আনন্দদায়ক কষ্ট

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

 

গৌরকথা হৃদয়ে থাকতে হবে । গৌরকথা হৃদয়ে থাকলে কখনও গৌরকে ছাড়া ভালো লাগবে না । মনটা গৌরকে দিতে হবে । শ্রীলজগদানন্দ পণ্ডিত বলেছেন :

আনের মন রাখিতে গিয়া আপনাকে দিবে ফাঁকি ।
মনের কথা জানে গোরা কেমনে হৃদয় ঢাকি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৪)

গোরা সব জানেন আপনি মনটা কাকে দিয়েছেন—আপনার মনটা গোরার দিকে আছে না অন্য দিকে আছে । গৌরাঙ্গের প্রেম কখনও না যায়—আমরা কৃষ্ণ চাই না, কৃষ্ণপ্রেম চাই । যত অসুবিধা হোক, যত ঝামেলা হোক, আমরা এখানে ধাম পরিক্রমা করতে, কিছু সুকৃতি অর্জন করতে এসেছি । আমরা বাঁদরের পায়খানা আর অন্য নোংরা জিনিস দেখতে আসি নি । খাওয়া-দাওয়া, পরা, ভালোমন্দ, অনেক কিছু কষ্ট পাচ্ছেন । আপনাদের বাড়িতে এক এক ঘরে একা থাকেন, এক এক খাটে ঘুমান আর এখানে দশটি লোক খাটে একসঙ্গে ঘুমাচ্ছেন । একটু তো কষ্ট হবে । বার বার কারেন্ট যাচ্ছে, জেনারেটর যাচ্ছে । এই সব নানারকম কষ্ট যাঁরা সহ্য করতে পারেন তাঁরা ভগবানকে পেতে পারেন ।

ভগবান এইসব কষ্ট দ্বারা আমাদের পরীক্ষা করেন, “তোমায় আমি অনেক কষ্ট দেব, সেই কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে তো ? সেই কষ্ট তুমি সহ্য করে আমার ভক্ত-সঙ্গে পরিক্রমা করতে পারবে ?”

পুরিতে দেখছেন বিরাট বিরাট বিল্ডিং, বিরাট বিরাট হোটেল আছে । কিছু হোটেলে এক রাত থাকার ৭০০ টাকা ভাড়া আর এমন কিছু হোটেল আছেও যেখানে এক রাত ভাড়া হচ্ছে ১০০,০০০ টাকা (সেখানে সুইমিং পুল আছে, মদ পাবেন, গাঁজা পাবেন, মেয়ে পাবেন, সব কিছু পাবেন) । আমরা তো সেগুলো করতে আসিনি । আমরা সাধুসঙ্গে ধামপরিক্রমা করতে কষ্ট করতে করতে এসেছি ।

সব কষ্ট সহ্য করে ধাম পরিক্রমা করতে হবে । ভগবানের কাছে আসতে হলে অনেক পরিশ্রম করতে হবে । আমরা ময়লা লোক, নোংরা লোক—বাহিরে কপালে তিলক করে আছি আর গলায় মালা পরে আছি কিন্তু আমি গোপনে কি করছি ?

“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে ।
গোরার আচার, গোরার বিচার লইলে ফল ফলে ॥
লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি ।
গোপনেতে অত্যাচার গোরা ধরে চুরি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৬-৭)

আমরা সেইরকম কপটতা করি । তাঁর কাছে যাবার জন্য ভগবান আমাদের পরীক্ষা করেন—আমাদেরকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে তাঁর কাছে নিয়ে যাবেন । সেইজন্য আমাদের নিজেকে একটু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে হবে, তার জন্য পরীক্ষা অনেক আছে । সেই বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করতে হবে, বিভিন্ন নিয়মকানুন অনুসারে চলতে হবে । রাগ, দ্বেষ, হিংসা সেগুলো আমাদের মধ্যে থাকলে হবে না ।

চিন্তা করতে হবে আমিও তা জীবাত্মা । আমি ঘরের মধ্যে আছি আর একটা ব্যাঙ, পোকা, সাপ প্রভৃতি কত কষ্ট করে জঙ্গলের মধ্যে জীবনযাপন করছে । গরুর মশারি নেই—আমায় একটা মশায় কামড় দিলে আমি ঘুমাতে পারি না, মশার কয়েল লাগাই আর গরুকে কত মশা কামড় দেয় । তারা কত কষ্ট করছে এই জীবন পেয়ে, আর আমরা এখন মানুষ জন্ম লাভ করে চলে এসেছি সামান্য একটু কষ্টই সহ্য করতে পারি না । সেইজন্য ভগবানকে পেতে হলে আমাদের সব কষ্ট সহ্য করতে হবে । এইটা হলে আমাদের কথা আজকে ।

জীবন চলে যাচ্ছে যেকোন মুহুর্তে চলে যেতে পারি কিন্তু আমরা এই ধাম পরিক্রমা করতে এসেছি আর মনের মধ্যে যদি খারাপ চিন্তা রাখি তাহলে ধাম পরিক্রমা হবে না ।

জয় শ্রীলগুরুমহারাজ কি জয় ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥