শ্রীনৃসিংহদেবের কথা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
৩ মে ২০১৫

 

আজকে খুবি শুভ দিন—ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি । ভক্তকে রক্ষা করবার জন্য ভগবান আবির্ভূত হয়েছেন আজকে দিনে ।

সমস্ত কিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয় ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাদের নাম জয় আর বিজয় ছিল । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী তার ঘরের ভিতরে বিশ্রাম করছিলেন, জয় আর বিজয় পাহারা দিলেন, তখন ব্রহ্মার চারি পুত্র উলঙ্গ অবস্থায় সেখানে চলে গিয়েছিলেন । জয় আর বিজয় তাচ্ছিল্য করছিলেন, “তোমাদের এখানে যাওয়া হবে না ।” যে তারা ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন, সে তারা জানতেন না, তাই তারা শিশুদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তখন শিশুর মধ্যে একজন বললেন, “তোমাকে আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের এই মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় আর বিজয় অবাক হয়ে গেলেন ।

এই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচি শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে ?”

জয় আর বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক আর এই ছেলেটা আমাদের আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বললেন, রাজি হয়ে গেলাম না, তখন তারা আমাদের অভিশাপ দিয়ে দিলেন ।”

নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! ঠিকই হয়েছে, তাই হবে ।”

“সে কি ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” (সব কিছু ভগবানের ইচ্ছায়ই হয়েছে ।) তখন নারায়ণ তাদেরকে এক শর্ত দিলেন, “যদি এই জন্মে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা কর, আমার পূজা, সেবা কর, তাহলে সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা কর, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?”

“প্রভু, তাড়াতাড়ি চলে আসব আপনার কাছে—আমরা শত্রুই থাকব !”

তখন তারা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, আর দ্বাপরে হলেন শিশুপাল আর দন্তবক্র—তারা সবসময় কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই হলেন । সেই দুই ভাই অসুর সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । উহু, কত ভীষণ অত্যাচার তারা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পলায়ন করল । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরও বেশি অত্যাচার করতে লাগলেন, তখন ভগবান রেগে রেগে শূকর-রূপ ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন ।

তখন যে তার ভাই মরে গেলেন হিরণ্যকশিপু শুনে আরো বেশি রেগে গেলেন । তখন কি করলেন ? জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার ধ্যান করতে লাগলেন । না খেয়ে দেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন তিনি, তখন ব্রহ্মা তার তপস্যায় খুব খুশি হয়েছেন । অসুরটার কাছে হাজির হয়ে ব্রহ্মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল তুমি কি বর চাও ?”

“আমি অমরতা চাই ।”

“এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু আছে কিন্তু আমারও এক দিন এই দেহ ছাড়তে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?”

হিরণ্যকশিপু খানিক ভেবে বললেন, “তখন আমি চাই যে, আমি দিনেও মরব না, রাতেও মরব না ।”

ব্রহ্মা বললেন, “ঠিক আছে ।”

“আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীব দ্বারা মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে । তুমি যেই বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বর দিয়ে দিলাম ।”

এই ফাঁকে হিরণ্যকশিপু তার স্ত্রী বাড়িতে রেখে গেছিলেন—তার নাম ছিল কয়াধু । যখন হিরণ্যাক্ষকে ভগবান বধ করেছিলেন, দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে আসল । এক দিন তারা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে অসুরের বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করল । কয়াধুকে একা দেখে তারা ওকে নিয়ে চলে গেল হত্যা করতে । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হয় ।

নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো ? মহিলাটার স্বামী এখন ব্রহ্মার ধ্যান করতে জঙ্গলে গিয়েছেন, তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছো ?”

“একে মেরে ফেলে দিতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এ সন্তানটা যদি জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !”

নারদ তখন তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এই গর্ভে যে সন্তান হবে, সে মহান ভক্ত হবে আর তোমাদেরটি রক্ষা করবে । বরং মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই, কয়াধু নারদের সঙ্গে তার আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সব কিছু সেবা, পূজা করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্ পাঠ করতেন, তখন প্রত্যেক দিন সেই কয়াধু শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দিয়েছেন, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সেগুলাই শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি বাবাকে আর স্কুলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিতেন ।

কয়াধুর সেবায় খুব খুশি হয়ে নারদ তাকে একদিন বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কি বর চাও, বল ।” কয়াধু বললেন, “হিরণ্যকশিপু চলে যাচ্ছে বনে ব্রহ্মার ধ্যান করতে, সে অসুর হল—ও তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দেন—স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান প্রসব হবে না । সে বরটা আমাকে দেন ।” নারদ রাজি হয়ে তাকে ওই বরটাই দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে আসলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড ছিল—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার দিলেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ?!” কেউ তাকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে নিয়ে গেলেন, আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসলেন । তখন তার সন্তান প্রসব হল, নাম রাখল প্রহ্লাদ ।

আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগল । অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, তার দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেকে তাদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সবগুলো শিক্ষা তাকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” কিন্তু যা ষণ্ড-অমর্ক শিক্ষা দিচ্ছে, প্রহ্লাদের ওই সব কিছুই কানে যাচ্ছে না ।

একদিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলে কি শিখেছে ? তাকে একবার নিয়ে চলে এস !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, সব কিছু করে, আর বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । তখন বাবা ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি এই স্কুলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছো ? তুমি যেটা ভালো শিখেছো তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা বল ।”

প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

যখন এটা শুনলেন, হিরণ্যকশিপু তাকে এবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে !! আমার ঘরে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্ককে ডাক করে বললেন, “ও রে ! আমার ছেলেকে তোমরা কি শেখাচ্ছ ?!”

ষণ্ড-অমর্ক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন, এসব শিক্ষা আমরা তোকে কোন দিন দেইনি ! কোথা থেকে যে পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।”

হিরণ্যকশিপু তখন তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখ ! তোমাদের স্কুলে অন্য কেউ আসে, কেউও তা শিখিয়ে দেয় !”

“ঠিক আছে ।”

প্রহ্লাদ কি করলেন ? যে স্কুলে অসুর ছিল, তাদের দলে নিয়ে আসল—স্কুলের মাস্টরমশাইটা যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন ।

আর এক দিন হিরণ্যকশিপু বাড়িতে প্রহ্লাদকে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বল, কি ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? মাস্টরমশাইটা কি শিখিয়েছে ?”

প্রহ্লাদ তখন বললেন, “শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কি ??! এসব কি বলছিস ?!”

একবারে হিরণ্যকশিপু রেগে হয় আর কি ! হুংকার দিয়ে বললেন, “কুলাঙ্গার !” আর মনে মনে ভাবলেন, “একে যে অবস্থা হয়, একে বধ করতে হবে !”

নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন হিরণ্যকশিপু তার ছেলেকে মেরে ফেলতে—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, হতির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, বিভিন্ন উপায় চেষ্ঠা করলেন কিন্তু কিছু তেই তাকে মারতে পারচ্ছেন না ! অনেক বহুবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তার লোক ডেকে বললেন, “তোমার দ্বারা কিছু হবে না, আমার কাছে তাকে নিয়ে চলে এস ! আমি তাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তার পাশে এসে বসলেন ।

হিরণ্যকশিপু হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই এই শিক্ষা কোথা থেকে পেয়েছিস ?”

প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বলল, “বাবা, আমাকে যাঁর শিক্ষা, সেই শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“মাস্টরমশাইও বলছেন এটা তার শিক্ষা নয় !” মনে মনে বললেন, “তোমরা মারতে না পারলে, আমি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল, তুই এই শিখা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম, তুই মরলি না ! বল ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?”

“হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বল পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছিলাম । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন আর ব্রহ্মা তার শক্তি কৃষ্ণ থেকে পেয়েছিলেন । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন আপনি বলটা কোথা থেকে পেয়েছেন । সব বল হরির কাছ থেকে ।”

“আ ! তুই বারবার 'হরি', 'হরি' বলছিস, তোর হরি কোথায় আছে ?”

“কৃষ্ণ সর্বত্রই আছেন ।”

“তোর হরি কোথায় থাকে ?”

“হরি কোথায় না থাকে ?”

“সব জায়গায় আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?”

“হ্যাঁ, এখানেও আছে ।”

“এখানে আছে তোর হরি ?!!!”

তখন হিরণ্যকশিপু স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার শুরু হয়ে গেল ! চিৎকারটা শুনে দেবতারা উপরে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বলল, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !”

লক্ষ্মী বললেন, “আমি পারব না, আমি খাণ্ডার নারায়ণে সেবা করলেই প্রভু আরো রেগে যাবেন ।”

তখন স্তম্ভ থেকে নৃসিংহদেব (আধ নর, আধ সিংহ) আবির্ভুত হলেন । তাকে দেখে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে যাচ্ছে আর নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্তও হয়ে যাচ্ছে । ভগবান জয় আর বিজয় বলেছিলেন, “তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” সে লড়াইটার কথা তিনি মনে করছিলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই হচ্ছে । সব দেবতারা বলছেন, “হায় হায় ! হায় হায় কি হলো ? আমার প্রভু এক্ষুনি হেরে যাবে ! যদি ভগবান হেরে যায়…” কিন্তু ভগবান হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছুটতে দিয়ে তখনই তাকে আবার হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছুড়ে দিলেন—ভগবানের ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু জয় করবে ? জয় করবে না ? প্রভু লড়াই হেরে গেলেন ?!” তখন হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সময় না দিয়ে নৃসিংহদেব তাকে ধরে তুলে ফেললেন । তারপর নৃসিংহদেব তাকে তুলে ঊরুর মধ্যে রেখে (ব্রহ্মা তাকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতে মরবে না, আকাশে মরবে না, পাতালে মরবে না, কোন অস্ত্র দ্বারা মরবে না, প্রভৃতি ।) নখ দিয়ে তার উদরটা ছিঁড়ে ফেললেন আর নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে গলায় পড়লেন !

তারপরে, প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে খুব আনন্দ পেলেন নৃসিংহদেব । ভগবান বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”

প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু আমি আর কি বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছো, প্রভু, আমি আর কিছু চাই না…”

“না, কিছু নিতে হবে ।”

“তাহলে এই বর দাও—আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন—আমার বাবাকে উদ্ধার কর, কৃপা কর ।”

“তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে—সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি খেলায় করলে, তবু আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয় । বল আর কি বর চাও ? কি বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লদ বললেন, “আর কি চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই—আমি চাই যে আমার জন্য চাওয়ার বাসনাটা কেটে যায়, এই বর দাও ।”

এইটা হল main (মূল) শিক্ষা । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই—এইটা বন্ধ করতে হবে । প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেবের অর্থ হয়েছে যে, লোকেরা নৃসিংহদেবের কাছে সবসময় বলে, “আমার ছেলে চাকরি হোক,” “মেয়ের বিয়ে হোক,” “শরীর ভালো হোক,” “টাকা-পয়সা হোক” ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি, যেন শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার করুণায় তোমার জন্য চিরন্তর আমি সেবা করতে পারি । ভক্তির বিনাশ না হয় তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ কর ! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার কোন ভক্তিতে বিনাশ না হয়, সেইটা তুমি একবার দেবে । সেই আমি বরটা চাই, নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণের জন্য কিছু চাই নি !”

জয় শ্রীলগুরুমহারাজ কী জয় !

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥