শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত


৯। যুক্তবৈরাগ্য

 

বৈরাগ্য দুই প্রকার—ফল্গু ও যুক্ত

একদিন জিজ্ঞাসিলেন গোসাঞি সনাতন ।

“‘যুক্ত বৈরাগ্য’ কারে বলে প্রভু করুন বর্ণন ॥১॥

মায়াবাদী বলে, ‘সব কাকবিষ্ঠাসম ।

বিষয় জানিলে ন্যাসী হয় সর্ব্বোত্তম’ ॥২॥

বৈষ্ণবের কি কর্ত্তব্য জানিতে ইচ্ছা করি ।

কৃপা করি’ আজ্ঞা কর আজ্ঞা শিরে ধরি” ॥৩॥

প্রভু বলে, “বৈরাগ্য হয় দুই ত প্রকার ।

‘ফল্গু’-‘যুক্ত’ ভেদে আমি শিখাইনু বার বার ॥৪॥

ফল্গুবৈরাগ্য

কর্ম্মী জ্ঞানী যবে করে নির্ব্বেদ আশ্রয় ।

তার চিত্তে ফল্গুবৈরাগ্য পায় দুষ্টাশয় ॥৫॥

সংসারেতে তুচ্ছবুদ্ধি আসিয়া তখন ।

জড়-বিপরীত ধর্ম্মে করে প্রবর্ত্তন ॥৬॥

কৃষ্ণসেবা সাধুসেবা আত্মরসাস্বাদ ।

জড়-বিপরীত ধর্ম্মে পায় নিতান্ত অবসাদ ॥৭॥

ফল্গুবৈরাগীর মন সদা শুষ্ক রসহীন ।

নামরূপগুণলীলা না হয় সমীচীন ॥৮॥

যুক্তবৈরাগ্য

যুক্তবৈরাগীর ভক্তি হয় ত’ সুলভ ।

কৃষ্ণভক্তি-পূত বিষয় তার ঘটে সব ॥৯॥

প্রকৃতির জড়ধর্ম্ম তার চিত্ত ছাড়ে অনায়াসে ।

চিৎ-আশ্রয়ে মজে শীঘ্র অপ্রাকৃত ভক্তিরসে ॥১০॥

ভক্তিযোগে শ্রীকৃষ্ণের প্রসন্নতা পায় ।

‘ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি’, প্রতিজ্ঞা জানায় ॥১১॥

প্রসন্ন হইয়া কৃষ্ণ যারে কৃপা করে ।

সেই জন ধন্য এই সংসার-ভিতরে ॥১২॥

গোলোকের পরম ভাব তার চিত্তে স্ফুরে ।

গোকুলে গোলোক পায় মায়া পড়ে দূরে ॥১৩॥

শুষ্কবৈরাগ্য অসম্ভব

ওরে ভাই শুষ্কবৈরাগ্য এবে দূর কর ।

যুক্তবৈরাগ্য আনি’ সদা হৃদয়েতে ধর ॥১৪॥

বিষয় ছাড়িয়া ভাই কোথা যাবে বল ।

বনে যাবে, সেখানে বিষয়-জঞ্জাল ॥১৫॥

পেট তোমার সঙ্গে যাবে, দেহের রক্ষণে ।

কত লেঠা হবে তাহা ভেবে দেখ মনে ॥১৬॥

অকারণে জীবনের শীঘ্র হবে ক্ষয় ।

মরিলে কেমনে আর মায়া কর­­​বে জয় ॥১৭॥

যদিও না মর তবু হইবে দুর্ব্বল ।

জ্ঞাননাশ হৈলে কোথা জ্ঞানের সম্বল ॥১৮॥

সুতরাং যুক্তবৈরাগ্য কর্ত্তব্য

ঘরে বসি’ সদা কাল কৃষ্ণনাম লঞা ।

যথাযোগ্য-বিষয় ভুঞ্জ, অনাসক্ত হঞা ॥১৯॥

'যথাযোগ্য' এই শব্দ দুটীর মর্ম্মার্থ বুঝে লহ ।

কপটার্থ লঞা যেন দেহারামী না হ ॥২০॥

শুদ্ধভক্তির অনুকূল কর অঙ্গীকার ।

শুদ্ধভক্তির প্রতিকূল কর অস্বীকার ॥২১॥

মর্ম্মার্থ ছাড়িয়া যেবা শব্দ অর্থ করে ।

রসের বশে দেহারামী কপট মার্গ ধরে ॥২২॥

ভাল খায়, ভাল পরে, করে বহু ধনার্জ্জন ।

যোষিৎসঙ্গে রত হঞা ফিরে রাত্রদিন ।

ভাল শয্যা অট্টালিকা খোঁজে অর্ব্বাচীন ॥২৩॥

দেহযাত্রার উপযোগী নিতান্ত প্রয়োজন ।

বিষয় স্বীকার করি’ কর দেহের রক্ষণ ॥২৪॥

সাত্ত্বিক সেবন কর আসব বর্জ্জন ।

সর্ব্বভূতে দয়া করি’ কর উচ্চ সঙ্কীর্ত্তন ॥২৫॥

দেবসেবা ছল করি’ বিষয় নাহি কর ।

বিষয়েতে রাগ-দ্বেষ সদা পরিহর ॥২৬॥

পরহিংসা কপটতা অন্য সনে বৈর ।

কভু নাহি কর ভাই যদি মোর বাক্য ধর ॥২৭॥

নির্জ্জন সুদৃঢ় ভক্তি কর আলোচন ।

কৃষ্ণসেবার সম্বন্ধে দিন করহ যাপন ॥২৮॥

মঠ মন্দির দালান বাড়ীর না কর প্রয়াস ।

অর্থ থাকে কর ভাই যেমন অভিলাষ ॥২৯॥

অর্থ নাই তবে মাত্র সাত্ত্বিক সেবা কর ।

জল-তুলসী দিয়া গিরিধারীকে বক্ষে ধর ॥৩০॥

ভাবেতে কাঁদিয়া বল, 'আমি ত’ তোমার ।

তব পাদপদ্ম চিত্তে রহুক আমার' ॥৩১॥

বৈষ্ণবে আদর কর প্রসাদাদি দিয়া ।

অর্থ নাই দৈন্যবাক্যে তোষ মিনতি করিয়া ॥৩২॥

পরিজন পরিকর কৃষ্ণদাস-দাসী ।

আত্মসম পালনে হইবে মিষ্টভাষী ॥৩৩॥

স্মরণ-কীর্ত্তন-সেবা সর্ব্বভূতে দয়া ।

এই ত’ করিবে যুক্ত বৈরাগী হইয়া ॥৩৪॥

কৃষ্ণ যদি নাহি দেয় পরিজন-পরিকর ।

অথবা দিয়া ত লয় সর্ব্ব সুখের আকর ॥৩৫॥

শোক-মোহ ছাড় ভাই নাম কর নিরন্তর” ।

জগাই বলে, “এভাব গৌরের সনে মোর কোঁদল বিস্তর” ॥৩৬॥

 


 

← ৮। কুটীনাটি ছাড় ১০। জাতিকুল →

 

সূচীপত্র:
১। মঙ্গলাচরণ
২। গ্রন্থরচনা
৩। প্রথম প্রণাম
৪। গৌরস্য গুরুতা
৫। বিবর্ত্তবিলাসসেবা
৬। জীব-গতি
৭। সকলের পক্ষে নাম
৮। কুটীনাটি ছাড়
৯। যুক্তবৈরাগ্য
১০। জাতিকুল
১১। নবদ্বীপ-দীপক
১২। বৈষ্ণব-মহিমা
১৩। শ্রীগৌরদর্শনের ব্যাকুলতা
১৪। বিপরীত বিবর্ত্ত
১৫। শ্রীনবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণ-লীলা
১৬। পীরিতি কিরূপ ?
১৭। ভক্তভেদে আচারভেদ
১৮। শ্রীএকাদশী
১৯। নামরহস্যপটল
২০। নাম-মহিমা
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥