![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের শিক্ষা-প্রণালী (ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীলভক্তিবনোদ ঠাকুর) শ্রীগৌড়ীয় দর্শন থেকে—১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৩০শে ভাদ্র, বঙ্গাব্দ ১৩৬২ (ইং ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৫৫)
শ্রীমন্মহাপ্রভুর শিক্ষাপ্রণালী জানিতে হইলে আমরা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আলোচনা করিতে বাধ্য হই । মহাপ্রভু স্বয়ং কোন গ্রন্থ রচনা করিয়া রাখেন নাই । শ্রীশিক্ষাষ্টকের আটটী শ্লোক ব্যতীত আর তাঁহার রচিত কোন গ্রন্থ পাওয়া যায় না । দুই একটি আরও শ্লোক পদ্যাবলী গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে বটে, কিন্তু সেই সকল শ্লোকে আমরা কোন আনুপূর্ব্বিক উপদেশ পাই না । এতদ্ব্যতীত আর এক আধখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থ কেহ কেহ প্রভুর রচিত বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন । আমরা অনেক বিচার করিয়া স্থির করিয়াছি যে, ঐ সকল গ্রন্থ আরোপিত মনে হয় । গোস্বামি-মহোদয়গণ অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তাহাতে মহাপ্রভুর শিক্ষা প্রচুররূপে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু মহাপ্রভুর নিজ রচনা বলিয়া তন্মধ্যে কিছুই লেখা হয় নাই । শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত—প্রামাণিক গ্রন্থ । তাহাতে প্রভুর চরিত্র ও উপদেশ যথেষ্ট পাওয়া যায় এবং ঐ সমস্ত উপদেশ গোস্বামি-মহোদয়দিগের বাক্যে সম্পূর্ণরূপে প্রমাপিত হইয়াছে । এতন্নিবন্ধন শ্রীচতিরামৃতের এত অধিক আদর সর্ব্বত্র লক্ষিত হয় । শ্রীকৃষ্ণদাস করিরাজ গোস্বামী মহাপ্রভুর অব্যবহিত পরেই উদিত হইয়া গ্রন্থ রচনা করেন । শ্রীমন্মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ শিষ্যবৃন্দ শ্রীদাস গোস্বামী শ্রীরূপ গোস্বামী প্রভৃতি অনেকেই কবিরাজ গোস্বামীকে চরিতামৃত রচনে সাহায্য করিয়াছিলেন । তৎপূর্ব্বে শ্রীকবিকর্ণপুর “শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয়-নাটক” এবং শ্রীবৃন্দাবনদাস ঠাকুর “শ্রীচৈতন্য-ভাগবত” লিপিবদ্ধ করিয়া কবিরাজ গোস্বামীকে অনেক বিষয়ে সহায়তা করিয়াছেন । সকল দিক বিচার পূর্ব্বক আমরা চরিতামৃতকে অবলম্বন করিতে বাধ্যে হইলাম । শ্রীমন্মহাপ্রভু যে চব্বিশ বৎসর গৃহস্থধর্ম্মে ছিলেন, তৎকালেও শ্রীবাস-অঙ্গনে, গঙ্গাতীরে, চতুষ্পাঠীতে এবং পথে পথে জীবসকলকে হরিনাম মাহাত্ম্য ও হরিসংকীর্ত্তনের কর্ত্তব্যতা প্রচার করিয়াছিলেন, পরে সন্ন্যাস অবলম্বনপূর্ব্বক শ্রীপুরুষোত্তমক্ষেত্রে শ্রীসার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য প্রভৃতিকে, বিদ্যানগরে শ্রীরায় রামানন্দকে, দক্ষিণদেশে বেঙ্কটভট্ট প্রভৃতিকে, প্রয়াগে শ্রীরূপ গোস্বামীকে এবং ভঙ্গীপূর্ব্বক শ্রীরঘুপতি উপাধ্যায়কে ও বল্লভভট্ট মহোদয়কে, বারাণসীতে শ্রীসনাতন গোস্বামী এবং শ্রীপ্রকাশানন্দ সন্ন্যাসী প্রভৃতিকে যে সকল উপদেশ দিয়াছিলেন তাহাতেই শ্রীমন্মহাপ্রভুর সমস্থ শিক্ষা যথাযথ লাভ করা যায় । ঐ সমস্ত শিক্ষা বিচারপূর্ব্বক আমরা প্রভুর শিক্ষাপ্রণালী সংগ্রহ করিতেছি । জগজ্জীবের প্রতি অপার দয়া প্রকাশপূর্ব্বক শ্রীমহাপ্রভু সমস্ত ভারতে বিশুদ্ধ বৈষ্ণবধর্ম্ম বা জীবধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন । কোনদেশে স্বয়ং গিয়া প্রচার কার্য্য করেন, কোন কোন দেশে প্রচারক পাঠাইয়া ঐ কার্য্য সম্পন্ন করেন । প্রচারকগণকে অসীম শক্তিসঞ্চারপূর্ব্বক দেশে দেশে পাঠাইয়াছিলেন । প্রেমসূত্রে মহাপ্রভুর প্রচারকগণ কার্য্য করিতেন । তাঁহারা কোন বেতন বা পুরস্কার আশা করেন নাই । বিশুদ্ধ চরিত্র প্রচারক ব্যতীত বিশুদ্ধধর্ম্মের প্রচার সম্ভব হয় না । এইজন্যই অন্যান্য ধর্ম্মে আজকাল বেতনগ্রাহী লোকেরা প্রচার করিতে থাকেন অথচ যথেষ্ট ফল হয় না । যথা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আদি লীলায় ৮ম পরিচ্ছেদে লিখিয়াছেন ;— “এই পঞ্চতত্ত্বরূপে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য । কৃষ্ণনাম প্রেম দিয়া বিশ্ব কৈল ধন্য ॥” “মথুরাতে পাঠাইল রূপ সনাতন । দুই সেনাপতি কৈল ভক্তিপ্রচারণ ॥ নিত্যানন্দ গোসাঁঞে পাঠাইলা গৌড়দেশে । তিঁহ ভক্তি প্রচারিল অশেষে বিশেষে ॥ আপনে দক্ষিণ দেশে করিল গমন । গ্রামে গ্রামে কৈল কৃষ্ণনাম প্রচারণ ॥ সেতুবন্ধ পর্য্যন্ত কৈল ভক্তির প্রচার । কৃষ্ণপ্রেম দিয়া কৈল সবার নিস্তার ॥” শ্রীমহাপ্রভুর শিক্ষার মূল এই যে, কৃষ্ণপ্রেমই জীবের নিত্যধর্ম্মধন । সেই ধর্ম্মধন হইতে জীব কখনই নিত্য বিচ্ছিন্ন হইতে পারে না । কিন্তু কৃষ্ণবিদ্মৃতিক্রমে মায়ামোহিত হইয়া অন্য বিষয়ে অনুরাগ হওয়ায় ক্রমশঃ সেই ধর্ম্ম গুপ্তপ্রায় হইয়া জীবাত্মার অন্তঃকোষে লুক্কায়িত হইয়াছে । তাহাতেই জীবের সংসার দুঃখ । পুনরায় সৌভাগ্য ঘটনাক্রমে জীব যদি “আমি নিত্য কৃষ্ণদাস”—এই কথাটী স্মরণ করেন, তবে উক্ত ধর্ম্ম পুনরুদিত হইয়া জীবের স্বাস্থ্য-বিধান অবশ্যই করিবে । এই সত্যের প্রতি বিশ্বাসই সকল মঙ্গলের মূল । বিশ্বাস দুই প্রকারে উদিত হয় অর্থাৎ কোন কোন লোকের সংসার ক্ষয়োন্মুখ হইলে বহু জন্মের সুকৃতিক্রমে স্বভাবসিদ্ধ বিশ্বাসের উদয় হয় । যথা চরিতামৃতে (মধ্যে ২৩শ অধ্যায় ৯ সংখ্যা)—“কোন ভাগ্যে কোন জীবের শ্রদ্ধা যদি হয় । তবে সেই জীব সাধু সঙ্গ করয় ॥” শ্রদ্ধার অন্য নাম বিশ্বাস, (চরিতামৃত মধ্য ২২শ অধ্যায় ৬২ সং)—“শ্রদ্ধা শব্দে বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয় । কৃষ্ণে ভক্তি কৈলে সর্ব্ব কর্ম্ম কৃত হয় ॥” কৃষ্ণভক্তি করিলে জীবের সমস্ত কর্ম্ম কৃত হইল, এই সুদৃঢ় নিশ্চয়ের নাম শ্রদ্ধা । সুকৃতিজনিত আত্মপ্রসন্নতাক্রমে আত্মার নিত্যধর্ম্ম হইতে স্বতঃসিদ্ধ শ্রদ্ধার উদয় হয় । উদিত-শ্রদ্ধ পুরুষ উপযুক্ত সাধুসঙ্গে ভজনপ্রণালী অবলম্বনপূর্ব্বক স্বীয় অনর্থ বিনাশ করিয়া ক্রমশঃ নিষ্ঠা, রুচি, আসক্তি ও ভাব পর্য্যন্ত উন্নতি লাভ করেন । স্বতঃসিদ্ধ শ্রদ্ধা প্রবলরূপে উদিত হইলে স্বয়ং রাগমার্গে বিচরণ করে । আর শাত্রযুক্তি বিধি ইত্যাদি অপেক্ষা না করিয়াই কৃষ্ণরতিরূপ ভাবপথে নির্ভয়ে আত্মোন্নতি সাধনে সমর্থ হয় । কিন্তু ঐ উদিত শ্রদ্ধা যদি কোমল অবস্থায় থাকে তখন সদ্গুরুর নিকট বিচার-সাহায্য লাভ করিয়া উন্নত হয় । শাস্ত্র ও গুরুবাক্যে বিশ্বাস-লক্ষণই যখন শ্রদ্ধার পরিচয় তখন সাধারণতঃ শাস্ত্রবিচার নিতান্ত প্রয়োজন । যথা প্রভুবাক্যে চরিতামৃত আদি সপ্তমে ;—“প্রভ কহে শুন শ্রীপাদ ইহার কারণ । গুরু মোরে মূর্খ দেখি করিল শাসন ॥ মূর্খ তুমি তোমার নাহি বেদান্তাধিকার । কৃষ্ণনাম জপ সদা এই মন্ত্র সার ॥ কৃষ্ণমন্ত্র হইতে হবে সংসার মোচন । কৃষ্ণ নাম হইতে পাবে কৃষ্ণের চরণ ॥ নাম বিনা কলিকালে নাহি আর ধর্ম্ম । সর্ব্বমন্ত্র সার নাম এই শাস্ত্রমর্ম্ম ॥ এত বলি এক শ্লোক শিখাইল মোরে । কণ্ঠে করি এই শ্লোক করহ বিচারে ॥ হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্ । কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥ এই আজ্ঞা পাইয়া নাম লই অনুক্ষণ । নাম লৈতে লৈতে মোর ভ্রান্ত হইল মন ॥ ধৈর্য্য ধরিতে নারি হইলাম উন্মত্ত । হাঁসি কাঁদি নাচি গাই যৈছে মদমত্ত ॥ তবে ধৈর্য্য ধরি মনে করিল বিচার । কৃষ্ণনামে জ্ঞানাচ্ছন্ন হইল আমার ॥ পাগল হইলাম আমি ধৈর্য্য নাহি মনে । এতচিন্তি’ নিবেদিলাম গুরুর চরণে ॥ কিবা মন্ত্র দিলা গোসাঁই কিবা তার বল । জপিতে জপিতে মন্ত্র করিল পাগল ॥ হাঁসায় নাচায় মোরে করায় ক্রন্দন । এত শুনি গুরু মোরে বলিলা বচন ॥ কৃষ্ণনাম মহামন্ত্রের এই ত স্বভাব । যেই জপে তার কৃষ্ণে উপজয়ে ভাব ॥ কৃষ্ণ বিষয়ক প্রেমা পরমপুরুষার্থ । যার আগে তৃণতুল্য চারি পুরুষার্থ ॥” এই প্রভু-বাক্যে আমরা একটী কথা সংগ্রহ করি । “কণ্ঠে করি এই শ্লোক করহ বিচার ।”—এই কথায় জানা গেল যে শাস্ত্র বিচার দ্বারা শ্রদ্ধা পুষ্ট হইয়া উন্নতি লাভ করে । প্রভুর মতে শাস্ত্র অর্থাৎ বেদশাস্ত্রই একমাত্র প্রমাণ । কেবল তর্কাদিশাস্ত্র কোন প্রমাণ নয় । যথা সন্ন্যাসী শিক্ষায় আদি সপ্তমে ১৩২ সংখ্যায়—“স্বতঃপ্রমাণ বেদ প্রমাণ শিরোমণি ।” পুনরায় মধ্য বিংশ অধ্যায়ে ১২২শ সংখ্যায় সনাতন গোস্বামী শিক্ষায় :—“মায়ামুগ্ধ জীবের নাহি কৃষ্ণস্মৃতি জ্ঞান । জীবেরে কৃপায় কৈল কৃষ্ণ বেদপুরাণ ॥” স্পষ্ট বোধ হয় যে, শ্রদ্ধা দুই প্রকার অর্থাৎ কোমকলশ্রদ্ধা ও দৃঢ়শ্রদ্ধা । দৃঢ়শ্রদ্ধা হইতে যে ভক্তির উদয় হয় তাহাই অত্যন্ত বলবতী ও স্বভাবতঃ ভাবরূপা । তৎসম্বন্ধে প্রভুর উপদেশ সম্পূর্ণরূপে শ্রীশিক্ষাষ্টকে আছে । কোমলশ্রদ্ধা সম্বন্ধে প্রভু সনাতনকে বলিয়াছেন (চৈঃ চঃ মধ্য ২৩শ অঃ ৯–১৩) :—“কোন ভাগ্যে কোন জীবের শ্রদ্ধা যদি হয় । তবে সেই জীব সাধুসঙ্গ করয় ॥ সাধসঙ্গ হইতে হয় শ্রবণ কীর্ত্তন । সাধন-ভক্ত্যে হয় ‘সর্বানর্থ নিবর্ত্তন’ ॥ অনর্থ নিবৃত্তি হইলে ভক্তি ‘নিষ্ঠা’ হয় । নিষ্ঠা হইতে শ্রবণাদ্যে ‘রুচি’ উপজয় ॥ রুচি হইতে হয় তবে ‘আসক্তি’ প্রচুর । আসক্তি হইতে চিত্তে জন্মে প্রীতির অঙ্কুর ॥ সেই রতি গাঢ় হইলে ধরে ‘প্রেম’ নাম । সেই প্রেমা ‘প্রয়োজন’ সর্ব্বানন্দধাম ॥” দৃঢ় শ্রদ্ধায় শাস্ত্রযুক্তির কার্য্য নাই । কোমলশ্রদ্ধদিগের শাস্ত্র ও সাধুসঙ্গ ব্যতীত গতি নাই । এই শ্রেণীর শ্রদ্ধাবান্ ব্যক্তির পক্ষে দীক্ষার নিতান্ত প্রয়োজন । সদ্গুরু নিকট শাস্ত্রসিদ্ধান্ত লাভ, মন্ত্রগ্রহণ ও গুরূপদিষ্ট মতে অর্চ্চনাদি সাধন করিতে করিতে তাঁহাদের ক্রমোন্নতি হয় । ইহাঁদের জন্য দশমূল-শিক্ষা । প্রমাণ একটী মূল ও প্রমেয় অর্থাৎ যে বিষয়গুলি প্রমাণিত হইবে, তাহা নয় প্রকার । দৃঢ়শ্রদ্ধ ভক্তের মনে স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসজনিত হরিনাম মাত্র সাধনে সকল প্রমেয়গুলি নামের কৃপায় আপনা হইতে উদিত হয় । দৃঢ়শ্রদ্ধ পুরুষদিগের প্রমাণ আলোচনার প্রয়োজন নাই । সুতরাং কোমলশ্রদ্ধ পুরুষগণের সম্বন্ধে প্রমাণ অবলম্বন ব্যতীত তাঁহারা দুষ্টসঙ্গে সত্বরই স্থানচ্যুত হইয়া পড়েন । ব্রহ্মবিস্তার স্বরূপ বেদই তাঁহাদের একমাত্র প্রমাণ । বেদ বিপুল এবং কর্ম্মী, জ্ঞানী প্রভৃতি অধিকারীদিগের জন্য অনেক ব্যবস্থ বেদে থাকায় শুদ্ধভক্তদিগের প্রতি উপদেশ সহজে সংগৃহীত হয় না । বেদের মূল তাৎপর্য্য স্থানে স্থানে বেদশাস্ত্রের অভিধেয়রূপে বর্ণিত আছে, তাহা স্পষ্ট দেখাইয়া দিবার জন্য সাত্ত্বিক পুরাণ সকল প্রদত্ত হইয়াছে । সাত্ত্বিক পুরাণগণের মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ এবং বেদের সাত্ত্বিক তাৎপর্য্য ব্যাখ্যায় বিশারদ । সুতরাং ভাগবতশাস্ত্র এবং তদনুগ পঞ্চরাত্রাদি তন্ত্র প্রমাণমধ্যে গণিত । সনাতন শিক্ষায় প্রভু কহিলেন (চৈঃ চঃ মঃ ২০।১২৪–১২৫) :—“বেদশাস্ত্র কহে ‘সম্বন্ধ’ ‘অভিধেয়’ ‘প্রয়োজন’ । ‘কৃষ্ণ’ প্রাপ্য-‘সম্বন্ধ’ ভক্তি প্রাপ্যের সাধন ॥ অভিধেয়—নাম ‘ভক্তি’, ‘প্রেম’ প্রয়োজন । পুরুষার্থ শিরোমণি প্রেম—মহাধন ॥” সম্বন্ধ । চিৎ (জীব), অচিৎ ও ঈশ্চর—এই তিনটী বস্তুর মধ্যে পরস্পর যে সম্বন্ধ, তাহাই সন্বন্ধ শব্দে উল্লিখিত হইয়াছে । বস্তুতঃ কৃষ্ণই একবস্তু । সেই বস্তুর দুই শক্তি, অচিৎ ও জীব । অচিৎশক্তির পরিণামে অচিৎ জগৎ এবং জীবশক্তির পরিণামে জৈবজগৎ । সম্বন্ধ বিচার করিলে জীবের কৃষ্ণদাস্য পুনঃপ্রাপ্তির নাম সম্বন্ধ স্থাপন । যথা সার্ব্বভৌব শিক্ষায়,—
“স্বরূপ ঐশ্বর্য্য তাঁর নাহি মায়াগন্ধ । পুনঃ চরিতামৃত (মধ্য ২০।১২৫) সনাতন শিক্ষায় :—“কৃষ্ণপ্রাপ্তি সম্বন্ধ ‘ভক্তি’ প্রাপ্যের সাধন ।”—এই সম্বন্ধতত্ত্ব বিচারে সাতটী বিষয় প্রমেয় স্বরূপে প্রদর্শিত হইয়াছে । অর্থাৎ ১। কৃষ্ণবিচার, ২। কৃষ্ণশক্তিবিচার, ৩। রসতত্ত্ববিচার, ৪। জীবতত্ত্ববিচার, ৫। জীবের সংসার বিচার, ৬। জীবের নিস্তার-বিচার এবং ৭। অচিন্ত্যভেদাভেদ বিচার । এই সাতটী প্রমেয় পৃথক পৃথক বিচার করিয়া সম্বন্ধজ্ঞান লব্ধ হয় । অভিধেয়—শব্দসকল বিন্যস্ত হইয়া একটী রচনা হয় । সহজ শব্দার্থ যে শক্তির দ্বারা বোধ হয় তাহার নাম—শব্দের অভিধা শক্তি । যথা ‘দশটি’ হাতী বলিলে সহজে দশসংখ্যক হাতীকে অনুভব করা যায় । এই সহজ অর্থকে অভিধেয় বলা যায় । ‘লক্ষণা’ নামক আর একটি শক্তি আছে ; যেমন “গঙ্গায় ঘোষপল্লী” । জল ঘোষপল্লী হয় না বলিয়া লক্ষণা শক্তিদ্বারা জলের ধারে ঘোষপল্লী বুঝা যায় । যে স্থলে লক্ষণার প্রয়োজন, সেখানে অভিধা শক্তির কার্য্য চলে না । সহজে স্বাভাবিক অর্থ হয়, এইরূপ স্থলে কেবল অভিধাই কার্য্য করে । বেদশাস্ত্রে অভিধা দ্বারা যে অর্থ পাওয়া যায়, তাহাই গ্রাহ্য । বেদশাস্ত্রের যথার্থ অর্থ—বেদশাস্ত্রের অভিধেয় । তাহাই আমাদের জানা কর্ত্তব্য । সর্ব্ববেদ বিচার করিলে দেখা যায় যে, ভগবদ্ভক্তিই বেদশাস্ত্রের অভিধেয় । কর্ম্ম, জ্ঞান, যোগ, ইত্যাদি অভিধেয়ের অবান্তর সম্বন্ধ । মুখ্য সম্বন্ধ নয় । অতএব কৃষ্ণপ্রাপ্তির যে মুখ্য উপায় ঐ শাস্ত্রে নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে তাহাই সাধনভক্তি এই একটী প্রমেয় । প্রয়োজন । যাহার উদ্দেশ্যে উপায় অবলম্বন করিতে হয় তাহাই প্রয়োজন । জীবের প্রেমসিদ্ধিরূপ প্রয়োজন একটী প্রমেয় । একত্রে নয়টী প্রমেয় উপস্থিত হইল । অতএব সনাতন শিক্ষায় :—“এই ত কহিল সম্বন্ধ তত্ত্বের বিচার । বেদশাস্ত্রে উপদেশে কৃষ্ণ এক সার ॥ এবে কহি শুন অভিধেয় লক্ষণ । যাহা হইতে পাই কৃষ্ণ, কৃষ্ণপ্রেমধন ॥” এই প্রণালীতে মহাপ্রভু জৈবধর্ম্ম শিক্ষা দিয়েছেন ।
|
|
||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||