বড় আশার বাধা

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
২২ মে ২০১৮

 

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্ ।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রীগুরুং দীনতারণম্ ॥

“বোবা লোকও বাচাল হতে পারে, পঙ্গুলোকও পাহাড় উলঙ্ঘন করতে পারে যদি শ্রীগুরুপাদপদ্মের কৃপা হয় ।” সর্ব্বাগ্রে মদীয় গুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজের রাতুলচরণে ষাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ পূর্ব্বক সেবামুখে তাঁহার অহৈতুকী কৃপা প্রার্থনা ভিক্ষা করছি । তৎপর গুরুবর্গ, গুরুভ্রাতৃমণ্ডলী, শ্রোত্রীমণ্ডলী, মাতৃমণ্ডলী, ভক্তমণ্ডলী আপনাদের শ্রীচরণে অধমের দণ্ডবৎ প্রণতি জ্ঞাপন করছি যে এই অধমকে কৃপা করবেন ।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীলভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ একটা কথা বলেছেন, সেই কথাটা সব সময় মনে রাখতে হবে । সেটা আমাদের গুরুমহারাজও বলেছিলেন, শ্রীলশ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজও বলেছিলেন । তিনি বললেন, “বৈষ্ণব হইতে মনে ছিল বড় আশা, কিন্তু ‘তৃণাদপি সুনীচেন’ শ্লোকে পড়িলেন বাধা ।” কথাটার অর্থ বুঝতে পারছেন কেউ ? বৈষ্ণব হতে আমার দীর্ঘ দিন ধরে আশা ছিল কিন্তু একটা শ্লোক আছে (‘তৃণাদপি সুনীচেন’ শ্লোক), সেইটাতেই বাধা পড়ে গেলাম । বৈষ্ণব হওয়ার আগে তৃণাদপি সুনীচ হতে হবে । যদি আপনারা নিজেকে কখনও বৈষ্ণব বলেন তাহলে বৈষ্ণব হওয়া যায় না ।

‘আমি ত’ বৈষ্ণব’, এ বুদ্ধি হইলে
অমানী না হ’ব আমি ।

(কল্যাণকল্পতরু, শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

কথাগুলো মন দিয়ে শুনবেন । এগুলো খুব গভীরের কথা, অত্যন্ত আশ্চর্য কথা । এই কথাগুলো কোথাও বইতে লেখা নেই, এগুলা গুরুপাদপদ্ম-গুরুবর্গের মুখ থেকে শ্রবণ করা হয় ।

“বৈষ্ণব হইতে মনে ছিল বড় আশা, কিন্তু ‘তৃণাদপি সুনীচেন’ শ্লোকে পড়িলেন বাধা ।” তৃণের মত নিচু হতে হবে, তরুর মত সহ্য করতে হবে, অপরকে সম্মান করতে হবে । প্রত্যেক দিন আমরা সকাল-সন্ধ্যা যখন পরিক্রমা করি তখনই প্রত্যেক সকাল-সন্ধ্যা একটা কীর্ত্তন আমরা করি—“সকলে সম্মান করিতে শকতি দেহ নাথ যথাযথ ।” সকলকে সম্মান করতে হবে । হে গুরুদেব, তুমি এই শক্তি আমাকে দাও, এই বুদ্ধি আমাকে দাও যেন আমি নিজেকে একেবারে নিচু অধম মনে করে সবাইকে সম্মান করতে পারি ।

শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু জগাই মধাইকে উদ্ধার করেছেন । আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন সেবা থেকে বঞ্চিত—তারা জগাই মাধাইয়ের চাইতে অধম । “জগাই মাধাই হৈতে মুঞি সে পাপিষ্ঠ, পুরীষের কীট হৈতে মুঞি সে লঘিষ্ঠ !” এটা কে বলেছেন ? শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী । “পুরীষের কীট হৈতে মুঞি সে লঘিষ্ঠ” মানে “পায়খানার পোকার চাইতে আমি নিচু” । কত তিনি নিজেকে হেয় মনে করছেন, কত নিজেকে হীন মনে করছেন !

মন দিয়ে শুনুন, এগুলো কখনও শুনেন নি । আপনারা জীবনে অনেক কথা শুনেছেন কিন্তু বৈষ্ণব হতে কী কী গুণটা দরকার, এসব কথাগুলো তো কেউ বলিবেন না । কতবার আমি ওইটা বলে দিচ্ছি :

“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে ।
গোরার আচার, গোরার বিচার লইলে ফল ফলে ॥

লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি ।
গোপনেতে অত্যাচার গোরা ধরে চুরি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবীবর্ত্ত, ৮/৬-৭)

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥