সেবার প্রতি টান

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
উলুবেড়িয়া, ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ৪র্থ অংশ

 

তদ্­বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ॥

“তুমি তত্ত্বদর্শী গুরুকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত, সঙ্গত প্রশ্ন ও অকৃত্রিম সেবা করতঃ সন্তুষ্ট করিয়া পূর্ব্বোক্ত সেই জ্ঞানের কথা জানিতে পারিবে । শাস্ত্রজ্ঞানে সুনিপুণ ও পরব্রহ্ম বিষয়ে সাক্ষাৎ অনুভূতি সম্পন্ন মহাপুরুষগণ তোমাকে তত্ত্বজ্ঞান উপদেশ করিবেন ।”

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা)

তদ্­বিদ্ধি মানে শরণাগত । প্রণিপাত মানে সৎজিজ্ঞাসা : কে আমি ? কেনে আমায় জারে তাপত্রয় ? কেমনে হিত হয় ? সাধ্য বাস্তু কী ? সাধ্য বস্তু কি করলে পাওয়া যায় ? আর সেবয়া মানে সেবা-প্রবৃত্তি । আমরা এসেছি এই যুগে কিসের জন্য ? এই হাত দিয়ে ভগবানের সেবা করতে হবে, পা দিয়ে ধাম পরিক্রমা করতে হবে, চোখ দিয়ে বিগ্রহ দর্শন করতে হবে, কাণ দিয়ে ভগবানের কথা শুনতে হবে । সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলাকে ভগবানের সেবায়, গুরু-বৈষ্ণবের সেবায় নিযুক্ত করতে হবে । তা হা হলে কিছু হবে না । অনেক চেষ্টা করতে হবে, অনেক অভ্যাস করতে হয়, আমরাও বলি, “practice makes perfect—গাইতে গাইতে গায়, বাজাতে বাজাতে বায় ।” practise (অনুশীলন) করতে হবে ।

হঠাৎ করে যদি আপনাকে আজকে বলি যে, সকাল বেলা মঙ্গলারতিতে উঠতে হবে, উঠতে পারবেন না । সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে অভ্যাস করতে হবে : ভোর ৪টা সময় উঠবেন, স্নান করে ঠাকুরের মঙ্গল আরতি করবেন, তারপর ৫টা-৬টা কীর্ত্তন করবেন, তারপর রান্না করে ভোগ লাগিয়ে স্বামীকে প্রসাদ দিয়ে, ওকে কাজে পাঠিয়ে দেবেন । যেন ও বাহিরের খাবার না খায়, প্রসাদ টিফিনে নিয়ে দিতে হবে । ভক্তের মধ্যে মায়েরা এটা সব করেন আবার বিকালে এসে স্বামীকে চা-দোকানে বসতে বারণ করেন ।

চা দোকানে যাবেন না, প্রকৃতির কথা শুনতে যাবেন না । আপনাকে কি কেউ যেতে চাপিয়ে দেয়, বলুন ? না গেলে কেউ আপনাকে কিছু করবে ? কিছু করবে না । আমাদের এই সব প্রাকৃত জিনিস দরকার নেই । এক দিন একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহারাজ, আপনি কি ভোটে যাবে না ?” আমি বললেন, “না, যাব না ।” “কেন রে ?” আমি বললাম, “মহাপ্রভু কি ভোটে দাঁড়িছিলেন ? মহাপ্রভু ত ভোটে দাঁড়েন নি, তাহলে আমি কাকে ভোট দেব, বাবা ?” আমাদের এইরকম একত্র চিত্ত শরণাগত হতে হবে ।

আর একটা কথা মনে রাখবেন :

'আমি ত' বৈষ্ণব', এ বুদ্ধি হইলে
অমানী না হ'ব আমি ।

(শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

আমি যদি মনে করি যে, আমি বৈষ্ণব হয়ে গিয়েছি, তাহলে আমি অপরকে সম্মান করতে পারব না । “আমি বৈষ্ণব হয়ে গিয়েছি,” “আমি senior (বরিষ্ঠ),” “ও junior (কনিষ্ঠ)”—এসব এখানে চলে না । ওই সব অফিসে চলে, এখানে seniority (প্রবীনত্ব) সেবার দ্বারা হচ্ছে ।ভগবানের সেবা যে যত করে, সে তত সেবার ফলে অধিক সেবা লাভ করবে । যে সেবা বেশী করবে, সে ভগবানের সেবা আর বেশী পাবে । আর যে সেবা থেকে দূরে থাকে, যে সেবা করতে ভয় পায়, তার কাছ থেকে সেবা আস্তে আস্তে পালিয়ে যায় । গুরু মহারাজও বলতেন, যে ফুটবল খেলে, তার পায়ে ফুট-বল চলে আসে, আর যে ফুটবল থেকে পালিয়ে ঘরের মধ্যে দরজা দেয়, ফুট-বল তার কাছে যাবে না । তাই, সেবা য়াঁরা করেন, তাঁদের সেবার ফলে কি promotion (উন্নতি) হয়? কি ফল পাওয়া যাবে ? আর বেশী সেবা করে পাবেন ।

উমুক করছে না, ও করছে না, এ করছে না, এ সব অভিযোগ দেওয়ার দরকার নেই—সে করছে না করছে, আমিই করব । একরম ভাবটা আসতে হবে । তা না হলে এই সব অভিযোগ ভগবান পছন্দ করেন না, শ্রীল প্রভুপাদ কখনও পছন্দ করেন না । কিসের জন্য অভিযোগ করবেন ? ভগবানের সেবায় যদি বিঘ্ন হয়, অভিযোগ করি না, আর যদি নিজের খাওয়া-দাওয়া হয় নি, তখন অভিযোগ করছি—কেউ আমাকে দুধ কমিয়ে দিলেন, প্রসাদ না পেলাম, তাই অভিযোগ করি । নিজের ভোগের জন্য আমরা অভিযোগ করব কেন ? কোন অভিযোগ নেই ! এটা সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে । এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ।

আপনারা খুব ভাগ্যবান যে, এখানে উলুবেড়িয়ায়, গঙ্গার পাশে এই সুন্দর মন্দির হয়েছে । আপনারা আসবেন, পঠকীর্ত্তন শুনবেন, হরিকীর্ত্তন করবেন, হরিকথা শুনবেন । অনেকে বলে, “অনেক দূরে ত মঠ, ওখানে যাব কি করে ? আমার বাড়িতে ঠাকুর আছে ত, আমি ওখানে একটু সেবা দিয়ে দিই ।” সে এক কথা নয় ! সেটা হচ্ছে প্রাদেশিক কথা আর প্রভুপাদ বলছেন সেটা খুব খারাপ । ধরো, যে নবদ্বীপ মঠে manager (পরিচালক), সে উলুবেড়িয়া থেকে এসেছিলেন—উলুবেড়িয়া থেকে কেউ এলে তাকে ভালো ঘর দেবেন আর হুগলী লোক এসে তাকে পারবেন না, ভালো ঘর দেবেন না । সেটা হচ্ছে প্রাদেশিক কথা । সেটা একদম ছেড়ে দিতে হবে । সর্ব্বটা সমভাবে দেখতে হবে । এরকম প্রীতি আসতে হবে । এরকম প্রীতি না হলে, হবে না । প্রীতি যদি না এসে, ভগবানের সেবার প্রতি টান, আসক্তি না এসে, তখন আসল ভক্তি হতে পারে না । যে আসল ভক্ত, সে অনুতাপ করেন, “আমি ভগবানের সেবা করতে পারলাম না !” এইরকম ভাবটা আসতে হবে । তবু সেই প্রীতিটা খুব কম ।

 


 

 

← গ্রন্থাগারে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥