আনুগত্যময়ী ভজন

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
উলুবেড়িয়া, ১৮ জানুয়ারি ২০২০, দ্বতীয় অংশ

 

অসৎ-সঙ্গ সদা ত্যাগ, ছাড় অন্য গীত-রাগ,
কর্ম্মী জ্ঞানী পরিহরি দূরে ।

(শ্রীলনরোত্তম দাস ঠাকুর—শ্রীপ্রেমভক্তি-চিন্দ্রিক, ১৫)

‘গীতরাগ’ মানে কী ? রেগে যাওয়া নয় । যারা কীর্ত্তনে অন্য রকম সংগীত, রাগ-রাগিনী করেন, সে সব হচ্ছে ‘রাগ’ । আপনারা বাড়িতে অষ্টপ্রহর কীর্ত্তন করেন, বাড়িতে ভারা কীত্তন দেন, বাড়িতে সাধু-সঙ্গ করেন, পালা দেন, ঘণ্টা বাজান, পূজা করেন, অনেক কিছু করেন, আর ভাবেন যে, সব হয়ে গিয়েছে । সন্ধ্যা হলে ঘণ্টা বাজান, একটু শঙ্খে ফুঁ মারেন, ফুলটুল দেন, ধূপ দেন, বলে আমাদের হরিভজন হয়ে গিয়েছে । হতে হয় না, হতে পারেও না । সৎগুরুর চরণে যতক্ষণ পর্যন্ত আশ্রয় গ্রহণ না করব, তিনি আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সঠিক দৃষ্টি না দেখালেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি নিজের মনের খেয়াল খুশিমত ভজন করার অভিনয় করব, কিন্তু সেটাকে সত্যিকারের ভজন বলে না । গুরু-বৈষ্ণবের আনুগত্যে, গুরু-বৈষ্ণবের সেবা করতে হবে ।

আমি এখানে এসেছি এই বাৎসরিক উৎসবে শুধু নয়—আমি এসেছি আনপাদেরকে শ্রীনবদ্বীপ ধাম পরিক্রমা করাতে । শ্রীনবদ্বীপ ধাম পরিক্রমায় প্রত্যেক বছর আপনাদের যাওয়া উচিত । যারা সবে-মাত্র এই পথে এসেছেন, যারা কিছু জানেন না, বুঝেন না, কিছু করতে পারেন না, যারা নতুন ভজনের পক্ষে, তাদের শ্রীনবদ্বীপ ধাম পরিক্রমা প্রতি বছর দরকার । যারা একটু যদি ভজনে এগিয়ে যান, তাদের জন্য শ্রীপুরুষোত্তম ক্ষেত্র পরিক্রমা, আর যদি ভজনের উন্নতি আরো হয়, তখন তাদের জন্য শ্রীব্রজমণ্ডল পরিক্রমা । এটা মনে রাখবেন । প্রতি বছর আমরা ৪-৫ দিন ধরে শ্রীনবদ্বীপ ধাম পরিক্রমা করি (আমলকী একাদশী থেকে পরিক্রমা শুরু করি, কোন বছর দশমী বা নবমী থেকেও শুরু করি) । আসলাম, এক দিন শুধু নাচলে গাইলে, সাত দিন ধরে থাকলাম, এখানে একদিন কীর্ত্তন করলাম, একটু প্রসাদ পেলাম—সেটা প্রাণহীন করলে ঠিক মত ভজন হবে না । প্রসাদ পাওয়াটাও ভজন । কিন্তু প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলছেন যে, প্রসাদ পাওয়ার সময় যদি বুঝি যে, “বেগুন ভাজা আমার পাতে দিল না, ওর পাতে দিল !”—তাহলে কিন্তু প্রসাদ পাওয়া হল না, ওই বেগুন ভাজা খাওয়া হল । এটা সব সময় মনে রাখতে হবে । যদি প্রসাদ পাওয়ার সময় কেউ বলছে, “ছানাগুলো বেশী বেশী আমাকে দেবেন”—তাহলে ছানা-পনির খাওয়া হল, প্রসাদ পাওয়া হল না । আর প্রসাদ যে পরিবেশন করেন, তাকেও দেখে করতে হবে—কার সঙ্গে আমার ঝগড়া, তাকে দেব না, যাকে আমার পছন্দ নয়, তাকে ভাল করে খেতে দেব না—এটা কিন্তু হবে না ! ভগবৎপ্রসাদ পরিবেশন করতে ঠিক মত দরকার ।

কি করে আমাদের সেবা করতে হবে ? আনেকে বলে, “আমার এই সেবা ভাল লাগে না, ওই সেবা করব”—এটা সেবা হবে না, এটা কর্ম্ম হয়ে যাবে । গুরুদেব যেটা বলেন, কায়-মন-বাক্যে একবারে গুরুদেবের কথা স্মরণ করে সেই সেবাটা করে নিতে হবে । আমার এটা ভাল লাগে না বা লাগে, সেটা কোন ব্যাপার নয় । আবার অনেকে বলেন, “আমি অনেক দিন অনেক পাঠ করেছি, অনেক হরিকথা বলেছি, অনেক কিছু করেছি, কিন্তু গুরুদেব আমাকে সন্ন্যাস দিচ্ছেন না ! গুরুদেব আমাকে মঠের দায়িত্ব দিচ্ছেন না ! আমার একটু টাকা-পয়সা ইচ্ছামত খরচ ভাল লাগে, কিন্তু গুরুদেব আমাকে মঠ রক্ষক করছেন না, গুরুদেব আমাকে এই সেবা দিচ্ছেন না ।” অনেকে এই সব চিন্তা করেন । কারও ভিক্ষা করতে ভাল লাগে না, কারও এই সেবা ভাল লাগে না, ওই সেবা ভাল লাগে না—এটাকে ভজন বলে না । মনের খেয়াল খুশিমত ভজন হয় না । গুরু-বৈষ্ণবগণ যে আদেশ করেন, সেই আদেশ মাথা পেতে নিয়ে যদি হরিভজন করতে পারি, সেইটাই ভজন হবে ।

মনে রাখবেন—যথা বৈষ্ণব তথা তীর্থ, আর যেখানে হরিকথা হয়, সেইটাই গোলোক বৃন্দাবন । এখানে ভগবানের কথা হচ্ছে, ভগবানের কীর্ত্তন হচ্ছে, ভগবানের রান্না হচ্ছে, ভগবানের ভোগ লাগবে, সেইটাই তীর্থস্থান, সেইটাই বৃন্দাবন । আপনারা এটাই কীর্ত্তনে করেন প্রতি একাদশী দিন : “যে দিন গৃহে ভজন দেখি, গৃহেতে গোলোক ভায় ।” (শ্রীলভক্তিবিনোদ ঠাকুর, শরণাগতি)

 


 

 

← গ্রন্থাগারে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥