|
আরে মোর জীবন ধন, অনুপমের নন্দন,
শ্রীজীব গোঁসাই দয়াময় ।
অতি সুচরিত যাঁর, শুনি’ লাগে চমৎকার,
পরম পণ্ডিত মহাশয় ॥১॥
গৃহে থাকি অনুক্ষণ, কৃষ্ণকথা আলাপন,
তিলার্ধেক নাহি যায় বৃথা ।
অত্যন্ত উদার-চিত্ত, প্রমেতে সতত মত্ত,
ক্ষণেক না শুনে অন্য কথা ॥২॥
অল্পকালে হেন গুণ, ঐশ্বর্য্যে নাহিক মন,
সদা চিন্তে বৃন্দাবন যাইতে ।
কি কহিব অনুরাগ, করি’ গোঁসাই সর্ব্বত্যাগ,
যাত্রা কৈল মহা আনন্দেতে ॥৩॥
নিত্যানন্দ-প্রভু-স্থানে, শীঘ্র গেলা হর্ষ-মনে,
যাইয়া করিল দরশন ।
নেত্রে অশ্রুযুক্ত হৈয়া, ধরণীতে লোটাইয়া,
বন্দিলেন যুগল চরণ ॥৪॥
নিত্যানন্দ-প্রভু প্রীতে, নিজপদ তার মাথে,
ধরিলেন পরম আনন্দে ।
দুই ভুজ ধরি’ তোলে, শ্রীজীবে করিল কোলে,
রূপ সনাতনের সম্বন্ধে ॥৫॥
গোঁসাই আনন্দমন, দৈন্য করে পুনঃ পুনঃ,
আজ্ঞা দেহ যাই বৃন্দাবন ।
শুনি’ নিত্যানন্দ রায়, শ্রীজীবের পানে চায়,
প্রমজলে ভরিল নয়ন ॥৬॥
পুনঃ নিত্যানন্দ রাম, সোঙরি চৈতন্য-নাম,
কহে অতি মধুর বচন ।
তোমার বংশে সেই স্থান, দিয়াছেন এই শুন,
শীঘ্র তুমি যাহ বৃন্দাবন ॥৭॥
নিত্যানন্দের আজ্ঞা পাঞা, চলে মহাসুখী হঞা,
কি কহিব যৈছন গমন ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য বলি’, কভু ডাকে ভুজ তুলি,
কভু ডাকে রূপ সনাতন ॥৮॥
চিন্তে মনে অনুক্ষণ, কবে যাব বৃন্দাবন,
কবে রাধাগোবিন্দ দেখিব ।
সুললিত কৃষ্ণগুণ, কবে হ'বে দরশন,
নয়ন পরাণ জুড়াইব ॥৯॥
এই রূপে পথে চলে, ক'রে নাহি বলে,
ভক্ষ্য দ্রব্য মিলে অনায়াসে ।
অতি সুকুমার হয়, কভু দুঃখ না জানয়,
চলে মাত্র প্রমের আবেশে ॥১০॥
কতদিনে মথুরাতে, গেলেন আনন্দচিত্তে,
মধুপুরী করিল দর্শন ।
যমুনাতে স্নান করি’, বৃন্দাবন পানে হেরি’,
অবিরত ঝরয়ে নয়ন ॥১১॥
তথা হৈতে হর্ষমনে, প্রবেশিলা বৃন্দাবনে,
দু’-গোঁসাইর চরণ বন্দিল ।
দূরে গেল মনোদুঃখ, হইল পরম সুখ,
আর কত বন্দিতে নারিল ॥১২॥
রূপের আনন্দ হৈল, শ্রীজীবেরে কৃপা কৈল,
সনাতনের অনুমতি পেয়ে ।
রাধাকৃষ্ণ-তত্ত্বসুখে, সুখী করাইল তাকে,
সবে হর্ষ শ্রীজীব দেখিয়ে ॥১৩॥
শ্রীজীবের গুরুভক্তি, কহিতে নাহিক শক্তি,
অনুক্ষণ করয়ে সেবন ।
গোঁসাই যে আজ্ঞা করে, তাহা যত্নে করে শিরে,
অন্য না জানয়ে যার মন ॥১৪॥
নিত্যানন্দের আজ্ঞা লৈয়া, যৈছে আইলা সুখী হৈয়া,
তৈছে গোঁসাই আজ্ঞা-ফল পাইলা ।
সর্ব্বশাস্ত্রে বিচক্ষণ, নাহিক তাঁহার সম,
বহুগ্রন্থ বর্ণন করিল ॥১৫॥
গুণের নাহিক অন্ত, কি কহিব ভক্তিতত্ত্ব,
রাখিলেন সিদ্ধান্ত করিয়া ।
সনাতনের দয়া যত, তাহা বা কহিব কত,
শ্রীজীবের বৈরাগ্য দেখিয়া ॥১৬॥
বৃন্দাবনে সবে সুখী, দেখিয়া জুড়ায় আঁখি,
জীব-গোঁসাইর চরিত্র সুধীর ।
যেরূপে ভজন করে, তাহা কে কহিতে পারে,
সদা প্রমে পুলক শরীর ॥১৭॥
ব্রজপুরে এই মতে, রহয়ে উল্লাস-চিত্তে,
কে বুঝিবে তাঁহার আশয় ।
দু’-গোঁসাইর অদর্শনে, যে বিরহ ভেল মনে,
তাহা কহিবার যোগ্য নয় ॥১৮॥
ধরণীতে লোটাইয়া, কান্দয়ে আকুল হৈয়া,
ফুৎকার করয়ে অনুক্ষণ ।
‘হা চৈতন্য’ মোর প্রাণ, প্রভু নিত্যানন্দ রাম,
কোথা প্রভু রূপ-সনাতন ॥১৯॥
ধারা বহে দু’নয়নে, না চাহয়ে কার পানে,
চিত্তে অতি অস্থির হইলা ।
রাত্রে প্রভু রূপ আসি, স্বপ্ন দিল কাছে বসি,
তবে কিছু দুঃখ সম্বরিলা ॥২০॥
সেইদিন শ্রীনিবাস, আইল শ্রীজীবপাশ,
তাঁরে দেখি’ হর্ষ হৈল মন ।
নরোত্তম তা’র পরে, আসিয়া মিলিলা তাঁরে,
জীব-সঙ্গে সদাই দু’জন ॥২১॥
প্রমের স্বরূপ দোঁহে, দেখিয়া আনন্দে রহে,
ভক্তিগ্রন্থ পড়ায় সদায় ।
রাধাকৃষ্ণ-লীলা যত, সেই রসে মহামত্ত,
আর কিছু মনে নাহি ভায় ॥২২॥
সদা গোবিন্দের সেবা, পরিপাঢী জানে কেবা,
যৈছন পিরীতি নাহি সীমা ।
যদি হয় লক্ষ মুখ, তথাপি না হয় সুখ,
কি কহিব জীবের মহিমা ॥২৩॥
পতিত অধম জনে, করি’ কৃপা নিজগুণে,
যত্নে প্রমভক্তি করে দান ।
আর কি কহিব গুণ, শুনিয়া পাষণ্ডগণ,
অনায়াসে পায় পরিত্রাণ ॥২৪॥
নরহরি-দাসে কয়, তরাও হে মহাশয়,
পড়ি’ আছে ভবসিন্ধু মাঝে ।
এ পামরে করি’ দয়া, দেহ মোরে পদছায়া,
তবে সে দয়ালু নাম সাজে ॥২৫॥
|