত্তনমেব তৎপদাশ্রিতানাং পরমানুকূলম্—
চেতোদর্পণমার্জ্জনং ভবমহাদাবাগ্নিনির্ব্বাপণং
শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকাবিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্ ।
আনন্দাম্বুধিবর্দ্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্ব্বাত্মস্নপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসঙ্কীর্ত্তনম্ ॥২॥
শ্রীশ্রীভগবতশ্চৈতন্যচন্দ্রস্য
হরিপদাশ্রিতের হরিসঙ্কীর্ত্তনই পরমানুকূল্য-বিধানকারী—
“চিত্তরূপ দর্পণের মার্জ্জনকারী, ভবরূপ মহাদাবাগ্নির নির্ব্বাণকারী, জীবের মঙ্গলরূপ কৈরবচন্দ্রিকা-বিতরণকারী, বিদ্যাবধূর জীবনস্বরূপ, আনন্দ সমুদ্রের বর্দ্ধনকারী, পদে পদে পূর্ণামৃতাস্বাদন স্বরূপ এবং সর্ব্বস্বরূপের শীতলকারী শ্রীকৃষ্ণসঙ্কীর্ত্তন বিশেষরূপে জয়যুক্ত হউন” ॥২॥
তত্র সম্পত্তিচতুষ্টয়ম্ পরমানুকূলম্—
তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা ।
অমানিনা মানদেন কীর্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ ॥৩॥
শ্রীশ্রীভগবতশ্চৈতন্যচন্দ্রস্য
হরিকীর্ত্তনে এই সম্পত্তিচতুষ্টয় বিশেষ অনুকূল বলিয়া গৃহীত—
“যিনি আপনাকে তৃণাপেক্ষা ক্ষুদ্র জ্ঞান করেন, যিনি তরুর ন্যায় সহিষ্ণু হন, নিজে মানশূন্য ও অপর লোককে সম্মান প্রদান করেন, তিনি সদা হরিকীর্ত্তনের অধিকারী” ॥৩॥
কার্ষ্ণানামধিকারানুরূপা সেবৈব ভজনানুকূলা—
কৃষ্ণেতি যস্য গিরি তং মনসাদ্রিয়েত
দীক্ষাস্তি চেৎ প্রণতিভিশ্চ ভজন্তমীশম্ ।
শুশ্রূষয়া ভজনবিজ্ঞমনন্যমন্য-
নিন্দাদিশূন্যহৃদমীপ্সিতসঙ্গলব্ধ্যা ॥৪॥
শ্রীরূপপাদানাং
ভক্তগণের অধিকারভেদে যথাযোগ্য সেবা ভজনানুকূল—
“কৃষ্ণসহ কৃষ্ণনাম অভিন্ন জানিয়া ।
অপ্রাকৃত একমাত্র সাধন মানিয়া ॥
যেই নাম লয়, নামে দীক্ষিত হইয়া ।
আদর করিবে মনে স্বগোষ্ঠী জানিয়া ॥
নামের ভজনে যেই কৃষ্ণসেবা করে ।
অপ্রাকৃত ব্রজে বসি’ সর্ব্বদা অন্তরে ॥
মধ্যম বৈষ্ণব জানি’ ধর তার পায় ।
আনুগত্য কর তার মনে আর কায় ॥
নামের ভজনে যেই স্বরূপ লভিয়া ।
অন্য বস্তু নাহি দেখে কৃষ্ণ তেয়াগিয়া ॥
কৃষ্ণেতর সম্বন্ধ না পাইয়া জগতে ।
সর্ব্বজনে সমবুদ্ধি করে কৃষ্ণব্রতে ॥
তাদৃশ ভজনবিজ্ঞে জানিয়া অভীষ্ট ।
কায়মনোবাক্যে সেব’ হইয়া নিবিষ্ট ॥
শুশ্রূষা করিবে তাঁরে সর্ব্বতোভাবেতে ।
কৃষ্ণের চরণ লাভ হয় তাঁহা হইতে” ॥৪॥
উৎসাহাদিগুণা অনুকূলত্বাদাদরণীয়াঃ—
উৎসাহান্নিশ্চয়াদ্ধৈর্য্যাৎ তত্তৎকর্ম্মপ্রবর্ত্তনাৎ ।
সঙ্গত্যাগাৎ সতো বৃত্তেঃ ষড়্­ভির্ভক্তিঃ প্রসিদ্ধ্যতি ॥৫॥
শ্রীরূপপাদানাং
উৎসাহাদি ছয়গুণ অনুকূল বলিয়া আদর করিতে হইবে—
“ভজনে উৎসাহ যার ভিতরে বাহিরে ।
সুদুর্ল্লভ কৃষ্ণভক্তি পাবে ধীরে ধীরে ॥
কৃষ্ণভক্তি প্রতি যার বিশ্বাস নিশ্চয় ।
শ্রদ্ধাবান্ ভক্তিমান্ জন সেই হয় ॥
কৃষ্ণসেবা না পাইয়া ধীরভাবে যেই ।
ভক্তির সাধন করে ভক্তিমান্ সেই ॥
যাহাতে কৃষ্ণের সেবা কৃষ্ণের সন্তোষ ।
সেই কর্ম্মে ব্রতী সদা না করয়ে রোষ ॥
কৃষ্ণের অভক্ত-জন-সঙ্গ পরিহরি’ ।
ভক্তিমান্ ভক্তসঙ্গে সদা ভজে হরি ॥
কৃষ্ণভক্ত যাহা করে তদনুসরণে ।
ভক্তিমান্ আচরয় জীবনে মরণে ॥
এই ছয় জন হয় ভক্তি অধিকারী ।
বিশ্বের মঙ্গল করে ভক্তি পরচারি” ॥৫॥
যুক্তবৈরাগ্যমেবানুকূলম্—
যাবতা স্যাৎ স্বনির্ব্বাহঃ স্বীকুর্য্যাত্তাবদর্থবিৎ ।
আধিক্যে ন্যূনতায়াঞ্চ চ্যবতে পরমার্থতঃ ॥৬॥
শ্রীব্যাসপাদানাং
যুক্ত-বৈরাগ্যই অনুকূল—
যে পরিমাণ মাত্র বিষয় স্বীকারের দ্বারা নিজ প্রয়োজন সিদ্ধ হয়, অর্থাভিজ্ঞ ব্যক্তি তৎ পরিমাণ মাত্রই গ্রহণ করিবেন । যথাযথ পরিমাণের অধিক বা ন্যূন হইলে পরমার্থ সাধন হইতে ভ্রষ্ট হইতে হয় ॥৬॥
তত্র কৃষ্ণসন্বন্ধস্যৈব প্রাধান্যম্—
ত্বয়োপভুক্তস্রগ্গন্ধবাসোঽলঙ্কারচর্চ্চিতাঃ ।
উচ্ছিষ্টভোজিনো দাসাস্তব মায়াং জয়েম হি ॥৭॥
শ্রীমদুদ্ধবস্য
যুক্ত-বৈরাগ্যে কৃষ্ণসম্বন্ধজ্ঞানই প্রধান—
“তোমাকে মাল্য, গন্ধবস্ত্র, অলঙ্কার ইত্যাদি যাহা অর্পিত হইয়াছে, তাহাতে ভূষিত হইয়া তোমার দাস-স্বরূপ আমরা তোমার উচ্ছিষ্ট সকল ভোজন করিতে করিতেই তোমার মায়াকে জয় করিতে নিশ্চয়ই সমর্থ হইব” ॥৭॥
সর্ব্বথা হরিস্মৃতিরক্ষণমেব তাৎপর্য্যম্—
অলব্ধে বা বিনষ্টে বা ভক্ষ্যাচ্ছাদনসাধনে ।
অবিক্লব-মতির্ভূত্বা হরিমেব ধিয়া স্মরেৎ ॥৮॥
শ্রীব্যাসপাদানাং
সর্ব্বপ্রকারে হরিস্মরণই মূল তাৎপর্য্য—
“হরিভক্তিপরায়ণ ব্যক্তিগণ ভোজন ও আচ্ছাদন-সংগ্রহের নিমিত্ত চেষ্টা করিয়াও যদি তাহা প্রাপ্ত না হন, অথবা লব্ধসামগ্রী বিনষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইলে ব্যাকুলচিত্ত না হইয়া মনোমধ্যে হরিকেই স্মরণ করিবেন” ॥৮॥
সর্ব্বত্র তদনুকম্পাদর্শনাদেব তৎসিদ্ধিঃ—
তত্তেঽনুকম্পাং সুসমীক্ষমাণো ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্ ।
হৃদ্বাগ্বপুভির্বিদধন্নমস্তে জীবেত যো মুক্তিপদে স দায়ভাক্ ॥৯॥
শ্রীব্রহ্মণঃ
সর্ব্বাবস্থায় ভগবানের কৃপা দর্শন করিতে পারিলেই তৎসিদ্ধি—
“যিনি তোমার অনুকম্পা লাভের আশয়ে স্বকর্ম্মের মন্দ ফল ভোগ করিতে করিতে মন, বাক্য ও শরীরের দ্বারা তোমাতে ভক্তি বিধান করিয়া জীবন যাপন করেন, তিনি মুক্তিপদে দায়ভাক্ অর্থাৎ তিনি মুক্তিপদ লাভ করেন” ॥৯॥
সাধুসঙ্গাৎ সর্ব্বমেব সুলভম্—
তুলয়াম লবেনাপি ন স্বর্গং নাপুনর্ভবম্ ।
ভগবৎসঙ্গিসঙ্গস্য মর্ত্ত্যানাং কিমুতাশিষঃ ॥১০॥
শ্রীশৌনকাদীনাং
সাধুসঙ্গেই সমস্ত সুলভ—
“ভগবৎসঙ্গি-সঙ্গ দ্বারা জীবের যে অসীম মঙ্গল হয়, তাহার সহিত স্বর্গ বা মোক্ষের কিছুমাত্র তুলনা করা যাইতে পারে না, রাজ্যাদি-প্রাপ্তির কথা ত’ দূরে” ॥১০॥
গুরু-পদাশ্রয় এব মুখ্যঃ—
তস্মাদ্­গুরুং প্রপদ্যেত
জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয়ঃ উত্তমম্ ।
শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং
ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্ ॥১১॥
শ্রীপ্রবুদ্ধস্য
সদ্­গুরুর চরণ-সেবাই মুখ্য সাধুসঙ্গ—
অতএব উত্তম মঙ্গলাম্বেষী ব্যক্তি শব্দ-ব্রহ্ম ও পরব্রহ্মে অভিজ্ঞ রাগাদিরহিত গুরুর শরণাগত হইবেন ॥১১॥
তত্র শিক্ষা-সেবা-ফলাপ্তিশ্চ—
তত্র ভাগবতান্ ধর্ম্মান্ শিক্ষেদ্ গুর্ব্বাত্মদৈবতঃ ।
অমায়য়ানুবৃত্ত্যা যৈস্তুষ্যেদাত্মাত্মদো হরিঃ ॥১২॥
শ্রীপ্রবুদ্ধস্য
সেখানে সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়োজন লাভ—
“উক্ত গুরুদেবকে নিজের হিতকারী বান্ধব এবং পরমারাধ্য শ্রীহরিস্বরূপ জানিয়া নিরন্তর নিষ্কপটভাবে তাঁহার অনুগমনপূর্ব্বক যে-সকল ধর্ম্মের অনুষ্ঠানে আত্মপ্রদ শ্রীহরি পরিতুষ্ট হন, সেই সকল ভাগবত-ধর্ম্ম অবগত হইবে” ॥১২॥
তদীয়ারাধনং পরমফলদম্—
মজ্জন্মনঃ ফলমিদং মধুকৈটভারে
মৎপ্রার্থনীয় মদনুগ্রহ এষ এব ।
ত্বদ্ভৃত্য-ভৃত্য-পরিচারক-ভৃত্য-ভৃত্য-
ভৃত্যস্য ভৃত্যমিতি মাং স্মর লোকনাথ ॥১৩॥
শ্রীকুলশেখরস্য
ভক্তসেবা পরম ফল-দানকারী—
“হে লোকনাথ ভগবন্, হে মধুকৈটভারে, আমার জন্মের ইহাই ফল, ইহাই আমার প্রার্থনা এবং ইহাই আপনার অনুগ্রহ যে, আপনি আমাকে আপনার ভৃত্য, বৈষ্ণবের দাসানুদাস, সেই বৈষ্ণবদাসানুদাসের দাসানুদাস এবং বৈষ্ণবদাসানুদাসের দাসানুদাসের দাসানুদাস বলিয়া স্মরণ করিবেন” ॥১৩॥
তদীয়সেবনং ন হি তুচ্ছম্—
জ্ঞানাবলম্বকাঃ কেচিৎ কেচিৎ কর্ম্মাবলম্বকাঃ ।
বয়ন্তু হরিদাসানাং পাদত্রাণাবলম্বকাঃ ॥১৪॥
শ্রীদেশিকাচার্য্যস্য
ভক্তসেবা তুচ্ছ নহে—
কেহ কেহ কর্ম্মপথের, কেহ বা জ্ঞানপথের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকেন । আমরা কিন্তু হরিদাসগণের পাদুকাই একমাত্র আশ্রয়রূপে বরণ করিয়াছি ॥১৪॥
অস্মাদনন্যনিষ্ঠা—
ত্যজন্তু বান্ধবাঃ সর্ব্বে নিন্দন্তু গুরবো জনাঃ ।
তথাপি পরমানন্দো গোবিন্দো মম জীবনম্ ॥১৫॥
শ্রীকুলশেখরস্য
ভক্তসেবা হইতে অনন্য-নিষ্ঠা জন্মে—
বন্ধুগণ আমাকে পরিত্যাগ করেন করুন ; এমন কি (লৌকিক) গুরু গণও যদি আমাকে নিন্দা করিতে থাকেন, তথাপি পরমানন্দস্বরূপ শ্রীগোবিন্দই আমার একমাত্র জীবন ॥১৫॥
অপ্রাকৃতরত্যুদয়শ্চ—
যত্তদ্বদন্তু শাস্ত্রাণি যত্তদ্ব্যাখ্যান্তু তার্কিকাঃ ।
জীবনং মম চৈতন্যপাদাম্ভোজসুধৈব তু ॥১৬॥
শ্রীপ্রবোধানন্দপাদানাং
অপ্রাকৃত রতির উদয়ও দৃষ্ট হয়—
শাস্ত্র সমূহ (বিভিন্নাধিকারে) যাহা বলিতে হয় বলুন ; তর্কনিপুণগণ যাহা ইচ্ছা ব্যখ্যা করিতে পারেন ; কিন্তু শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের পাদপদ্মসুধাই আমার জীবন-স্বরূপ ॥১৬॥
সাধ্যসেবাসঙ্কল্পঃ—
ভবন্তমেবানুচরন্নিরন্তরঃ
প্রশান্তনিঃশেষমনোরথান্তরঃ ।
কদাহমৈকান্তিকনিত্যকিঙ্করঃ
প্রহর্ষয়িষ্যামি সনাথজীবিতম্ ॥১৭॥
শ্রীযামুনাচার্য্যস্য
সাধ্যভক্তি লাভের আগ্রহ—
“আপনার নিরন্তর সেবার দ্বারা অন্য মনোরথ নিঃশেষিত হইলে প্রশান্তভাবে আমি কবে আপনার নিত্য কিঙ্কর বলিয়া দাসজীবনের সহিত প্রফুল্ল হইব” ॥১৭॥
পরিকরসিদ্ধেরাকাঙ্ক্ষা—
সকৃত্ত্বদাকারবিলোকনাশয়া
তৃণীকৃতানুত্তমভুক্তিমুক্তিভিঃ ।
মহাত্মভির্মামবলোক্যতাং নয়
ক্ষণেঽপি তে যদ্বিরহোঽতি দুঃসহঃ ॥১৮॥
শ্রীযামুনাচার্য্যস্য
পরিকরসিদ্ধিলাভের অভিলাষ—
হে ভগবন্, তোমার যে ভক্ত-সমূহ তোমার শ্রীবিগ্রহ একমাত্র দর্শন-প্রত্যাশায় ভুক্তি ও মুক্তি তৃণবৎ বিচার করেন, যাঁহাদের ক্ষণমাত্র বিচ্ছেদ তোমারও অতি দুঃসহ, আমাকে সেই সকল মহাত্মাগণের দৃষ্টিপথে নীত কর ॥১৮॥
নিরুপাধিকভক্তিস্বরূপোপলব্ধিঃ—
ভক্তিস্ত্বয়ি স্থিরতরা ভগবন্ যদি স্যাৎ
দৈবেন নঃ ফলতি দিব্যকিশোরমূর্ত্তিঃ ।
মুক্তিঃ স্বয়ং মুকুলিতাঞ্জলি সেবতেঽস্মান্
ধর্ম্মার্থকামগতয়ঃ সময়প্রতীক্ষাঃ ॥১৯॥
শ্রীবিল্বমঙ্গলস্য
নিরুপাধিক-ভক্তির স্বরূপানুভব—
“হে ভগবন্, যদি তোমাতে আমাদের ভক্তি স্থিরতরা থাকে, তাহা হইলে তোমার কিশোরমূর্ত্তি স্বতঃই আমাদের হৃদয়ে উদিত (স্ফূর্ত্তিপ্রাপ্ত) হন । তখন (ধর্ম্মার্থকামরূপ ত্রিবর্গ ও মুক্তিরূপ অপবর্গ-প্রার্থনার কিছুমাত্র প্রয়োজন হয় না । কেন না) স্বয়ং মুক্তিই কৃতাঞ্জলিপুটে (দাসীর ন্যায় পূর্ব্ব হইতেই আনুষঙ্গিকভাবে অবিদ্যামোচনরূপ অবান্তর ফল দ্বারা) আমাদিগের সেবা করিতে থাকিবে । আর ভুক্তি (অনিত্য স্বর্গভোগাদি) ধর্ম্মার্থকামের ফলসমূহ (যখন যেমন প্রয়োজন, তখন সেইরূপভাবে তোমার চরণ-সেবার নিমিত্ত আমাদিগের) আদেশকাল প্রতীক্ষা করিতে থাকিবে” ॥১৯॥
ব্রজরসশ্রেষ্ঠত্বম্—
শ্রুতিমপরে স্মৃতিমিতরে ভারতমন্যে ভজন্তু ভবভীতাঃ ।
অহমিহ নন্দং বন্দে যস্যালিন্দে পরং ব্রহ্ম ॥২০॥
শ্রীরঘুপতি-উপাধ্যায়স্য
ব্রজরসের শ্রেষ্ঠতা—
“ভবভীত ব্যক্তি সকল কেহ শ্রুতিকে, কেহ স্মৃতিকে, কেহ বা মহাভারতকে ভজনা করেন ; আমি কিন্তু এই স্থানে শ্রীনন্দেরই বন্দনা করি,—যাঁহার অলিন্দে (বারান্দায়) পরম-ব্রহ্ম খেলা করেন” ॥২০॥
তত্র ভজন-পদ্ধতিঃ—
তন্নাম-রূপ-চরিতাদি-সুকীর্ত্তনানু-
স্মৃত্যোঃ ক্রমেণ রসনামনসী নিযোজ্য ।
তিষ্ঠন্ ব্রজে তদনুরাগিজনানুগামী
কালং নয়েদখিলমিত্যুপদেশসারঃ ॥২১॥
শ্রীরূপপাদানাং
ব্রজরসে ভজন প্রণালী—
“কৃষ্ণ নাম, রূপ, গুণ, লীলা চতুষ্টয় ।
গুরুমুখে শুনিলেই কীর্ত্তন উদয় ॥
কীর্ত্তিত হইলে ক্রমে স্মরণাঙ্গ পায় ।
কীর্ত্তন স্মরণকালে ক্রম-পথে ধায় ॥
জাতরুচি-জন জিহ্বা মন মিলাইয়া ।
কৃষ্ণ-অনুরাগ ব্রজজনানুস্মরিয়া ॥
নিরন্তর ব্রজবাস মানস ভজন ।
এই উপদেশ-সার করহ গ্রহণ” ॥২১॥
ব্রজভজন-তারতম্যানুভূতিঃ—
বৈকুণ্ঠাজ্জনিতো বরা মধুপুরী তত্রাপি রাসোৎসবাদ্-
বৃন্দারণ্যমুদারপাণি-রমণাত্তত্রাপি গোবর্দ্ধনঃ ।
রাধাকুণ্ডমিহাপি গোকুলপতেঃ প্রেমামৃতাপ্লাবনাৎ
কুর্য্যাদস্য বিরাজতো গিরিতটে সেবাং বিবেকী ন কঃ ॥২২॥
শ্রীরূপপাদানাং
ব্রজভজনের তারতম্য জ্ঞান—
“বৈকুণ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠা মথুরা নগরী ।
জনম লভিলা যথা কৃষ্ণচন্দ্র হরি ॥
মথুরা হইতে শ্রেষ্ঠ বৃন্দাবন ধাম ।
যথা সাধিয়াছে হরি রাসোৎসব-কাম ॥
বৃন্দাবন হইতে শ্রেষ্ঠ গোবর্দ্ধনশৈল ।
গিরিধারী-গান্ধর্ব্বিকা যথা ক্রীড়া কৈল ॥
গোবর্দ্ধন হইতে শ্রেষ্ঠ রাধাকুণ্ড-তট ।
প্রেমামৃতে ভাসাইল গোকুল লম্পট ॥
গোবর্দ্ধন গিরিতট রাধাকুণ্ড ছাড়ি’ ।
অন্যত্র যে করে নিজ কুঞ্জ পুষ্পবাড়ী ॥
নির্ব্বোধ তাহার সম কেহ নাহি আর ।
কুণ্ডতীর সর্ব্বোত্তম স্থান প্রেমাধার” ॥২২॥
ব্রজরস-স্বরূপসিদ্ধৌ সম্বন্ধজ্ঞানোদয়-প্রকারঃ—
গুরৌ গোষ্ঠে গোষ্ঠালয়িষু সুজনে ভূসুরগণে
স্বমন্ত্রে শ্রীনাম্নি ব্রজনবযুবদ্বন্দ্বশরণে ।
সদা দম্ভং হিত্বা কুরু রতিমপূর্ব্বামতিতরা-
ময়ে স্বান্তর্ভ্রাতশ্চটুভিরভিযাচে ধৃতপদঃ ॥২৩॥
শ্রীরঘুনাথপাদানাং
ব্রজরসে স্বরূপ-সিদ্ধিতে সম্বন্ধ জ্ঞানের প্রকার—
“গুরুদেবে, ব্রজবনে,ব্রজভূমিবাসী জনে,
শুদ্ধভক্তে, আর বিপ্রগণে ।
ইষ্টমন্ত্রে, হরিনামে,যুগল ভজন কামে,
কর রতি অপূর্ব্ব যতনে ॥
ধরি মন চরণে তোমার ।
জানিয়াছি এবে সার,কৃষ্ণভক্তি বিনা আর,
নাহি ধুচে জীবের সংসার ॥
কর্ম্ম, জ্ঞান, তপঃ, যোগ,সকলই ত’ কর্ম্মভোগ,
কর্ম্ম ছাড়াইতে কেহ নারে ।
সকল ছাড়িয়া ভাই,শ্রদ্ধাদেবীর গুণ গাই,
যাঁর কৃপা ভক্তি দিতে পারে ॥
ছাড়ি’ দম্ভ অনুক্ষণ,স্মর অষ্টতত্ত্ব মন,
কর তাহে নিষ্কপট রতি ।
সেই রতি প্রার্থনায়,শ্রীদাস গোস্বামী পায়,
এ ভকতিবিনোদ করে নতি” ॥২৩॥
নামাভিন্ন-ব্রজভজন-প্রার্থনা—
অঘদমন-যশোদানন্দনৌ নন্দসূনো
কমলনয়ন-গোপীচন্দ্র-বৃন্দাবনেন্দ্রাঃ ।
প্রণতকরুণ-কৃষ্ণাবিত্যনেকস্বরূপে
ত্বয়ি মম রতিরুচ্চৈর্বর্দ্ধতাং নামধেয় ॥২৪॥
শ্রীরূপপাদানাং
নামভজনের সহিত অভিন্নভাবে ব্রজরসাস্বাদন প্রার্থনা—
“হে অঘদমন, হে যশোদানন্দন, হে নন্দসূনো, হে কমলনয়ন, হে গোপীচন্দ্র, হে বৃন্দাবনেন্দ্র, হে প্রণতকরুণ, হে কৃষ্ণ,—ইত্যাদি বহু স্বরূপে তুমি আবির্ভূত হইয়াছ । অতএব হে নামধেয়, তোমাতে আমার রতি প্রচুর পরিমাণে বর্দ্ধিত হউক” ॥২৪॥
পরমসিদ্ধিসঙ্কল্পঃ—
কদাহং যমুনাতীরে নামানি তব কীর্ত্তয়ন্ ।
উদ্বাষ্পঃ পুণ্ডরীকাক্ষ রচয়িষ্যামি তাণ্ডবম্ ॥২৫॥
কস্যচিৎ
সিদ্ধির অনুকূলে বিরহাবস্থায় সঙ্কল্প—
“হে পুণ্ডরীকাক্ষ, আমি কবে তোমার নাম কীর্ত্তন করিতে করিতে উদ্বাষ্প হইয়া যমুনাতীরে নৃত্য করিতে থাকিব” ॥২৫॥
বিপ্রলম্ভে মিলনসিদ্ধৌ নামভজনানুকূল্যম্—
নয়নং গলদশ্রুধারয়া বদনং গদ্গদরুদ্ধয়া গিরা ।
পুলকৈর্নিচিতং বপুঃ কদা তব নামগ্রহণে ভবিষ্যতি ॥২৬॥
শ্রীশ্রীভগবতশ্চৈতন্যচন্দ্রস্য
বিপ্রলম্ভরসে নামভজনেই মিলন সংসিদ্ধির অনুকূলতা—
“হে নাথ, তোমার নাম গ্রহণে কবে আমার নয়নযুগল গলদশ্রুধারায় শোভিত হইবে । বাক্যনিঃসরণ সময়ে বদনে গদ্­গদ্-স্বর বাহির হইবে এবং আমার সমস্ত শরীর পুলকাঞ্চিত হইবে” ॥২৬॥

ইতি শ্রীপ্রপন্নজীবনামৃতে শ্রীভক্তবচনামৃতান্তর্গত
আনুকূল্যস্য সঙ্কল্পো নাম তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ ।

 

 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥