আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি প্রণামী ENGLISH
 

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


—: শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য :—

ত্রয়োদশ অধ্যায় : শ্রীবিদ্যানগর ও শ্রীজহ্ণুদ্বীপ বর্ণন

(শ্রীশ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর রচিত)

 

জয় গৌর নিত্যানন্দাদ্বৈত গদাধর ।
শ্রীবাস শ্রীনবদ্বীপ কীর্ত্তন সাগর ॥
শ্রীবিদ্যানগরে আসি নিত্যানন্দরায় ।
বিদ্যানগরের তত্ত্ব শ্রীজীবে শিখায় ॥
নিত্যধাম নবদ্বীপ প্রলয় সময়ে ।
অষ্টদল পদ্মরূপে থাকে শুদ্ধ হয়ে ॥
সর্ব্ব অবতার আর ধন্যজীব যত ।
কমলের একদেশে থাকে কত শত ॥
ঋতুদ্বীপ অন্তর্গত এ বিদ্যানগরে ।
মৎস্যরূপী ভগবান সর্ব্ববেদ ধরে ॥
সর্ব্ব বিদ্যা থাকে বেদ আশ্রয় করিয়া ।
শ্রীবিদ্যানগর নাম এই স্থানে দিয়া ॥
পুন যবে সৃষ্টি মুখে ব্রহ্মা মহাশয় ।
অতি ভীত হন দেখি সকল প্রলয় ॥
সেই কালে প্রভু কৃপা হয় তাঁর প্রতি ।
এই স্থানে পেয়ে ভগবানে করে স্তুতি ॥
মুখ খুলিবার কালে দেবী সরস্বতী ।
ব্রহ্ম জিহ্বা হৈতে জন্মে অতি রূপবতী ॥
সরস্বতী শক্তি পেয়ে দেব চতুর্ম্মুখ ।
শ্রীকৃষ্ণে করেন স্তব পেয়ে বড় সুখ ॥
সৃষ্টি যবে হয় মায়া সর্ব্বদিক ঘেরি ।
বিরজার পারে থাকে গুণত্রয় ধরি ॥
মায়া প্রকাশিত বিশ্বে বিদ্যার প্রকাশ ।
করে ঋষিগণ তবে করিয়া প্রয়াস ॥
এইত সারদা পীঠ করিয়া আশ্রয় ।
ঋষিগণ করে অবিদ্যার পরাজয় ॥
চৌষট্টী বিদ্যার পাঠ লয়ে ঋষিগণ ।
ধরাতলে স্থানে স্থানে করে বিজ্ঞাপন ॥
যে যে ঋষি যে যে বিদ্যা করে অধ্যয়ন ।
এই পীঠে সে সবার স্থান অনুক্ষণ ॥
শ্রীবাল্মিকী কাব্যরস এই স্থানে পায় ।
নারদ কৃপায় তেঁহ আইল হেথায় ॥
ধন্বন্তরী আসি হেথা আয়ুর্ব্বেদ পায় ।
বিশ্বামিত্র আদি ধনুর্ব্বিদ্যা শিখি যায় ॥
শৌনকাদি ঋষিগণ পড়ে বেদ মন্ত্র ।
দেবদেব মহাদেব আলোচয় তন্ত্র ॥
ব্রহ্মা চারিমুখ হৈতেবেদ চতুষ্টয় ।
ঋষিগণ প্রার্থনায় করিল উদয় ॥
কপিল রচিল সাঙ্খ্য এই স্থানে বসি ।
ন্যায় তর্ক প্রকাশিল শ্রীগৌতম ঋষি ॥
বৈশেষিক প্রকাশিল কণভুক্ মুনি ।
পাতঞ্জলি যোগশাস্ত্র প্রকাশে আপনি ॥
জৈমিনি মীমাংসা শাস্ত্র করিল প্রকাশ ।
পুরাণাদি প্রকাশিল ঋষি বেদব্যাস ॥
পঞ্চরাত্র নারদাদি ঋষি পঞ্চজন ।
প্রকাশিয়া জীবগণে শিখায় সাধন ॥
এই উপবনে সর্ব্ব উপনিষদগণ ।
বহুকাল শ্রীগৌরাঙ্গ করে আরাধন ॥
অলক্ষ্যে শ্রীগৌরহরি সে সবে কহিল ।
নিরাকার বুদ্ধিতব হৃদয় দূষিল ॥
তুমি সবে শ্রুতিরূপে মোরে না পাইবে ।
আমার পার্ষদ রূপে যবে জন্ম লবে ॥
প্রকট লীলায় তবে দেখিবে আমায় ।
মমগুণ কীর্ত্তন করিবে উভরায় ॥
তাহা শুনি শ্রুতিগণ নিস্তব্ধ হইয়া ।
গোপনে আছিল হেথা কাল অপেক্ষিয়া ॥
এই ধন্য কলিযুগ সর্ব্বযুগ সার ।
যাহাতে হইল শ্রীগৌরাঙ্গ অবতার ॥
বিদ্যালীলা করিবেন গৌরাঙ্গ সুন্দর ।
গণ সহ বৃহস্পতি জন্মে অতঃপর ॥
বাসুদেব সার্ব্বভৌম সেই বৃহস্পতি ।
গৌরাঙ্গে তুষিতে যত্ন করিলেন অতি ॥
প্রভু মোর নবদ্বীপে শ্রীবিদ্যাবিলাস ।
করিবেন জানি মনে হইয়া উদাস ॥
ইন্দ্রসভা পরিহরি নিজগণ লয়ে ।
জন্মিলেন স্থানে স্থানে আনন্দিত হয়ে ॥
এই বিদ্যানগরেতে করি বিদ্যালয় ।
বিদ্যা প্রচারিল সার্ব্বভৌম মহাশয় ॥
পাছে বিদ্যাজালে ডুবে হারাই গৌরাঙ্গ ।
এই মনে করি এক করিলেন রঙ্গ ॥
নিজ শিষ্যগণে রাখি নদীয়া নগরে ।
গৌর জন্ম পূর্ব্বে তেঁহ গেলা দেশান্তরে ॥
মনে ভাবে যদি আমি হই গৌর দাস ।
কৃপা করি মোরে প্রভু লইবেন পাশ ॥
এই বলি সার্ব্বভৌম যায় নীলাচল ।
মায়াবাদ শাস্ত্র তথা করিল প্রবল ॥
হেথা প্রভু গৌরচন্দ্র শ্রীবিদ্যাবিলাসে ।
সার্ব্বভৌম শিষ্যগণে জিনে পরিহাসে ॥
ন্যায় ফাঁকি করি প্রভু সকলে হারায় ।
কভু বিদ্যানগরেতে আইসে গৌররায় ॥
অধ্যাপকগণ আর পড়ুয়ারগণ ।
পরাজিত হয়ে সবে করে পলায়ন ॥
গৌরাঙ্গের বিদ্যালীলা অপূর্ব্ব কথন ।
অবিদ্যা ছাড়ায়ে তার যে করে শ্রবণ ॥
শুনি জীব প্রেমানন্দে সে বেদ নগরে ।
ব্যাসপীঠে গড়াগড়ি যায় প্রেমভরে ॥
নিত্যানন্দ শ্রীচরণে করে নিবেদন ।
আমার সংশয় ছেদ করহ এখন ॥
সাঙ্খ্য বিদ্যা তর্ক বিদ্যা অমঙ্গলময় ।
কেমনে এ নিত্যধামে সে সকল রয় ॥
শুনি প্রভু নিত্যানন্দ জীবে দেয় কোল ।
আদর করিয়া বলে হরি হরি বোল ॥
প্রভুর পবিত্র ধামে নাহি অমঙ্গল ।
তর্ক সাঙ্খ্য স্বতঃ নহে হেথায় প্রবল ॥
ভক্তির অধীন সব ভক্তি দাস্য করে ।
কর্ম্মদোষে দুষ্ট জনে বিপর্য্যয় ধরে ॥
ভক্তি মহাদেবী হেথা আর সব দাস ।
সকলে করয় ভক্তিদেবীর প্রকাশ ॥
নবদ্বীপে নববিধ ভক্তি অধিষ্ঠান ।
ভক্তিরে সেবয় সদা কর্ম্ম আর জ্ঞান ॥
বহির্ম্মুখ জনে শাস্ত্র দেয় দুষ্টমতি ।
শিষ্টজনে সেই শাস্ত্র দেয় কৃষ্ণরতি ॥
প্রৌঢ়ামায়া গৌরদাসী অধিষ্ঠাত্রী দেবী ।
সর্ব্বযুগে এই স্থানে থাকে গৌরসেবী ॥
অতি কর্ম্মদোষ যার বৈষ্ণবেতে দ্বেষ ।
তারে মায়া অন্ধ করি দেয় নানা ক্লেশ ॥
সর্ব্বপাপ সর্ব্বকর্ম্ম হেথা হয় ক্ষয় ।
প্রৌঢ়ামায়া বিদ্যারূপে করে কর্ম্ম লয় ॥
কিন্তু যদি শ্রীবৈষ্ণবে অপরাধ থাকে ।
তবে দূর করে তারে কর্ম্মের বিপাকে ॥
বিদ্যাপড়ি নদীয়ায় সে সব দুর্জ্জন ।
কভু নাহি পায় কৃষ্ণপদে প্রেম ধন ॥
বিদ্যার অবিদ্যা লাভ করে সেই সব ।
নাহি দেখে শ্রীগৌরাঙ্গ নদীয়া বৈভব ॥
অতএব বিদ্যা নহে অমঙ্গলময় ।
বিদ্যার অবিদ্যা ছায়া অমঙ্গল হয় ॥
এ সব স্ফুরিবে জীব গৌরাঙ্গ কৃপায় ।
লিখিবে আপন শাস্ত্রে প্রভুর ইচ্ছায় ॥
তোমা দ্বারা করিবেন শাস্ত্র পরকাশ ।
এবে চল যাই মোরা জহ্ণুর আবাস ॥
বলিতে বলিতে সবে জান্নগর যায় ।
জহ্ণু তপোবন শোভা দেখিবারে পায় ॥
নিত্যানন্দ বলে এই জহ্ণুদ্বীপ নাম ।
ভদ্রবন নামে খ্যাত মনোহর ধাম ॥
এই স্থানে জহ্ণুমুনি তপ আচরিল ।
সুবর্ণ প্রতিমা গৌর দর্শন করিল ॥
হেথা জহ্ণুমুনি বৈসে সন্ধ্যা করিবারে ।
ভাগীরথী বেগে কোশাকোশী পড়ে ধারে ॥
ধারে পড়ি কোশাকোশী ভাসিয়া চলিল ।
গণ্ডুষে গঙ্গার জল সব পান কৈল ॥
ভগীরথ মনে ভাবে কোথা গঙ্গা গেল ।
বিহ্বল হইয়া তবে ভাবিতে লাগিল ॥
জহ্ণুমুনি পান কৈল সব গঙ্গাজল ।
জানি ভগীরথ মনে হইল বিকল ॥
কতদিনে মুনিরে পূজিল মহাধীর ।
অঙ্গ বিদারিয়া গঙ্গা করিল বাহির ॥
সেই হৈতে জাহ্ণবী হইল নাম তাঁর ।
জাহ্ণবী বলিয়া ডাকে সকল সংসার ॥
কতদিন পরে হেথা গঙ্গারনন্দন ।
ভীষ্মদেব কৈল মাতামহ দরশন ॥
ভীষ্মরে আদর করে জহ্ণু মহাশয় ।
বহুদিন রাখে তারে আপন আলয় ॥
জহ্ণু স্থানে ভীষ্ম ধর্ম্ম শিখিল অপার ।
যুধিষ্ঠিরে শিক্ষা দিল সেই ধর্ম্ম সার ॥
নবদ্বীপে থাকি ভীষ্ম পাইল ভক্তিধন ।
বৈষ্ণব মধ্যেতে ভীষ্ম হইল গণন ॥
অতএব জহ্ণুদ্বীপ পরম পাবন ।
হেথা বাস করে সদা ভাগ্যবান জন ॥
সেইদিন জহ্ণুদ্বীপে নিত্যানন্দরায় ।
ভক্তগণ সহ রহে ভক্তের আলয় ॥
পরদিন প্রাতে প্রভু লয়ে ভক্তগণ ।
মোদদ্রুমদ্বীপে তবে করিল গমন ॥
জাহ্ণবা নিতাই পদ যাহার গরিমা ।
এ ভক্তিবিনোদ গায় নদীয়া মহিমা ॥

 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 


শ্রীনবদ্বীপধাম
মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


এইগ্রন্থশিরোমণি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্য এবং তাঁর শ্রীচরণের তৃপ্তির জন্য তাঁর অহৈতুক কৃপায় শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ হইতে প্রকাশিত হয় শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শুভার্বিভাব তিথিতে শ্রীগৌরাব্দ ৫৩৪, বঙ্গাব্দ ১৪২৬, খৃষ্টাব্দ মার্চ্চ ২০২০ ।


সূচীপত্র:

শ্রীগৌরধাম ও শ্রীভক্তিবিনোদ

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য
(১) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের সাধারণ মাহাত্ম্য কথন
(২) শ্রীশ্রীগৌড়মণ্ডল ও শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের বাহ্যস্বরূপ ও পরিমাণ
(৩) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমার সাধারণ বিধি
(৪) শ্রীজীবের আগমন ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁহাকে শ্রীনবদ্বীপতত্ত্ব বলেন
(৫) শ্রীমায়াপুর ও শ্রীঅন্তর্দ্বীপের কথা
(৬) শ্রীগঙ্গানগর, শ্রীপৃথুকুণ্ড, শ্রীসীমন্তদ্বীপ, শ্রীবিশ্রামস্থানাদি দর্শন
(৭) শ্রীসুবর্ণবিহার ও শ্রীদেবপল্লী বর্ণন
(৮) শ্রীহরিহরক্ষেত্র, শ্রীমহাবারাণসী ও শ্রীশ্রীগোদ্রুমদ্বীপ বর্ণন
(৯) শ্রীমধ্যদ্বীপ ও নৈমিষ বর্ণন
(১০) শ্রীব্রাহ্মণপুষ্কর, শ্রীউচ্চহট্টাদি দর্শন ও পরিক্রমা-ক্রম বর্ণন
(১১) শ্রীশ্রীকোলদ্বীপ, শ্রীসমুদ্রগড়, শ্রীচম্পাহট্ট ও শ্রীজয়দেব-কথা বর্ণনা
(১২) শ্রীশ্রীঋতুদ্বীপ ও শ্রীরাধাকুণ্ড বর্ণন
(১৩) শ্রীবিদ্যানগর ও শ্রীজহ্ণুদ্বীপ বর্ণন

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজনকুটির (স্বানন্দ-সুখদা-কুঞ্জ)
শ্রীনৃসিংহপল্লী
শ্রীকোলদ্বীপ


বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥