শ্রীউপদেশ


“শ্রীকৃষ্ণজন্ম বিনা জীবের জীবন বৃথা”

 

আজ শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী বা জয়ন্তী, আগামী কল্য শ্রীনন্দোৎসব । এই উপলক্ষে শ্রী মঠে আচার্য্যের ইচ্ছানুসারে হরিকীর্ত্তনোৎসব হইতেছে । আচার্য্য জানাইয়াছেন, “শ্রীকৃষ্ণজন্মে বিনা জীবের জীবন বৃথা”; কিন্তু তঁাহার এই বাণী—আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছে না! আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইন্দ্রিয়ের ব্যর্থ ও পরিণামে পরমদুঃখের সম্ভোগের পিপাসায় শ্রীকৃষ্ণের এক একটি ক্ষুদ্র নকল সংস্করণ সাজিয়া রহিয়াছি! পরাৎপর-কৃষ্ণের পরিবর্ত্তে অসুর-কৃষ্ণের জন্ম আমাদের অস্মিতাকে গ্রাস করিয়াছে ।

সম্ভোগে মত্ত হইয়া আমরা কেহ মনে করিতেছি, কৃষ্ণভজনের প্রয়োজন কি ? আমরাই জগতের অদ্বিতীয় ভোক্তার পদবী গ্রহণ করিব । আব্রহ্মস্তম্ব এই ভোক্তার পদবীর জন্যই আকাশ-পাতাল আলোড়ন করিতেছে—ইহাই তাহাদের কর্ম্মের প্রেরণা । কেহ বিষ্ঠার কৃমি হইয়া সেই পদবীর অনুসন্ধিৎসু, কেহ বা মানুষের মধ্যে উচ্চপদ, সম্মান, অাভিজাত্য, রূপ, ঐশ্বর্য্য প্রভৃতি লাভ করিয়া সেই চেষ্টায় ধাবিত । কখনও জার্ম্মেণ কাইসার, কখনও প্রেসিেডন্ট চ্যান্ স্ লার হিট্ লার, কখনও আর কোনও রাষ্ট্র-নেতা, কখনও জাতীয় আন্দোলনের নায়ক, কখনও সমাজ সংস্কারক, কখনও দুস্থের উপকর্ত্তা—পরার্থী, কখনও কবি, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক, জড়দার্শনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবাদিক, কখনও গায়ক, নর্ত্তক, বাদক, কথক, কখনও বা পেটভিখারী, কখনও দুর্ভিক্ষ-পীড়িত, কখনও ভূমিকম্পে, বন্যায় গৃহহীন, স্বজন-হীন, সম্পদ্হীন, কখনও কৃষক, কখনও শ্রমিক, কখনও ধনিক, কখনও জড়প্রেমিক—কতরূপে আমরা সম্ভোগে মত্ত হইয়া কৃষ্ণজন্মের আবশ্যকতা অস্বীকার করিতেছি ।

কৃষ্ণের জন্মের সহিত আমাদের কোন সম্বন্ধই রাখি নাই । আমাদের জন্মমরণমালাই আমাদিগকে পাইয়া বসিয়াছে । আমরা জীব-জন্তু বা মানবের জন্ম ও মৃত্যুর হার গণনা করিতেছি, বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সংবাদ লইয়া ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িতেছি, আবার সুখে থাকিবার সময় নানপ্রকার স্থূল ও সূক্ষ্ম সম্ভোগ-পিপাসায় প্রমত্ত হইয়া উঠিতেছি; আমাদের হৃদয়ে সম্ভোগের অসুর প্রতিমুহূর্ত্তে জন্মগ্রহণ করিতেছে, কৃষ্ণের জন্মে আমাদের প্রয়োজন কি ?

বিশুদ্ধসত্ত্ব অর্থাৎ বসুদেবের ন্যায় হৃদয় না হইলে অজ ভগবান্ বাসুদেব আবির্ভূত হন না । আমরা এ সকল কথায় মুহূর্ত্তের জন্য কানও দিই না, কান দেওয়া কোন প্রয়োজনও মনে করি না । শাস্ত্রের শাসন-বাণীগুলিকে শিশুগণের উপযোগী জুজুর ভয় দেখাইবার মেয়েলী ছড়ার মত মনে করি । প্রত্যক্ষ আপদ-বিপদে পতিত হইয়া সাময়িক বিভীষিকার নিষ্পেষিত হই বটে; কিন্তু পরমুহূর্ত্তেই ‘কুকুরের লেজ বঁাকিয়া যায়’!

কখনও আস্তিকের সজ্জায়, কখনও নৈতিকের সজ্জায়, কখনও নাস্তিকের সজ্জায় কৃষ্ণজন্মকে অস্বীকার করিয়া থাকি । গীতার “অহোঽপি সন্নব্যায়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্ । প্রকৃতিং—স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্ম-মায়য়া॥ জন্ম কর্ম্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ । ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোঽর্জ্জুন ॥” (৪।৬, ৯) প্রভৃতি শ্রীকৃষ্ণ-বাণীসমূহের আস্তিক বলিয়া পরিচয় দিয়াও বিকৃত অর্থ করিয়া থাকি—অজের নিত্য জন্মলীলার অপ্রাকৃতত্ত্ব স্বীকার করিতে না পারায় আমাদের আস্তিকত্বের অভিমান যে প্রচ্ছন্ন নাস্তিকত্বে পর্য্যবসিত হইয়া যায়, তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি না, আস্তিক অভিমান করিয়া সর্ব্বশক্তিমান্ অবিচিন্তাশক্তিযুক্ত স্বরাট লীলাপুরুষোত্তমকে আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির গণ্ডির অন্তর্গত করিতে চাহি । আবার নৈতিক হইয়া বলি,—নীতি-দ্বারা জাগতিক সুবিধাবাদ সংরক্ষিত হয় বলিয়া নীতিই ঈশ্বর—পৃথক্ ঈশ্বরের প্রয়োজন নাই । আবার ঈশ্বর মুখে স্বীকার করিলেও শ্রীকৃষ্ণই যে পরাৎপর স্বয়ংরূপ ভগবান্ তাহা স্বীকার করিলে সাম্প্রদায়িকতা হইয়া যাইবে, সুতরাং বহু তথাকথিত ধার্ম্মিক অর্থাৎ জাগতিক সুবিধাবাদীর সহিত পাংক্তেয় থাকিবার জন্য একমেবাদ্বিতীয়ম্ পরব্রহ্মের পক্ষপাতিত্ব পরিত্যাগ করিলে কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই ভাবিয়া লই ।

সম্ভোগ-বাদের অসংখ্য অাবিলতার ঝোপ-জঙ্গল, উইয়ের ঢিবি, কঁাটা ও ভোগ-বাসনার জন্ম-জন্মান্তরের রুদ্ধ পচা জল প্রভৃতি অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলি সরাইতেই আমাদিগকে সাধুগণের অসংখ্য উপদেশ ও প্ররোচনা প্রদান করিতে হয় । আমাদের বিশুদ্ধসত্ত্বে কৃষ্ণের জন্মশোভার বৈচিত্র্য দেখিবার আর সময় থাকে কই ? কৃষ্ণ জন্মের রাজ্যে কত অফুরন্ত বৈচিত্র্য আছে, কৃষ্ণের রাজ্যে মুক্ত আত্মার কত চমৎকারময়ী স্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা আছে, কত সেবানন্দ ব্রহ্মানন্দকেও তিরষ্কার করিয়া তাহার মস্তকে নৃত্য করিতেছে, তাহা আর আমাদের দেখিবার সুযোগ হইল কই ? আমরা পশুপক্ষীর, ইতর প্রাণীর সম্ভোগবাদে আত্ম হারাইয়া ফেলিলাম, না হয় সাধুত্ব ও ধার্ম্মিকতা বলিতে পশু-জীবন হইতে সামান্য নিষ্কৃতি লাভকেই মানবজীবনের সার্থকতা মনে করিয়া লইলাম; মানব-জীবনের চরমফল যে কৃষ্ণজন্ম, তাহা শিক্ষা দিবার মত লোক যেরূপ সুবিরল, আমাদের বহির্ম্মুখতার স্তূপ ও তদ্রূপই দুর্লঙ্ঘ্য ।

শ্রীকৃষ্ণ শ্রীবসুদেব—দেবকীর পুত্ররূপে অাবির্ভূত হইলেও প্রাকৃত ব্যক্তির ন্যায় চরমধাতু প্রভৃতিতে প্রবিষ্ট হইয়া জন্মগ্রহণ করেন না । সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ বিশুদ্ধসত্ত্ব ও তদ্বৃত্তিরূপা দেবকী-বসুদেবের অপ্রাকৃতসত্ত্বে অাবিষ্ট হইয়া জন্ম-লীলা আবিষ্কার করেন । তজ্জন্যই শ্রীমদ্ভাগবতে (১০।২।১৯) বলা হইয়াছে যে, পূর্ব্বদিক্ যেরূপ আনন্দকর চন্দ্রকে ধারণ করে, তদ্রূপ দেবকী-দেবী বসুদেব কর্ত্তৃক বৈধ-দীক্ষাবিধানে সমর্পিত জগন্মঙ্গল সর্ব্বাংশ-পরিপূর্ণ সর্ব্বমূল-স্বরূপ সর্ব্বসুখনিদান শ্রীহরিকে মনোমধ্যে পুত্ররূপে ধারণ করিয়াছিলেন । বাৎসল্য-প্রেম-হেতুই শ্রীবসুদেব-দেবকীতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল ।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম যে প্রাকৃত ব্যক্তির জন্মের ন্যায় নহে, তাহার আর একটি প্রমাণ এই যে, প্রাকৃত জন্মশীল শিশু সর্ব্বতোভাবে দিগ্ বসন হইয়াই মাতৃকুক্ষি হইতে ভূমিষ্ট হয়; কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন অাবির্ভূত হইলেন, তখন ভাগবতীয় বর্ণনাতে দেখা যায় যে, তিনি চতুর্ভূজ শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধক, কিরীট-কুণ্ডলাদি নানাপ্রকার ভূষণে বিভূষিত, অপরিমিত কেশদামযুক্ত ও পীত-বসন-পরিহিত । প্রাকৃত বালক কখনও মাতৃকুক্ষি হইতে বসনাদি-পরিহিত বা অলঙ্কারাদি-বিভূষিত হইয়া জন্মগ্রহণ করে না । ইহা দ্বারা কৃষ্ণের নাম-রূপের ন্যায় অলঙ্কার-বিভূষণাদিরও নিত্যত্ব ও অপ্রাকৃতত্ব প্রমাণিত হইয়াছে ।

শ্রীভগবানের এইরূপ চতুর্ভূজরূপে অাবির্ভাবের কারণ শ্রীভগবান্ স্বমুখে জানাইয়াছেন । দ্বিভুজই তঁাহার স্বরূপ, কেবলমাত্র ঐশ্বর্য্যজ্ঞানমিশ্র-বাৎসল্যরসরসিকদ্বয়কে পূর্ব্ব-জন্মের কথা স্মরণ করাইবার জন্যই তিনি চতুর্ভূজরূপ প্রকট করিয়াছিলেন ।

যে সময় জীব কৃষ্ণোন্মুখ হন, সেই সময়ই শ্রীকৃষ্ণ তঁাহার হৃদয়ে আর্বিভূত হন । জীবের তমসাচ্ছন্ন হৃদয়-নিশার মধ্যভােগ বর্ষাকালে শ্রীগুরুপাদপদ্মের কৃপায় প্রতিবর্ষে শ্রীকৃষ্ণের উদয় হয় । বর্ষাকালেই হরিশয়ন ও ভাদ্র স্পৃষ্টাষ্টমীর মধ্যরাত্রে তঁাহার প্রকট কাল । ‘জয়শ্রী’ বৃষভানুনন্দিনী শুক্লাষ্টমী দিবসে মধ্যাহ্ণে প্রতিবর্ষে অাবির্ভূত হন । কৃষ্ণজন্মদিনের পক্ষান্তে তঁাহার অাবির্ভাব দিবস নিত্যকাল বর্ত্তমান আছে । শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব কেবলমাত্র ঐতিহাসিক সত্য নহে—ইহা নিত্য সত্য ।

শ্রীকৃষ্ণ ও জয়শ্রী মিলিততনু শ্রীগৌরসুন্দর । তিনি অচৈতন্য জীবের হৃদয়ে কৃষ্ণের অাবির্ভাব করাইয়া চৈতন্যদানের জন্য কৃষ্ণ হইয়াও কৃষ্ণের সর্ব্বোত্তম সেবকের ভাব ও কান্তি লইয়া কৃষ্ণের পূর্ণ সম্ভোগের দিনে অর্থাৎ দোলপূর্ণিমাতে অাবির্ভূত হন । শ্রীগৌরসুন্দর কৃষ্ণের সম্ভোগ ও কৃষ্ণসেবকের বিপ্রলম্ভময় ভজন শিক্ষা দিবার জন্যই সম্ভোগমূর্ত্তি হইয়াও বিপ্রলম্ভের ভাব ও কান্তি লইয়া আবির্ভূত হইয়াছেন, তাই শ্রীকৃষ্ণজন্মবাসরে রূপানুগ গুরুবর্গের ও গৌড়ীয় আচার্য্যবর্গের শ্রীচরণপরাগ মস্তকে ধারণ করিয়া শ্রীকৃষ্ণাবির্ভাবের জয়গাথা গানের যোগ্যতা ভিক্ষা করিতেছি—

“যদদ্বৈতং ব্রহ্মোপনিষদি তদপ্যস্য তনুভা য আত্মান্তর্যামী পুরুষ ইতি সোঽস্যাংশবিভবঃ ।
ষড়ৈশ্বর্য্যৈঃ পূর্ণো য ইহ স স্বয়ময়ং ন চৈতন্যাৎ কৃষ্ণাজ্জগতি পরতত্ত্বং পরমিহ ॥”

 

— • • • —

 

 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥