ভক্ত ও নাপিত

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১৭ জানুয়ারী ২০১৬

 

বিশ্বাস করতে হয় । সাধুসঙ্গ না করলে, হয় না । আমি এক উদাহরণ দিয়ে দেব । বাইরের লোক সপ্তাহ ধরিয়া চাকরি-বাকরি করে আর রবিবার দিনে সপ্তাহের শেষে চুল-দাড়ি থাকে । সেইজন্য রবিবার দিনে তারা চুল-দাড়ি কাটে—সবাই নাপিতের দোকানে লাইন দিয়েছে, ওখানে ঘিরে বসে আছে । এক রবিবার দিনকে পূর্ণিমা ছিল—সাধুরা পূর্ণিমায় মস্তক মুণ্ডন করেন ।

তাই এক মঠের সাধু নাপিতের দোকানে গিয়ে বলল, “বাবা, আমিও মস্তকটা মুণ্ডন করব ।”

নাপিতটা বলল, “এই তো লাইনে অনেক লোক আছে, আপনি এখন বসুন ।”

সাধুটা এখানে বসল একটা বেঞ্চের মধ্যে । সবাই কাগজ পড়ছে, আলতু-ফালতু গল্প করছে আর সাধুটা চুপ করে বসে ছিল ।

একটু পরে নাপিতটা বলল, “এই জগতে ভগবান নেই । দেখো খবরটা হচ্ছে—কত লোক গাড়ি দুর্ঘটনায় মরছে, এখানে মারামারি হচ্ছে, এই ছেলে বাবাকে মেরে দিচ্ছে ! ভগবান থাকলেই, ভগবান দেখতে পায় না ! ভগবান নেই ।”

কথায় কান না দিয়ে সাধু চুপ করে বসে ভাবল, “আমি যদি এখানে প্রতিবাদ করি, তাহলে বাড়ির দল আমাকে ধরে মারবে । আমি বরং উপেক্ষা করব এ সব, মাথা মুণ্ডন করে দিয়ে চলে যেতে পারছি ।”

পরে সেখান থেকে চলে গিয়ে সাধুটি মনে মনে চিন্তা করল, “এ লোকগুলোকে কি করে এ পথে আনা যায় ? বিশেষ করে দোকানের নাপিতটাকে—সে ওই দলে সায় দিচ্ছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ করছে । নাপিতটাকে কি করে এ পথে আনা যায় ?”

এই দিন হেঁটে হেঁটে স্টেশনের দিকে চলে এসে ও দেখতে পেল এক পাগল লোক—বড় দাড়ি হয়ে গেছে, অত বড় বড় চুল, নোংরা, কোন দিন স্নান করে না । একজন আখ খাচ্ছেন, আখের ছোবলাগুলো ফেলছে আর ও এগুলো আবার ছুড়ছে—ড্রেন থেকে ময়লাগুলো খাচ্ছে … এ পাগলটা করছে ।

সাধু তখন তাকে বলল, “বাবা, আমার সঙ্গে চল !” এ যাবে না । সাধুটা তখন এক টুকরো চকলেট কিনে দিয়ে বলল, “আমি তোমাকে চকলেট দিয়ে দেব, চল ! চল, আমার সঙ্গে চল ।” একে চকলেট-বকলেট দেখিয়ে দিয়ে দোকানের কাছে নিয়ে এল, বলল :

“এই দেশে নাপিত নাই ! এই দেশে নাপিত নাই ! এই দেশে নাপিত নাই !”

নাপিতটা তখন রাস্তায় বেরিয়ে বলল, “এ কি ! আপনি তো কালকেই আমার কাছে মস্তক মুণ্ডন করে গেলেন, দাড়ি কেটে গেলেন আর আজকে বলছেন নাপিত নেই ? আমি তো নাপিত !”

সাধুটা উত্তরে বলল, “আপনি যদি নাপিত থাকেন, তাহলে এর বিরাট চুল-দাড়ি কেন ?”

নাপিত বলল, “আপনি পাগল না কি ? এই লোকটা কি আমার দোকানে এসেছে কোনদিন চুল-দাড়ি কাটতে ? আসুন, আমি এইক্ষণেই তার চুল-দাড়ি কেটে দেব !”

“ওঃ, আপনার দোকানে আসতে হবে তারপর আপনি চুল-দাড়ি কেটে দেবে ? আর কালকে যে বলেছিলেন ? ভগবান নেই ! আপনি কি করে জানেন ? আপনি থাকেন বেগমপুরে আর সেখান থেকে বলে দেন যে, কলকাতা বলতে একটা শহর নেই—আপনি কলকাতা দেখলেন না, গেলেন না, বুঝতে পারলেন না, এখান থেকে এই বলে দিলেন ; কিন্তু আপনি কলকাতায় গিয়ে দেখতে পাবেন কলকাতা শহর আছে । আর আপনি সে দোকানে বসে বলেন ভগবানটা নেই—আপনি ভগবানের মন্দিরে গিয়েছেন ? ভগবানের ভক্তের কাছে গিয়েছেন ? ভক্তের হৃদয়ে ভগবান অবস্থান করেন ! সাধু-সঙ্গের মধ্যে ভগবান থাকেন, যেখানে হরিকথা সেখানে ভগবান আসেন আর তুমি কি সাধু-সঙ্গ করেছো ? আপনি ভগবানের কথা শুনেছেন ? আপনি ভগবানের মন্দিরে গিয়েছেন ?”

“তাতো যাই নি …”

“তারপর তুমি কি করে বললে ? কাল থেকে মন্দিরে যাবে ।”

“ঠিক আছে, যাব ।”

তখন নাপিতটা মন্দিরে গেল আবার তার অনুভূতি হতে লাগল—“সত্যই তো ভগবান বলতে কিছু আছে ।” সাধু-সঙ্গ করতে করতে সে ভক্ত হয়ে গেল ।

আমি হাতটা মুখের সামনে তুলে কি আঙ্গুলটা গুণতে পারব ? না, হাতটা একটু দূরে, একটু ডিস্টেন্সে রেখতে হবে । ভগবানের মন্দিরে গিয়ে ভগবানকে দেখেবে ? “ভক্তের হৃদয়ে গোবিন্দ বিশ্রাম করেন”—ভক্তের কাছে গেলে ভগবান দেখা দেবেন, তার ভক্তের সঙ্গই করে যেতে হবে । অতি দূরেও নাই আবার অতি ভিতরেও নাই, নির্দিষ্ট ডিস্টেন্সে যেতে হবে । বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা ?

 


 

 

 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥