আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

গুরুদেবের আবির্ভাব তিথি (সকাল)

শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁবিষ্ণুপাদ
শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত
ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব তিথি
নৃসিংহপল্লী, ১ জানুয়ারি ২০২১, সকাল

 

(১) গুরুদেবের আবির্ভাব


আজকে মদীয় গুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজের তিরানব্বইতম শুভ আবির্ভাব তিথি । এই শুভ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে আপনারা সবাই এখানে উপস্থিত হয়েছেন । গুরুদেব এই কৃষ্ণ-দ্বিতীয়া তিথিতে অবলম্বন করে তিরানব্বই বছর আগে বামুনপাড়ায় (বর্ধমান জেলায়) গৌরধামে অবতীর্ণ হয়েছেন । এই দিনে পিতাকে নিতাইপদ অধিকারী এবং মাতাকে তরঙ্গিনী দেবী অবলম্বন করে, তাদেরকে কৃপা করবার জন্য, ভগবান্ তাঁর নিজ জনকে এই জগতে পাঠিয়াছিলেন ।

আপনারা জানেন যে, আমাদের পরমগুরুদেব ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি রক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ১৯৪১ সালে বৃন্দাবন থেকে নবদ্বীপে ফিরে এসেছিলেন । প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ১ম জানুয়ারি ১৯৩৭ সালে চলে গিয়েছিলেন (পরশুদিন তাঁর তিরোভাব তিথি), কিন্তু ভগবান্ তাঁর নিজ জনকে তাঁর কথা বলবার জন্য জগতে পাঠিয়ে দেন । তাই প্রভুপাদ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের চলে যাওয়ার পর শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ যেভাবেই হোক চৈতন্য মঠ থেকে চলে গিয়ে নন্দগ্রামে বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন কিন্তু কিছু দিন পরে সেখানে থেকে তিনি প্রভুপাদের দৈববাণী শুনতে পেলেন যে, “তুমি কি একা বৃন্দাবনে এসে শুধুমাত্র নিজের ভালো দেখে ভজন করে ভগবানের কাছে চলে যাবে কিন্তু আমার যে এই জগতে কিছু পতিত অধম জীব রেয়েছে তাদের কী হবে ?” সেই কথা শুনে শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ কোলদ্বীপে এসে একটা জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন প্রথমে (মাসে ৫৮টাকা ভাড়া ছিল) । ওই জায়গায় তিনি একটা কুঁড়েঘর করে সেখানে থাকতেন । তিনি একাই থাকতেন প্রথমে, আর তখন আস্তে আস্তে তাঁর গুরুভ্রাতা এসেছিলেন ; আমাদের গুরুদেবও ১৯৪৭ সালে এসেছিলেন ।

পিতা নিতাইপদ অধিকারী আর মাতা তরঙ্গিনী দেবীর সন্তান পাওয়ার আগে আরো দুই-একজন সন্তান মারা গিয়েছিল । এইজন্য তারা মনন করেছিলেন যে, “সন্তান যদি এবার হয়, সেই সন্তানকে আমরা বুড়োরাজকে দিয়ে দেব ।” জামালপুরে (বামুনপাড়ার কাছে) ধর্ম্মরাজ (বুড়োরাজ) শিব আছেন । এইজন্য গুরুদেবের নাম আগে ছিল ধর্ম্মদাস এবং বলা হয় যে, গুরুদেব শিবের পুত্র । আর গুরুদেব যে কথা বলতেন, মুখ দিয়ে যে কথা বেরিয়ে গেল, সেটা ভুলা যাবে না ।

গুরুদেবের যখন ছয় দিন বয়স ছিল, তখন ষষ্ঠী পূজার সময় । গুরুদেবের বাবা বুড়োরাজের কাছে এসেছেন পূজা করবার জন্য আর ধর্ম্মরাজ তাকে বললেন, “তুমি এই পুত্র আমাকে দিয়েছো কিন্তু এখন পুত্র নিজের বলে ওর কপালে কালির ফোঁটা দিচ্ছো কেন ? ওকে কালির ফোঁটা না দিয়ে তুমি চন্দনের ফোঁটা দাও !” গুরুদেবের বাবা (নিতাইপদ অধিকারী) বাড়ি ফিরে এসে তাঁর মাকে (গুরুদেবের ঠাকুরমাকে) বললেন, “মা, তুমি ধর্ম্মদাসের কপালে কালির ফোঁটা বাদ দিয়ে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দাও । আমি ধর্ম্মরাজের কাছ থেকে এই আদেশ পেয়েছি । পুত্র তো তাঁর, আমাদের ওর উপর কোন অধিকার নেই ।”

 

 

(২) মঠে গুরুদেবের আসা


গুরুদেবের বাবা নিত্যানন্দ প্রভুর বংশধর হয়ে কুলগুরু ছিলেন । তিনি অনেক শিষ্যও করেছিলেন । আর তিনি খুব ভালো লীলাকীর্ত্তন করতেন । তিনি গুরুদেবকেও লীলাকীর্ত্তনে নিয়ে যেতেন বলে ওই লীলাকীর্ত্তন শুনতে শুনতে এবং করতে করতে গুরুদেবও অনেক লীলাকীর্ত্তন অল্প বয়স থেকে (তিনি তখন আট-বারো বছর বয়স ছিলেন) শিখেছিলেন এবং পড়তেন । কয়েক বছর পরে গুরুদেবের পিতা চলে গেলেন । তারমধ্যে আবার দুটো সন্তান হল (গুরুদেবের আরো দুই ভাই ছিল) কিন্তু ওই সময় তারা খুব ছোট তাই বাবার চলে যাওয়ার পরে গুরুদেবের সংসার আর কে ধরবে ? পয়সা কম, খুবই গরিব । কি করে কী করবে ?

তখন একজন কলিপদ সিঙ্ঘ নামে ডাক্তার ছিলেন । তিনি নদনঘাটে ডাক্তারি করতেন আর গুরুদেবকে সহকারী হিসেবে চাকরিতে নিয়োগ দিলেন । গুরুদেব ভালো রান্নাবান্না করতে পারতেন । (আমিও যেটুকু রান্নাগুলো জানি, সেটুকু গুরুদেবের কাছ থেকে শিখেছি । গুরুদেব নিজে আমাকে রান্নাগুলো বলতেন : “এই ভাবে রান্না করতে হবে ।”) আর গুরুদেব মৃদঙ্গও ভালো বাজাতেন ।

নদনঘাটে কলিপদ সিঙ্ঘ একজন জমিদারের বাড়িতে থাকতেন । গুরুদেবও বামুনপাড়া থেকে এসে তার সঙ্গে সেখানে থাকতেন । মাত্র মাসে ২০টাকা পেতেন কিন্তু ওই ২০টাকা তিনি মাকে পাঠিয়ে দিতেন তার সংসার চলাবার জন্য । এইভাবে গুরুদেব নদনঘাটে থাকতে শুরু করলেন ।

এদিকে শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ তাঁর গুরুভ্রাতার সঙ্গে — শ্রীল ভক্তিকমল মধুসূদন গোস্বামী মহারাজ, নরসিংহ ব্রহ্মচারী (পরে শ্রীপদ ভক্তিবৈভব পুরী মহারাজ হয়েছিলেন), ভুতবৃৎ প্রভু (পরে শ্রীপদ আশ্রম মহারাজ হয়েছিলেন) — নদনঘাটে প্রচারে গিয়েছিলেন । শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ একদিন পাঠ দিয়ে আবার মঠে ফিরে চলে গিয়েছিলেন আর তাঁর গুরুভ্রাতা অন্যান্য লোকের বাড়িতে সারা দিন চাল ভিক্ষা করতেন । সন্ধ্যায় সময় নদনঘাটের জমিদারের বাড়িতে পাঠ-কীর্ত্তন হত । ওই পাঠ-কীর্ত্তনের সময় গুরুদেব বসে হরিকথা শুনলেন । যে কথা তিনি ওই দিন শুনেছিলেন, সেটাও তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন । “ওরা বললেন যে, এই আমাদের দেহ কিছু নয়, মন কিছু নয়, আত্মাই সব ।” তাদের হরিকথা শুনে গুরুদেবের মনটা পরিবর্তন হয়ে গেল । আর যে ব্রহ্মচারী খোল বাজাছিলেন, গুরুদেব তাঁকে দেখে ভাবলেন, “এই লোকটা খোল ভালো বাজাতে পারে না, আমি ওর চেয়ে ভালো বাজাতে পারি কিন্তু সেটা ওকে কি করে বলব ? ও একটি সাধুলোক তো । যেই হোক, বলেই ফেলব ।”

তখন গুরুদেব বললেন, “একটু মৃদঙ্গটা আমাকে দেবেন ?”

“কি বাজাবে ?”

“হ্যাঁ, বাজাব ।”

গুরুদেবের বাজনা দেখে যারা সব ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসীরা ছিলেন তাদের খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছে । তারমধ্যে একজন বললেন, “বাঃ, ছেলে তো খুব ভালো মৃদঙ্গ বাজে ! তুমি কি মঠে থাকবে ?”

“থাকব । নিয়ে যাবেন ?” গুরুদেব উত্তরে বললেন ।

“হ্যাঁ, নিয়ে যাব ।”

“যদি আজকেই নিয়ে যান, তাহলে যাব ।”

“আজকে ?”

“হ্যাঁ, আজকে !”

“ঠিক আছে, তাহলে আজকেই নিয়ে যাব ।”

ওই সময় নদনঘাটে বৃষ্টি হওয়ার পরে নদী ছিল (গঙ্গাতীর বেরিয়ে যাওয়ার ফলে) কিন্তু নদীতে কোন সেতু ছিল না । তাই গুরুদেব কাপড়টা খুলে মাথায় বেঁধে দিলেন আর নদীটা সাঁতরে পার করে কাপড়টা আবার পরে ওখান থেকে হেঁটে হেঁটে কোলের ডাঙ্গার মঠে চলে আসলেন । ওই দিন ছিল নৃসিংহচতুর্দ্দশী । ওই দিন তিনি মঠে হাজির হলেন । গুরুদেব বললেন যে, “আমি বর্ধমানের ছেলে — প্রতিদিন তিনবার তো ভাত খেতাম আর একবার-দুইবার মুড়িও খেতাম । আর এখানে এসে দেখি যে, সাধুরা সারা দিন উপবাস করছেন ! কিছুই খায় না । কত দূর হেঁটে এসেছি, তারমধ্যে আমার খিদে পেয়ে গিয়েছে আর এখানে এসে তারা বলছেন ‘উপবাস’ ! কেউ কিছু খায় না । কই আসলাম ?! ওরা কিছু খায় না !”

তখন গুরুদেব আশেপাশে ঘুরছেন, ঘুরছেন । এদিকে একজন সাধু তাঁকে লক্ষ্য করলেন—সেটা শ্রীল শ্রীধর মহারাজ ছিলেন । তিনি খুব লম্বা, চুপচাপ ও গম্ভীর (গুরুদেব তাঁর গুরুমহারাজের প্রথম দর্শনের কথা আমাদেরকে বললেন) । তিনি বারান্দায় থেকে হরিনাম করে যাচ্ছিলেন । গুরুদেবের ঘুরাঘুরি দেখে শ্রীধর মহারাজ বুঝতে পারলেন, “নতুন ছেলে ঘুরাঘুরি করছে ।” ওকে ডাকলেন, “শুনো বাবা, এদিকে এসো । তুমি আজকে এসেছো ?”

“হ্যাঁ ।”

“আচ্ছা, এসেছো … তাহলে তোমার খিদে পেয়েছে মনে হচ্ছে । খাবে কিছু ?”

“কোথায় খাব ? আজকে তো সবাই উপবাস করছে ।”

“আচ্ছা, আচ্ছা । দেখি কী আমার ঘরে আছে, দেখি । ফলটল আছে কি না দেখি ।”

তখন গুরুদেব দেখলেন যে, এক গাছে পাকা পেঁপে ছিল । তিনি শ্রীল শ্রীধর মহারাজকে বললেন, “ওই গাছে একটা পেঁপে আছে ।”

“গাছে উঠতে পারো ?”

“হ্যাঁ, উঠতে পারি !”

“ঠিক আছে, পেঁপে এখানে টেনে নিয়ে এসো ।”

পেঁপেটা টেনে নিয়ে এসে গুরুমহারাজের হাতে দিলেন, তখন গুরুমহারাজ বললেন, “তুমি এটা খেয়ে নাও ।” ওই দিন সবাই কিছু খান না, উপবাস করছেন (জল পর্যন্ত খান না !) আর শ্রীল শ্রীধর মহারাজ গুরুদেবকে বললেন, “পেঁপে খেয়ে নাও ।” শ্রীল শ্রীধর মহারাজ ছেলেটাকে পছন্দ করলেন । শুধু তাই নয় : আমরা শুনেছি যে, সাত দিন ধরে শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ গুরুদেবের ব্যবহার লক্ষ্য করে দেখতে পেলেন যে, “এই ছেলেটাই পরবর্তী আচার্য্য হবে, ও আমার মঠের হাল ধরবে ।”

 

 

(৩) সম্পূর্ণ আনুগত্য


এক দিন শ্রীল শ্রীধর মহারাজ গুরু মহারাজকে ডেকে বললেন, “বাবা, যেটা আমি বলব, সেটাই শুধু শুনবে । তোমার মন যেটা বলবে, সেটা তুমি কখনই করবে না ।” কথাটা মনে রাখবেন । আমিও সেটা বলি : আপনাদের মন যেটা বলবে, সেটা আপনারা কখনই করবেন না — যেটা আমি বলব, সেটাই আপনারা করবেন । কিন্তু আমরা তো উলটা করি । শাস্ত্রে বলা হয় যে, মনের সঙ্কল্প ও বিকল্প আছে । সঙ্কল্প মানে মন বলে “আমি এই করব” আবার শেষ মুহূরতে বিকল্প এসে যায় তাই আমরা সেটা করি না । এখনই মন এক কথা বলল আবার পরে আর কোন অন্য চিন্তা আসবে – মনে বিভিন্ন চিন্তা এসে ।

তাই পরম গুরু মহারাজ গুরুদেবকে বলেছিলেন, “মন যেটা বলবে, সেটা করবে না । মন খুব দুষ্ট, মনের কথা শুনতে নেই । মন যেটা বলবে, সেটা কখনও করতে নেই । যেটা আমি বলব, সেটাই করবে ।” তখন গুরুদেব সেভাবেই চলতে লাগলেন ।

ওই সময় মঠের অবস্থা ভালো ছিল না । যখন আমিও প্রথম মঠে থাকতাম আর জমিতে যেতাম, সকাল বেলায় আমি কড়কড়া ভাত আর পোড়া লঙ্কা খেয়ে যেতাম । সেটা আমার খুব প্রিয় । আর যদি একটু আলু মিশে যায়, তাহলে আরো ভালো ! এখন মঠে যে প্রসাদ রাত্রে বেলায় আছে, আমরা তা সব গরুকে দিয়ে দিই কিন্তু ওই সময় যে প্রসাদ থাকত, সকাল বেলায় উঠে তা সব ব্রহ্মচারীরা খেতেন । শ্রীল শ্রীধর মহারাজ এই রকম নিয়ম করেছিলেন । তাই একদিন কিছু ডাল-ভাত থাকত কিন্তু রাতের বেলায় যে কোন রকম ডালের মধ্যে পিঁপড়া ঢুকে পড়ল । সকাল বেলায় ওই ডালটা গুরুদেবের পাতায় পড়েছিল । গুরুদেব পিঁপড়াটা দেখে প্রথম ডালটা খেতে ইচ্ছা করলেন না কিন্তু তখন পিঁপড়াটা ডাল থেকে ফেলে দিয়ে বাকিটা খেয়ে নিয়েছেন । শ্রীধর মহারাজ সেটা দেখতে পেয়ে গুরুদেবকে বললেন, “প্রসাদ পাওয়া হয়ে গেলে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো ।”

প্রসাদ পেয়ে গুরুদেব শ্রীল শ্রীধর মহারাজের কাছে এসে বললেন, “আপনি আমাকে ডেকেছেন ?”

“হ্যাঁ, ডেকেছি । বসো । সকাল তোমাকে ওই ডালের মধ্যে কিছু পোকা দাওয়া হল, সেটা তুমি কেন খেয়েছিলে ?”

“কেন ? আমার তো প্রথম খেতে মন চাইছিল না কিন্তু আপনি বলেছিলেন যে, মনের কথা শুনলে হবে না । মন আমাকে বলল, ‘খাব না !’ কিন্তু আপনার কথা মনে পড়েছে যে, আপনি যেটা বলেছেন, সেটাই শুনতে হবে । তখন আমি সেটা খেয়েছি ।”

তখন শ্রীল শ্রীধর মহারাজ বললেন, “এই চেলেটি আমার পরবর্তী আচার্য্য হবে ।”

আবার তখন গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বহে গিয়েছে । মঠে অনেক ব্রহ্মচারী ছিল আর অনেকে বলে, “শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ একটা গৃহস্থলোককে এনে সন্ন্যাস দিয়ে তাকে আচার্য্য করেছেন ।” কিন্তু যারা সেটা বলে, তাদের জানা উচিৎ যে, মঠে অনেক ব্রহ্মচারী, অনেক সন্ন্যাসী ছিল — শ্রীল শ্রীধর মহারাজ তাদেরকে বাদ দিয়ে একটা “গৃহস্থলোককে” নিয়ে এসে তাঁকে সন্ন্যাস দিয়ে কেন আচার্য্য করলেন ? শুধু তাই নয়, তিনি ত্রিশ(!) বছর ধরে অপেক্ষা করেছিলেন গুরুদেবকে তাঁর chair (চেয়ার) দেওয়ার জন্য কিন্তু গুরুদেব সেটা নেননি ।

 

 

(৪) গুরু কে ?


“গুরুমুখ-পদ্মবাক্য চিত্তেতে করিয়া ঐক্য আর না করিহ মনে আশা ।” গুরুদেব সবসময় এই কথা বলতেন । আমি এখানে দুই-চার কথা লিখে দিয়েছি, সেখান থেকে এখন কিছু বলব । আমাদের আর ১৫-১০ মিনিট সময় আছে ।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধব মহারাজকে কী বলেছেন ? “আচার্য্যং মাং বিজানীয়ান্ । আচার্য্যকে মৎস্বরূপ বলে দেখবে ।” তার অর্থ যে, “গুরুদেবকে আমার স্বরূপ বলে জানবে ।” শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম, তাঁরা একই দেহে দুই রূপ । তাঁরা একই কিন্তু তাঁদের দুইটা রূপ : বলরাম এক রূপ, কৃষ্ণ এক রূপ ; গৌরাঙ্গ এক রূপ, নিত্যানন্দ এক রূপ । একই দেহে দুই রূপ । তিনি এক কিন্তু দুই রূপ ধারণ করে এই জগতে অবতীর্ণ হয়েছেন লীলা করবার জন্য । তাহলে গুরুদেব কে ? তিনি সাক্ষাৎ কৃষ্ণ । আমরা এখনই সকাল বেলায় কীর্ত্তন করলাম :

সাক্ষাদ্ধরিত্বেন সমস্ত-শাস্ত্রৈ-
রুক্তস্তথা ভাব্যত এব সদ্ভিঃ ।
কিন্তু প্রভোর্যঃ প্রিয় এব তস্য
বন্দে গুরোঃ শ্রীচরণারবিন্দম্ ॥

শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর লিখেছেন : “সাক্ষাৎ হরিত্বেন, গুরুদেব হলেন সাক্ষাৎ হরি ।” আবার তিনি বলছেন যে, “কিন্তু প্রভোর্যঃ প্রিয় এব তস্য, তিনি সাক্ষাৎ হরি হয়েও কিন্তু তিনি প্রভুর অত্যন্ত প্রিয়, অর্থাৎ তিনি সাক্ষাৎ শ্রীমতী রাধিকা ।” যার যেরকম রস, সেই রস অনুযায়ী গুরুদেবকে দেখা হয় । কেউ গুরুদেবকে রাধারাণী বলে জানেন, আর কেউ গুরুদেবকে নিত্যানন্দ প্রভু বলে জানেন । বাৎসল্য রসে তিনি নিত্যানন্দ আর মধুর রসে তিনি রাধারাণী । কেউ যদি আপনাদেরকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনার গুরুদেব কে ?” আপনারা বলবেন, “আমার গুরুদেব সাক্ষাৎ রাধারাণী” বা “তিনি সাক্ষাৎ নিত্যানন্দ ।”

শ্বেতাশ্বতরেও উল্লেখ আছে :

যস্য দেবে পরা ভক্তির্যথা দেবে তথা গুরৌ ।
তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ ॥

“যাঁহার শ্রীভগবানের পরা ভক্তি বর্তমান, আবার যেমন শ্রীভগবানে, তেমন শ্রীগুরুদেবেও শুদ্ধভক্তি আছে, সেই মহাত্মার নিকট এই সকল বিষয় অর্থাৎ শ্রুতির মর্মার্থ উপদিষ্ট হইয়া প্রকাশ পাইয়া থাকে ।”

(শ্বেতাশ্বতর, ৬।২৩)

যাঁর মধ্যে শ্রীভগবানের পরা ভক্তি বর্তমান, তিনি হলেন গুরুদেব । গুরু-তত্ত্ব সম্বন্ধে শ্রীল রূপ গোস্বামী বলেছেন :

বাচো বেগং মনসঃ ক্রোধবেগং
জিহ্বাবেগমুদরোপস্থবেগম্ ।
এতান্ বেগান্ যো বিষহেত ধীরঃ
সর্বামপীমাং পৃথিবীং স শিষাৎ ॥

“যেই ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধ-বাঞ্ছা-রহিত পন্ডিত ব্যক্তি বাক্যের বেগ, মনের বেগ, ক্রোধের বেগ, জিহ্বার বেগ, উদরের বেগ, উপস্থের বেগ—এই ষড়্ বেগ ধারণ করিতে সমর্থ, তিনি এই সমস্ত পৃথিবীকে শাসন করিতে পারেন ।”

(শ্রীউপদেশামৃত, ১)

গুরুদেবের ছয় বেগ দমন হয়েছে । কি কি বেগ ? বাক্যের বেগ, মনের বেগ, ক্রোধের বেগ, জিহ্বার বেগ, উদরের বেগ, উপস্থের বেগ—যাঁর ছয় বেগ দমন হয়েছে, তিনি হলেন সাক্ষাৎ গুরু বা সাক্ষাৎ হরি ।

হরিভক্তিবিলাসে (১।৪৫-৪৬) লেখা আছে যে, গুরুদেব অপার করুণাময় । ভগবান যাঁকে সমস্ত শক্তি দিয়েছেন, তিনি হলেন স্বয়ং সম্পূর্ণ : তিনি সর্ব্ব বিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, ভক্তিশাস্ত্রে সুনিপুণ । তিনি হলেন সাক্ষাৎ হরি ।

কৃষ্ণের প্রসাদে গুরু-কৃপা লাভ করা যায় । গুরুকৃপা হলে সমস্ত কৃপা লাভ করা যায় ।

কৃষ্ণ যদি কৃপা করেন কোন ভাগ্যবানে ।
গুরু অন্তর্যামিরূপে শিখায় আপনে ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২।২২।৪৭)

কৃষ্ণ যদি কোন ভাগ্যবান জীবকে কৃপা করেন, তখন গুরু অন্তর্যামিরূপে তাকে শিখিয়ে দেন । গুরুর মধ্যে চৈত্যগুরু আছে এবং মহন্তগুরু আছে । চৈত্যগুরু কে বলা হয় ? চৈত্যগুরুরূপে ভগবান্ আপনাদের হৃদয়ে (ভিতরে) থাকেন, আর যখন তিনি তার মধ্যে আপনাদেরকে কৃপা করেন, তখন তিনি আপনাদেরকে মহন্ত গুরুর কাছে নিয়ে যাবেন । “দীক্ষা নিয়ে যাবে ?”—সহজে একজনলোক এসে এরকম কথা বলে না । যাকে ভগবান্ হৃদয়ে থেকে কৃপা না করেন, তিনি দীক্ষা নিতে পারে না । এই সব সময় শাস্ত্রে বলা আছে ।

 

 

(৫) শ্রীগুরুতত্ত্ব


শ্রীচৈতন্যমঙ্গলে লেখা আছে :

সেই সে পরম বন্ধু, সেই পিতামাতা ।
শ্রীকৃষ্ণচরণে যেই প্রেমভক্তিদাতা ॥
সকল জন্মে পিতামাতা সবে পায় ।
কৃষ্ণ গুরু নাহি মিলে, ভজহ হিয়ায় ॥

বিভিন্ন বক্তৃতায় আমি বলি না যে, আপনারা আমার পরমাত্মীয়, পরমবন্ধু । কেন পরমাত্মীয় ? কারণ আমরা অমৃতস্য পুত্র ও অমৃতস্য কন্যা । আপনারা অমৃতের পুত্র, অর্থাৎ ভগবানের পুত্র । যদি আপনারাও ভগবানের পুত্র বা কন্যা হন এবং আমিও ভগবানের পুত্র, তাহলে আমাদের সম্বন্ধ কী ? আমরা সবাই ভাই-বোন । সবাই একই আত্মীয় । আপনাদের সঙ্গে আমরা পরমাত্মীয় । কিন্তু আমরা মায়ার কবলে পড়ে এই আত্মীয়তা ভুলে গিয়েছি । শাস্ত্রে সুন্দর করে লেখা আছে :

কৃষ্ণ-বহির্ম্মুখ হঞা ভোগ বাঞ্ছা করে ।
নিকটস্থ মায়া তারে জাপটিয়া ধরে ॥
পিশাচী পাইলে যেন মতিচ্ছন্ন হয় । মায়াগ্রস্ত জীবের হয় সে ভাব উদয় ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৬/৩)

ভগবান্-গুরুদেবকে ভুলে গিয়ে, সব ভুলে গিয়ে, আমাদের আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বন্ধব, এ সব নিয়ে ভুলে গেলাম ।

“আমি নিত্য কৃষ্ণদাস” এই কথা ভুলে ।
মায়ার নফর হঞা চিরদিন বুলে ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৬/৪)

আমরা চিরদিন বারবার আসি । কখনও রাজ হয়, কখনও প্রজা হয়, কখনও বিপ্র বা ব্রাহ্মণ হয়, কখনও শূদ্র হয়, কখনও সুখী হয়, কখনও দুঃখী হয়, কখনও কীট হয়, কখনও ক্ষুদ্র হয়, কখনও স্বর্গে আসে, কখনও মর্তে আসে, কখনও নরকে আসে, কভু ত দেবতা হয়, কভু ত অসুর হয় আর কভু ত দাস হয় । কিন্তু আমরা “নিত্য কৃষ্ণ-দাস” ।

ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান্ জীব ।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ২/১৯/১৫১)

এই ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণ করতে করতে কোন ভাগ্যবান্ জীব গুরু-কৃষ্ণ প্রসাদে ভক্তিলতা-বীজ গুরুদেবের কাছ থেকে নিয়ে হরিভজন করলে তাদিয়া তো ভগবৎ ধামে পৌঁছাতে পারবে । (আমার কথাগুলো শুনতে বুঝতে পারছেন ? না বুঝতে পারলে প্রশ্ন করবেন । সন্ধ্যা সময় এখানে থাকবেন, প্রশ্ন করবেন । যার প্রশ্ন আছে, বলবেন, “আমি বুঝতে পারলাম না, গুরুদেব, বুঝিয়ে দিন ।”)

তাই, কে গুরু হবেন ?

কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয় ।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয় ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ২/৪/১২৪)

গুরু হওয়ার জন্য ব্রাহ্মণ বা পণ্ডিত হতে হবে না । যে কৃষ্ণতত্ত্ব-বেত্তা, সেই গুরু হতে পারেন । প্রেম-বিবর্ত্তে একটা সুন্দর কথা আছে (শ্রী জগদানন্দ পণ্ডিত লিখেছেন) :

কিবা বর্ণী, কিবাশ্রমী, কিবা বর্ণাশ্রমহীন ।
কৃষ্ণতত্ত্ব-বেত্তা যেই, সেই আচার্য প্রবীণ ॥
আসল কথা ছেড়ে ভাই বর্ণে যে করে আদর ।
অসদ্ গুরু করি’ তার বিনষ্ট পূর্ব্বাপর ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ১১/১৬–১৭)

আসল কথা ছেড়ে কেউ বলে, “ও ব্রাহ্মণ নয়, ও শূদ্রা !” এ কথা যারা বলে, তারা অসৎ গুরুর মধ্যে পড়ে, তারা সৎগুরু নয় । আবার বৃন্দাবনে দেখলেন যে, অনেক লোকগুলো শুধু চুপচাপ ভজন করে—আচার করে কিন্তু প্রচার করে না । আবার কেউ অপরদিকে প্রচার করে কিন্তু নিজে আচার করে না । দুইরকম লোক আছে । শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে লেখা হয় :

আপনে আচরে কেহ, না করে প্রচার ।
প্রচার করেন কেহ, না করেন আচার ॥
'আচার', 'প্রচার'—নামের করহ 'দুই' কার্য্য ।
তুমি—সর্ব্ব-গুরু, তুমি—জগতের আর্য্য ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ৩/৪/১০২–১০৩)

আচারও করতে হবে, প্রচারও করতে হবে । কেউ আচার করলে প্রচার করে না, বা প্রচার করে আবার আচার করে না । দুটোই হতে হবে : আচারও করতে হবে, প্রচারও করতে হবে । যে আমি এখনই বলেছিলাম, সে শ্লকটা এখানে ভগবাতে আছে :

আচার্য্যং মাং বিজানীয়ান্নাবমন্যেত কর্হিচিৎ ।
ন মর্ত্ত্যবুদ্ধ্যাসূয়েত সর্ব্বদেবময়ো গুরুঃ ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/১৭/২৭)

ভগবান্ উদ্ধবকে বলেছিলেন, “হে উদ্ধব, গুরুদেবকে মৎস্বরূপ বলে জানবে । গুরুতে মনুষ্যবুদ্ধি করিয়া তাকে অবজ্ঞা করবে না ।” যদি কেউ বলে, “গুরুদেব আমার মত পায়খানা করে, আমার মত খায়, আমার মত ঘুমায়”—গুরুদেবকে মর্ত্ত্যবুদ্ধি করলে তাহলে গুরুপদে বঞ্চিত হবে ।

শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে বলেছে :

যদ্যপি আমার গুরু—চৈতন্যের দাস ।
তথাপি জানিয়ে আমি তাঁহার প্রকাশ ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ১/১/৪৪)

কত সুন্দর কথা লেখা আছে !

গুরু কৃষ্ণরূপ হন শাস্ত্রের প্রমাণে ।
গুরুরূপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগণে ॥
শিক্ষাগুরুকে ত’ জানি কৃষ্ণের স্বরূপ ।
অন্তর্যামী, ভক্তশ্রেষ্ঠ,—এই দুই রূপ ॥

(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ১/১/৪৫, ৪৭)

 

(৬) গুরুর লোভ, শিষ্যদের লোভ


আর এখানে যে পুরাণ থেকে কথা আছে, সেটা আমি আপনাদেরকে মাঝে মাঝে বাংলায় বলি । কথাটা সবাই মনে রাখতে হবে । শ্লোকটা এই :

গুরবো বহবঃ সন্তি শিষ্যবিত্তাপহারকাঃ ।
দুর্লভঃ সদ্­গুরুর্দেবি শিষ্যসন্তাপহারাকঃ ॥

“হে দেবি, শিষ্যের বিত্ত অর্থাৎ ধনাপহারক বহু গুরু আছেন, কিন্তু শিষ্যের সন্তাপনাশক সদ্ গুরু দুর্ল্লভ ।”

(পুরাণ)

এই জগতে বিত্তহরণকারী গুরু অনেক পাবেন । বিত্তহরণকারী গুরু কে ? ধন-সম্পত্তি নেওয়া গুরু । অনেক গুরু দেখবেন দীক্ষা দিয়ে চলে যায় আর বছরে একবার আসবে । আপনাদের জমি যেমন খাজনা বছরে বছরে দিতে হয় বা পঞ্চায়েত বা মুনিসিপালিটির ট্যাক্স দিতে হয়, তেমন জগতে অনেক গুরু আছে যে আপনাদের প্রতি ট্যাক্স বসিয়ে দেয় । এখন কী হয় জানি না কিন্তু আগে গুরু কুড়ি-পয়সার জন্য একটা বাক্স দিয়ে বলত, “প্রত্যেক দিন আমার জন্য কুড়ি-পয়সা রেখে দেবে, আমি এক বছর পরে এসে সেটা নিয়ে নেব ।” এরকম গুরুদেব ট্যাক্সে বসিয়ে দেন । সৎগুরুরা কখনো শিষ্যের প্রতি ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দেন না । সৎগুরু সব সময় চিন্তা করেন, “শিষ্যের কীভাবে সন্তাপ (ত্রিতাপ-জ্বালা) দূর হবে ?” গুরুদেব শিষ্যের প্রতি ট্যাক্স বসিয়ে দেয়—তা নয় ! “আমি মাসে বা বছরে একবার আসব : আমাকে এক বস্তা চাল আর কিছু টাকা দিতে হবে ।” যেমন গুরু, তেমন শিষ্য । ওইরকম গুরুর শিষ্যেরাও বলে, “আমি গুরুদেবের কাছ থেকে আজ দীক্ষা নিয়েছি ! আমার দীক্ষা হয়ে গেছে ! আমার গুরুদেব এক বছরে আসবেন আর আমি চুল দিয়ে তার পা ধুয়ে দেব ।” আর যা তার ইচ্ছা হয়, সেটা রান্না করে—সে সব খায়, সব কিছু তার চলে ।

এরকম গুরু বলে যে, “তোমাদের আত্মা যা চায়, তাই খাও ।” আত্মা চায় পরমাত্মার সেবা করতে ! আত্মা কখনো চায় না যে, “তুমি মাছ-মাংস খাও !” ওসব মন এবং জিহ্বা চায় । শুনলেন তো যে মনের বেগ আছে, জিহ্বার বেগ আছে, ইত্যাদি । এগুলো এসব চায় কিন্তু আত্মা কখনো চায় না যে, “তুমি মাছ খাও, মাংস খাও, এই খাও, সেই খাও ।” আত্মা সব সময় চায় পরমাত্মা ও ভগবানের সেবা করতে । মাছ-বাজারের পাশে যাওয়ার সময় মাছের গন্ধ পেয়ে আপনারা ভাবেন, “টাকা থাকতো এই মাছটা কিনতে পারতাম !”— সেটা মন চায় কন্তু আত্মা কখনো সেটা চায় না । আমাদের দেশের লোকেরা আত্মাকে এবং মনকে এক করে । আমাদের দেশের গুরুও বোঝে না আত্মা কী বস্তু আর মন কী বস্তু । আত্মা অন্তর-জগতে বিচরণ করে আর মন বাহির-জগতে বিচরণ করে ।

অনেকে আমাকে বলে, “আমি দীক্ষা নিয়েছি, এখন কি করে আবার দীক্ষা নেব ? ওই গুরু অভিশাপ দেবেন ।” সৎগুরু কখনো অভিশাপ দেয় না । দেবতাদের গুরু অভিশাপ দেয় (যেমন এক সময় দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি ইন্দ্রকে অভিশাপ দিয়েছিলেন) । যারা সৎগুরু তারা কখনো অভিশাপ দেয় না । শিষ্যেরা যত অন্যায় করুক, শিষ্যদের দোষ ও গুণ সমস্ত ক্ষমা করে দেওয়া গুরুদেবের কর্তব্য । অনেক গুরু বলে, “না, তুই আমাকে ত্যাগ করেছিস, তোকে আমি অভিশাপ দেব !” কেন সেটা বলে ? ওরা ভাবে, “ও আমার শিষ্য হয়েছে বলে বছরে একবস্তা চাল আর পঞ্চাশটাকা আমাকে দিয়ে দেয় আর সেটা তো বন্ধ হয়ে গেলে আমার আয় কমিয়ে যাবে !” আমাকে অনেকে বলে, “আমি ওই গুরু কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছি । গুরুদেব, আপনার কাছে দীক্ষা নিলে ও রাগ করবে ।” রাগবে না । আপনারা ওকে যে বছরে বস্তা চাল বা ১০কেজি চাল দিতেন সেটা ওকে দিয়ে দেন, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে । ও রাগ বা অভিশাপ দেবে না । সত্য কথা ।

 

(৭) প্রবঁচক ও প্রবঁচিত


গুরুদেব সব সময় হরিকথা-কীর্ত্তন করেন । তিনি বসে বসে পরচর্চা, পরনিন্দা, অন্য লোকের কীর্ত্তন বা বাহ্য গ্রাম্যবর্ত্ত বলেন না । মহাভারতে লেখা আছে :

গুরোরপ্যবলিপ্তস্য কার্যাকার্যমজানতঃ ।
উৎপথপ্রতিপন্নস্য পরিত্যাগো বিধীয়তে ॥

“ভোগ্যবিষয়লিপ্ত, কর্তব্যাকর্তব্যবিবেক-রহিত মূঢ় এবং শুদ্ধভক্তি ব্যতীত ইতরপন্থানুগামী ব্যক্তি নামে-মাত্র-গুরু হইলেও তাঁহাকে পরিত্যাগ করাই বিধি ।”

(মহাভারত-উদ্যোগ-পর্ব্ব, ১৭৯।২৫)

যিনি ভোগের মধ্যে থাকেন — স্ত্রী, পুত্র নিয়ে বাস করে এবং কোনটা কর্তব্য ও কোনটা অকর্তব্য সেটা তার কোন সুবুদ্ধি নাই — আর শুদ্ধভক্তি বিধি তিনি করেন না, তিনি ইতরপন্থানুগামী ব্যক্তি । নামে মাত্র গুরু হইলেও তাঁহাকে পরিত্যাগ করাই বিধি । এটা শাস্ত্রে লিখেছে । আমি সেটা লিখি নি—আমি বলি যে “ওর পরিত্যাগ করে দাও”, সেটা নয় । যখন প্রচার করবেন, তখন বলবেন যে, মহাভারতের বাণী সেটা বলছে ।

গুরোরপ্যবলিপ্তস্য কার্যাকার্যমজানতঃ ।
উৎপথপ্রতিপন্নস্য পরিত্যাগো বিধীয়তে ॥

“ভোগ্যবিষয়লিপ্ত, কর্তব্যাকর্তব্যবিবেক-রহিত মূঢ় এবং শুদ্ধভক্তি ব্যতীত ইতরপন্থানুগামী ব্যক্তি নামে-মাত্র-গুরু হইলেও তাঁহাকে পরিত্যাগ করাই বিধি ।”

(মহাভারত-উদ্যোগ-পর্ব্ব, ১৭৯।২৫)

ভগবান্ বলেছেন, “আমি তোমাকে মুখটা দিয়েছি কিন্তু তুমি শুধু খেয়েছো আর গ্রাম্যকথা, গ্রাম্যবর্ত্ত বলেছো । কান দিয়েছি কিন্তু আমার কথা না শুনে অন্য কথা শুনেছো । চোখ দিয়েছি কিন্তু আমার দর্শন না করে তুমি অন্য জিনিষ দেখেছো । এখন আমি তোমার কাছ থেকে সব কেড়ে নেব !” গরুকুলে সব গরু শুধু হাম্বা হাম্বা করে, গরু কথা বলতে পারে না । এইভাবে ভগবান্ সব কেড়ে নেবেন । তিনি আমাদেরকে মনুষ্য-জন্মে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু এই জন্ম সদ্ব্যবহার করতে না পারলে আমাদের অধোগতি প্রাপ্ত হবে । আমি যদি স্কুলে পড়াশোনা ভালো না করি, তাহলে আমাকে নিচে নামিয়ে যেতে হবে । এখানেও যদি আমরা ভগবানের কথা শুনিনি, ভগবানের কীর্ত্তন শুনিনি, গুরুবাক্য শুনিনি, তাহলে ভগবান্ বিচার করে মৃত্যুর পরে আমাকে এই মনুষ্য-জন্ম থেকে নিচের জন্ম পাঠিয়ে দেবেন (যেকোন জন্ম হোক—বানর হতে পারি, গরু হতে পারি, ছাগল হতে পারি, ইত্যাদি) ।

হরিভক্তিবিলাসে বলেছে :

স্নেহাদ্বা লোভতো বাপি যো গৃহ্ণীয়াদদীক্ষয়া ।
তস্মিন্ গুরৌ সশিষ্যে তু দেবতাশাপ আপতেৎ ॥

“স্নেহবশতঃ বা লোভবশতঃ যে গুরু দীক্ষাবিধি ব্যতিরেকে মন্ত্র দেন এবং ভালবাসা খাতিরে বা কোনরূপ লোভের আশায় য়িনি এইরূপভাবে মন্ত্র গ্রহণ করেন, তাঁহারা উভয়েই দেবতার অভিশাপ প্রাপ্ত হন ।”

(হরিভক্তিবিলাস, ২।৭)

আমাকেও কেউ ‘বাবা’ বলে ডাকে, কিন্তু গুরুকে “বাবা” বলতে নেই । গুরুদেবের সঙ্গে সম্বন্ধ হচ্ছে যে তাঁকে গুরুদেব বলে ডাকতে হয় । বাবা-মা বলে দরকার নেই । গুরুদেবকে গুরুদেব বলেই ডাকে । কেউ “ভালবাসা খাতিরে বা কোনরূপ লোভের আশায় মন্ত্র গ্রহণ করেন” । অনেকে বলে, “বাঃ এই গুরুদেবের অনেক মঠ-মন্দির, অনেক টাকা-পয়সা আছে, এর কাছ থেকে দীক্ষা নিলে কিছু পাওয়া যাব, কিছু আমার লাভ হবে ।” এখনও দেখছেন যে, অনেকে বলে, “ওর বড় বড় মঠ থাকলে, তাই সে বড় গুরু । আর যার ছোট মঠ আছে, সে বড় গুরু নয় ।” অনেক মঠ থাকলে, অনেক কিছু প্রভাব এবং গাড়ি-বাড়ি থাকলে, লোকেরা বলছে, “বাঃ বাঃ ! এই বিশাল গুরু ! এর কাছ থেকে দীক্ষা নিতে হবে ।” সবাই ওইকরম মিশনে দৌড়ায় : “বাঃ বাঃ এত বড় বড় মঠ ! এই গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিলে আমি একবারে গোলক-বৃন্দাবনে চলে যাব !” আর ছোট ছোট মঠ থাকলে, ছোট ছোট নিয়ে কী আছে ? “ওখান থেকে দীক্ষা নিলে আমার কোন লাভ নেই ।” বড় গুরু—তার পেটও মোটা হতে হবে, ভালো গাড়ি থাকতে হবে । বালিতোরা-গ্রামে একজন মহিলা আছে, সে বলল, “আমার গুরুদেব না আমার বাড়িতে এসেছিলেন ! কত সুন্দর দেখতে লাগে ! চেয়ারে বসে পা বেরিয়ে সিগারেট টেনে বসেছিলেন—কত সুন্দর দেখতে লাগে ! আপনার মঠে গুরুদেব এসে একবার জলও খায় না, কিছুই খায় না আর আমার গুরুদেব এসে সিগারেট খুব সুন্দর টেনে, কত ভালো লাগে !”

যো ব্যক্তি ন্যায়রহিতমন্যায়েন শৃণোতি যঃ ।
তাবুভৌ নরকং ঘোরং ব্রজতঃ কালমক্ষয়ম্ ॥

“যিনি (আচার্য্যবেশে) অন্যায় অর্থাৎ সাত্বতশাস্ত্রবিরোধী কথা কীর্ত্তন করেন এবং যিনি (শিষ্যরূপে) অন্যায়ভাবে তাহা শ্রবণ করেন, তাঁহারা উভয়েই অনন্তকাল ঘোরনরকে গমন করেন ।”

(হরিভক্তিবিলাস, ১।১০১)

উলুবেড়িয়ায় আছে একজন গুরু । যে কার অনুষ্ঠানে (যেমন বিয়ে বাড়িতে) হাঁড়ি-কড়াইয়ে মাছ-মাংস রান্না হয়, সেটা পরে ঠাকুরের জন্য রান্না করাবার জন্য ব্যবহার করতে নেই । কিন্তু একজন বললেন, “কী অসুবিধা আছে ? গঙ্গা জলে ধুয়ে নেবে !” গুরুদেব যাকে শিষ্য করলেন, সেও বললেন, “ঠিক আছে, আপনি মাছ-মাংস সব খাবেন আর গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে আসবেন, সব শুদ্ধ হয়ে যাবে ! যা অশুদ্ধ সব পরিষ্কার হয়ে যাবে । মাছ-মাংস খাবেন আর গঙ্গায় ডুব দিলে পেটটা পরিষ্কার হয়ে যাবে !” এই করম গুরুদেবের বুদ্ধি… তাই এখানে বলেছে : “যিনি আচার্য্য বেশ ধরেছে কিন্তু সব সময় শাস্ত্র বিরুদ্ধে কথা বলেন আর যিনি শিষ্যরূপে অন্যায়ভাবে তাঁকে শ্রবণ করেন, তাহলে তাঁহারা উভয়েই অনন্তকাল ঘোরনরকে থাকেন ।” যারা শাস্ত্র বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের ওইরকম গতি হবে ।

শুদ্ধবৈষ্ণব-বিদ্বেষী গুরু পরিত্যাজ্য—ভক্তিসন্দর্ভ লিখেছে । গুরু বৈষ্ণববিদ্বেষী হইলে কী করে তাকে ত্যাগ করতে হবে জানেন ? মন্ত্রটাও বলে দিয়েছে ।

গুরোরপ্যবলিপ্তস্য কার্যাকার্যমজানতঃ ।
উৎপথপ্রতিপন্নস্য পরিত্যাগো বিধীয়তে ॥

“ভোগ্যবিষয়লিপ্ত, কর্তব্যাকর্তব্যবিবেক-রহিত মূঢ় এবং শুদ্ধভক্তি ব্যতীত ইতরপন্থানুগামী ব্যক্তি নামে-মাত্র-গুরু হইলেও তাঁহাকে পরিত্যাগ করাই বিধি ।”

(মহাভারত-উদ্যোগ-পর্ব্ব, ১৭৯।২৫)

এই মন্ত্রটা বলে সেই গুরুকে ত্যাগ করাই বিধি । সেই গুরুকে ত্যাগ করতে হবে ! যে গুরু বৈষ্ণবভাব না থাকায়, যে গুরুর অবৈষ্ণবরূপ থাকলে, মহাভারত বলছে তাকে ত্যাগ করাই তার পক্ষে শ্রেয় । এইটা সব সময় মনে রাখবেন । আমি আর বেশি বলব না । এই গুরু-কথা একটু বললাম । যখন সব বৈষ্ণবরা আসবেন, আপনারাও আসবেন, তখন আমি কিছু কীর্ত্তন করব, এখন আমাদের সময় হয়ে গিয়েছে । আমি আর বেশিক্ষণ বিলম্ব করব না ।

আমি মঠে জেনে শুনে এসেছিলাম । অনেকে তখন উল্টাপাল্টা কথা বললেন গুরুদেবের সম্বন্ধে । আমি গুরুদেবের সঙ্গে বিদেশে ছিলাম, দেখেছি যে, হাজার হাজার শিষ্য তাঁর শ্রীচরণে এসেছেন—তারা কি কিছু জানতেন না ? লোকে বলে, “শ্রীল শ্রীধর মহারাজ একটি গৃহস্থ লোককে এনে তাকে দীক্ষা দিলে আচার্য্য করেছেন !” যাঁকে শ্রীল শ্রীধর মহারাজ গুরুরূপে বরণ করে দিয়েছেন, তাঁকে আমরা মানতে পারছি না, তাহলে আমরা কিছু বুঝতে পারছি না । আর গুরুদেবের আমার মত অধম পতিত ব্যক্তি—আমার যোগ্যতা নাই, কোন রকম গুণ নাই, কিছু নাই—সব বড়-বড় লোককে বাদ দিয়ে আমাকে গুরুদেব এই পটে বসিয়ে দিয়েছেন । আপনারাও আমার কাছে এসেছেন এখানে আমার কথা শুনতে । আপনারা সবাই গুরুদেবের শিষ্য । তাই আপনারা ভালো থাকুন, আপনাদের মঙ্গল হোক—এই আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি । আমি এখানেই শেষ করছি ।

বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ ।
পতিতানাং পাবনেভ্যো বৈষ্ণবেভ্যো নমো নমঃ ॥

 

 

 


 

 

← ফিরে

সম্পূর্ণ পাঠ ডাউনলোড / শুনুন
(16.4 Mb, 40 min)

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥