ভগবতধাম : পরমকল্যাণ ও সাধ্যবস্তু

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

 

‘কৃষ্ণনাম’ করে অপরাধের বিচার ।
কৃষ্ণ বলিলে অপরাধীর না হয় বিকার ॥

(চৈঃ চঃ, ১/৮/২৪)

“কৃষ্ণ বলিলে অপরাধীর না হয় বিকার”—কারণটা কী জানেন ? এই কৃষ্ণনাম চেতনবস্তু আর এই চেতনবস্তু সবার মুখে আসে না । যাঁরা নামে অপরাধী (কৃষ্ণনামের প্রতি অপরাধ করেন) তাঁদের মুখে কখনও কৃষ্ণনাম আসতে পারে না । আপনারা নিশ্চয়ই কৃষ্ণনামে অপরাধী নন তাই আপনাদের মুখে কেন কৃষ্ণনাম আসবে না ? সবাইকে কৃষ্ণনাম করতে হবে । আমি কোন গায়ক নই, কোন পাঠক নই—আমি এসেছি আপনাদেরকে কৃষ্ণনাম করাতে, জীবকে দয়া ও সাহায্য করতে এসেছি । আপনারা এই কৃষ্ণনাম যদি করবেন, এ দিয়ে আমাদের কিছু মঙ্গল হবে, আপনাদেরও কিছু মঙ্গল হবে ।

এখন একদম কথা বলবেন না । কোন কথা নেই । কথাগুলা বললে আপনাদের অপরাধ হবে । আমাদের বৈষ্ণব অপরাধ বা ভক্তির যেটা প্রতিকূল সেগুলা করা উচিৎ নয় । ভগবানের কথা শোনার সময় অন্য প্রজল্প করা উচিত নয় ।

আমি আগেও এটা বুঝিয়ে দিয়েছি আর কীর্ত্তনে আমরা প্রতিদিন গাই : “ছয় বেগ দমি’, ছয় দোষ শোধি, ছয় গুণ দেহ দাসে” । ছয় বেগ কী ? ছয় দোষ কী ? আর ছয় গুণ কী ? এই ছয় বেগটা আর ছয় দোষটা আমাদের বর্জ্জন করতে হবে । ছয় দোষের মধ্যে অত্যাহার, প্রয়াস, প্রজল্প, নিয়মাগ্রহ, জনসঙ্গ, লৌল্য আছে । ছয় বেগের মধ্যে বাক্যবেগ, মনবেগ, ক্রোধবেগ, জিহ্বাবেগ, উদরবেগ, উপস্থবেগ । আর ছয় গুণটা মানে উৎসাহ, নিশ্চয়, ধৈর্য্য, ভক্তিপোষক কর্ম্ম, সঙ্গত্যাগ আর সদ্বৃত্তি ।

সেইজন্য, প্রজল্প কখনও করবেন না । আপানারা এসেছেন কিছু হরিকথা শ্রবণ কীর্ত্তন করবার জন্য, সেটাই মন দিযে শুনতে হবে । সেইটা মন দিয়ে শুনলে আপনাদের পরমকল্যাণ বস্তু লাভ হবে ।

পরমকল্যাণ এবং সাধ্যবস্তু কী ? আমাদের এই শ্রবণ কীর্ত্তন করার অর্থ কী ? রাধাগোবিন্দের সেবায় নিজেকে অর্পণ করা, তাঁদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা । সেটা হচ্ছে আমাদের পরমাবস্থা ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলেছেন : ভগবানকে যদি প্রীতি সহকারে নিত্য সেবা করা হয়, তখন কী হয় ? ভগবান নিজেই বলেছেন : “সে আমার কাছে চলে যায় ।” বিরজা, ব্রহ্মলোক, বৈকুন্ঠ, পরব্যোম ভেদ করে গোবিন্দের চরণে গোলোক-বৃন্দাবনে তিনি জায়গা পান ।

আপনারা এই জন্মে সুদুর্লভ দেহ পেয়েছেন, এই দুর্লভ বস্তু হেলায় হারিয়ে ফেলবেন না । হেলায় হারালে আবার গতাগতের অনুসারে আপনাদের বারবার এই সংসারে প্রবেশ করতে হবে । এইজন্য আপনাদের বুঝতে হবে আমাদের সাধ্যবস্তু কী, সাধ্যবস্তু কী করলে পাওয়া যাবে ? “‘সাধ্যবস্তু’ ‘সাধন’ বিনা কেহ নাহি পায়” (চৈঃ চঃ, ২/৮/১৯৬) এই সাধ্যবস্তু পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সাধন । এই সাধ্যবস্তু আপনাদের পেতে হলে বার বার যাতে এই সংসারে আসতে না হয়—তাই আপনাদের কৃষ্ণ ভজন করতে হবে ।

‘শ্রদ্ধা’ শব্দে—বিস্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় ।
কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্ব্বকর্ম্ম কৃত হয় ॥

(চৈঃ চঃ, ২/২২/৬২)

সর্ব্বকর্ম্ম কীরকম ? পিতৃঋণ, মাতৃঋণ, ঋষিঋণ, দেবঋণ, সব ঋণ শোধ হয়ে যায় যদি আমরা কৃষ্ণপূজা করি আর ভগবানের সেবা ও গুণ কীর্ত্তন করি—তার দ্বারা আমরা ভগবতধামে পৌছে যাব ।

এই চিন্তাভাবনার মধ্যে থাকতে হবে ।

চারি বর্ণাশ্রমী যদি কৃষ্ণ নাহি ভজে ।
স্বকর্ম্ম করিলেও সে রৌরবে পড়ি মজে ॥

(চৈঃ চঃ, ২/২২/২৬)

রৌরব মানে নরকের চাইতে আরও কঠিন জায়গা—সেটা অত্যন্ত কষ্টের জায়গা আপনাদের যেতে হবেই যদি আপনারা কৃষ্ণ ভজন না করে বর্ণাশ্রম পালন করবেন । আপনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শুদ্র হতে পারেন বা ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থজীবন বা বানপ্রস্থ আশ্রম পালন করতে পারেন, কিন্তু এটা দ্বারা ভগবানকে পাওয়া যায় না । বানপ্রস্থ করে বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণ করুন । কিন্তু শাস্ত্রে বলেছেন,

তীর্থযাত্রা পরিশ্রম কেবল মনের ভ্রম,
সর্ব্বসিদ্ধি গোবিন্দচরণ

(শ্রীলনরোত্তমদাস ঠাকুর)

সর্ব্বসিদ্ধি হবে কি করে ? গোবিন্দের চরণে আশ্রয় গ্রহণ করলে । এটা সব সময় আপনাদের মনে রাখতে হবে । এটা যদি ভুলে যান তাহলে আপনাদের কিছু হবে না । আপনাদের সব সময় কৃষ্ণসেবায় নিজেকে নিযুক্ত থাকতে হবে । সেইজন্য আপনাদের ভক্তির অনুকূলটা স্বীকার করতে হবে আর ভক্তির প্রতিকূলটা বর্জন করতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥