ভোগী নই ত্যাগীও নই

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১৭ জানুয়ারী ২০১৬

 

“দিনের মধ্যে আবল-তাবল কত পচাল পাড়িতে পার, তার মধ্যে কি একবার গোবিন্দ বলতে নার ।” কত কথা আমরা বলি ! পরচর্চা ছেড়ে দিয়ে গুরু-বৈষ্ণবের চরণ সবসময় চিন্তা করতে হবে । কিছু যখন করছেন, কথা তখন কম বলতে হবে । “সেবোন্মুখে কহ কৃষ্ণনাম” : হাত দিয়ে সেবা করবেন, কান দিয়ে শুনবেন আর মুখ দিয়ে “কৃষ্ণ, কৃষ্ণ” করবেন । ভগবান বলেন, “তুমি আমার চিন্তা করবে, আমি তোমার চিন্তা করব, আর যদি কেউ নিজের চিন্তা নিজেই করবে, ওকে আমি দেখব কেন ?”

এক ছেলে যদি বাবার কাছে বারবার গিয়ে বলে, “বাবা আমাকে এই দাও, সেই দাও, অমুক দাও, তমুক দাও,” বাবাও সেই ছেলের প্রতি বিরক্ত হয়ে যায় । আর যদি কোন ছেলে বাবাকে বলে, “বাবা, তোমার বয়স হচ্ছে, এবার সংসারটা আমি দেখি । আমি কাজবাজ করি, তোমাকে আর কিছু কষ্ট করতে হবে না । তুমি শুধু বসে বসে খাও ।”—তাহলে বাবারও সন্তুষ্ট হবে সেই ছেলের প্রতি । ভগবানের জিনিসটা ওইরকমও—যে ভগবানের সেবা করেন, ভগবান তাকে সমস্ত কিছু দেন, ভগবান তাকে দেখেন । এই বিশ্বাস থাকতে হবে ।

‘শ্রদ্ধা’ শব্দে—বিস্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় ।
কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্ব্বকর্ম্ম কৃত হয় ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত মধ্য ২২/৬২)

পিতৃঋণ, মাত্রিঋণ, ঋষিঋণ, দেবঋণ—কোন ঋণ থাকে না । আপনি বলতে পারেন, “আমি যদি ভগবানের সেবা করি, কালীপূজা করব না, দুর্গাপূজা করব না, লক্ষ্মীপূজা করব না,” ইত্যাদি । কিন্তু বিশ্বাস থাকতে হবে যে, আপনি যদি ভগবানের সেবা করছেন আর কোন পূজা করার দরকার নেই ।

অন্য অভিলাষ ছাড়ি, জ্ঞান কর্ম্ম পরিহরি,
কায়মনে করিব ভজন ।
সাধুসঙ্গে কৃষ্ণসেবা, না পূজিব দেবী-দেবা,
এই ভক্তি পরম কারণ ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমভক্তি-চন্দ্রিকা, ১৩, শ্রীলনরোত্তমদাস ঠাকুর)

জ্ঞান ছাড়তে বলেছে, কর্ম্মও ছাড়তে বলেছে । এখন আপনারা আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, “মহারাজ, শাস্ত্রে বলেছে কর্ম্ম ছাড়তে হবে, কিন্তু কর্ম্ম ছাড়লে তো খাব কি ? পরব কি ? ব্যবস্থা কি করব ?”

অন্যাভিলাষিতা-শূন্যং জ্ঞান-কর্ম্মাদ্যনাবৃতম্ ।
আনুকূল্যেন কৃষ্ণানুশীলনং ভক্তিরুত্তমা ॥

(শ্রীভক্তিরসামৃতসিন্ধুঃ, ১/১/১১)

এইটা শ্রীলরূপ গোস্বামী লেখেছেন । অন্যাভিলাষ ছাড়তে হবে—জ্ঞান, কর্ম্মও ছাড়তে হবে । যখন কর্ম্মটাকে সেবায় পরিণত করা যায়, তখন কর্ম্মটা আর কর্ম্ম থাকে না । একটা উদাহরণ দিছি, আপনারা তখন বুঝতে পারবেন ।

বাড়িতে ফুলগাছ লাগিয়ে রেখেছেন আর একটু পরে দেখছেন ফুলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে—সেই বাড়ির ফুলগুলো গোবিন্দের চরণে যাচ্ছে না সুতরাং গাছটারও জীবন বৃথা । আর যদি ফুলগাছটা লাগিয়ে, জল দিয়ে, আস্তে আস্তে ফুল হয়ে, সেই ফুলগুলো দিয়ে মালা করে যদি গোবিন্দের গলায় ও চরণে দেন, তাহলে গাছটারও মঙ্গল হয়—তখন সেটা সেবা হয়ে যায় ।

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্ম্মের লোক আছে । আপনার বাড়িতেও রান্না হচ্ছে আর এক অন্য বাড়িতেও রান্না হচ্ছে । এক বাড়িতে স্ত্রী মনে মনে ভাবছেন, “আমার ছেলে স্কুলে যাচ্ছে, স্বামী কাজে বেরিয়ে যাবে, তাদের জন্য আমি রান্না করে দিছি ।” আর অন্য ঘরে স্ত্রী মনে মনে ভাবছেন ,”আমি রান্না করছি গোপালের জন্য, গোবিন্দের জন্য ।” সুতরাং ভগবানের জন্য যদি সমস্ত কিছু করেন, তাহলে ভগবান সব ব্যবস্থাটা করে রাখবেন আর তখন কর্ম্মটাকে সেবা হয়ে যায় ; কিন্তু কর্ম্ম করলে, কর্ম্ম-বন্ধনে পড়তে হয় আর কর্ম্ম-বন্ধনের ফল হচ্ছে নরক যন্ত্রণা । এটা সবসময় মনে রাখবেন । কর্ম্ম করলে কর্ম্ম-বন্ধনে পড়তে হয় আর কর্ম্ম-বন্ধনের ফল হচ্ছে নরক যন্ত্রণা ।

কর্ম্ম ছাড়তে হবে কিন্তু আপনাকে আমি তাই বলছি না যে, বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আপনি যোগী বা ঋষি হয়ে হরিদ্বারে গিয়ে, পাহাড়ের মধ্যে গিয়ে বসে থাকুন । সেইটা আমাদের শাস্ত্রে বলেনি । ভোগটাকেও ত্যাগ করতে হবে, ত্যাগটাকেও ত্যাগ করতে হবে । আপনি এখানে এসেছেন ভোগ করার জন্য নয়, আপনি ভোগী নয় । এটা ঠাকুরের বাড়ি আর এই ঠাকুরের বাড়ি আপনারা রঙ করতে পারেন, ঠাকুরের বাড়ি আপনি মার্বেল লাগাতে পারেন, সব কিছু করতে পারেন—বাড়িটা ঠাকুরের বাড়ি, আমরা তাহলে সব ভালো করেই করব । আমাকে যদি পয়সা ঠাকুর দেন, আমি মার্বেল করে নেব, সব কিছু করব—এটা ঠাকুরের বাড়ি তো, তখন অসুবিধা কি আছে ? কোন অসুবিধা নেই । ত্যাগটাকেও ত্যাগ করতে হবে । আপনি কার জিনিস ত্যাগ করবেন ? যেটা আপনার নয়, ত্যাগ করতে সেটাই পারেন না । আপনি ভার্যা গ্রহণ করলেন, সব গ্রহণ করলেন আর এখন সব ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যাবেন ? না, আপনি স্ত্রীকে ভগবানের সেবায় লাগাতে হয়, এ বাড়িটাকেও ভগবানের সেবায় লাগাতে হয় । বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আপনাকে চলে যাতে হবে না । সেইটা সবসময় মনে রাখতে হবে : “ভোগ ত্যাগ, ত্যাগ ত্যাগ” । ভোগকে ত্যাগ করতে হবে, ত্যাগটাকেও ত্যাগ করতে হবে ।

যদি আমাকে কেউ বলে, মহারাজ আপনি ত্যাগী ? আমি বলি, না, আমি ত্যাগী নই, আমি নিজের লাভের জন্য জঙ্গলে গিয়ে থাকি না । আমাকে সব জায়গায় যেতে হয়, গাড়িতে চড়তে হয়, প্লেনে চড়তে হয়, সব কিছু ঘুরতে হয়, সারা পৃথিবীতে যেতে হয় । আপনি ভাবছেন আমি সেটা করি নিজের ভোগের জন্য ? না, ভগবানের সেবার জন্য । আমি যদি ভাবতাম যে, মঠ থেকে সেখানে হেঁটে গিয়ে প্রোগ্রাম করবার জন্য, তখন এক মাস লেগে যাবে । কিন্তু ভগবান এই সুযোগ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আর তার জন্য সেগুলো ভগবানের সেবায় লাগাতে হয় । কেউ যদি সেটা দেখে এটা luxury (‘বিলাস’) মনে করে, সেটা ভুল ধারণা । এক ভক্ত গাড়ি দিয়ে বলল, “মহারাজ, একটা গাড়ির দরকার ?” আমি বললাম, “ঠিক আছে, দিয়ে দাও, ভগবানের সেবায় লাগাতে পারি ।”

সেইভাবে আমাদেরকে গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবায় নিজেকে ব্যবহার করতে হবে । আমার পুত্র, আমার স্ত্রী, আমার পরিজন আমি যদি এ সব চিন্তা করি, কখনই কিছু কাজ হবে না । এটাকে ছাড়াবার জন্য সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণের সান্নিধ্যে আসতে হবে, হরিনাম (কৃষ্ণনাম) করতে হবে । কোন পূজা করলে ভগবানকে পাবেন না, কোন ধ্যান করলে ভগবানকে পাবেন না, কোন যজ্ঞ করলে ভগবানকেও পাবেন না । যেটা কলিযুগের ধর্ম্ম, এই হরিনাম সঙ্কীর্ত্তন আপনাদের করতে হবে ।

 


 

 

 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥