গৃহে আবদ্ধ

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১৭ জানুয়ারী ২০১৬

 

গৃহস্থ ব্যক্তিকে আমি বারবার বলি যে, সময় পেলেই আশ্রমে গিয়ে, মঠে গিয়ে সেবা করতে পারেন । সময়টা নষ্ট করবেন না—হরিগুরুর সঙ্গে যেতে থাকুন, ভক্তগণের সঙ্গে যেতে থাকুন । দেখুন কত সুন্দর করে শ্রীমদ্ভাগবতম্ লিখে দিয়েছেন :

আপনারা গৃহে থাকবেন, কিন্তু গৃহে কি করতে হবে ? গৃহে থাকতে হবে অতিথির মত । আপনি এ বাড়ির অতিথি । কোন বাড়িতে আপনি যদি এসেন—জামাই বাড়িতে এসেন, শশুর বাড়িতে এসেন, আর অন্য কোন আত্মীয় বাড়িতে এসেন—সেখানে আপনি কিন্তু অতিথি । আপনি যদি ভাবেন যে, “এই বাড়িটা আমার বাড়ি !” তাহলে অন্ধতমঃ যোনিতে প্রবেশ করতে হবে (মানে খারাপ জন্ম পরে পাবেন) ।

ইত্থং পরিমৃশন্মুক্তো গৃহেষ্বতিথিবদ্বসন্ ।
ন গৃহৈরনুবধ্যেত নির্ম্মমো নিরহঙ্কৃতঃ ল॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/১৭/৫৪)

“যারা বিবেচনা করে অনাসক্ত ভাবে অতিথির ন্যায় গৃহে বাস করে ‘অহং-মমতা’ ও অহঙ্কারশূন্যে, তারা কখনও গৃহে আবদ্ধ হবে না ।” আপনি গৃহস্থ-আশ্রমে গৃহে বাস করতে পারেন, বারণ কিছু নেই, কিন্তু ভগবান বলেন, “আমার ভক্ত গৃহে থেকে কর্ম্মসমূহের দ্বারা আমাকে ভজনা করেন ।” আপনি কোন চাকরি, ব্যবসা করেন, টাকা-পয়সা উপায় করেন আর সেই পয়সা দিয়ে ভগবানের সেবা করেন—তখন আপনি যা কিছুই করেন, সেই উদ্দেশ্যটা সফল হয়ে যাবে, বুঝতে পারছেন ?

যদি না বুঝতে পারেন, এক উদাহরণ আমি দিয়ে দিচ্ছি । কেউ ভাবছেন যে, “টাকা-পয়সা অনেক আছে, আমার তো বৃহৎ বাড়ির দরকার”, আর অন্য কেউ ভাবছেন যে, “আমার ঠাকুরের জন্য একটা বাড়ির দরকার ।” তখন গৃহে বাস করবেন কি রকম ? বাড়িতে অনেক লোকগুলো আছে (সংসারের ছেলেমেয়ে, আত্মীয় হচ্ছে), কিন্তু আপনি বুঝতে পারেন যে, ভগবান সে সবগুলো ব্যবস্থা করে দেন । যতটা আপনার দরকার, ততটাই ভগবান আপনাকে ব্যবস্থা দেবেন ।

যে ব্যক্তি গৃহে আসক্তিচিত্ত হয়—সবসময় আতুর হয়ে যায়, খালি পুত্রের চিন্তা করে, ধনের চিন্তা করে, স্ত্রীর চিন্তা করে—সেই মূঢ় ব্যক্তি “আমি” এবং “আমার” জ্ঞানে বদ্ধ হয় । আপনারা ভাবছেন, “হায়, আমার পিতা-মাতার কি হবে ? হায়, আমার শিশু-সন্তানের কি হবে ? হায়, আমার ভার্যা-স্ত্রীর কি হবে ? আমি না থাকলে, আমার বিনা সবাই অনাথ ও দুঃখিত হয়ে যাবে !” এইটা গৃহবিলাস অতৃপ্তচিত্ত, অসন্তুষ্ট ও মন্দ বুদ্ধি ব্যক্তি—পুত্র-কন্যার সর্ব্বদা ধ্যান করে (সবসময় চিন্তা করে), মৃত্যুর পর অন্ধতমঃ অতিতামসীক যোনিতে প্রবেশ করে । অর্থটা হচ্ছে এটাই—পরের জন্মে অন্য প্রাণী হয়ে জন্ম গ্রহণ করতে হয় (বিড়াল, ছাগল, কুকুর ইত্যাদি) । কি কঠিন জিনিস…

শুধু দুর্গা, কালীর কাছে গিয়ে “ধনং দেহি, বিদ্যাং দেহি, রূপং দেহি, ভার্যাং দেহি”—ধন চাই, বিদ্যা চাই, রূপ চাই—বারবার চাইলেন, তাহলে ভগবান বলছেন, “আমি তার কাছে থাকি না ।” দেবদেতার একটা পূজা যদি করেন, যে কম আছে সেটা তারা আপনাদেরকে দিয়ে সন্তুষ্ট করবেন । তারা আপনাদের পূজা চান আর তার বিনিময়ে আপনাদেরকে সুখ দিয়ে দেবেন—সাময়িক সুখ । আপনাদের কিন্তু এই দেহ চলে যাওয়ার পরে কি অবস্থা হবে ?

যারা প্রকৃত সাধু, তারা এই কথা বলবার জন্য আপনার বাড়িতে আসেন :

মহান্ত-স্বভাব এই তারিতে পামর ।
নিজ-কার্য্য নাহি তবু যান তার ঘর ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ২/৮/৩৯)

তাদের উদ্দেশ্যটা কি ? টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত ? না । মুখ্য উদ্দেশ্যটা হচ্ছে এইটা : আমরা এসেছি আপনাদেরকে আত্মসাথ করবার জন্যই—আপনার বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলতকে আত্মসাথ করবার জন্য আসিনি । আমরা এসেছি আপনাকে আত্মসাথ করবার জন্য ।” শুদ্ধ কথা এই যে, আমরা বড় ডাকাত—বাড়িতে যে যে আছে তাদেরকে আত্মসাথ করি আর তাদেরকে নিয়ে গোবিন্দের (ভগবানের) সেবায় লাগাই । এইটা হচ্ছে আত্মসাথ । আমাদের কীর্ত্তনেই বলি, “হে প্রভু, তুমি আমাকে আত্মসাথ করে নিয়ে যাও !” সে কথা হৃদয় থেকে বলতে হবে  । আত্মসাথ করা মানে কী ? “আমাকে তুমি নিয়ে চল, তোমার সেবায় আমাকে নিযুক্ত কর ।” সেইজন্য সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ সবাইকে গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবায় লাগাতে চান । এটা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচ্চ চিন্তা । কেউ গুরু-বৈষ্ণব-ভগবানের সেবা করলে (যদি সেটা সেসত্যিকারের হরি-ভজন হচ্ছে), তার যে পূর্ব্ব পুরুষগণ আছেন (তার বাবা, তার ঠাকুরদাদা, আর তার বাবাও, তার দাদাও, এর যে আছেন), যে অন্ধতমঃ যোনিতে পড়ে আছে, তারাও সেই কষ্ট থেকে উদ্ধার পেয়ে গোবিন্দের চরণে চলে যেতে পারেন—শুদ্ধু এক জনের দ্বারা ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥