নিত্য-সেবা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
৬ মে ২০১৮

 

গৃহে থেকে ভগবানের সেবা করা যায় । সারা পৃথিবীর লোকের যে একবারে সংসার ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে এমন কথা নেই । কথাটা বুঝতে হবে ।

একদিন শ্রীলভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছে দু’জন স্বামী ও স্ত্রী গিয়ে পড়ে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে গিয়েছেন । বিকালে প্রভুপাদের কাছে এসে বললেন,

“আমরা দুজনই দীক্ষা নিতে এসেছি আপনার কাছে ।”

“দীক্ষা আপনারা কেন নেবেন ?” প্রভুপাদ জিজ্ঞেস করলেন ।

তাঁরা উত্তরে বললেন, “যেন আমাদের সংসার ভাল শান্তিভাবে থাকবে, আমাদের ছেলেমেয়ের ভাল লেখাপড়া হবে—এইজন্য আমরা দীক্ষা নিতে এসেছি ।”

“ওটার জন্য আমি দীক্ষা দিতে পারি না ।” প্রভুপাদ বললেন । তারপর তিনি প্রস্তাব করলেন, “আমি বলি কী, আপনারা এক কাজ করুন । আপনাদের ঘর দেওয়া হবে, সেই ঘরে সাত-দশ দিন ধরে থাকুন । আমি প্রত্যেক দিন পাঠ করি সকাল ও সন্ধ্যা, আপনারা প্রত্যেকদিন আমার পাঠে আসবেন এবং ভগবানের কথা শুনবেন । শুনতে শুনতে যদি আমাকে আপনাদের ভাল লাগবে তাহলে আপনাদের দীক্ষা দেওয়ার উপযুক্ত মনে করব ।”

তারপর সাত দিন ধরে তারা ভাগবতকথা শ্রবণ কীর্ত্তন করেছেন । প্রভুপাদ তাঁদেরকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনাদের কি দীক্ষা নেওয়ার কথা মনে হচ্ছে - না কি বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে ?”

“না, আমরা দীক্ষা নিয়ে তারপর বাড়ি বা পূর্বাশ্রমে ফিরে যাব ।”

“এখন বুঝলেন কেন দীক্ষা নিতে হবে ?”

“আমরা আপনার হরিকথার মাধ্যমে কথাগুলো সব শুনে বুঝতে পারলাম যে, এই কারণে আমরা দীক্ষা নিতে চাই”

তখন প্রভুপাদ বললেন, “দীক্ষা নিয়ে আপনারা আমাকে কী দেবেন ?”

“প্রভু, আমরা তো গরিব মানুষ, বেশি টাকাপয়সা নিয়ে আসি নি । কী আর দিতে পারি আপনাকে ? যা আমার আছে—দশটাকা—সেটা দিতে পারি ।”

প্রভুপাদ বললেন, “এটা হবে না ।”

“বলুন কী দিতে হবে ?”

“আমার টাকার দরকার নেই ।”

“আপনি কী চান ? বলুন ।”

“আমি চাই এইটা : আপনাদের যে কুটির (গৃহ) আছে, সে গৃহে আমার জন্য একটা ঘর দিতে হবে । আর প্রত্যেক দিন আমি যে খাবার খাই সেটা আমাকে খেতে দিতে হবে । আমি আপনাদের বাড়ি গিয়ে থাকব আর যত দিন থাকব তত দিন আপনাদের আমাকে খেতে দিতে হবে ।”

প্রভুপাদের কথা শুনে স্বামী স্ত্রী মনে মনে ভাবছেন, “এতো ভারি বিপদে পড়ে গেলাম ! প্রভুপাদ কত দারুণ বিল্ডিয়ে থাকেন আর আমাদের ক্ষুদ্র কুটিরের মধ্যে কোথায় প্রভুপাদকে থাকার জায়গা দেব ? আর প্রভুপাদকে আমরা কিই-বা খেতে দেব ?”

মুখে তাঁদের ইতস্তত দেখে প্রভুপাদ বললেন, “আপনারা একটু চিন্তা করুন তার পরে আবার আমার কাছে আসুন ।”

তাহলে তাঁরা বাহিরে গিয়ে দুজনে কানাকানি করতে শুরু করলেন । একজন মহারাজ (প্রভুপাদের শিষ্য) বললেন, “কি ব্যাপার ? তোমরা কানাকানি করছ কেন ? প্রভুপাদ কি দীক্ষা দিচ্ছেন না ?”

“না… তিনি অনেক দাবি করছেন…”

“কী দাবি করছেন ?”

“তিনি বলছেন আমাদের যে ঘর আছে, সেই ঘরের মধ্যে তাঁর জন্য একটা থাকার জায়গা দিতে হবে আর তাঁকে প্রত্যেক দিন ছয়বার বা পঞ্চবার খেতে দিতে হবে… আমরা কি করে রাজি হই ? আমরা তো গরিব মানুষ । আমরা প্রভুপাদকে কি করে নিয়ে রাখব ? আর কি করে খেতে দিতে পারব ?”

“আরে বোকা ! তোমরা প্রভুপাদকে বুঝতে পারছ না !”

“তবে তিনি কি বলেছেন ?”

“তিনি যখন তোমাদের হরিনাম দীক্ষা দেবেন, তাঁর এক সেবক আছে, সে তোমাদের একটা ফটো (আলোকচিত্র) দেবে । সেই ফটোটা ঠাকুরের সিংহাসনে রেখে প্রত্যেক দিন তাঁর চরণে ফুল দিতে হবে, একটা থালা কিনে গঙ্গাজল তুলসী দিয়ে প্রভুপাদের জন্য ভোগ লাগাতে হবে । আর তাঁর প্রসাদ তোমরা পাবে । তোমরা ভাবছো কি প্রভুপাদ তোমাদের বাড়ি গিয়ে বসে থাকবেন ? প্রভুপাদের বিগ্রহ (ফটো) রাখা মানে প্রভুপাদকে রাখা । গুরুদেবকে তোমাদের বাড়ীতে রাখতে হবে—তাঁর জন্যই একটা ঘর রেখে প্রত্যেক দিন তাঁকে ভোগ লাগিয়ে প্রসাদ পাবে । সেইটা তোমাদের খাওয়া ।”

তখন তারা বুঝতে পারলেন, “এটা সত্যই হবে ! এটা তো কোন ব্যাপারই নয় । প্রভুপাদের আলোকচিত্র সিংহাসনে রাখব আর একটা নতুন থালা ও গ্লাস কিনে তুলসী পাতা দিয়ে তাঁকে জল ভোগ লাগাব আর তাঁর প্রসাদ পেতে হবে । এতো সব জানি, প্রভুপাদ পাঠেও বলেছেন । এইটা আমরা প্রথম বুঝতে পারিনি !”

“তখন তোমরা রাজি হয়ে যাও !” মহারাজ বললেন ।

তখন দুজন প্রভুপাদের কাছে গিয়ে বললেন, “প্রভুপাদ, আমরা রাজি ! আমাদের কোন সমস্যা নেই । আমরা আপনার কাছে দীক্ষা নেব ।”

এটা হচ্ছে প্র্যাকটিস (অনুশীলন) । আমরা যে কোন অবস্থায়ই থাকি না কেন, আমাদের প্রত্যেক দিন নিষ্ঠা সহকারে ঠাকুরের নিত্য-সেবা করতে হবে ।

প্রত্যেক দিন নিত্য-সেবা করতে হবে । প্রত্যেক দিন মঙ্গলারতিতে উঠতে হবে । স্নান করে ধোয়া কাপড়-চোপড় পরে ঠাকুরকে জাগাতে হবে । ঠাকুরের আরতি করে বাল্য-ভোগ দিতে হবে, তারপর অর্চ্চন করে ঠাকুরকে ভোগ লাগাতে হবে । সকালবেলা যদি কাজে বেরিয়ে যান, তাহলে অর্চ্চন করে যে রান্না হবে সে রান্না ভোগ লাগিয়ে প্রসাদ পেয়ে আবার টিফিন বক্সে সেই প্রসাদ নিয়ে কাজে বেরিয়ে যেতে পারেন । যারা কাজ করেন তাদের কোন অজুহাত করা চলবে না (লোক বলেন যে, “আমরা বাহিরে কাজ করছি, এত সব কি করে হবে ?”) । যদি ভগবানকে আপনার স্ত্রী ভালবাসে, সে যদি আপনার জন্য রান্না করতে পারে তবে ভগবানের জন্যও রান্না করতে পারবে । ভগবানের জন্য রান্না করে সেই প্রসাদ আপনাদের পেতে হবে । আবার সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে আসলেন, আবার সন্ধ্যা আরতি করে ঠাকুরকে রাতে ভোগ লাগিয়ে দিতে হবে । এইভাবে নিয়ম করতে হবে । বিকালেও একটু বৈকালের ভোগ দিতে হবে—একটু ফল-জল, যার যেরকম জোটে সেটা দিতে পারেন । কারও আপেল জোটে, কারও শসা জোটে, কারও পেয়ারা জোটে, কারও গাছের জাম জোটে, কারও গাছের বাতাবিলেবু জোটে—যার যেরকম জুটবে, সেটা ভোগ লাগাতে পারেন । ভগবানের জন্য যে পঁাচ বা দশ প্রকার ফল দিতে হবে, এমন নিয়ম-কানন নেই :

ভক্তের জিনিষ প্রভু লুটিপুটি খায় ।
অভক্তের জিনিষ প্রভু উলটি নাহি চায় ॥

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥