ভক্তিজগতের পরীক্ষা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
৬ মে ২০১৮

 

বৈষ্ণবের ছব্বিশটা গুণ আছে । সেই গুণটা আপনার মধ্যে আছে কি না ? ছব্বিশটাই গুণ দূরে থাকুক তার মধ্যে একটাও আছে কি না ? সেইটা আপনাদেরকে নিজেই নিজের দিকে বিচার করতে হবে ।

স্কুলে পড়লে যখন যে ক্লাস ৪ পর্যন্ত পড়লে প্রাইমারি পাস হয়, তারপর ১০ পর্যন্ত পড়লে হাই স্কুল পাস হয়, আর ১২ ক্লাস পড়লে উচ্চমাধ্যমিক পাস হয়, তাদের কলেজে ভর্তি হবে । কিন্তু এখানে পরীক্ষা দেবে কে ? নিজের পরীক্ষা নিজেই নিতে হবে : আপনি সত্যিকারের ভজন করছেন কি করছেন না ? আপনার হরিকথায় মতি আসছে কি রতি আসছে না ? সেটা আপনাকে নিজেকে বিচার করতে হবে । আপনি নিজেকেই পরীক্ষা দিতে হবে : আপনি সত্যিকারের হরিভজন করছেন কি না ? আপনি সাদু হলেন কি না ? আপনি পরচর্চা, পরনিন্দা করছেন কি না ? ‘আমি’ ‘আমার’ বস্তুটা দেখলেন কি না ? নাম বলে পাপাচার করলেন কি না ? এই ধরনের জিনিষ যদি থাকে, তাহলে এটা হরিনাম হল না । কতক্ষণ হরিনাম হয় সেটা নিজেকে বুঝতে হবে । সেইজন্য বৈষ্ণব-ভজনটা আমাদের কর্তেব্য ।

একাকি নির্জন ভজন করলে তবে এই কৈতব । নির্জনে একাকি থাকব ও কাদের সঙ্গ করব না—সেটা হচ্ছে কৈতব, অত্মবঞ্চন । নির্জনে বসে থাকে একাকি ভজন করা মানে আপনি আত্মবঞ্চন করেন । কলিযুগের ভজনটা হচ্ছে গোষ্ঠভজন, গোষ্ঠ্যানন্দী—নির্জন ভজন নয়, গোষ্ঠভজন । সাবাইকে নিয়ে সঙ্কীর্ত্তন করতে হবে । সাবাইকে নিয়ে সঙ্কীর্ত্তন করলে সত্যিকারের নাম হয় ।

মনে মনে হরিনাম করলে আপনার অনেক চিন্তাভাবনা এই সময় আসে । এমনকি ১০ মিনিট অমনই বসে থাকতে মুশকিল কারণ অনেক চিন্তা মনের মধ্যে এসে যায়, তখন ধ্যানে বসে অন্য করতে বসি । আর যখন আপনি জোরে জোরে হরিনাম করেন, তখন পশুপাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ (যা বলতে না পারে, শুনতে না পারে) তারাও কিছু মঙ্গল পেতে পারেন । তারা sound vibration (সব্দতরঙ্গ) শুনতে পায় । সেই সব্দতরঙ্গ ইথারের মধ্যমে চলে আসে ।

গুরুমহারাজ বলছেন সব্দতরঙ্গ ইথারের মধ্যমে এসে যায় । ইথার মানে কী ? যেমন টেলিভিশনের সেন্টার হচ্ছে কলকাতায় বা আকাশতার (অ্যরিয়েল) সেন্টার হচ্ছে কলকাতায় কিন্তু আপনি এখান থেকে একটু সুইচ দেন আর সিগন্যালটা (ছবি বা সব্দ) তরঙ্গের মধ্যমে ওখান থেকে চলে আসে । মোবাইলটাও এইরকম । টাওয়ারটা হচ্ছে কথায় ? সেখান থেকে আমরা কথা শুনতে পাই, দেশ বিদেশের কথা শুনতে পাই । সেটা হচ্ছে সব্দ তরঙ্গ (sound vibration) যে ইথারের মধ্যমে চলে আসে । গুরুমহারাজ সেই কথা বলেছেন ।

গুরুমহারাজ আর একটা কথা বলছেন, সুন্দর করে মনে শুনতে হবে আর মনে রাখতে হবে ।

এই জগতে লোকগুলো আছে যে বলে ভক্তি জগৎ নেয় । আপনার কান না থাকে, যদি কান বধির থাকে, তাহলে সব্দজগৎ বলতে কিছু আছে ? আপনি কথা বুঝতে পারবেন ? কানে যদি শুনতে পাই না (লোকে বলেও ‘কান কালা’), বাহিরে যে অত সব্দ হচ্ছে (মাইক বাজছে, লোক কথা বলছে, পাঠও হচ্ছে) আমি সেটা কিছুই শুনতে পারছি না, তাহলে আমি ভাবি যে, কোন সব্দ নেই এই জগতে, সব্দ জগৎ নেই । কিন্তু সেটা কি সত্য কথা ? আমি যদি ভালো শুনতে পারছি আবার কান কালা নয়, তাহলে আমি বুঝি যে, এটা সত্য কথা নয় । সব্দজগৎ আছে ।

দৃষ্ট জগৎও আছে । আমি যদি চোখে অন্ধ হয় তাহলে আমার কাছে পৃথিবীতে আর কিছু নাই—আলো নেই, গাছপালা নেই, কীটপতঙ্গ নেই, পশুপাখী নেই, কিছুই নেই কারণ আমার দৃষ্ট বস্তু কিছু নেই । চোখে দেখতে পারছি না বলে জগতে আমি আর কিছু দেখতে পারছি না । এইজন্য, আমি বলি এই জগতে কিছুই নেই । কিন্তু সেটা কি সত্য কথা ? সেটা সত্য কথা নয় ।

কান থাকলে যেমন সব্দ জগৎ আছে, চোখ থাকলে যেমন দৃষ্ট জগৎ আছে (দেখার বস্তু আছে), সেইরকম ভক্তি থাকলে ভগবান আছেন । ভক্তি থাকলে ভগবান আছেন । এটা মনে রাখতে হবে । ভগবান নেই বললে সেটা কেউ শুনবেন না । ভক্তি থাকলে ভগবান আছেন ।

চোখ যদি থাকে, আমি এই বিল্ডিং দেখতে পারছি, গাছপালা দেখতে পারছি, পুকুর দেখতে পারছি, জঙ্গল ও রাস্তা দেখতে পারছি, আপনাদেরকে দেখতে পারছি । যাদের চোখ আছে, তারাও এটা বলবে । যদি চোখটা অন্ধ হতে দেখতে পেতাম না । তাহলে, যে ভক্তি আছে বলে, সেই ভগবানকে দেখতে পাবে—ভক্তি থাকলে ভগবানকে দর্শন হবে । ভগবান আছে বলে সেটা বিশ্বাস করতে হবে । ভক্তি থাকলে সেটা বুঝতে পারবে । ভক্তি মধ্যমে ভগবান লাভ হয় । এইটা মনে রাখতে হবে ।

এটা পরমগুরুমহারাজ শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের কথা, এটা তিনি তাঁর বইতেও লেখেছেন ।

আমাদের সেইভাবে সবসময় এই চিন্তা করতে হবে । এই চিতাভাবনার মধ্যে আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হাবে এবং থাকতে হবে । এই সব মিলে থাকতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥