আমার শোচন

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
২২ মার্চ ২০১৬

 

শ্রীলগুরুপাদপদ্মের কৃপায়, গৌরহরির কৃপায় আপনারা সুষ্ঠু ভাবে, সুন্দর ভাবে, কোন বিঘ্ন ছাড়াই ধামপরিক্রমা সমাপ্ত করেছেন । প্রতি বৎসরের মত এই বৎসরও ২০১৬ ধামপরিক্রমা আজকে সমাপ্ত করেছেন ।

গুরুর, ধামের কৃপা ছাড়া, ধামবাসী-বৈষ্ণবগণের কৃপা ছাড়া, ধামেশ্বর মহাপ্রভুর কৃপা ছাড়া, নিত্যানন্দের কৃপা ছাড়া, সবাই এই ধামপরিক্রমা সমাপ্ত করতে পারে না । সবার দ্বারা ধামপ্রিক্রমা হয় না, এইটা সবসময় মনে রাখবেন ।

আজকে আধিবাস গৌরাবির্ভাব তিথির, আমাদের খুবি আনন্দের দিন কিন্তু মাঝখানে আবার নিরানন্দ হয়ে যায় । আপনারা এই পরিক্রমা করে ব্যাসদেব গোস্বামী, শুকদেব গোস্বামী, ব্রহ্মা, শিবাদি, সমস্তা ভক্তগণের সঙ্গে, গৌরহরির সঙ্গে, নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে, গুরুপাদপদ্মের সঙ্গে, বৈষ্ণবগণের সঙ্গে, কত দেব-দেবতার সঙ্গে । আপনারা কেউই বুঝতে পারছেন না, আমরাও এটা বুঝতে পারছি না । পরিক্রমার সময় কত দেবদেবী এই ধামপরিক্রমা করতেই স্বর্গলোক থেকে এখানে চলে আসে—ব্রহ্মালোক থেকে ব্রহ্মা চলে আসে, শিবলোক থেকে শিব চলে আসে, ব্যাসদেব গোস্বামী, শুকদেব গোস্বামী ইত্যাদি—তারা সবাই এই ধামপরিক্রমা করতে আসেন । স্বয়ম ভগবানের লীলা-ভূমি, এই লীলা ক্ষেত্র তারাই পরিক্রমা করতে আসেন কিন্তু আমরা এই সাধারণ চক্ষু দ্বারা সেটা বুঝতে পারি না, সেটা জানতেও পারি না । কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের কথা এটাই যে, আপনারা এই ধামপরিক্রমা করে ভাবছেন, “কখন চলে যাব ?” অনেকই মধ্যম পরিক্রমার করে’ বিকালেই বেরিয়ে গিয়েছেন । পরিক্রমা শেষ না করে তিন দিন করে আজকে বলে, “একদিন থাকল, বাড়ি চলে যাই ।” অনেকই চলে যাচ্ছেন কিন্তু পরিক্রমাটা সম্পূর্ণ হয় না, তাদের ভাগ্যেরও ক্ষতি হয়…

 

এই দিন থেকে প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর সবসময় বলতেন, “নবদ্বীপ ধামপরিক্রমার পরে, জগন্নাথ মিশ্রের আনন্দ-মহোৎসবের পরে অনেকই সেই গঙ্গা পেরিয়ে আবার তারা মায়ার জগতে চলে যায় !” তাই, যে দিন সবাই চলে যাবে, প্রভুপাদকে দেখা করে, একটু প্রণাম করে, কিন্তু সে দিন প্রভুপাদ দেখা দিচ্ছেন না । প্রভুপাদ খুব কষ্ট পাচ্ছেন । এরাই সত্যিকারের গুরু, বুঝতে পারছেন ? দরজার আড়ালে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জল ফেলছেন ! প্রভুপাদ বলতেন, “আপনারা ধামপরিক্রমা করলেন, আপনাদের সঙ্গে একটা সম্বন্ধ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা আপনারা ভুলে যান নাতো !”

এই জগতের পিতা, মাতা, ভাই, বোন, এইসব সম্বন্ধ দুদিনের সম্বন্ধ কিন্তু গুরুর সঙ্গে শিষ্যের সম্বন্ধটা হয়েছে জন্ম-জন্ম-অন্তরের সম্বন্ধ । সেইটা যে বুঝতে না পারে, সে সত্যিকারের গুরু হতে পারে না, সে সত্যিকারের শিষ্য হতে পারে না । এটা সবসময় আপনাদের মনে রাখতে হবে । সম্বন্ধ-জ্ঞানটা বুঝতে হয়, সম্বন্ধ-জ্ঞানটা জানতে হয় । সম্বন্ধ-জ্ঞানটা সাধারণ এই বহ্যিক বিশ্বতে দেখলে হয় না, বহ্যিক বিশ্বতে বুঝতে পারা যায় না ।

সেইভাবে, সেই দিন সবাই খুঁজে বেড়াছেন, “প্রভুপাদ কোথায় গেলেন ?” ঘরে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না কিন্তু শেষে কেউ দেখল বাথরুমের দরজা খোলা ছিল—সেখানে ঢুকে দেখতে পেল যে, বাথরুমের দরজার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রভুপাদ কাঁদছেন । সবাই এখনই তাকে ধরে নিয়ে এসে নিজের চেয়ারে বসিয়ে দিল, আর তখন প্রভুপাদ বললেন, “আপনারা এতদিন পরিক্রমা করলেন, কৃষ্ণের সংসারের সদস্য হয়ে থাকলেন কিন্তু এখন আবার সেই মায়ার জগতে চলে যাচ্ছেন, সেই মায়ার বন্ধনে পড়ে যাচ্ছেন ! সেই মায়ার জগত থেকে আমরা দ্বারে দ্বারে ভক্তগণকে পাঠিয়ে আপনাকে কৃষ্ণের পরিবারে সদস্য করলাম, আবার আপনারা সেই মায়ার জগতে চলে গিয়ে ভগবানকে ভুলে যাবেন নাতো ! আমাকে ভুলে যাবেন নাতো ! আমার সঙ্গে যে সম্বন্ধটা হয়েছে, সে সম্বন্ধটা ভুলবেন নাতো !”

শ্রীধরদেবগোস্বামী মহারাজও বলতেন, “লোকরা পরিক্রমা করতে আসল, যার যার ঘরে চলে যাচ্ছে আবার প্রভুপাদের সঙ্গে সম্বন্ধ ছাড়া আর কষ্ট কি আছে ?”

আপনারা অনুভব করতে পারলেন যে, প্রভুপাদ কত গুহ্যের কথা বলেছেন, কত অন্তরঙ্গ সম্বন্ধের কথা বলেছেন । এটা সাধারণ ব্যক্তিরা কখনও বুঝতে পারে না । একে বলা হয় বিরহ ।

 

যখন কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় এবং দ্বারকায় চলে গেলেন, ব্রজগোপীরা তখন চোখের জলে, নাকের জলেই সব কিছু একাকার করেই কৃষ্ণের জন্য শুধু হাহাকার করছেন । যাকে দেখতে পারছেন, তারা কৃষ্ণকে দেখতে পেল । বৃক্ষকে জড়িয়ে জড়িয়ে তারা বললেন, “এই পথ দিয়ে গিয়েছে ! এই য়ে পায়ের নূপুর ফুটলই সেগুলো পড়ে আছে ! প্রভু কি আমাদের ভুলে গেল ? এত নিষ্ঠুর ! ওকে আমাকে মরে রাখতে পারল না ! ওকে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল ! এত নিষ্ঠুর ! ওকে আমরা এত ভালবাসি, ওকের ছাড়া কিছু জানি না, ওকের ছাড়া কিছু বুঝতে পারি না কিন্তু আমাকে ছেড়ে চলে গেল !”

সেইভাবে, চৈতন্য মহাপ্রভু যখন সন্যাস নিয়ে পুরীতে থাকতেন, তিনি তখন সে বিরহ আস্বাদন করতেন । একে বলা হয় বিপ্রলম্ভ-লীলা, বিরহ-লীলা । বিরহ দিয়ে আনন্দটা বেশি পাওয়া যায়—সংযোগে আনন্দ পাওয়া যায় না, সংযোগে যে ইচ্ছাই, সে বিয়োগেই আনন্দটা বেশি ! সংযোগে আনন্দটা ক্ষণস্থায়ী আনন্দ কিন্তু বিয়োগের যে আনন্দ সে আনন্দ ক্ষণে ক্ষণে, মুহূর্তে মুহূর্তে আপনারা ভাব করতে পারবেন । যদি কৃষ্ণের সঙ্গে সত্যিকারের সম্বন্ধ হয়, গুরুর সঙ্গে সম্বন্ধ হয়, তাহলে আপানারা সব বুঝতে পারবেন ।

সেইভাবে, এই সম্বন্ধ-জ্ঞানের কথা আপনাদেরকে ভালো করে বুঝাতে হবে । সে রামানন্দের সংবাদ যদি আপনারা পড়েন, তখন দেখতে পাবেন যে এটা অত্যন্ত উচ্চের মার্গের কথা ।

আজকে আপনারা দেখলেন যে, চম্পাহট্টে গিয়ে সেখানে আমরা গীতগোবিন্দ কীর্ত্তনটা করলাম না । গীতগোবিন্দ থেকে “দেহি পদপল্লবমুদারম্” সেই জয়দেব-পদ্মাবতীর কথা এখানে আমরা বললাম, আমি এখানে বুঝতে পেরেছি কিন্তু সেই জয়দেবের বিরহের কথা কাকে বলব, কাকে শুনাব ? কে বুঝতে পারবে, বলুন ?

জয়দেব গীতগোবিন্দ রচনা আরম্ভ করেছিলেন অন্য জায়গায় নবদ্বীপে কিন্তু ওখানে শেষ করতে পারলেন না । পরে তিনি ওই চম্পাহট্টে থাকতেন, সেখানে বসে গিতগোবিন্দ রচনা করেছেন । এক দিন চম্পাহট্টে বসে গীতগোবিন্দ রচনা করতে গিয়ে তিনি ভুলে গিয়েছেন পরের লাইটা কি, মনে কিছু রাখলে না ।

তাই তিনি তার স্ত্রী পদ্মাবতীকে বললেন, “আমি গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছি, আমার জন্য একটু প্রসাদের ব্যবস্থা করে রাখো ।”

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন সেখানে সেই জয়দেব সেজে চলে এসে বললেন, “পদ্মাবতী, প্রসাদ প্রস্তুত হয়েছে ?”

“হ্যাঁ, তুমি তো বলেছো স্নান করে এসে প্রসাদ পাবে—প্রসাদ পেয়ে নাও ।”

প্রসাদ পেয়ে তখন কি তিনি করলেন ? জয়দেব যেখানে বসে গীতগোবিন্দ রচনা করলেন, ভগবান সেই ঘরে ঢুকে গেলেন আর গীতগোবিন্দের শ্লোকটা শেষ করলেন । শ্লোকটা শেষ করে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন ।

একটু পরে আসল জয়দেব বাড়ি এসে বললেন, “পদ্মাবতী, আমার প্রসাদ কোথায় ?”

পদ্মাবতী অবাক হয়ে বললেন, “কি বলছো ? তুমি তো এই মাত্র প্রসাদ পেয়ে আবার ঘরে ঢুকলে । ঢুকে তুমি কি লেখা লিখি করছিলে ।”

জয়দেব বললেন, “সে কি ? আমি তো আসি নি এখানে !”

তখন ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখতে পারলেন সেই লেখা “দেহি পদপল্লবমুদারম্” (“তোমার চরণকমল আমার মস্তকে বিন্যস্ত কর”) । সেই রচনা সেখানে পড়ে আছে । ভগবান নিজে এসে লিখে দিয়ে চলে গেলেন । রাধারাণীর সম্বন্ধে কি লিখতে হবে ? কৃষ্ণ নিজেই সেইটা লিখি দিয়েছেন !

 

তাই এই সম্বন্ধটা ভুলে গেলে চলবে না । এই সম্বন্ধ দুইদিনের সম্বন্ধ নয় । শুধু দীক্ষা নিয়ে চলে গেলাম, শুধু চিন্তা করতে পারলাম না কিন্তু বুঝতে হবে : গুরুকে কি দিতে পেরেছি ? গুরুর জন্য কতটা ভালবাসতে পেরেছি ? গুরুর জন্য কতটা করতে পেরেছি ? সেইটা সবসময় আপনাদের চিন্তা করতে হবে ।

দীক্ষাকালে ভক্ত করে আত্মসমর্পণ ।
সেইকালে কৃষ্ণ তারে করে আত্মসম ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ৩/৪/১৯২)

দীক্ষা মানে দিব্য-ঞান, সেই করে তারাই আত্মসম, নিজের আত্মার সম তিনি মনে করে । আপনাদের সবসময় সেই চিন্তা করতে হবে, সেই ভাবটা আসতে হবে । সেই ভাবটার জন্যই, সেই লীলা করবার জন্যই শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এসেছিলেন । যদি রাধা-বিরহ শুনেন, আপনারা বুঝতে পারছেন তার যে বিরহের জ্বালা ।

বাঁশি বারণও মানে না, কথা যে শুনে না,
ও মরা কেন মরে না ।
বাঁশির কোন কাজ নাই, দিবানিশি ডাকে-তাই
আমি যত দূরে যাই, বাঁশি বলে এস রাই,
কেন যে সময় বুঝে না ।

কৃষ্ণও বলেন, “ওরে সুবল ! আজকে তো বলরাম নেই, আজকে আমি আর গো চারণে যাব না !” বলরামও সে দিন বলেন, “আজকে তো কৃষ্ণ নেই, আজকে আমি আর গো চারণে যাব না !”

সেই বিরহটা বুঝতে হবে, সেই বিরহটা চিন্তা করতে হবে । ভগবানের নিজের জন গুরুপাদপদ্মকে ভুলে গেলে চলবে না । আমরা মীরাবাইয়ের মত ভজনা করি না—শুধু কৃষ্ণ কৃষ্ণ করা আমাদের লাইন নয় ।

রাধা-ভজনে যদি মতি নাহি ভেলা ।
কৃষ্ণ-ভজন তব অকারণ গেলা ॥

রাধা ভজন যদি করতে না পারি, কৃষ্ণ ভজন করে কিছু নয় । নিত্যানন্দের বিনা গৌর পাওয়া যাবে না, গুরুপাদপদ্ম বাদ দিয়ে কৃষ্ণকে পাওয়া যাবে না ! গুরু বাদ দিয়ে ভগবানকে ভজন করলে কিছু হবে না । এই সবসময় চিন্তা করতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥