অনিবার্য টান—কার প্রতি ?

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
২২ মে ২০১৮

 

হরিকীর্ত্তন কে করতে পারে ?

দৈন্য, দয়া, অন্যে মান, প্রতিষ্ঠা বর্জ্জন ।
চারিগুণে গুণী হই করহ কীর্ত্তন ॥

(শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

যে দৈন্যে-দয়া করতে পারবে, অন্যে মান দিতে পারবে, অন্যে সম্মান দিতে পারবে আর প্রতিষ্ঠা (নাম ও যশ) বর্জ্জন করতে পারবে । সেই হবে একমাত্র কৃষ্ণনামের অধিকারী ।

সেইভাবে, বিষয়ের প্রতি অনাসক্ত হয়ে কৃষ্ণের ভজন করতে হবে ।

আসক্তিরহিত সম্বন্ধসহিত ।
বিষয়সমূহ সকলি মাধব ॥

(“বৈষ্ণব কে ?” শ্রীলভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর)

আসক্তি থাকবে না কিন্তু সম্বন্ধ থাকবে—বিষয়সমূহ সকলি মাধব । আপনাদের বিষয়ের প্রতি আসক্তি থাকবে না, কিন্তু সম্বন্ধ থাকবে । আপনাদের ভাবতে হবে ওইরকম : যে বাড়িতে আপনি থাকেন, সে বাড়িটা আপনার নয়, ঘরটা আপনার নয় কিন্তু আপনি পাহাড়া দিচ্ছেন—সেই সম্বন্ধেই আপনি ওখানে থাকবেন । যেহেতু ভগবানের সম্পত্তি পাহাড়ার দরকার আছে সেহেতু আপনি ওখানে বাস করেন । এইরকম ভাবে আপনার নিজের বাড়িটা দেখবেন ।

বিষয়ে যে প্রীতি এবে আছয়ে আমার ।
সেই মত প্রীতি হউক চরণে তোমার ॥

(শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

কাম আছে কৃষ্ণ-কর্ম্মার্পণে, কৃষ্ণের জন্য : যা কিছু করবেন সেটা কৃষ্ণের সেবার জন্য করবেন । রান্না করছেন ভগবানের জন্য, ব্যবসা করছেন ভগবানের জন্য, চাকরি করছেন ভগবানের জন্য, যে সব কিছু করছেন সেটা ভগবানের জন্য । এইরকম বুদ্ধিটা যাঁর আসবে, তিনি হবে কৃষ্ণভক্ত । কৃষ্ণভক্ত না হলে কৃষ্ণভক্তের সেবা করা যায় না । আগে কৃষ্ণভক্ত হতে হয়, তবে কৃষ্ণভক্তের সেবা করা যায় ।

আসলে বিষয় ছাড়া খুব দুষ্কর । আমরা চাই যে বিষয় ছেড়ে দেব, কিন্তু গৃহের আসক্তি ছাড়তে পারছি না, স্ত্রীর আসক্তি ছাড়তে পারছি না, পুত্রেতে আসক্তি ছাড়তে পারছি না । কোনটার আসক্তি ছাড়তে পারছি আমরা ।

দুই সাধু হরিদ্বারে গিয়ে গঙ্গার ধারে বসে ছিলেন । ওখানে গঙ্গার তো জল কম (পাথরগুলো দেখা যায়) কিন্তু স্রোত খুব বেশি । এবং দেখতে পেলেন যে, জলে একটা কালো মত জিনিস ভেসে যাচ্ছিল । এক সাধু এক সাধুকে বলছেন, “হে দেখ, এটা কি কম্বল চলে যাচ্ছে ? কম্বলটাকে তুলে নিয়ে আসতে পারলে তো আমরা দিনের বেলা শুকিয়ে দেব আর রাত্রে গায়ে দিতে পারি ।” “হ্যাঁ, ঠিক বলছ, আমি এটাকে নিয়ে আসব ।”

তখন তার মধ্যে একজন সাধু জলে নেমে পড়ল । কিন্তু ওটা তো কম্বল ছিল না—ওটা ছিল কালো ভল্লুক ! সেই ভল্লুকটা ওই লোকটাকে চেপে ধরল । ভল্লুকটাও বাঁচতে চাইল—সে ভাসছিল কিন্তু স্রোতার টানে সে উঠতে পারছিল না । আপনি যখন গঙ্গায় ডুবে যান আর সাঁতরাতে পারেন না, সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিছু খড় পেলে তাকে ধরার চেষ্টা করবেন, তাই না ? তখন সেই ভাল্লুকটাও মানুষটাকে পেল আর তাকে চেপে ধরল । ভাল্লুকটার শক্তি মানুষের চাইতে বেশি, তাই সাধুটা উঠতে পারছিলেন না । যে সাধুটা উপরে ডাঙায় ছিলেন অপর সাধুর অবস্থা দেখে বললেন, “আরে, তুমি কম্বলটা ছেড়ে দাও !” কথা শুনে সাধুটা উত্তরে বললেন, “আমি তো কম্বল আগেই ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু কম্বলটা আমাকে ছাড়ছে না !”

আমরাও বিষয় ছাড়তে চাইছি কিন্তু বিষয় আমাদের ছাড়ছে না ।

বিষয়ে যে প্রীতি এবে আছয়ে আমার ।
সেই মত প্রীতি হউক চরণে তোমার ॥

(শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

কখন ভক্তি হবে বুঝব কি করে ? আমার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, পুত্র, কন্যার প্রতি যে টানটা থাকবে, সেই টানটা ভগবানের প্রতি থাকতে হবে । “আমি ভগবানকে সেবা করতে পারলাম না !”—এইরকম টানটা থাকতে হবে, তখন এইরকম প্রীতিটা পাওয়া যাবে । তখন বুঝবেন যে, আপনার ভক্তি হয়েছে ।

স্কুলে দশ বছর পড়ে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায় । কীরকম দশ বছর ধরে পড়েছেন পরীক্ষায় দেখা হয় । আর সাধুর পরীক্ষা কীরকম ? আমার আজেবাজে কথা শুনতে ভাল লাগছে না আমার গল্প করতে ভাল লাগছে না আমার টিভি সিরিয়েল দেখতে ভাল লাগছে না আমার এই হরিকথা, ভগবতকথা শুনতে ভাল লাগছে ? কোনটা ভাল লাগছে আপনাদের ? যদি আপনাদের হরিকথা শুনতে ভাল লাগছে তখন আপনারা বুঝতে পারবেন যে আপনাদের কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি আর কৃষ্ণের প্রতি রতি-মতি আসছে । যদি রতি-মতি আসবে না তাহলে কিছু হবে না । সেইজন্য, কৃষ্ণের চরণে সমর্পণ করতে হবে । এইটা আপনাদের সব সময় মনে রাখতে হবে ।

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥