![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
গুরুদেবের আবির্ভাব তিথি (সন্ধ্যা)
শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁবিষ্ণুপাদ
(১) ভগবানকে জানা, ভকগবানকে প্রীতি করা আজকে আপনারা শ্রীলগুরুমহারাজের তিরোভাব উৎসব ঠিকমত পালন করেছেন । আমার খুব আনন্দ হয় যখন আমরা গুরুদেবের উৎসব শুষ্ঠভাবে, সুন্দরভাবে পালন করতে পারি । আপনারা চলে এসেছিলেন আর যে ভাবে সেবা করেছেন, কেউ অংশ গ্রহণ করেছেন, কেউ সেবা না করতে পেরে এখানে বসে হরিকথা শ্রবণ ও কীর্ত্তন করেছেন, এতেই আমার খুশি, এতেই ভগবান্ আপনাদের কৃপা ও মঙ্গল করবেন । এটাই আমি চাই যেন আপনাদের মঙ্গল হবে । আমি অত্যান্ত খুশি হই যে, গুরুদেবের সেবা ও উৎসব যারা ভালোভাবে অংশ গ্রহণ করে আসলেন । আপনারা সবাই এই তিথিকে অবলম্বন করে এখানে উপস্থিত হয়েছেন । আপনারা মনে করছেন, “উৎসব শেষ হয়ে গেছে, মহারাজ হয়ত বলবেন যে, চলে যান ।” না । এই উৎসবের পরে পরশুদিনকেও গুরুদেব সব সময় পালন করতেন : গুরুদেবের আবির্ভাব তিথি হয়ে যাওয়ার পরে আর এক দিন মাঝখানেতে পরের দিন, অর্থাৎ রবিবারে, প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের তিরোভাব তিথি । শ্রীল প্রভুপাদের ছবিটা ডান দিকে দেখতে পান । আপনারা অনেকে তাকে চিন্তা পারছেন না । গুরু-পরম্পরা সবায়ের বাড়িতে দেওয়া আছে তবে অনেকে তাঁদের নাম জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে না । অনেকে জয় দিতে পারে না । এগুলো শিখবেন ভালো করে । একবার করে যদি গুরুবর্গের জয় দেন, সেটা কাজ নয় । প্রত্যেক দিন গুরুবর্গের জয় দিলে তাতে আপনাদের হৃদয়ে ভক্তি বসানো হবে, প্রীতি পাবেন । অনেকে গুরুবের্গের জয় দিতে পারেন না : গুরুবর্গের নাম ভালো করে ধরে জয় দিতে পারে না । গুরুদেবের নাম বললে ভালো করে বলতে পারেন না । বাড়িতে স্ত্রী, পুত্র, স্বামী, বন্ধু-বান্ধব সবায়ের নাম আপনারা ভালো করে জানেন কিন্তু গুরুবর্গের নাম ভালো করে জানেন না । এমনকি হরেকৃষ্ণ নামও ভালো করে গাইতে পারেন না । যাকগে, গুরুদেবের উৎসবে আপনারা যোগদান করেছেন । শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের তেমনই তিরভাব তিথি পরশুদিনটা । সেদিনটা আমরা মঠে যারা থাকবেন তাদেরকে নিয়ে উৎসব করব । থাকুন, কোন আপত্তি নেই । যারা থাকবেন বাড়ি-ঘড় ছেড়ে দিয়ে এসে থাকতে তো বলি না কিন্তু কয়েক দিন থাকুন । মঠে থাকুর । এই সংসারটাকে নিজের সংসারের মত মনে করুন ।
বিষয়ে যে প্রীতি এবে আছয়ে আমার । (শ্রীগীতাবলী, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) কথার অর্থাটা বুঝুন । আমাদের বাড়ি, ঘর, স্ত্রী, পুত্র, বন্ধু-বান্ধবের প্রতি যেরকম আমরা স্নেহ ও প্রীতি করি, সেই প্রীতি যেন ভগবানের প্রতি হয় । সে দিন কবে হবে ? সে দিন ততদিন পর্যন্ত না হবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই সংসারে বারবার করে আসতে হবে । আজকে সাধুদের কথা শুনলেন । আমি একলা বললে না হয়, বিশ্বাস হয় না, কিন্তু সব সাধুরা এক কথাই বললেন, তাই তো ? কেউ কম বলেছেন, কেউ বেশি বলেছেন, কিন্তু সবাই একই কথা বলেছেন । আমরা এই সংসারে মায়াবদ্ধ হয়ে পড়েছি :
সংসার সংসার করি মিছে গেল কাল ।
কিসের সংসার এই, ছায়াবাজী প্রায় ।
দিন যায় মিছা কাজে নিশা নিদ্রাবশে । (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)
(২) সেবার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিন [একজন ভক্তকে] ওদেরকে বলে দাও : নটার সময় । নটার সময় ক্লাস দিতে হবে । একশোটা দেশ join (যোগদান) করবে । সেখানে নটা মানে আমাদের সন্ধ্যা নটা—ওদের সকাল নটা, আজকের দিনটা । আমাদের এগিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে । আবার কোন জায়গায় ওই সময় রাত দুটো । এইজন্য গুরুমহারাজ বলতেন, “শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠে সূর্য কখনও অস্ত যায় না ।” কি রকম ? আজকে এখানে সূর্যাস্ত, কালকে ওখানে সূর্যাস্ত ; আমাদের এখন সন্ধ্যা হয়েছে আর ওদের এখন সূর্যোদয় হয়েছে । লন্ডনে এখন দুপুর বারটা-একটা আর রাত নটা সময় আমেরিকাতে সকাল নটা হবে । ওরা ওখানে তখন পঠে বসবেন আর আমি তাদের সঙ্গে কিছু হরিকথা আলোচনা করব : গুরুদেবের সম্বন্ধে ইংরেজিতে বলব । আবার ওখানে সঙ্গে সঙ্গে যা যের দেশের ভাষা সেই দেশে তারা অনুবাদ করে দিচ্ছেন । আমি যে কথাগুলা বলছি, তারা আমার ভাষা থেকে সঙ্গে সঙ্গে পরিণতি করে নিচ্ছে । এই বাংলায়ওআজ যে বলেছি, ওরা সব রেকর্ডিং তুলেছে আর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিতে হয়ে আবার ওয়েবসাইটে (scsmathinternational.com) চলে গেছে । যা আমি আজকে বলেছি, সব কথাগুলো, আপনাদের উৎসব, আপনাদের ছবিগুলো, আপনাদের ফটো, আপনারা ওয়েবসাইটে সব দেখতে পারবেন । সারা পৃথিবীর লোক দেখছে আজ এখানে কত লোক হয়েছে, কত লোক প্রসাদ পেয়েছে, কত লোক কি করেছে, সারা পৃথিবীর লোক ওয়েবসাইটে এখনই চলে গেছে । আজ ফটোগুলো দেখে সবাই আমাকে ফোন করে বলছে, “এত লোক হয়েছে !” এই জন্য গুরুদেব বলতেন, “শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠে সূর্য কখনও অস্ত যায় না ।” এই সূর্য অস্ত মানে এখানে সূর্যাস্ত, ওখানে সূর্যোদয় । দুপুরে আমাকে ঘরে বসে সারাক্ষণ ফোন-টোন ধরতে হল কারণ আমি সারা সকাল ফোনটা off রেখেছিলাম আর যখন চারটায় ফনটা খুলে দিয়েছে, তখন অনেক missed call (মিসড কল) দেখেছি । বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক call (কল) এসেছিল, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম । আর রাত নটার সময় আবার দুঘন্টা পঠ দিতে হবে, রাত এগারো পর্যন্ত চলবে । সব দেশের লোক কিছু কিছু আমার কাছে প্রাশ্ন করবে, তারা সব জানতে চাইবে । তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে । রবিবার দিনও প্রভুপাদের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে পঠ দিতে হবে । প্রত্যেক রবিবার এমনি পঠ দিই । সেইভাবে এই শ্রীচৈতন্য সারস্বত মঠ শুধু আপনাদের কয়েকজন পশ্চিমবঙ্গের লোক নিয়ে নয়—সারা পৃথিবীর লোক নিয়ে । সারা পৃথিবীর লোক নিয়ে আমাকে চলতে হয়, সারা পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্য করে কথা বলে হয় । যে যেরকম লোক, তাদের সঙ্গে সেইরকম ব্যবহার করতে হয় । গুরুদেব সারা পৃথিবীতে গিয়ে বীজগুলো বুনিয়ে দিয়েছেন । প্রথম ISKCON-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ লাঙ্গল চষে দিয়ে এসেছেন, তারপর গুরুদেব সেখানে গিয়ে বীজগুলো বুনে দিয়েছেন, আর তার ফলে আমরা এখন এই ফসলগুলা (ফলগুলা) পাচ্ছি । ওখান থেকে হরিকথা শুনতে শুনতে তারা এই পঠে এসে দিক্ষা নেয় । আমরা এখান থেকে দিক্ষা দিই । যেহেতু আমি বিদেশে যেতে পারচ্ছি না আর এখন লকডাউনও বাহিরে, সেহেতু তারা এই ভাবে দিক্ষা নেয় । আমি টিভির সামনে থাকি । এখানে আমাদের TV (টিভি) নাই কিন্তু কলকাতায় বড় TV screen (টিভি স্ক্রিন) লাগানো থাকে, তাই আমি টিভিতে সব দেখতে পাই । আর এখানে খুব ছোট ছোট দেখা যায় । আমি আগে মালা জপ করে পাঠিয়ে দিই আর ওখানে একজন যে মঠের in charge (ইন চার্জ—দায়িত্বে) থাকেন, সে ওখান থেকে তাদেরকে মালাটা দিয়ে দেয় । কোন মঠ থেকে পাঁচজন দিক্ষা নিল, কোন মঠ থেকে সাতজন দিক্ষা নিল, কোন মঠ থেকে দুজন দক্ষা নিল । এইরকম করে লকডাউনের মধ্যেও সহে সহে গুরুদেবের চরণে আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে । আমরা মালা পাঠিয়ে দিচ্ছি । কিছু দিন পোস্ট অফিস বন্ধ ছিল, প্লেনও বন্ধ ছিল, তখন খুব সমস্যা ছিল । তবে এখন পোস্ট অফিস চালু হয়েছে, মালা এখনও পাঠাতে হচ্ছে । এখন মালা যায় আর আমরা সঙ্গে সঙ্গে skype-এ programme (প্রোগ্র্যাম) করি । সবাইকে আপনারা চেনেন : শ্রীল জনার্দ্দন মহারাজ, শ্রীল আশ্রম মহারাজ আর অনেক বড় ভক্তেরা, তাদের সবাইকে আপনারা চেনেন কেনান তাদের সঙ্গে প্রত্যেক দিন নিয়ত সামনে সামনে যোগাযোগ হয় zoom-এর বা skype-এর মাধ্যমে । সেই ভাবে এই সারা পৃথিবীতে গুরুদেব ১৩০ মত মঠ করে দিয়ে গেছেন, আবার গুরুদেব চলে যাওয়ার পর আরো অনেক centre (কেন্দ্র) হয়েছে, বঙ্গেও হয়েছে, বঙ্গের বাহিরেও হয়েছে । এইভাবে গুরুদেবের কৃপা যদি থাকে গুরুদেবের সেবার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে । মন, প্রাণ, সমস্ত উজাড় করে দিতে হবে । কবে এই আমাদের দেশীয় ভক্তগণ সেটা বুঝতে ও করতে পারবে ?
(৩) ভাগবনের বাড়িতে সব দেশে বড় বড় নদী আছে কিন্তু এই গঙ্গা ও যমুনার মত নদী নাই । আজকে শ্রীল বোন মহারাজ বলেছেন, আপনারা তাঁর কথা শুনেছিলেন । গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী—এই নদী কথাও নেই । সারা পৃথিবীতে ভূমি আছে কিন্তু ভাগবন্ আবির্ভূত হয়েছেন এই ভারতভূমিতে আর কোন জায়গায় আবির্ভুত হন নি, হবেনও না । ভারতের মনুষগুলো ধর্ম্মপরায়ণ বলে ভাগবন্ জগতে বারবার আসেন এখানে । এবং সেই ভারতের মধ্যে কলিকালে এই পশ্চিমবঙ্গ এবং নদীয়াতে, নবদ্বীপে, মায়াপুরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভুত হয়েছেন । কত সৌভাগ্য আপনাদের, বলুন ! কী বলবেন ! কী দেখবেন ! কী বুঝবেন ! খালি মায়াপুরে ঘুরতে যাবেন আর ঘুরতে গিতে মেলায় গিয়ে নাতি-পুতির জন্য জিনিস কিনবেন আর দালান বাড়ি ও মন্দির দেখবেন । আর কী দেখবেন ? শ্রীল শ্রীধর মহারাজ বলতেন, “এটা eye-exercise (চোখের ব্যায়াম) ।” আপনারা চোখের ব্যায়াম করে আসেন । চোখের কিছু ব্যায়াম হয়—দেখে কী বুঝবেন, বলুন ? দেখে কী কিছু বঝা যায় ? সাধুকে কি দেখে চেনা যায় ? সাধুকে কাণ দিয়ে দেখতে হয় ! সাধুকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না । আর ধাম কী দিয়ে পরিক্রমা করতে হয় ? জানেন ? পা হেটে নয় । ধাম-পরিক্রমা করতে হয় মাথা দিয়ে । ধামের পদধূলি মাথায় নিতে হবে । যেখানে আমরা বসে আছি, সেটা হচ্ছে নৃসিংহপল্লি বা দেবপল্লি । এখানে ৩৩০,০০০,০০০ (তেত্রিশ কুটি) দেবতা বিরাজ করেন । দেবপল্লিতে তেত্রিশ কুটি দেবতা আসেন আর আপনারা জানেন যে, প্রত্যেক মঠের পরিক্রমা এখানে আসেন । আমরা নবদ্বীপে যখন জল-মন্দিরে ছিলাম, তখন পরিক্রমার তিন দিনের দিন আমরা এখানে আসতাম । কিন্তু এখন তো বহু ভাগ্যের ফোলে, “বড় কৃপা করি গুরুদেব গোদ্রুমে দিয়েছেন স্থান ।” গুরুদেবের কৃপায় আপনাদের সবার থাকার জন্য গোদ্রুমে একটা জায়গা করা হচ্ছে । কষ্ট হলেও আপনারা আগে নাট-মন্দিরে থাকতেন কিন্তু এখন আপনারা দেখছেন যে, আস্তে আস্তে করে সব হচ্ছে । একদিনে তো সব ঘুরে উঠে না । যেমন ইতালির rome (রোম) শহর আছে, শহরটা এত সুন্দর কিন্তু সেই সুন্দর শহর রোমও একদিনে তৈরি হয় নি—আস্তে আস্তে করে তৈরি হয়েছে । এখানেও সেরকম আস্তে আস্তে করে সব কিছু হয়েছে । জল-মন্দিরে আমি যখন প্রথম এসেছিলাম, আমি কোন দালান মন্দির বা দালান কিছু দেখি নি । তখন পরম গুরুমহারাজের একটা ঘর ছিল, গুরুদেবের ঘর ছিল, বাঙ্গালীর দোতলা বিল্ডিং ছিল, আরো বিদেশের ব্রহ্মচারীর বিল্ডিং ছিল । যে গোবিন্দ কুণ্ডে মন্দির, পাঁচতলা বিল্ডিং, চারতলা বিল্ডিং এখন দেখছেন, ওখানে আগে সব লোক পায়খানা করত । আমি যে চারতলায় থাকতাম, সেখানে লোক গোলাপ ফুলের চাষ করত । এখন দুখানা চারতলা বিল্ডিং ধারি আছে, গোশালাও বাড়িয়ে গেছে । আর প্রথম গোশালা শূন্য দেত্তয়াল ছিল । যেমন আপনারা একটা ঘর তৈরি করলেন । ঘরে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, স্বামী নিয়ে শান্তিতে থাকলে সেইটাকে ঘর বলা হবে, সংসার বলা হবে । তাই না ? আর যদি সেই সংসারের শান্তিই না থাকে, সংসারে যদি অশান্তি থাকে, সে ঘরটাকে কি করে ঘর মনে হবে, বলুন ? সে ঘরটাকে ঘর মনে হবে ?? কখনই মনে হবে না । সে ঘরটা ঘর নয় । সেখানে কাঠ, ইট, পাথর ধারিয়ে থাকবে, কিন্তু ঘুমলেও কোন শান্তি নেই । ওই শান্তিটা আপনারা এখানে পাবেন । কেউ আপনাকে ধরতে আসবে না । কেউ আপনাকে মারতে আসবে না । কেউ আপনাকে গালাগালি দিতে আসবে না । কেউ আপনাকে কথা বলে আসবে না । সুন্দর এখানে পরিবেশ । আপনারা দেখছেন যে, কাল থেকে বা পরশুদিন থেকে ভক্তেরা আসছেন, দেখতে পার্ছেন যে, সর্ব্বক্ষণ হরিকথা । আজকে একটা মোটা বুড়ী আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল, “কেন এই সব পাঠ-কীর্ত্তন ? এটা কি আপনার বাড়ি না কি ?” এটা তো মন্দির ! এখানে সাকল-সন্ধ্যা প্রত্যেক দিনেই পাঠ-কীর্ত্তন হয় । ঠাকুরের ভোগ ও আরতি যেভাবে আপনারা নিজের ঘরে করছেন, সেইভাবে এখানে আরতি, পরিক্রমা, ইত্যাদি প্রত্যেক দিনেই হয় । এখানে সব কিছু হয়, হয়ত ঘরে লোক কম আর এখানে লোক বেশি । তাই এটা নিত্য-সেবা এখানে হয় । এখানে এসব বন্ধ হয় না কি ? সব মঠে একই চলে । সব মঠে নিত্য-ভোগ হয়, নিত্য-পাঠ-কীর্ত্তন হয়, নিত্য-আরতি হয়, সব কিছু হয় । সব মঠে সবটা প্রত্যেক দিনই চলে । মন্দির অন্য গৃহস্থ-বড়ির মত নয় তো ! যে ৮টা বা ১০টা সময় আমি ঘুম থেকে উঠলাম, তারপর ঠাকুরকে আমি জাগালাম, আর যখন সময়, তখন ঠাকুরকে গিয়ে তালা করলাম । এটা গৃহমেধির লোকের কাজ নয় ! আমাদের নিয়ম এটা : ভোর ৪টা উঠতে হবে, উঠে মন্দরি জাগাতে হবে, ঠাকুরকে বাল্যভোগ দিতে হবে, আরতি করতে হবে, পাঠ-কীর্ত্তনে বসতে হবে, অর্চন করতে হবে, ভোগ দিতে হবে, তারপর প্রসাদ পেতে হবে সকালে । প্রসাদ পাওয়ার পরে যে যার মঠের সেবা আছে, সেটা করবেন । দুপুরে আবার ভোগ দিতে হবে, ভোগারতি করতে হবে, তারপর মন্দির বন্ধ করে ঠাকুরকে শয়ান দেবেন । আপনারাও দুপুরে প্রসাদ পেয়ে বিশ্রামে যেতে পারেন । বিকাল বেলা আবার উঠে মন্দির ও ঠাকুরকে জাগিয়ে আর সন্ধ্যা সময় সন্ধ্যারতি ও পরিক্রমা করতে হবে । আবার সন্ধ্যা সময় পাঠ-কীর্ত্তনে বসবেন । রাত্রে আবার ভোগ দিয়ে ঠাকুরকে শয়ান দিতে হবে । এইটা নিয়ম ।
(৪) প্রচারকের প্রকৃত স্বভাব [যে একজন ঘুনিয়ে যাচ্ছে, সেটা লক্ষ্য করে শ্রীল গুরুমহারাজ বলছেন] ঘুমেয়ে যাচ্ছ ! তুমি আমার গেটের সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেছ । কালকে বলেছিলাম যে, আমি প্রণাম-নেওয়ার গুরু নই, প্রণামী-নেওয়ারও গুরু নই । আমি তা বলেছি । আমি ওই সব প্রণাম-নেওযার জন্য বা প্রণামী-নেওয়ার জন্য কার জন্য বসে থাকি না । আমি একটু কথা বলে বিশ্রাম করছিলাম আর তুমি ওখানে গিয়ে দরজা খড়খড় করছ । কী ? তাই না ? তুমি করেছ না ? আমি আওয়াজ পেয়ে বুঝতে পেরেছি । আমি জানি । আমি তোমার কথা শুনতে পেরেছি । ওইভাবে হয় না । গুরুদেবও এগুলো বলতেন । গুরুদেব কি বলতেন আপনারা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন । গুরুদেব বলছেন এই বিদেশ থেকে যে ভক্তরা আসে, এর মধ্যে তিন প্রকার ভক্ত আছে । আপনাদের মধ্যেও আছে (আপনাদের মধ্যে তো বেশি আছে) । তিন প্রকার ভক্ত আছে—কী রকম জানেন ? বলব ? বললে একটু মন খরপ হয়ে যাবে, বলবেন, “সর্ব্বনাশ !” বলব ? গুরুদেব কী বলেছেন, সেটা শুনুন । গুরুদেব বললেন, “এই যে বিদেশীদেরকে দেখছেন না ? এর মধ্যে তিন প্রকার ভক্ত আছে । কী করম ? ওরা বিদেশ থেকে এসে প্লেন (বিমান) থেকে নেমে অনেক কিছু আমার জন্য কিনে নিয়ে আসে । ত্রিশখানা ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে আসে । কিন্তু সব ভক্ত একরকম নয়, আর সবকিছু যেমনটা মনে হয় তেমনটা নয় । কেউ এসে গুরুর সেবা করে (তারা গুরুসেবী), কেউ এসে ভক্তি দেখায় কিন্তু কিছুক্ষণ পর গুরুকে ছেড়ে দেয় (তারা গুরুত্যাগী); আর তিনটা শ্রেণি ভক্ত হচ্ছে যারা এসে গুরুকে ব্যবহার করে (তারা গুরুভোগী) ।” একজন শিষ্য ইন্টারনেটে খুঁজে আমার জুতার দাম দেখেছিল । আমি যা জুতাগুলো পড়ি, সেগুলা কত করে দাম জানেন ? ৫-৬০০০টাকা । এগুলা ওরা পাঠায় আমার জন্য । এই জ্যাকেটটাও । সব তো ডাকাতি করে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর ওরা আবার সব পাঠিয়েছে । এইসব দেশী জিনিস কিছুই নয় । আমি তা নিজের পায়সা নিয়ে কিনি না । একটা সাবানও নিজের পায়সায় কিনি না । একটা সাবান, দাঁতের paste (পেস্ট) বা দাঁতের মাজনের brush (ব্রাশ), তাও ঠাকুর ও ভাগবনের পায়সা দিয়ে কিনি না । কোন দিন কিনিও না, আজ পর্যন্ত কিনতেও হয় নি । কেউ দশটাকা আমার জন্য দেন, তা দিয়ে একটাও পেস্ট বা ব্রাশ কিনতে না হয় । আমি ওই সব কোন দিন কিনি না । তবু আমি একটা জিনিস খরচা করি, সেটা হচ্ছে গাড়ির তেলটা কারণ আমাকে প্রচারে যেতে হয় । লোকে পায়সা দিল বা না দিল, লোকে কে প্রণামী দিল না দিল, তা বয়ে গেল । আমি প্রচার করতে যাব । গাড়ির তেল খরচা যদি সে দেবে, দেবে, আর না দেয়, না দেয় । আমার পকেটের খরচা দিয়ে (গুরুদেবের খরচা দিয়ে) আমি প্রচার করব । প্রচারের জন্য আমি খরচা করব । বইও ছাপিয়ে দেব । কেউ দিল না দিল, আমার কিছু ক্ষতি হয়ে না । আমি কার বাড়িতে গেলাম, সে আমাকে গাড়ির জন্য তেল খরচা দিল না দিল, সে বয়ে যায়, আমি গুরুদেবের খরচা করে তেল কিনব । গুরুদেব বলেছেন, “প্রচারের জন্য খরচা করো । যদি প্রয়োজন থাকে ধার করে খরচা করো !” শ্রীল প্রভুপাদও বলেছেন, “টাকা ধার করে প্রচার করো । আর যখন লোক তোমাদেরকে ড়ের-এক টাকা দেবে, তখন তোমরা ভিক্ষায় বেরবে ওই টাকা শোধ করার জন্য কারণ লোকটা দাবি করবে, ‘আমার টাকা কখন ফরত দেবে ? আমার টাকা দাও ! টাকা দাও !’ তখন ভিক্ষায় বরবে ওই টাকা শোধ করার জন্য ।” এইটা হচ্ছে নিয়ম । এইভাবে প্রচার করতে হবে । প্রচারের জন্য আমরা লাখ-লাখ টাকার বই ছাপিয়ে দিচ্ছি । এবারও পাঁচলাখটাকার বই ছাপিয়েছি । কত বই নিয়েছে আর লোকে এমনি দিই মাঝে মাঝে, “নিয়ে নাও ! কম দামে নিয়ে নাও ! ছাপার খরচা না দিতে পারলে এমনি নিয়ে যাও, বাড়ি গিয়ে পড়ো !” কিন্তু বাড়িতে রেখে দিও না—পড়ো ! পড়লে কাজে লাগবে, কিছু মঙ্গল হবে । এভাবে আমরা প্রচার করি । গাড়ির তেল খরচাটা আমি করি । মাসে একলাখটাকা গাড়ির তেল খরচা আছে, সেটা আমি করি কারণ এইটা আমার প্রচারের জন্য । আমাকে যেতে হয়—বিভিন্ন জায়গায় হরিকথা প্রচার করতে হয়, বিভিন্না মঠে যেতে হয় ।
(৫) স্পষ্ট দৃষ্টি সবায়ের লকডাউন (lockdown) হয়েছে কিন্তু আমার কোন দিন লকডাউন হয় নি । আমার গাড়ি চলছে । লকডাউন সরকারের হয়েছে, আমার কিছু লকডাউন হয় নি । যার লকডাউন হক, তার হবে, আমার লকডাউন হবে না কারণ আমি তো প্রচারক—আমি লোকের দ্বারে দ্বারে গিয়ে মহাপ্রভুর কথা প্রচার করব । যারা শুনতে না চাইবে, যারা গালাগালি দেবে, যারা দরজা বন্ধ করে দেবে, তাদের দরজায় আরও দশবার করে ধাক্কা মারব । এই কাজই আমার । সবায়ের দরজায় আমি দশবার করে যাব, বলব, “চলো ! যেতে হবে । তোমাদের হরিনাম করতে হবে ! ভিখারি মানুষ হয়ে আমি তোমাদের কাছে এই ভিক্ষা চাই : কৃষ্ণ বল, সঙ্গে চল, এই মাত্র ভিক্ষা চাই । আরও ভিক্ষা চাই যে, তোমরা আমাকে আশীর্বাদ করো যাতে আমার একটু কৃষ্ণভক্তি হয় । তোমাদের বাড়ি দশবার করে যাব, দাবি করব—তাড়ালেও যাব, আবার মারলেও যাব, লাঠি মারলেও যাব, ঝাঁটা মারলেও যাব । তোমাদেরকে আসতেই হবে এই পথে ।” বারবার করে যাব এবং বারবার করে সেটা বলব । এইটা হচ্ছে আমার কথা । যতদিন জীবন থাকবে, ততদিন এইভাবে আমি মহাপ্রভুর কথা প্রচার করব । “প্রাণ আছে যার সেই হেতু প্রচার ।” প্রভুপাদ বলেছেন, “প্রাণ আছে যার সেই হেতু প্রচার ।” যখন প্রাণ চলে যাবে, তখন প্রচার আর থাকবে না । যতদিন প্রাণ থাকবে, ততদিন পর্যন্ত প্রচার করতে হবে । কথা বলতে বলতে গুরুদেবের মুখ দিয়ে রক্ত বেরে—তাঁর সেবকের হাত ধরে রক্তগুলো ধরছেন । রক্ত পড়ছে তবু তিনি হরিকথা বলে যাচ্ছেন । আপনাদের রক্ত পড়লে শুয়ে হাসপাতালে ভোর্তি থাকবেন । আর গুরুদেব কথা বলছেন—রক্ত পড়ছে আবার কথা বলে যাচ্ছেন । গলা চলে যাচ্ছে কীর্ত্তন করতে করতে, কথা বলতে বলতে কিন্তু তিনি ভগবানের কথা বন্ধ করেন নি ! এইরকম ছিলেন আমার গুরু এবং তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি । তিনি আমাকে আশীর্বাদ করেছেন, সুতরাং আমি তো সেভাবেই হব । তার অন্যটা তো কিছু করব না । আমি শরীরের চিন্তা করি না । শরীরটা ভগবানের জন্য নিয়োজিত করেছি, তাই শরীর ভগবান্ দেখবেন । একদিন তো মরতে হবেই, তাই না ? মরণ বা জীবন থেকে কেউ আমাকে রক্ষা করবে না—ভগবান্ রক্ষা করবেন । আয়ুটা গুরুদেব ও ভগবান্ দেবেন । যদি তিনি বলেন যে, “তোমার থাকা উচিত” আমরা থাকব, আর যদি বলেন যে, “থাকা উচিত নয়” তখন আমরা চলে যাব । সুতরাং ঘরে বসে থাকলে কোন লাভ নেয় । সেইভাবে প্রচার করতে হবে । আপনাদেরও সেইভাবে উদ্যমশীল হতে হবে । মঠটা তো আমার একাই নয়, আর আমি তো কইদিন থাকব ? আপনারাই থাকবেন । আপনারাই আসবেন । এইজন্য সব সময় গুরুদেবের প্রতি একটু স্নেহ, ভালোবাসা থাকতে হয় । মাঝে মাঝে মঠে আসতে হবে—দুদিন, পাঁচদিন, সাতদিন, দশদিন থাকতে হবে । এত চিন্তা কিসের ? বলতে হবে কেন,“গুরুদেব, এবার সাতসিন এসে থাকব” ? একটা মেয়ে আমার কাছে এসে বলল, “গুরুদেব, আমি সাতদিন থাকব ।” আমি বললাম, “সাতদিন কেন ? সত্তর বছর থাকো !” এখানে থাকলে তো বেশি আয়ু পাবেন । বাড়ি থাকলে চেলের চিন্তা করবেন, এই চিন্তা করবেন, সেই চিন্তা করবেন । ওই সাব বাদ দিয়ে এখানে থাকুন, হরিভজন করুন, ঠাকুরের চিন্তা করুন । আরও বেশি আয়ু পাবেন । বাড়ি থাকলে ওইসাব চিন্তা করবেন, বরং এখানে থাকুন, ভগবানের নাম করুন, হরিনাম করুন, সেবা করুন—এখানে ভালো থাকবেন । কন্তু, না, “সাতদিন থাকব ।” কেন বলতে হবে যে, “সাত দিন থাকব” ? আপনাদের বাড়ি এটা ! এই সব ঘর-বাড়ি করেছি কী আমার জন্য ? আমার কী কোন ভাই, বন্ধু, স্ত্রী, স্বজন, বান্ধব আছে ? আমার কী কোন সংসার আছে, বলুন ? আপনারাই তো আমার সংসারের লোক । আপনারা এখানে না থাকলে কে থাকবে ? আপানারাই থাকবেন । এই বাড়িতে যারা হরিভজন করবেন, তারাই থাকবেন । আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন তো আপনারা ! আমার নিজের ভাইয়ের সঙ্গে আমি কথা বলি না । ভাই আমাকে মাঝে মাঝে disturb (বিরক্ত) করে, আমি তাকে বললাম, “তোরা স্বজনাখ্য দস্যু ।” আমি direct (সরাসরি) বলি । ও বলছে, “আপনার পিতাঠাকুরের একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ।” আমি বললাম, “এটা হবেই ।” আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, ও আমাকে একটাকা দয়ে বলল, “বিড়ি আনতে হবে ।” আমি স্কুলে এক ঘন্টা ধরে হেঁটে হেঁটে যেতাম কাদা রাস্তা দিয়ে । রাস্তাই ছিল না—কাদার মধ্যে যেতাম । আমি half-প্যান্ট পড়ে স্কুলে যেতাম (full-প্যান্টের সময় যুগ ছিল না, half-প্যান্ট পড়তাম) । ওই দিন স্কুলে গিয়ে কাদায় পড়ে গিয়েছি আর ওই একটাকা কোথায় পকেট থেকে পড়ে গিয়েছে । আমার বিড়ি-টিড়ি আনার কথা মনেও নেয়, আর টাকার কথা মনেও নেয় । কিন্তু ও আমাকে এমন মার দিয়েছে যে আমি ‘বাপের নামে ভুলে গিয়েছি’ ! সে বিড়ি খেয়ে এখন বলছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে—আমি বললাম, “এটা হবেই । শ্বাসকষ্ট ? ভালোই হচ্ছে !” শ্বাসকষ্ট হক । তাদের কষ্ট পাবেই । আমার দুঃখ নেই—আমার ওইসব নিয়ে কখনও কোন দুঃখ, কোন যন্ত্রণা নেই । আমি ভাইকেও বলি, “তোরা হচ্ছে স্বজনাখ্য দস্যু ।” “স্বজনাখ্য দস্যু” মানে দেখতে স্বজন কিন্তু দস্যু । “তোমার কাছ থেকে কি করে নেব ? ভগবানের কাছ থেকে কি করে নেব ?”—এই বুদ্ধি তাদের । এইজন্য ওরা স্বজনাখ্য দস্যু : যারা আত্মীয়-স্বজন আছে, তারা হচ্ছে স্বজনাখ্য দস্যু । এরা ডাকাতি করে আপনাদের কাছ থেকে জোর করে সব নিয়ে নেবে । এটা সবসময় মনে রাখতে হবে । আর ভগবানের ভক্তরা কখনও দস্যু হয় না—তারা আপনাদেরকে কৃপা করবার জন্য আপনাদেরকে সব কিছু ব্যবস্থা করে দেন ।
(৬) স্পষ্ট আত্মাবুদ্ধি আপনারা হরিভজন করবেন । আপনাদের স্ত্রী, পুত্র, বন্ধু-বান্ধব, সূত-পরিবার—এই সব তো ক্ষণস্থায়ী জিনিস, তাই না বলুন ? নিজেতে আত্মাবুদ্ধি নেয় । একজন আমাকে বলছে, “আমি ব্রহ্মচারী !” মহাপ্রভু বলেছেন :
নাহং বিপ্রো ন চ নরপতির্নাপি বৈশ্যো ন শূদ্রো (শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত, ২/১৩/৮০) “আমি ব্রহ্মচারী নই, আমি সন্ন্যাসী নই, আমি ক্ষত্রিয় নই, আমি বৈশ্য নই । আমি কী ? আমি দাসানুদাস । দাস, দাস, দাস, তার দাস !” এইটা মহাপ্রভু বলেছেন । কিন্তু অনেকের আত্মাভিমান এখনও যায় নি, বুদ্ধি নেয় । এমনি ওই ছেলে ভালো, কিন্তু বোকা-বোকা কথা বলে মাঝে মাঝে । ও কাপড় দেখাচ্ছে ও বলছে, “আমি তো ব্রহ্মচারী !” আমি ওকে বললাম, “কাপড়টা তো এখনই ওকেও পড়ে দিতে পারি, তাহলে কি ও ব্রহ্মাচারী হয়ে যাবে ?” আমাদের তো এই পোশাক দেখে পরিচয় নয় বা বর্ণ দেখে পরিচয় নয়—আমাদের আচরণ দেখে পরিচয় । একজন ** প্রভুকে জিজ্ঞেস করল, “প্রভু, আপনি একরম বাসন মাজছেন শীতকালে, আপনার কী ঠান্ডা লাগছে না ?” ও বলল, “না ! আমি বৈষ্ণব ! আমার কেন ঠান্ডা লাগবে ?” তখন ওইজন আমার কাছে এসে বলল, “ওর মাথায় শীত আছে, তাই একটু পাগল হয়েছে ।” ও বলল যে, বৈষ্ণব হয় বলে ওর ঠান্ডা লাগছে না—আরে বাবা ! তাহলে যে সবাই জ্যাকেট বা কোট পড়ে এখানে এসেছে, ওরা কেউ বৈষ্ণব নয় ?? আমরা তো নিজেকে বৈষ্ণব বলি না । বৈষ্ণব কখনও নিজেকে বৈষ্ণব বলবে না । যত বৈষ্ণবতা আছে, তত দৈন্যতা আছে ।
তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা । (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ৩/৬/২৩৯)
‘আমি ত’ বৈষ্ণব’, এ বুদ্ধি হইলে (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রলি ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) যদি এই বুদ্ধি হয়ে যায়, আমরা অপরকে সম্মান করতে পারব না (অমানী না হ’ব আমি) । একদিন ** প্রভু আমাকে ফোন করে বলল, “দণ্ডবৎ, আমি ** প্রভু বলছি ।” গুরুদেব কী বললেন, জানেন ? গুরুদেবকেও একজন শিষ্য ফোন করে বলল, “আমি অমুক প্রভু বলছি”, তখন গুরুদেব তাকে ফোনে বললেন, “হ্যাঁ, প্রভু, দণ্ডবৎ । আমি আপনার দাস গোবে বলছি ।” বুঝতে পারছেন ? গুরুদেবের নামটা গোবিন্দ—তিনি বুঝিয়ে দিলেন, “এখন তো সবাই আমাকে ‘গোবিন্দ মহারাজ’ বলে ডাকে কিন্তু গুরুমহারাজ আমাকে সন্ন্যাস না দিয়ে এই আচার্য্য না করতেন, আমি তো বামুনপাড়ার গোবেই থাকতাম ।” তাহলে কার এই সব ?… আর একজন গোবর্দ্ধনে আছে । সে আমাকে বলছে, “আমি এখন বাড়িতে যাব । ওদেরকে প্রণামী (টাকা) দেব ।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “লোকডাউন এখন, তুমি এসব টাকা কোথায় পেয়েছ ?” ও বলছে, “যারা আমাকে বিভিন্ন উৎসবে নিমন্ত্রণ করতে আসে, তারা আমাকে প্রণামী দেয় । আমি ওই প্রণামীগুলা কী করব ? ।” আমি বললাম, “তাই না কি ?? প্রণামীগুলা কী করবে ??” সেগুলা বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় ! গুরুদেব একটা কথা বললেন, আমি সেটা সকালে সবায়ের সামনে বললাম না । গুরুদেব সংসারে গিয়েছেন আর তার সম্পর্কে তিনি বললেন, “আমি তো পাক্কা পায়খানা করেছি । আর মঠে অনেক ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসীরা থাকে, তারা কাঁচাপায়খানায় পায়খানা করে ।” এই কথা গুরুদেব আমাকে বলেছেন । কথাটার অর্থ বোঝেন ? গুরুদেব বললেন, “লোকে আমাকে নিন্দা করে বলে যে, আমি মঠ ও সন্ন্যাস ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করেছি । আর মঠে সন্ন্যাসীর কাপড় পড়ে বা ব্রহ্মচারীর কাপড় পড়ে, তারা একটা করে মেয়ে রাখে আর উপরে দেখায় যে, ওরা সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারী ।” এইটা গুরুদেবের মূল কথা । “আমি তো পাক্কা পায়খানা করেছি আর আনেকে যে কাঁচা পায়খানা করে, সেটা দেখতে পায় না কেউ ?” আপনারা গুরুদেবের কথাগুলা একবার শুনেন নি । আমি কাছে থেকে শুনেছি । তিনি যে দুই-একটা কথা চোকাচোকায় আমাকে বলেছেন, সেইটাই আমি মনে রেখে দিয়েছি । সেটা তো সবায়ের সঙ্গে বলতে যায় না । এইরকম ছিলেন আমার গুরুদেব । তিনি কাউকে ছাড়তেন না । আমাকে চোকাচোকায় সব সময় বলে দিতেন কি করে সেবা করতে হবে, কি করে রান্না করতে হবে, কি করে ভগবানের সেবা করতে হবে, কি করে ভোগ লাগাতে হবে । আপনারাও দেখেছেন আমার কাছে যারা থাকেন তারা কি করে সেবা করে । আমার যদি কীর্ত্তন করে জলের তৃষ্ণা লাগছে, তাদের বলতে হয় না যে, আমি জল চাই । তারা বুঝে যায় যে, “মহারাজের জলের তৃষ্ণা পেয়েছে” আর জল ধারিয়ে যায় । তারা কি করে সেবা করে ! আমার এত বড় চুল হয়ে গেছে, আমি শিখাটা আর বাঁধতে পারি না—এই প্রভু সেটা আমাকে বেঁধে দেয় । Daily (দৈনিক) আমাকে ৩০খানা ট্যাবলেট খেতে হয় । জানেন সেটা ? কিন্তু আমাকে দেখলে মনে হয় যে আমি এত অসুস্থ ? আমি নিজের মনের জোরে চলি আর ডাক্তার যা ওষুধ দিয়েছে আমাকে সেটা খেতেই হয় । গুরুদেবও খেতেন । গুরুদেব আমাকে সব দিয়েছেন আর তাঁর যত রোগগুলা ছিল, সবগুলো আমাকে দিয়ে গেছেন । গুরুদেব আমার হাত দেখে বলে দিয়েছিলেন যে, “আপনি এত চঞ্চল, আপনার তো ডায়াবেটিক হল বলে কথা ।” গুরুদেবের সময়ও আমার ডায়াবেটিস হয়ে গিয়েছিল । আর ডায়াবেটিস হয়ে গেল, তারপর কত কিছু হল । তবু তো এখনও খালি চোখে লিখি, খালি চোখে পরি । এখন দূর থেকে আরাতিগুলা দেখে একটু আবছা আবছা লাগছে । ডাক্তার বলছিল চশমা পরতে কিন্তু চখের মধ্যে এটা পড়তে সব সময় আমি পারি না । আমার বিরক্ত লাগে, “কী একটা পরেছি মাথার মধ্যে !” কোন দিন চশমা পরি নি । ৬০-৬২ বছর বয়স হয়ে গেল কিন্তু পরি নি কোন দিন । চোখের minus power (মাইনাস পাওয়ার) ছিল কলেজে পড়ার সময় থেকে, আজ থেকে ৪০ বছর আগে, কিন্তু এখনও চশমা পরি নি । এখনও চলছে । এখন দেখছি আরাতি সময় কিছু কীর্ত্তন পড়তে হলে একটু অসুবিধা হয়, এইজন্য চশমাটা পরি । কিন্তু কাছে, বই-টই পড়তে লাগে না । দূরে একটু অসুবিধা, পাওয়ারটা মাইনাস ১.২৫ হয়েছে । ডাক্তার বলছে, “এখন তো ৬০ বছর বয়স হল এবার একটা চশমা পরুন,” তাই মাঝে মাঝে গাড়িতে পড়লে একটু পরি । এমনি সবসময় পরি না । যদি বলি, “চশমা পরব,” বিদেশীরা দুলাখটাকা চশমা পাঠিয়ে দেবে আর দুলাখটাকা চশমা যাদি পরি, লোকে বলবে, “সাধু মানুষ দুলাখটাকা চশমা পরছে !” সবাই না চিনতে পারে, অনেকে তো চিনতে পারে । যখন কোলকাতায় জুতা পড়ে হাঁটি, সবাই আমার পায়ের দিকে তাকায় । আমি বুঝতে পারি : ওরা জানেন যে, এসব জুতাগুলো খুব দামি । কি আর উপায় ? উপায় তো কিছু নাই । আমার অন্য জুতা নেই—সব চুরি করে নিয়ে গেছে ; আমাকে যা দেওয়া হয়, সেটাই আমি পরি ।
(৭) গুরুদেবের কথা দ্বারা নিজেকে টিকিয়ে রাখুন অনেক গুরুদেব দিয়েছেন, অনেক গুরুদেব কৃপা করেছেন, তাই আমি আপনাদেরকেও বলছি যেন আপনারা এরকম গুরু-সেবা ও ভগবানের সেবা করতে পারেন । আমি সব সময় চাতক পাখির মত থাকিয়ে থাকতাম । আমি কি করে গুরু-সেবা করেছি, তার নিদর্শন—বাথরুমের মধ্যে যেখানে সাবান থাকে, সেখানে ফোনটা রাখতাম । কেন না ? আমি সব সময় বসে থাকতাম, “গুরুদেব কখন ফোন আসবে ? গুরুদেব কখন আমাকে এই খবরটা দেবেন ?” আমি সব সময় বসে থাকতাম । “গুরুদেব আমাকে কখন ফোন করবেন ?”… গুরুদেব বলতেন আমার দ্বারা কী সেবা হয় এবং আমি বুঝি গিয়েছি আমাদের দ্বারা কী সেবা হবে না হবে । আমি কখনও মন্দিরে উঠে যাই নি কারণ গুরুদেব আমাকে বললেন, “মন্দিরের পূজা আপনার দ্বারা হবে না ।” রান্নাগুলা বলেছেন কিন্তু বললেন, “রান্নাঘরে আপনার ঢুকা হবে না, রান্না করবেন না ।” আর দুটা জিনিস বলেছিলেন, “মোটরসাইকেল চালাবেন না” আর “বন্দুক কখনও হাতে নেবেন না কারণ আপনার উগ্র মেজাজ এইরকম যে, আপনি যখন তখন লোকে ঘা করে দেবেন ।” সেই জন্য তিনি বললেন, “বন্দুকের লাইসেন্স কখনও করবে না ।” আমি সেটা কথা মেনে চলেছি । কোন দিন বন্দুকের লাইসেন্সও করে নি—লোককে করে দিয়েছি কিন্তু আমি নিজে লাইসেন্স করি নি । কোন দিন মোটরসাইকেলও চালাই নি । গুরুদেব যা বলেছেন, সেটা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছি । যে যে কথা গুরুদেব আমাকে বলেছেন, আমি সবটাই শুনেছি । গুরুদেবের কথা আপনিও শুনিছেন । আরো অনকে কথা আছে : গুরুদেবের যে কথা, গুরুদেবের যে বিরল বিরল দৃষ্টান্ত, গুরুদেবের যে অমায়িক ব্যবহার, তাঁর যে “সাদা মিষ্ট হাসি” । কথাবার্তা যখন গুরুদেবের ছিল না, তখন তিনি এমন গম্ভীর ছিলেন, কথা কম বলতেন ; আবার যখন বলা শুরু করতেন, তখন রসিক কথা করে সব সময় খুব কথা বলতেন । সেই কথাগুলা এখনও ভালো লাগে । গুরুদেব কৃপা না করলে কবেই চলে যেতাম, বলুন ? কিন্তু গুরুদেব কৃপা করেছেন বলে এখন আপনাদের সামনে বেঁচে আছি আর আপনাদের সামনে বসে কিছু ভগবানের কথা আলোচনা করতে পারছি । এটাই আমার সৌভাগ্য । একটা ভিখারি মানুষ আমি । এই ভিক্ষাই আমাকে দেবেন যে, আমি যেখানে যাব আপনারা সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে চলবেন এবং যেন আমার কৃষ্ণভক্তি হয় । সেই আশীর্বাদ করবেন । আর আমিও আপনাদেরকে বলব সবাই : এক সঙ্গে চলুন । “কৃষ্ণ বল, সঙ্গে চল, এই মাত্র ভিক্ষা চাই ।” এক সঙ্গে থাকুন তাহলেই এই মায়ার জগৎ থেকে, এই মায়ার কারাগার থেকে উদ্ধার পেয়ে আমরা ভগবানের কাছে পৌঁছতে পারব । এই মায়ার কারাগারের মধ্যে আমরা পড়ে আছি, বিষয়-দুর্মতি ও সংসার-দুর্মতি হয়ে পড়েছি ।
আমার জীবন, সদা পাপে রত, (শ্রীশরণাগতি, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) এই আপনাদের কাছে প্রার্থনা : আপনারা সব সময় হরিভজন করবেন । এতেই আপানাদের ভালো থাকবেন । জয় শ্রীল গুরু মহারাজ কি জয় । এখন দুই-একটা কীর্ত্তন করি । বেশি কীর্ত্তন আজকে করব না ।
(৮) আন্তরিক পবিত্রতা [কিছুক্ষণ ধরে কীর্ত্তনগুলা করবার পর শ্রীল গুরু মহারাজ আবার পাঠ শুরু করছেন ।]
কৃপা কর বৈষ্ণব ঠাকুর । (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) আপনারা যে কথা শুনছেন, সে কথা মনে রাখবেন । আমি অনেক সময় এটা বুঝে দেই না, কিন্তু মর্যাদা শিখন উচিত । শাস্ত্রে বলা হয় :
গৃহী হউক ত্যাগী হউক ভক্তে ভেদ নাই । (শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত, ১৭/২২) আনেকে ভাব দেখিয়ে বলে, “অই ! আমি ব্রহ্মচারী আর তুমি গৃহস্থ ! আমি বড়, তুমি ছোট !” গৃহস্থ-ব্রহ্মচারীতে ভেদ কভু নাই, বেদ করিলে কুম্ভীপাক-নরকেতে যাই । বড় বড় সন্ন্যাসীরা যারা চৈতন্যমঠে ছিলেন প্রভুপাদের সময় (বাতোজন সন্ন্যাসী ছিল), তারা সবাই শ্রীল ভক্তিবিলাস তীর্থ মহারাজের কাছে গিয়ে তাঁকে ষষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেন । ওই সময় শ্রীল ভক্তিবিলাস তীর্থ মহারাজ মঠের সেক্রেটারি শ্রীপাদ কুঞ্জ বাবু (একজন গৃহস্থ লোক) ছিলেন, অনেক পরে তাঁর নাম ভক্তিবিলাস তীর্থ মহারাজ নামে হয়েছে । ওনাকে সবাই গিয়ে ষষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেন : গৃহস্থ লোককে সব সন্ন্যাসীরা গিয়ে প্রণাম করতেন । এটা প্রভুপাদের নির্দেশ ছিল যে, কুঞ্জ বাবুকে সবাই গিয়ে প্রণাম করবেন । সে গৃহস্থ, তাহলে প্রভুপাদ এটা কেন করেছেন ? শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের এগার সন্তান ছিল । আপনাদের কত সন্তান ? দুই-তিনটা, এর বেশি তো নয়, আর শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের এগার তো সন্তান ! তিনি সব সময় বলছেন, “এমন দুর্ম্মতি সংসার-ভিতরে পড়িয়া আছিনু আমি !” সংসার করে এত সুন্দর গ্রন্থ ও কীর্ত্তন তিনি রচনা করেছিলেন আর তাঁকে সবাই বড় বড় সন্ন্যাসীরা, বড় বড় বাবাজীরা নবদ্বীপ থেকে এসে প্রণাম করতেন । তাঁকে প্রণাম করতেন কেন ? কারণ তিনি প্রকৃত বৈষ্ণব ছিলেন । সবাই তাঁকে প্রণাম করে তাঁর কৃপা চাইতেন । এটা মনে রাখতে হবে । আপনারা যদি কাউকে হিংসা করেন, আপনারা যদি কাউকে ভালোবাসতে না পারেন, আপনাদেরকেও কেউ ভালোবাসবে না । আপনারা যদি কাউকে শ্রদ্ধা না করেন, আপনারাও কাউকের শ্রদ্ধা পাবেন না । সম্মান কাউকে দিলে তবে তাদের সম্মান পাওয়া যায় । শ্রদ্ধা করলে তবে শ্রদ্ধা পাওয়া যায় । আমি যদি কারও ভালো না চাই, ভগবান্ও আমার ভালো চাইবেন না । আমি যদি সবায়ের মঙ্গল চাই, ভগবান্ও আমার মঙ্গল চাইবেন । আমি যদি সবাই দেখে হিংসা করি, আমার প্রতি ভগবান্ও রূষ্ট হয়ে যাবেন । এটা মনে রাখতে হবে । “আমি ত বৈষ্ণব—এ বুদ্ধি হইলে অমানী না হব আমি ।” এই কথাটাই আপনাদের কাছে এখান থেকেই বলি । “প্রতিষ্ঠাশা আসি’ হৃদয় দূষিবে, হইব নিরয়গামী ।” আমার মনে প্রতিষ্ঠা আসবে । কনক কামিনী ও প্রতিষ্ঠা—এগুলো বাধা আছে । যখন প্রতিষ্ঠা আসবে, তখন আমার হৃদয় দূষিত হয়ে যাবে আর আমি হইব নিরয়গামী । “নিরয়” মানে নরক । প্রতিষ্ঠাশা দ্বারা আমি নরকে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছি—নরকগামী হয়ে যাব । অপারকে সম্মান করতে পারছি না, আমার প্রতিষ্ঠা এসে গেচ্ছে, আমি মরে গেচ্ছে ও নরক চলে যাব ।
তোমার কিঙ্কর, আপনে জানিব, (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) “তোমার কিঙ্কর আপনে জানিব : আমি তোমার কিঙ্কর, তোমার দাস ।” আমার নিজের কোন অভিমান থাকবে না । আপনারা আমার কাছে শিষ্য হলেন কিন্তু আমি আপনাদের কৃপা করলাম না—আপনারা আমাকে কৃপা করলেন । “শিষ্য হয়ে আপনারা আমাকে কৃপা করবেন”—এই বুদ্ধিটা থাকতে হবে । “আমার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে আপনারা আমাকে কৃপা করছেন”—গুরুর এইভাব থাকতে হবে । এইজন্য প্রভুপাদকে কেউ যদি প্রণাম করতেন, প্রভুপাদ বলতেন, “দাসোঽস্মি । আমি আপনার দাস ।” তিনি শিষ্যকে প্রণাম করতেন ! এখন তো যদি আমি শিষ্যকে প্রণাম করি, তাহলে ওরা ভাববেন, “আরে বাবা, আমার কী অপরাধ হয়েছে ! গুরু আমাকে প্রণাম করছেন !” তাই আমি এটা করি না কিন্তু মনে মনে আমি ভাবি, “আমি আপনার দাস ।” তাই শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এখানে লিখেছেন, “তোমার কিঙ্কর আপনে জানিব, গুরু-অভিমান ত্যজি’ । তোমার উচ্ছিষ্ট ও পদজলরেণু সদা নিষ্কপটে ভজি । তোমার যে উচ্ছিষ্ট, সেইটা প্রসাদ পাব ।” সাদা নিষ্কপট করে ভজন করতে হবে ।
নিজে শ্রষ্ঠ জানি’, উচ্ছিষ্টাদি দানে, (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর) আপনারা দেখেছেন না ? অনেক সময় গুরুরা আছে যারা প্রসাদ রেখে দিয়ে বলে, “অই ! আমারই প্রসাদ সবাইকে দিয়ে দাও ।” জোর করে দেয় । আপনাদেরকে শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজের কথা আমি বলেছি । সে কলাপাতাও খেয়ে নিয়েছেন । বুড়িটি মনে মনে করছে, “আমার বাড়িতে এসেছেন । আমি কী প্রসাদ পাব না ?” তাই ও তাঁকে জোর করে আবার প্রসাদ দিয়েছে । বাবাজী মহারাজ বুঝি গিয়েছেন । যখন বুড়িটি ডাবল করে আবার প্রসাদ দিল, তিনি সেটাও খেয়ে নিলেন আর সঙ্গে কলাপাতাও খেয়ে নিলেন । হাসি নয় ! সত্য কথা ! কলাপাতা খেয়ে নিলেন ! আর আমরা কী করি ? “অই, আমার প্রসাদ সবাইকে দাও । আমার প্রসাদ সবাই পাচ্ছে !” এটা অভিমান হয় । বুঝতে পারছেন ? “তাই তাই শিষ্য তব থাকিয়া সর্ব্বদা, না লইব পূজা কার ।” আমাদের গুরু-পরম্পরে শ্রীল বাবাজী মহারাজের ছবিটা লাস্ট, দেখতে পারছেন । নবদ্বীপে গেলে তাঁর ভজনকুটির আমরা পরিক্রমার সময় যাই । ওখানে গিয়ে আমরা তাঁর কথা বলি, আর সব কথাটা বইয়ের মধ্যেও লিখে দিয়েছি : শ্রীনদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা । তাই, শ্রীল বাবাজী মহারাজ এইরকম ছিলেন । একবার তিনি টাকা নিলেন, আবার টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন । যে লোক তাঁকে টাকাটা দিল, ওর কাছে ফিরে এসে বললেন, “তুমি যে টাকা দিয়েছ, এই ভারটা আমি সহ্য করতে পারছি না ! এই টাকার দিয়ে কী কিনব, কী করব, আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছি । আমার হরিনাম হচ্ছে না ! বাবা, টাকাটা নিয়ে নাও !” তিন মাইল হেঁটে গিয়ে আবার টাকা ফেরত দিতে চলে এসেছিলেন । এইরকম ভজন করতেন তিনি । “আমি সব সময় শিষ্য থাকব, না লাইব পূজা কার ।” আমরা বলি না ? “পা হাত দিয়ে প্রণাম করতে নেই !” কেন পা হার দিয়ে প্রণাম করতে নেয় ? ওই হাত দিয়ে আপনারা ভগবানের সেবা করেন, ভগবানের সবজি কাটেন—আমার মত অধমের পা কেন আপনারা হাত দেবেন ? এই জন্য পা হাত দিতে বারণ । কিন্তু যখন বে-খেয়াল ভাবে কথা বলি, তখন কেউ পা হাত দিয়ে প্রণাম করে চলে যায় । মহাপ্রভুর সময়ও এরকম ছিল । কিন্তু একজন চালাক ভক্ত ছিল । তিনি ভাবলেন, “কি করে বৈষ্ণবের পদজল নেব ? পা ধোয়ার জল কি করে নেব ?” তখন বুদ্ধি বুঝলেন । গুন্ডিচা মার্জন করতে গিয়ে মহাপ্রভু উপরে উঠে জল দিয়ে ঘষছে ও মাজছে (মন্দিরটা তো উঁচু, দেখেছেন তো) । আর ওই ভক্ত করল কী ? এক ঘটি জল মহাপ্রভুর পায়ে ফেলে দিল—জলগুলা গড়িয়ে নিচে পড়ছে আর ও হাত পেতে জলটা খাচ্ছে ! দেখে মহাপ্রভু বললেন, “দেখো ! তোমার গৌড়ীয় গুন্ডিচায় বসে আমার পা ধুয়ে এবার জল খাচ্ছে ! কেমন লোক দেখো তো কি ! “গৌড়ীয়” মানে বাংলার লোক । চালাক তরাই হয় ! “যে জন কৃষ্ণ ভজে সেই বড় চতুর !” মহাপ্রভু ওকে এবার বাহিরে করে দিলেন, কিন্তু তিনি অন্তরে সন্তুষ্টি, “অত চালাক ! আমি পা হাত দিতে দেই না আর সে কি করে আমার পা ধোয়ার জল খেয়ে নিল ! কত চালাক সে !”
অমানী মানদ, হইলে কীর্ত্তনে, (শ্রীকল্যাণকল্পতরু, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)
দয়াল বৈষ্ণব ঠাকুর
(৯) কীর্ত্তন-যজ্ঞ
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্ । (ভাবার্থ দীপিকা) সর্ব্বাগ্রে মদীয় গুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেব-গোস্বামী মহারাজের রাতুল চরণে ষাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ পূর্ব্বক সেবোন্মুখে তাঁহার অহৈতুকী কৃপা প্রার্থনা ভিক্ষা করছি । তৎপর গুরু-বর্গ, গুরু-ভ্রাতৃমণ্ডলী, শ্রোতৃ-মণ্ডলী, মাতৃ-মণ্ডলী, আপনাদের শ্রীচরণে দণ্ডবৎ প্রণতি জ্ঞাপন করছি, এই আধামকে কৃপা করবেন ।
যস্য প্রসাদাদ্ভগবৎ-প্রসাদো (শ্রীগুর্ব্বষ্টকম্, শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তি ঠক্কুর) গুরুদেব মানে যার কৃপা ছাড়া কোন গতি নাই, যার কৃপা না হলে আমরা এই মায়ার কবল থেকে উদ্ধার হতে পারব না । “কৃপা” কথার অর্থ হচ্ছে “সেবা পাওয়া” । গুরুদেব কখন কৃপা করেন ? জানেন ? যখন সেবার অধিকার দেন । তিনি বলবেন, “এই সেবাটা আপনি মঠে করবেন ।” গুরুদেব সেবার অধিকার দেন । আমি আগেও বলেছি যে, দীক্ষা নিয়ে বাড়ি চলে গেলেই হবে না । বাড়ি গেলেও শ্রবণ-কীর্ত্তন করতে হবে । আমি আপনাদের সবাইকে বলেছি, ছোট কীর্ত্তনের বইও করে দিয়েছি : যারা বাড়িতে থাকেন, তারা সবাই প্রত্যেক দিন সকাল পাঁচটা কীর্ত্তন ও সন্ধ্যা সময় পাঁচটা কীর্ত্তন করবেন । যারা একদম বাড়ি থেকে চলে আসতে পারছেন না—যারা সংসারে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে আর সব সময় কান্নাকাটি করছেন দুতো পয়সা ও খাওয়া-পরার জন্য—তারা অন্ততপক্ষে সকালে পাঁচটা কীর্ত্তন ও সন্ধ্যায় পাঁচটা কীর্ত্তন করবেন । বেশি তো সময় লাগে না : পাঁচটা কীর্ত্তন করতে পনের মিনিট লাগে । সেই কীর্ত্তনগুলা করবেন : প্রথমে গুরুবন্দনা, তারপর বৈষ্ণব-বন্দনা, পঞ্চতত্ত্বের কীর্ত্তন, বৈষ্ণব-বন্দনা, নিত্যানন্দের বন্দনা আর মহাপ্রভুর বন্দনা । এগুলা প্রত্যেক দিনে সকাল-সন্ধ্যা কীর্ত্তন করবেন । কীর্ত্তন-যজ্ঞেই মহাপ্রভু খুশি হন : কীর্ত্তন-যজ্ঞেই মহাপ্রভুকে আরাধানা করা যায় । আমি তার সম্বন্ধে বইতেও ( উপদেশের মধ্যে, চতুর্থ খণ্ড) লিখে দিয়েছি । দুতো ফুল দিলেন, আরতি করলেন, ধুপ দেখালেন—ওটার চাইতে বেশি মহাপ্রভু কখন খুশি হবেন ? কীর্ত্তন করলে । তাঁর মহিমা-কীর্ত্তন । মহিমা-কীর্ত্তন মানে যখন গুরুদেবের বন্দনা করেন, তখন গুরুবন্দনা বা গুরু-মহিমা-কীর্ত্তন হয় । তদ্রূপ বৈষ্ণবের মহিমা-কীর্ত্তন আছে : “ওহে বৈষ্ণব ঠাকুর দয়ার সাগর”, “কৃপা কর বৈষ্ণব ঠাকুর”, ইত্যাদি । এই সব প্রতি দিন গাইতে হবে । খালি গুরুদেবের কাছে যদি একবার এসে বলেন, “গুরুদেব, কৃপা করুন”, তাহলে হবে না । প্রত্যেক দিন গুরুদেবের কীর্ত্তন করতে হবে । প্রতি দিন যেমন খাই, পরি, ঘুমাই, বাথরুম যাই, তেমন প্রত্যেক দিনই কীর্ত্তন করতে হবে । প্রত্যেক দিন বই দেখে দেখে করলে মুখস্ত হয়ে যাবে । প্রত্যেক দিন কীর্ত্তন করতে হবে । সকালে উঠে স্নান করে ও ঠাকুরের আহ্নিক করে কীর্ত্তন করতে হবে । পাঁচ মিনিট, পনের মিনিট বা কুড়ি মিনিট করে সময় দিতে হবে । সারা জীবন তো খালি খেটেই খাচ্ছেন । সংসারের জন্য খেটে যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন আর ভগবান্ বোঝেন, “তুমি তো আমার জন্য সময় দিচ্ছ না, তাই আমি কি করে তোমাকে ব্যবস্থা করব ? আমি তোমার কি করে যোগান দেব ? তুমি যদি আমার যোগানটা না দাও, তুমি যদি আমার বন্দনা না কর, আমার গুণকীর্ত্তন না কর, আমি তোমার যোগানটা কেন দেব ?” স্ত্রীর একটা ধর্ম্ম আছে, ব্রহ্মচারীর একটা ধর্ম্ম আছে, সন্ন্যাসীর একটা ধর্ম্ম আছে, গৃহস্থলোকের একটা ধর্ম্ম আছে, ক্ষত্রীয়ের একটা ধর্ম্ম আছে, বৈশ্যের একটা ধর্ম্ম আছে কিন্তু শাস্ত্রে কী বলেছে ? শ্রীমদ্ভগবদগীতায় কী বলেছেন ?
সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ । (শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ১৮/৬৬) “সব ধর্ম্ম ত্যাগ করে তুমি আমার শরণাপন্ন হও । আমি তোমাকে দেখব ।” এইটা ভগবান্ বলেছেন । “আমি তোমাকে দেখব, কোন চিন্তা কর না । আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে রেহাই করে দেব । ভগবানের চরণে সমর্পণ করলে সমস্ত পাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় ।
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্য্যুপাসতে । (শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ৯/২২) ভগবান বললেন, “যারা অন্য চিন্তা বাদ দিয়ে আমার শরণাপন্ন হয়, তাদের খাবারটা আমি বাড়ি পর্যন্ত বহে দিয়ে আসি ।” ভগবান্ সেটা বলছেন । আবার বলেছেন :
অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্ । (শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ৯/৩০) “যত অন্যায় করেছ, যত কিছু পাপ (খুন, রাহাজারি, ডাকাতি, ইত্যাদি) করেছ, তুমি যদি সব কিছু আমার চরণে অর্পণ করে দিয়ে আমার শরণাপন্ন হও, তাহলে আমি তোমাকে পাপ থেকে রেহাই করে দিয়ে পুনরায় আমার সেবায় লাগিয়ে দেব ।”
|
সম্পূর্ণ পাঠ ডাউনলোড / শুনুন | ||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||