বামনদেবের কথা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১৭ জানুয়ারী ২০১৬

 

আপনারা শুনেছেন বামনদেবের হিস্ট্রি (কথা) । দশটা অবতার আছে : নৃসিংহ অবতার, বামন অবতার, বরাহ অবতার, কূর্ম অবতার, মৎস্য অবতার, কল্কি অবতার, রাম অবতার, বুদ্ধ অবতার, পরশুরাম অবতার, কৃষ্ণ অবতার ।

স্বর্গে দেবতারা থাকে, সেখানে রাজা হচ্ছে ইন্দ্র । ভগবান দেবতাকে স্বর্গ রাজ্য দিয়ে দিলেন কিন্তু দেবতারাও তাদের অহঙ্কারে স্বর্গ রাজ্য পেয়ে ভগবানকে ভুলে গিয়েছে । তাই তাদের কি দোষ হয়েছে জানেন : তাদের স্বর্গ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে । ভগবানের ইচ্ছায় অসুরও হয়েছে—অসুর দেবতাকে উৎপাত করে শেষে স্বর্গ থেকে বিতাড়ণ করে দিল । তারপর ভগবান নিজে অবতার হয়ে, জন্ম গ্রহণ করে অসুরকে নিধন করলেন ।

এইরকম দৈত্যরাজ ছিলেন বলি মহারাজ (দৈত্য মানে তিনি অসুর ছিলেন) । একটু পরেই বলি মহারাজ দেখতে পারলেন যে, সব অসুররা পরাজিত হচ্ছে, সবাই মরে যাচ্ছে আর তিনি ভাবলেন, “আমাকে বিরাট যজ্ঞ করতে হবে ।”

এদিকে স্বর্গে অদিতি ও কশ্যপ ঋষি ছিলেন । অদিতি চিন্তা করলেন যে, “আমার দেবপুত্রগণ সমস্ত স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পড়েছেন… হে প্রভু ! তোমার ইচ্ছায় এ সব হচ্ছে । অনেক অন্যায় করেছে, দেবতারা অহঙ্কারে মত্ত হয়ে গিয়েছিল আর এইজন্য উত্তরে অসুররা সব শেষ করে দিয়েছে এবং সব স্বর্গটাও দখল করে নিয়েছে । প্রভু ! তুমি একটু ব্যবস্থা করে দাও—তুমি আবির্ভুত হও !” তখন অদিতির গর্ভেই ভগবান বামন-রূপে আবির্ভুত হলেন ।

দৈত্যরাজ বলি মহারাজ অনেক অনেক ব্রাহ্মণ নিয়ে বিরাট করে যজ্ঞ করেছিলেন আর ঘোষণা করে দিলেন, “যেই অঞ্চলে যত ব্রাহ্মণ আছে, সবাই ওই দিন আসবে, আমি সবাইকে কিছু দান দেব—যে যা চাইবে, তাকে তাই দিয়ে দেব ।” এই ঘোষণা করার পরে ব্রাহ্মণরা সব সেই লোভে বলি মহারাজের যজ্ঞ স্থানের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন । হঠাৎ ব্রাহ্মণগণের নজরে পড়ল এক অসাধারণ বটুবামন, ছোট ব্রাহ্মণ (সেটা বামনদেব, স্বয়ং ভগবান অদিতির পুত্র ছিলেন) । সে একটা ছাতা নিয়ে আরামভাবে যাচ্ছেন । দূর থেকে সবাই ভাবল, “আরে ! ছাতা হেঁটে যাচ্ছে ! ওর সঙ্গে আমরা হেঁটে পারছি না, কি ব্যাপার ?” জোরে এসে কিন্তু ওকে কেউ ধরতে পারছে না । এইভাবে বামনদেব যজ্ঞ স্থানে গিয়ে হাজির হয়ে গেলেন ।

বামনদেব যাওয়া মাত্রই যজ্ঞের স্থানে সবাই অবাক হয়ে গেল—যজ্ঞের যে অগ্নি (ঘির আগুন) ছিল, বামনদেবের এত বেশি তেজ ছিল যে সে তেজে আগুনটা নিবু-নিবু হয়ে প্রায় নষ্ট হয়ে গেল ! (ভগবান তো !)

তখন বলি মহারাজ বামনদেবকে বললেন, “আপনি নিশ্চয়, বটুবামুন, আমার কাছে দান নিতে এসেছেন ।”

বামনদেব বললেন, “হ্যাঁ । দান নিতে এসেছি ।”

“কি চান আপনি ? যা চান, তাই দেব ।”

“হ্যাঁ, আপনি অনেক কিছু দিতে পারেন ।”

“কি চান আপনি ?” বলি মহারাজ আবার জিজ্ঞেস করলেন ।

“বেশি চাই না, শুধু ত্রিপাদ-ভূমি চাই । এ তিনটা পা আমি রাখব এবং এ তিনটা পা রাখার মত আমি জায়গা চাই ।”

বলি মহারাজ অবাক হয়ে বললেন, “সে কি ? মাত্র এক টুকরো চান ? আপনার ত্রিপাদ-ভূমি দিয়ে কি হবে ? আপনি তাতে ঘর করে থাকতে পারবেন না । আধুলি জমি দিয়ে কি করবেন ? আপনি জানেন আমি কে ? আমি ত্রিলোকপতি—আমি আপনাকে জম্বুদ্বীপ কিংবা স্বর্গের অর্ধেক দিতে পারি ! আপনি অন্য কিছু চিন্তা-ভাবনা করে বলুন ।”

“না, আমি ছোট বামুন, আমার পা ছোট, চাওয়াটাও ছোট । আমি বেশি চাই না—ওই ত্রিপাদ-ভূমি আমাকে দিলেই হবে । আপনি কথা দেন ?”

তখন বলি মহারাজ বললেন, “ঠিক আছে । আমি রাজি হয়ে যাই, ত্রিপাদ-ভূমি দেব কিন্তু আপনি আমার কাছে এই ত্রিপাদ-ভূমি নিয়ে আবার অন্যর কাছে দান চাইবেন, এটা হতে পারে না নতুবা আমার কলঙ্ক হবে—আমি বিরাট রাজা এখানকার… “

বামনদেব বললেন, “ঠিক আছে ।”

তখন বলি মহারাজ কথা দিলেন, “হ্যাঁ, আমি আপনাকে ত্রিপাদ-ভূমি দেব ।”

এদিকে উপস্থিত সন্ন্যাসীর মধ্যে একটা গুরু ছিলেন । দেব-দেবতা-গুরুর গুরু হয়েছেন বৃহস্পতি আর দৈত্য-গুরুর গুরু হয়েছেন শুক্রচার্য্য ।

সে দৈত্যগুরুর গুরু শুক্রচার্য্য যজ্ঞ-স্থানের পাশে বসেছিলেন আর বলি মহারাজকে কানে কানে এসে বলল, “এই বলি ! কি করছো ? তুমি কথা দিয়ে দিলে ?! ত্রিপাদ-ভূমি দিয়ে দেবে ?! তুমি জান না এ কে ? বলি, এ স্বয়ং ভগবান ! ইনি অদিতির গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেছেন দেবতাকে রক্ষা করবার জন্য আর অসুরকে নিধন করবার জন্য—ইনি ছলনা করে তোমার কাছে দান নিয়ে ত্রিপাদ-ভূমির নাম করে সব নিয়ে নেবে আর তোমার তখন কিছুই থাকবে না ! তোমার থাকার জায়গাই থাকবে না—তুমি একে দান দেবে আর পরে তোমার কিছু থাকবে না ! কথা ফিরিয়ে নাও !”

বলি মহারাজ বললেন, “না, আমি ব্রাহ্মণকে কথা দিয়ে দিয়েছি । আর যদি ইনি ভগবানই হয়ে থাকেন, তাহলে এর চেয়ে বড় দাতা কথায় পাব ?”

শুক্রচার্য্য বললেন, “তুমি বলি মহারাজ বাচ্চা ছেলে । তুমি ছোট মানুষ, তুমি কিছু বোঝো না । দান-সম্পত্তি রাখা হলে মিথ্যা কথা বলতে হয়, ছলচাতুরী করতে হয় । তুমি কথা ঘুরিয়ে নাও ।”

কিন্তু বলি মহারাজ রাজি হলেন না, “গুরুদেব, যে আপনি বলছেন তা আমি করতে পারি না ।”

বলি মহারাজ গুরু ত্যাগ করে দিলেন । তখন দেখেন যে, গুরু ত্যাগ করার বিধি আছে (শ্রীমদ্ভাগবত, ৫/৫/১৮)—

গুরুর্ন স স্যাৎ স্বজনো ন স স্যাৎ,
পিতা ন স স্যাজ্জননী ন সা স্যাৎ ।
দৈবং ন তৎ স্যান্ন পতিশ্চ স স্যান্ন,
মোচয়েদ্ যঃ সমুপেতমৃত্যুম্ ॥

“ভক্তিপথের উপদেশদ্বারা যিনি সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার হইতে মোচন করিতে না পারেন, সেই গুরু ‘গুরু’ নহেন, সেই স্বজন ‘স্বজন’-শব্দবাচ্য নহেন, সেই পিতা ‘পিতা’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পুত্রোৎপত্তি-বিষয়ে যত্ন করা উচিত নহে, সেই জননী ‘জননী’ নহেন অর্থাৎ সেই জননীর গর্ভধারণ কর্তব্য নহে, সেই দেবতা ‘দেবতা’ নহেন অর্থাৎ যে সকল দেবতা জীবের সংসারমোচন অসমর্থ, তাঁহাদিগের মানবের নিকট পূজাগ্রহণ করা উচিৎ নহে, আর সেই পতি ‘পতি’ নহেন অর্থাৎ তাঁহার পাণিগ্রহণ করা উচিত নহে ।”

যেই গুরু আপনাকে প্রবৃত্তি মার্গের উপদেশ দেন, সেই গুরু ত্যাগ করার বিধি আছে । এখানে বলি মহারাজ গুরু ত্যাগ করে দিলেন—তার গুরুদেবের কথা শুনলেন শুনলেন আর শেষে বললেন, “না, না । আমি আপনার কথা শুনব না, যা ব্রাহ্মণ চান সেটা আমি একই দেব ।”

তখন বলি মহারাজ কমণ্ডলু হাতে নিলেন আর “ওঁ বিষ্ণু” বলে জল ঢাললেন কিন্তু জলটা পড়ল না । তার গুরু শুক্রচার্য্য যোগ বলে বলি মহারাজকে আটকাবার জন্য কমণ্ডলুর মধ্যে ঢুকে পড়লেন—তিনি যোগী ছিলেন তাই ঢুকতে পারলেন । ফলে জলটা বের হচ্ছে না । তখন বলি মহারাজ ঝাড়ুর কাঠি নিয়ে কমণ্ডলুর মুখে খোঁচা দিলেন আর খোঁচা দিয়ে তখন শুক্রচার্য্যের চোখটা অন্ধ হয়ে গেল ।

শাস্ত্র কি বলা আছে ? যে ভগবানের সেবায় বিঘ্ন ঘটায়, তার একটা অঙ্গহানি হয়ে যায় । এটা শাস্ত্রের কথা । শুক্রচার্য্য ভগবানের সেবায় বিঘ্ন ঘটায় কাজেই তার চোখ অন্ধ (অঙ্গহানি) হয়ে গেল । এইজন্য তার নাম ‘কানা শুক্র’ হয়ে গেল ।

সেইভাবে, বলি মহারাজ আবার “ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু” বলে জল ঢাললেন আর ত্রিপাদ-ভূমি বামনদেবকে দিয়ে দিলেন । সঙ্গে সঙ্গে বামনদেবের দেহ এত বড় হয়ে গেল—তিনি জম্বুদ্বীপ ও সব বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড একটা পাদে নিয়ে নিলেন । আর একটা পাদ তুলে দিলেন স্বর্গে—স্বর্গটাও নিয়ে নিলেন । সবাই অবাক হয়ে গেল, “এটা কি ? তিনি সব নিয়ে নিলেন !”

তারপর বলি মহারাজ দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রভু, আপনি এসেছেন, আমি বুঝতে পারি নি—”

বামনদেব বললেন, “তুমি বুঝতে পারবে পরে, আগে তোমার কথা রাখো ! তুমি কথা দিলে যে আমাকে ত্রিপাদ-ভূমি দিয়ে দেবে কিন্তু আমি মাত্র দুপাদ ভূমি পেয়েছি । একটা পা রেখেছি এখানে আর একটা পা তুলে দিয়ে স্বর্গ নিয়ে নিচ্ছি—দুপাদ-ভূমি আমি পেয়েছি, আর একটা পাদ-ভূমি আমি কোথা পাব ? আর একপাদ-ভূমি দাও ।”

বলি বললেন, “প্রভু, আমার আর কিছুই নাই । আপনি দুপাদ দিয়ে সব নিয়ে নিয়েছেন, আমি কোথায় কি পাব ?”

বামনদেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো করে দেখো, তোমার আর কিছু আছে কিনা ?”

“না, প্রভু, আমার আর কিছুই নাই । আপনি সবই দেখতে পারছেন, আপনি সব তো নিয়ে নিয়েছেন ।”

বলি মহারাজের বুদ্ধিমতী স্ত্রী ছিল, তার নাম বিন্ধ্যাবলি । বিন্ধ্যাবলি ওখানে বসে সব শুনেছিলেন আর তার স্বামীকে বললেন, “আরে ! শুনো !” কানে কানে এসে বললেন, “তোমাকে প্রভু বারবার বলছেন, ‘তোমার আর কিছু নাই ? আর কিছু নাই ? আর কিছু নাই?’ আর তুমি ‘না, না’ করে যাচ্ছো, ‘না, না’ করে যাচ্ছো । তুমি সব দিয়ে দিলে ? কিন্তু নিজেকে দিয়েছো ?” বলি মহারাজ রাজি হয়ে গেলেন, “তাই তো ! দেই নি !”

তখন বলি মহারাজ প্রভুর চরণে সাষ্টাঙ্গে পড়ে গিয়ে বললেন, “প্রভু এবার আমি আমার নিজেকে দিচ্ছি । তুমি আমার, আমি তোমার ।” তখন বামনদেবের নাভি-পদ্ম হইতে একটা পা বেরিয়ে আসল আর ওই পা ভগবান বলি মহারাজের মাথার উপরে রাখলেন । বামনদেব তার চরণ বলি মহারাজের মাথায় রাখলেন ।

তখন বামনদেব বললেন, “তুমি তোমার কথা রেখেছো, আমি এবার সন্তুষ্ট । তোমার দান তুমি আমাকে দিতে পেরেছো আর আমি যা পেয়েছি সে, আমি সন্তুষ্ট । এখন কিন্তু, বলি, একটা কথা হবে ।”

“কি কথা, প্রভু ?”

“এতক্ষণ আমি ছিলাম গৃহীত আর তুমি ছিলে দাতা, এবার কিন্তু আমি হব দাতা আর তুমি হবে গৃহীত !”

“না, প্রভু, আপনার চরণ কৃপা করে আমার মস্তকে দিয়েছেন, আমি আর কিছু চাই না ।”

“না, তোমাকে কিছু নিতে হবে ।”

জোর করে বামনদেব বলি মহারাজকে সুতলপুরী বৈকুন্ঠ দিয়ে দিলেন (সেখানে নারায়ণ থাকেন) আর বললেন, “তুমি ওখানে গিয়ে থাকবে প্রহ্লাদ মহারাজের সঙ্গে, আর আমি ওই সুতলপুরীর পাহারা হব ।” তখন ভগবান পাহারাদার হয়ে গেলেন আর তার ভক্ত ওখানকার বাসিন্দা হয়ে গেলেন ।

তাহলে ভগবানের নিলয় কোথায়, বলুন ? ভগবান এতো দয়ালু ! তিনি সব কিছু আমাদেরকে দিয়েছেন তবু আমরা বলি, “আমরা কিছু পাইনি !” “আমাদের কিছু নাই ।” ভগবান আমাদেরকে চলতে দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, কথা-বল দিয়েছেন, তবু আমরা সবসময় ভাবি আমরা কিছু পাই নি, সবসময় তার দোষ দেই…

 


 

 

 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥