আমার প্রার্থনা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
৬ মে ২০১৮

 

এই কলিযুগে মহাপ্রভু এসে বলেছেন :

জীব জাগ, জীব জাগ, গোরাচাঁন বলে ।
কত নিদ্রা যাও মায়া-পিশাচীর কোলে ॥

“জীব আর ঘুমিও না ! উঠে পড় ! কৃষ্ণ ভজ ! তোমাকে আমার কাছে যেতে হবে : তুমি আমার কাছ থেকে চলে গিয়েছ, এখন তোমাকে আবার আমার কাছে আসতে হবে ।”

তাহলে কি করে আসতে হবে ?

“শাস্ত্রে বলেছি : আমাকে ভজন করলে তুমি আমার লোক প্রাপ্ত হবে । তুমি শিবের পূজা করলে শিবলোকে যাবে, মনুষ্যের সেবা করলে মনুষ্যলোকে যাবে, জীবের সেবা করলে জীবলোকে যাবে কিন্তু তুমি ভগবানের সেবা করলে ভগবত-লোকে—যেখানে আমার গুণকীর্ত্তন হয়, আমার নিত্যসেবা হয়—সেই নিত্যধামে প্রবেশ করতে পারবে ।”

ভগবানের সেবা করতে হবে । ভগবানের সেবা বাদ দিয়ে আপনি কিছুই পাবেন না । সেইজন্য, কৃষ্ণ নিজে এই জগতে এসেছেন—রাধা-কৃষ্ণ মিলিত বিগ্রহ গৌরাঙ্গের রূপে জগতে এসে বলেছেন, “তুমি আর ঘুমিও না, তোমার ঠিকানা, তোমার বাড়ি তুমি হারিয়ে ফেলেছ । তোমার ঠিকানা এটা নয় ! তোমাকে আমার কাছে যেতে হবে ।” আমরা ভগবানকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর ভগবান আমাদের মত পতিত সন্তানকেও খুঁজে বেড়াচ্ছেন । তাঁর কাছেই যেতে হবে । তাঁর কাছে না গেলে আমরা কোন দিনই ভগবানকে লাভ করতে পারব না ।

সেইজন্য সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের স্থানে ভাগবত শ্রবণ করতে হবে, সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের কথা শুনে চলতে হবে । সাধু জগতে অনেক পাওয়া যায় কিন্তু সত্যিকারের যাঁরা সাধু তাঁদের কাছে যেতে হবে । শাস্ত্র-গ্রন্থে যে সাধুদের লক্ষণ বলা আছে সেগুলোর অনুসারে আপনারা বলতে পারবেন কে সত্যিকারের সাধু হয় ।

“বৈষ্ণব হইতে মনে ছিল বড় আশা, কিন্তু ‘তৃণাদপি সুনীচেন’ শ্লোকে পড়িলেন বাধা” । বৈষ্ণব হতে আমার খুব আশা ছিল কিন্তু “তৃণের মত নিচু, তরুর মত সহ্য, অপরকে সম্মান করা” এটা আমি করতে পারলাম না ।

তৃণাধিক হীন দীন অকিঞ্চন ছার ।
আপনে মানবি সদা ছাড়ি অহঙ্কার ॥
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন ।
প্রতিহিংসা ত্যজি অন্যে করবি পালন ॥

অপরকে প্রতিহিংসা করলে হবে না । যদি কেউ আপনার প্রতি হিংসা করছে আপনার কাউকেই প্রতিহিংসা করলে হবে না ।

জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে ।
পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥

পরের উপকারের জন্য নিজের সুখটাকে বিলিয়ে দিতে হবে । তৃণের মত নিচু হতে হবে, তরুর মত সহ্য করতে হবে, অপরকে সম্মান করতে হবে । এইটা না করলে কিছু পাওয়া যাবে না । এইটা না করলে আমরা কোন দিন ভগবানকে লাভ করতে পারব না ।

এইটা সব সময় আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের জানতে হবে, আমাদের লোককে বোঝাতে হবে—লোকটাকেও বুঝতে হবে, লোকটাকেও এটা জানতে হবে ।

তৃণাধিক হীন দীন অকিঞ্চন ছার ।
আপনে মানবি সদা ছাড়ি অহঙ্কার ॥
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন ।
প্রতিহিংসা ত্যজি অন্যে করবি পালন ॥
জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে ।
পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥

(শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

তাহলে আপনাদের কাছে আমার প্রার্থনা এই যে, আপনারা সব সময় কৃষ্ণনাম করবেন, ভগবানকে মনে রাখবেন, ভগবানকে ভোগ দিয়ে তাঁর প্রসাদ গ্রহণ করবেন আর সদ্গুরুর চরণে আশ্রয় গ্রহণ করবেন । হরিভজন না করলে কোন দিনও আত্ম রেহাই পাবেন না । বারবার এই জগতে আসতে হবে :

ভবে কয় বার এলি কয় বার গেলি
তবু তত্ত্ব না শিখিলি ।
নিজের মাথা নিজে খাইলি
এ দোষ দিবি কারে ভাই ?

দোষটা আমার, আপনার নিজের,—নিজেই নিজের বন্ধু নিজেই নিজের শত্রু । নিজের জন্য নিজেই যদি উপকার করতে না পারি, আমি পরের উপকার করতে পারব না । এইটা সব সময় মনে রাখতে হবে ।

জীবে দয়া, নামে রুচি, বৈষ্ণব সেবা ।
ইহা বহি সনাতন নাহি আর ধর্ম্ম ॥

এটা ছাড়া আর কোন ধর্ম্ম নয় । জীবকে দয়া করতে হবে । কৃষ্ণবহির্মুখ জীবকে এই পথে নিয়ে অাসতে হবে তাহলে আমাদের পরমকল্যাণ লাভ হবে, পরমবস্তু লাভ হবে ; আমরা পরম জিনিস লাভ করতে পারব ।

 

আমরা এসেছি শুধু হরিনাম করতে নয়—হরিনাম করাতে এসেছি । আমরা গান গাইতে আসিনি, আমরা পালা কীর্ত্তন, লীলা কীর্ত্তন করতে আসিনি—আপনাদের হরিনাম করাতে এসেছি । আপনাদের মধ্যে যদি একজনও লোক মঠে গিয়ে হরিভজন করবেন বা মঠে থাকবেন, সেইটা আমাদের সফলতা । মঠের থাকা বড় ভাগ্যের কথা । মঠে থেকে ভগবানের সেবা করা বা আশ্রমে থেকে ভগবানের সেবা করা—সেটা বহু ভাগ্যের কথা ।

সেইভাবে, আপনারা সবাই হরিনাম করবেন, আপনারা সবাই মঠে যাবেন, সব সময় হরিভজন করবেন তাহলে আমিও অত্যন্ত শান্তি পাব । আমি খুশি হব কি করে ? আমাকে ভাল খাওয়া দিলে এটা দ্বারা আমি খুশি নই । যদি আপনারা হরিনাম করেন, ভগবানের নাম করেন, গুরুদেবের কথা প্রচার করেন, তাহলে আমি তার চাইতে অনেক বেশি খুশি হব । কোটি টাকা দিলেও আপনি আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না । কিন্তু আপনি আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন কী করে জেনে রাখুন । যদি আপনি নিয়মিত নিষ্ঠাসহকারে ভগবানের সেবা করেন তাহলেই আমি সন্তুষ্ট হব ।

বৈষ্ণব, গঙ্গাজল, তুলসী আর ভগবানের বিগ্রহ—এই চারটা আপনারা সব সময় মনে রাখবেন । তার মধ্যে গঙ্গাজল, তুলসী আর বৈষ্ণব সব সময় প্রতিষ্ঠিত । গঙ্গাজল দেখলেও জল মাথায় নিয়ে প্রণাম করবেন, তুলসী রাস্তায় দেখলেও প্রণাম করতে হবে, তিনি প্রতিষ্ঠিত, আর বৈষ্ণব দেখলেও প্রণাম করতে হবে । ভগবানের বিগ্রহ দেখলেও প্রণাম করতে হবে । এটা আপনারা মনে রাখবেন সব সময় । তুলসীগাছ কখনও প্রতিষ্ঠা করতে হয় না আর বৈষ্ণবগণকে কখনও প্রতিষ্ঠা করতে হয় না : গুরুদেব, গুরুবর্গগণ যাঁকে সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন, তাঁর জন্য আর কোন সার্টিফিকেটর প্রয়োজন হয় না । তাহলে, সেই সার্টিফিকেট শুনে আপনারা যদি সদ্গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করে গুরুপাদপদ্মের সেবা করতে পারেন তাহলে আমি অত্যন্ত খুশি হব ।

জয় শ্রীল গুরুমহারাজ কি জয় ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥