মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১ জুন ২০১৫

 

রঘুনাথদাস গোস্বামির বার লাখ মুদ্রা ইনকাম (উপার্জন) ছিল, অপ্সরার মত সুন্দরী স্ত্রী পেয়েছিলেন কিন্তু সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি পানিহাটিতে চলে এলেন ।

যখন উৎসবটা শেষ হয়ে গেল তখন নিত্যানন্দ প্রভু গাছের তলায় বসলেন আবার রঘুনাথ তার চরণে এসে দণ্ডবৎ করলেন । নিত্যানন্দ প্রভু তখন তার মাথার উপর পা তুলে দিয়ে বললেন, “কৃষ্ণ কৃপা করেছেন যাঁরে, তাঁরে কে বান্ধিয়া রাখিতে পারে ? কৃষ্ণ যাকে কৃপা করছেন, তাকে কেউ বেঁধে রাখতে পারে না ! যাও, এবার তুমি চলে যাও ।” তখন রঘুনাথদাস গোস্বামী মহাপ্রভুর কাছে চলে গেলেন । এবার মহাপ্রভু তাকে বললেন, “আয়, রঘুনাথ, চলে আয় । তোকে আজকে আমি সেবা দিচ্ছি !”

সেবা না পেলে, কৃপা হয় না । গুরু মহারাজও বলতেন : যার সেবা আছে, তার কৃপা আছে । আমরা এখানে পানিহাটির মহৎসবে প্রতি বৎসর আসি কিসের জন্য ? বৈষ্ণবগণের সেবা করবার জন্য । লোককে প্রসাদ দিতে হবে তাহলে এই ভক্ত-সেবা দিয়ে আমাদের কৃপা হবে । সেবা না করলে, ভগবানকে লাভ হয় না, আর সেবা হলেই কৃপা হয়ে যায় ।

সেইরকম রঘুনাথদাস গোস্বামী মহাপ্রভুর কাছ থেকে কৃপা ও সেবা পেয়েছিলেন—তার আগে তিনি বারবার তার কাছে গিয়েছেন কিন্তু বিফল । শেষ পর্যন্ত জানেন তার কি অবস্থা হয়েছিল ?

রঘুনাথ বড় জমিদারের পুত্র ছিলেন, তাই যখন এ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে মহাপ্রভুর কাছে চলে গেলেন, তখন তার বাবা তাকে প্রত্যেক মাস চারশো টাকা পাঠাতেন । তার বাবা ভাবতেন, “আমার ছেলেটা আশ্রমে চলে গেছে, ঠিকমত খেতে পায় না…” কিন্তু রঘুনাথদাস গোস্বামী কি করতেন ? এই পয়সা দিয়ে সবাইকে বৈষ্ণব-সেবা দিতেন । মহাপ্রভু জানেন যে, রঘুনাথ বৈষ্ণব সেবা করতেন কিন্তু তিনি ভাবতেন এতো ভালো জিনিস নয় । কেন ? কারণটা বৈষ্ণব-সেবা দ্বারা তার অহঙ্কার হয়ে যাচ্ছিল, “আমার বাবার টাকা দিয়ে লোককে খাওয়াছি !”—এটা অহঙ্কার হয়ে যাচ্ছিল, প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল । রঘুনাথ বুঝতে পারলেন যে, মহাপ্রভুর পছন্দ হচ্ছিল না, বাবাকে বললেন, “আর টাকা পাঠিও না, আমি নেব না ।”

বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন ।
মলিন মন হৈলে, নহে কৃষ্ণ-নাম গ্রহণ ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ৩/৬/২৭৮)

মঠ মন্দির দালান বাড়ীর না কর প্রয়াস ।
অর্থ থাকে কর ভাই যেমন অভিলাষ ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৯/২৯)

যদি অর্থ না থাকে, তখন কি করবেন ?

অর্থ নাই তবে মাত্র সাত্ত্বিক সেবা কর ।
জল-তুলসী দিয়া গিরিধারীকে বক্ষে ধর ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৯/৩০)

আপনার অর্থ না থাকে তো কি হয়েছে ? আপনার জল আছে, আপনার তুলসী আছে, সেই দিয়ে আপনি গোবিন্দকে হৃদয়ে ধারণ করেন । টাকার কিছু দরকার নেই ।

সেইরকম রঘুনাথদাস গোস্বামী চারশো মুদ্রা টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন এবং আর কোন টাকা নিতেন না । এক দিন মহাপ্রভু স্বরূপ দামোদরে জিজ্ঞেস করলেন, “কি ব্যাপার ? রঘুনাথ তো আর নিমন্ত্রণ করছে না ?” স্বরূপ দামোদর বললেন, “প্রভু, ওর মনে কি হচ্ছে আর টাকা নিচ্ছে না ।” এটা শুনে মহাপ্রভু খুব আনন্দিত হয়ে বললেন, “শেষ ! ওর সব বিষয় কেটে গেল !”

এইরকম আমাদের বিষয় ছাড়তে হবে, বিষয়ের অসক্তি থাকতে হবে । প্রকাশানন্দ সরস্বতী এক শ্লোক লেখেছেন, আপনারা শ্লোকটা শুনলে হাসবেন আর মর্মার্থটা বুঝবেন ।

আপনি লোকাল ট্রেনে চাপেন কিন্তু সে ট্রেনে পায়খানা নেই আর যদি পায়খানা চাপে আপনার কি অবস্থা হয় ? খুব করুণ অবস্থা ! আপনি ভাবছেন, “কোথায় পায়খানায় যাব ? পায়খানা চেপে রাখতে পারছি না, কি কষ্ট !” খুব কষ্ট ! আর যখন পায়খানা হয়ে গেল, তখন শান্তি পেলেন । সেইরখম, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত এগুলোর আসক্তি যখন ছেড়ে দেবেন, তখন শান্তি লাভ করবেন, আর যতো ধরে রাখবেন, ততোই অশান্তি আসবে । বুঝতে পারছেন ?

আপনার যেটা দরকার প্রযোজন, সেইটা আপনি গ্রহণ করবেন—যেটা জীবন বাঁচাবার জন্য, খাওয়া-পাওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, সেই টুকু আপনাকে গ্রহণ করতে হবে—এর বেশি আপনাকে দরকার নেই । তা ছাড়া আপনি শান্তি লাভ করতে পারবেন না । “আরও চাই, আরও চাই, আরও চাই”—অত্যাহার (বেশি খাব), প্রয়াস (বেশি সঞ্চয় করব), প্রজল্প (বেশি কথা বলব)—ওগুলো ভক্তির-প্রতিকূল আর এগুলো বন্ধ করতে হবে । এটা সব মহাপ্রভু রঘুনাথদাস গোস্বামীকে বলেছেন । আর কি শিক্ষা তিনি দিয়েছেন ?

“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে ।
গোরার আচার, গোরার বিচার লইলে ফল ফলে ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৬)

খালি আমি বলি, “আমি মহাপ্রভুর ভক্ত, মহাপ্রভুর ভক্ত, মহাপ্রভুর ভক্ত !” কিন্তু মহাপ্রভুর আচার, বিচার নিছি না । আমি লোক দেখিয়ে তিলক করেছি কিন্তু :

লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি ।
গোপনেতে অত্যাচার গোরা ধরে চুরি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৭)

গোরা ধরে, চুরি ! গোরা জানেন আপনি চোর ! লোক দেখান গোরা ভজা—এটা করলে হবে না ।

সেইজন্য, আপনাদের সবসময় ভগবানের চিন্তা করতে হবে । এক মুহুর্তের জন্য ভগবানকে ভুলে গেলে চলবে না, এক মুহুর্তের জন্য কৃষ্ণকে ভুলে গেলে চলবে না । সবসময় কৃষ্ণের চিন্তা করতে হবে ।

কৃষ্ণকে যদি পেতে চান, মহাপ্রভুর ভক্ত হতে হবে—গৌরকে বাদ দিয়ে কৃষ্ণ ভজন হয় না, আর নিতাই বাদ দিয়ে গৌর ভজন হয় না । নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “আয় চোর ! তুই চোর ! আমাকে বাদ দিয়ে তুই মহাপ্রভুর কাছে গিয়েছিস, তবু কৃপা হয়েছে কি ?” বারবার রঘুনাথদাস গোস্বামীকে মহাপ্রভু ফেরত দিয়ে দিতেন । শেষে নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “এবার তুই এসেছিস । সমস্ত বৈষ্ণবগণের সেবা করেছিস—যাও এবার ! এবার তোর মায়ার বন্ধন মুক্ত হয়ে গেল !”

এই মায়ার সংসার ছাড়তে হবে ! আমরা এখানে এসেছি সবাই একই পরিবারের লোক—কার পরিবার ? কোন সংসারের লোক আমরা ? কৃষ্ণের সংসার । আমরা কৃষ্ণের সংসারে যোগদান করেছি—কৃষ্ণের সংসারের মানুষ । আমরা মায়ার সংসারের মানুষ নয় । অমুক চৌধুরীর বাড়ি নয়, অমুক কবিরাজের বাড়ির বউ নয়, আমি অনেক দাস পরিবারের বউ নয়—আমি কৃষ্ণের পরিবারের বউ, আমি কৃষ্ণের পরিবারের মেয়ে, আমি কৃষ্ণের পরিবারের সন্তান, আমি কৃষ্ণের পরিবারের ছেলে ! সেই পরিবারে আমার অংশ গ্রহণ করতে হবে । সেই পরিবারের অংশ গ্রহণ করলে, ভগবান যেখানে থাকেন, সেখানে আপনারা পৌছাতে পারবেন এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসতে হবে না ।

বৈকুন্ঠ থেকেও জীব ফিরে আসতে পারে । জয় আর বিজয়, দুই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক, ব্রহ্মার সন্তানের প্রতি অপরাধ করলেন আর তাদের কাছ থেকে অভিশাপ পেয়ে তাদের বৈকুন্ঠ থেকে মর্ত্যে ফিরে আসতে হল । আর এক দেবতার শিশু দুর্বাসা মুনির জটা কেটে দিয়েছিল, এই অপরাধের ফলে তার কুমির রূপে জন্মা গ্রহণ করতে হল । সেই হচ্ছে অপরাধের ফল । সেইজন্যই, বৈষ্ণব-অপরাধ, সেবা-অপরাধ, নাম-আপরাধ, ধাম-অপরাধ সবসময় বর্জন করবেন । অনেকই অনেক কিছু করেন কিন্তু ফল পাচ্ছেন না—কারণ নাম-অপরাধ তা বেশি করেন । সেইজন্য, আপনাদের চরণে এই আমাদের প্রার্থনা—নাম-অপরাধ, বৈষ্ণব-অপরাধ, সেবা-অপরাধ, ধাম-অপরাধের সবসময় আপনাদের চিন্তা করতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥