![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীল প্রভুপাদের তিরোভাব তিথি অধিবাস
শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁবিষ্ণুপাদ
(১) শ্রীল প্রভুপাদের আবির্ভাব
জয় ওঁ বিষ্ণুপাদ জগদ্গুরু শ্রীল ভক্তি সুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ কী
জয় ।
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্ । (ভাবার্থ দীপিকা)
ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া ।
গুর্ব্বাভীষ্টসুপূরকং গুরুগণৈরাশীষসংভূষিতং
দেবং দেব্যতনুং সুছন্দবদনং বালার্কচেলাঞ্চিতং
বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসন্ধুভ্য এব চ ।
বৃন্দায়ৈ তুলসীদেব্যৈ প্রিয়ায়ৈ কেশবস্য চ ।
অথ নত্বা মন্ত্রগুরূন্ গুরূন্ ভাগবতার্থদান্ । জয়ঃ সপরিকর-শ্রীশ্রীগুরু-গৌরাঙ্গ-গান্ধর্ব্বা-গোবিন্দসুন্দর-পাদপদ্মানাং জয়স্তু । বন্দে রূপ-সনাতনৌ রঘু-যুগৌ শ্রীজীব-গোপালকৌ । শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ । শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ ॥
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।
আমাদের গুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণপাদ জগদ্গুরু শ্রীল ভক্তি সুন্দর গোবিন্দ দেব-গোস্বামী মহারাজের শুভ আবির্ভাব তিথি কালকে সমাপ্ত হয়েছে । নবদ্বীপ থাকলে প্রতি বছরে এই দিন বামুনপাড়ায় যেতাম । এখন বামুনপাড়ায় প্রোগ্রাম করার জায়গা নিয়ে বিরাট সমস্যা । যখন ওখানে সন্তোষ প্রভু ছিলেন, তখন তিনি সব কিছু ব্যাবস্থ করতেন, কিন্তু এখান এমন লোকজন ওখানে নেই । ওই সব আয়োজন করতে গিয়ে কে কী করবে ? এইজন্য ভক্তদের কষ্ট ও অসুবিধা হবে । তাই আমরা আর ওখানে যাই না । কালকেও ওঁ বিষ্ণুপাদ ভগবান্ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদের তিরোভাব উৎসব । শুনেছি যে, অনেকে কালকে চলে যাবে, তাই আমি এখন শ্রীল প্রভুপাদের কথা আলোচনা করব । তিনি গৌড়ীয় গগনে ভাস্কর । আমি আজকে দুপরে প্রসাদ পাওয়ার পরে কছু সময় পেয়ে এই গ্রন্থ ‘গৌড়ীয় আচার্য্য ভাস্কর শ্রীল প্রভুপাদ’ ভালো করে পড়াশোনা করেছিলাম । এই গ্রন্থ আমার কাছে কলকাতায় ছিল আর কালকে শ্রীল প্রভুপাদের তিরোভাব তাই এখানে গ্রন্থগুলো দেখছি, আছে তাদের মধ্যে । সেই ভাবে আজকে পড়াশোনার সময় পেলাম । কালকে আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণব সঙ্গের প্রোগ্রাম, তাঁরা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন । Zoomএই পঠ দিতে হবে, চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত । কালকে সন্ধ্যা class (ক্লাস) দেব আর সাতটা আমাদের অনলাইন প্রোগ্রাম চলবে । ইংরেজিতে বা বাংলায় প্রভুপাদের সম্বন্ধে বলব, কোন সমস্যা নেয় । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের আবির্ভাবের দিনেও লকডাউন ছিল, তখন আমি কলকাতায় ছিলাম আর ওইরকমও প্রোগ্রাম করতাম । তাই, কালকে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের তিরোভাব তিথি । তিনি আমাদের পরম গুরুদেবের গুরুদেব । প্রভুপাদের বিগ্রহ আপনারা দেখতে পাবেন বিভিন্ন মঠে । গৌড়ীয় যত মঠ (ISKCON, ইত্যাদি) সবাইয়ের গুরু ছিলেন শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর । পরে শ্রীল স্বামী মহারাজের শিষ্যেরাও তাঁদের গুরু ‘প্রভুপাদ’ বলতে চেয়েছিলেন । যার তার গুরু সে প্রভুপাদ বলতে পারে, কোন অসুবিধা নেয় । কিন্তু তাতে প্রভুপাদ যেন ছোট না করা হয়, তা না হলে তাতে অপরাধ হবে । সেই জন্য ওটার নিয়ে আমি contradiction (অসঙ্গতি, প্রতিবাদ) করি না । আমি শ্রীল স্বামী মহারাজ কখন নিজেই ‘প্রভুপাদ’ বলি : শ্রীল A.C. ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ শ্রীল প্রভুপাদ । আমি সম্মান দিতে জানি ; সকলকে সম্মান দিতে হবে । যে সবাইকে সম্মান না দিলে নিজে সম্মান পাওয়া যায় না, সেটা আমি ভালো করে জানি । সবাইকে শ্রদ্ধা করতে হবে । আমি যদি কারও ভালো না চাই, ভগবানও আমার ভালো চাইবেন না । যদি আমি সবায়ের অমঙ্গল চাই, তাহলে ভগবান্ আমারও অমঙ্গল তুলে নিয়ে আসবেন । আর আমি যদি সবায়ের মঙ্গল চাই, ভগবান্ আমার মঙ্গল দেবেন । এটা সবসময় মনে রাখতে হবে । কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেয় । আপনারা জানেন যে, শ্রীজগন্নাথধাম পুরীতে নারায়ণ ছাতা একটা জায়গা আছে, সেখানেই শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর আবির্ভুত হয়েছিলেন । সচ্চিদানন্দ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর যখন নয় বছর বয়স ছিলেন, তাঁর স্ত্রী ছিল পাঁচ বছর বয়স । আগের যুগে কম বয়সে বিয়ে হত । নয় বছর ছেলে ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের বয়স আর তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল পাঁচ বছর । সেই সময় তাঁর বিয়ে হয়েছিল । কিছু ক্ষণ পরে প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন, তারপর তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করলেন । সেই ঘরে এই সব সন্তানাদি হয়েছিল—তার মধ্যে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ষষ্ঠ সন্তান রূপে ছিলেন । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আগে মেদিনীপুরে স্কুল মাস্টারি করতেন, তার পর ICS (ইম্পেরিয়াল সিভিল সার্ভিস—তখন ছিল ব্রিটিশ শাসন) পরিক্ষা দিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন । ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকা কালে তিনি দক্ষিণ দিনাজপুর যাকে বলা হয় বাংলাদেশে (আগে দিনাজপুর এক জেলা ছিল, কিন্তু বিভক্ত হওয়ার পর উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর হয়েছে এবং আরো কয়েক জেলা) । এই দিনাজপুরে ম্যাজিস্ট্রেট থাকার কলে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন, তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “সত্যিকারের মহাপ্রভুর ধর্ম্মটা কী ?” মহাপ্রভুর চলে যাওয়ার পরে শ্রীল নরোত্তম দাস, শ্যামানন্দ প্রভু ও শ্রীনিবাস আচার্য্য মহাপ্রভুর ধর্ম্ম ও সিদ্ধান্ত প্রচার করতেন । কিন্তু তার পর বৈষ্ণবদেরকে লোকে নিন্দা করতে লাগল । বৈষ্ণবদের সঙ্ঘ লোকে “আখড়া” বলত । “আখড়া” শয়তানের এলাকা বলে না ? তিলকধারী মেয়ে-ছেলে খরপ সঙ্গ করত, যা সহজিয়া করে । মুসলমানের এদিকে ওরা মঠ বলে কিছু বলে না—ওরা বলে “আখড়া” । সত্যিকারের ধর্ম্মের নামে সমস্ত কিছু কলঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল । যার গায়ে তিলক দেখলে, তাকে লোকে নিন্দা করত । বৈষ্ণব ধর্ম্ম কলুষিত হয়েছিল, নোংরা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল । সেটা দেখে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভাবলেন, “এটা চোখের দেওয়া যায় না ।”
(২) মহাপ্রভুর ধারার উদ্ধার বীরনগরে একটা উলা গ্রাম আছে, সেখানে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আবির্ভূত করেছেন । আমরা কোন দিন ওখানে যাই নি কারণ জায়গাটা এখন সহজিয়ার দখলে আছে । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের একটা ছেলে সহজিয়ার লাইনে চলে গিয়েছেন, তার নাম ছিল ললিতা প্রসাদ । ওই বংশদ্রোহীরূপ সন্তান দ্বারা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আবির্ভাব স্থানটা দখল হয়ে গিয়েছিল । ওখানে আর বৃন্দাবনেও । বৃন্দাবনে গিয়ে আমি কোন দিন ওখানে যাই নি—দূর থেকে প্রণাম করেছি । দুই ভাই হলেও ললিতা প্রসাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সঙ্গে হিংসা করলেন কারণ রাধারাণীর যে সম্পদ সে সমস্ত শক্তি ও সম্পদটা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বিমলা প্রসাদকেই (শ্রীল প্রভুপাদকেই) দিয়ে দিয়েছিলেন । এই জন্য আমরা মাঝে মাঝে বলি না যে, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এক দিন তাঁর ভাইকে লিখেছিলেন, “বাবা বাধা রাধা ।” এই “বাবা বাধা রাধা” মানে “বাবা” বলে এক জিনিস এবং “গুরু” বলে আর এক জিনিস । সবাই নিজের বাবাকে জানে । সব জন্মেই বাবা পাওয়া যাবে । আমি যখন কুকুর ছিলাম, আমার একটা বাবা ছিল ; আমি যখন ছাগল ছিলাম, আমার ত বাবা ছিল । অনেক ধরনের বাবা ছিল আমার, এখন আমার এটা ভদ্রলোক বাবা হয়েছে । যখন মেক্সিকো, পাকিস্তান, লন্ডন বা চীনদেশে জন্মিয়াছি, তখন আমার বাবা ছিল, মামা ছিল । কিন্তু সব জন্মে গুরু পাওয়া যায় না । গুরুদেব একটা আলাদা জিনিস : গুরুদেব সাক্ষাৎ রাধারাণী বা সাক্ষাৎ নিত্যানন্দ প্রভু । এটা আপনাদের সবসময় মনে রাখতে হবে । আমাকেও শিষ্যেরা “বাবা” বলে ডাকে—আমি কিছু বলি না কিন্তু এটা ঠিক নয় । “বাবা” হচ্ছে আরো নিচে, তার উপরে হচ্ছেন গুরুদেব । গুরুদেব হচ্ছেন রাধারাণী বা নিত্যানন্দের নিজ জন । লোকে মাঝে মাঝে আমাকে “বাবা” বলে, আমি কিছু বলি না, কিন্তু আপনাদের বুঝতে হবে “বাবা বাধা রাধা” কেন বলা হচ্ছে । ললিতা প্রসাদ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরকে শুধু বাবা বলেই ডাকতেন । কিন্তু বিমলা প্রসাদ কখনোই শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরকে সেই হিসেবে দেখেন নি । তিনি তাঁকে কি হিসেবে দেখেছেন ? তিনি তাঁর পিতা হলেও আগে তিনি তাঁকে গুরুদেব হিসেবে দেখেছেন । তিনি বললেন না, “বাবা এসেছেন”—তিনি বললেন, “গুরুদেব এসেছেন” বা “প্রভু এসেছেন” । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর নিজের বাবা ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁকে “গুরু” বলে ডাকতেন । আপনারা “সানন্দ সুখদা কঞ্জ” দেখেছেন—তাঁরা এক সঙ্গে ওখানে থাকতেন কিন্তু তিনি শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরলে “প্রভু” বলে ডাকতেন । বাবাজী মহারাজকে “প্রভু” বা “গুরুদেব” বলে ডাকতেন আর নিজের বাবাকে “প্রভু” বা “গুরুদেব” বলে ডাকতেন । কখনও তিনি তাঁকে “বাবা” বলে ডাকতেন না । সেইজন্যই বলা হয়, “বাবা বাধা রাধা ।” শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছিলেন, “তুমি বাবাকে ‘বাবা’ বলে চেন, তাই তুমি বাবাকে পাবে, রাধাকে পাবে না । তুমি শুধু এই শারীরটাকেই দেখেছ, ওই শারীরটা বাবা, কিন্তু তার মধ্যে যা আর জিনিসটা আছে সেই জিনিসটাকে তুমি চিনতে পারবে না—সেটা হচ্ছেন রাধারাণী ।” আমার কথার অর্থটা বুঝতে পারলেন ? “ওই শারীরটা হচ্ছে ‘বাবা’ আর ভিতরে যে জিনিসটা, সেটা হচ্ছেন রাধারাণী । তাই যে বাবা তোকে জন্ম দিলেন, সেটা শারীরটা—তোমার তাঁর সঙ্গে সম্বন্ধ আছে বলে তুমি বাবাকে “বাবা” বলে ডাকছ । কিন্তু তোমার আসল সম্বন্ধ হয়েছে না । আমাদের সম্বন্ধ পারমার্থিক সম্বন্ধ—সেখানে তিনি রাধারাণী । তুমি সেটা যদি না জান, তাহলে তোমার সম্বন্ধ হল না, তোমাকে রাধারাণী পেতে বাধা হয়ে গেল (ওই বাবাটাই তোর বাধা হয়ে গেল রাধারাণীকে পাওয়ার জন্য) ।” এইজন্য তিনি বলেছেন, “বাবা বাধা রাধা” । বুঝলেন কথাটা ? যাকগে, এই কথা আমি কালকেও বলব । শ্রীল ভক্তিবিনোর ঠাকুর দেখলেন যে এই অবস্থা । তিনি সব বৈষ্ণব-ধর্ম্মের গ্রন্থ জোগাড় করলেন । আপনারা শুনেছেন যে, বাঁকুড়ায় বিষ্ণুপুরে যখন শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর, শ্রীল শ্যামানন্দ প্রভু ও শ্রীআচার্য্য শ্রীনিবাস বৃন্দাবন থেকে গ্রন্থগুলো নিয়ে এসেছিলেন রাজা বিরহম্বিরের দস্যুরা ওদেরকে ডাকাতি করেছিল । পরে রাজা বিরহম্বির ক্ষমা চেয়েছিল কিন্তু ওই গ্রন্থগুলো শেষে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গিয়েছিল । সেগুলা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর উদ্ধার করেছিলেন । তার মধ্যে মহাপ্রভুর শিক্ষা, ধারা । শ্রীল রূপ গোস্বামী ও শ্রীল সনাতন গোস্বামী প্রথম গ্রন্থগুলো রচনা করে এদেরকে বৃন্দাবনে রেখে দিয়েছিলেন আর পরে শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর, শ্রীল জীব গোস্বামী, শ্রীশ্যামানন্দ প্রভু ও আচার্য্য শ্রীনিবাস ওই গ্রন্থগুলো নিয়ে আবার বাংলায় এনেছিলেন প্রচার করার জন্য । ওই সময় রাস্তায় গ্রন্থগুলো ডাকাতি হয়ে গিয়েছিল বিষ্ণুপুরের কাছে । সেই গ্রন্থগুলো পরে উদ্ধার করে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর সব জানতে পারলেন যে মহাপ্রভুর সত্যিকারের ধারা, শিক্ষা ও সিদ্ধান্তটা কী । এইটা মূল কথা । এটা জেনে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অবশেষে ভাবলেন, “আমি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আর ওড়িশায় ফিরে যাব না । আমি এই গোদ্রুমদ্বীপে থাকব ।” তাই তিনি এই গোদদ্রুমদ্বীপে থাকতেন যেখানে আমরা বসে আছেন এখন । আগেই তিনি ওড়িশায় (পুরীতে) ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও জগন্নাথ মন্দিরের ট্রাস্টি সভাপতি ছিলেন । এখনও জগন্নাথ মন্দিরের যে হেড (head) থাকে, তার পদ অধিকার করে DM (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) । সে হিসেবে জগন্নাথ মন্দিরের রথ তিনি পরিচালনা করতেন । ওইসময় একজন ভন্ড সাধু যে তাঁর প্রতি অভিশাপ দ্বারা কিছু যাদু করতে গিয়েছিলেন, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ওই ‘সাধুকে’ শাস্তি দিয়ে জেলে ঢুকিয়েছেন । তিনি অনেক কিছু করেছেন । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের “স্বলিখিত জীবনী” পড়লে সব ওখানে পাওয়া যাবেন । পুরীতে বাস করে একদিন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর স্ত্রী শ্রীভগবতী দেবী নিয়ে জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে যে বিমলা দেবীর নামে লক্ষ্মী দেবী ওখানে আছে, সে বিমলা দেবীর কাছে গিয়ে প্রণাম করে বললেন, “হে দেবী, তুমি আমাকে একটা সন্তান দাও যে সন্তান মহাপ্রভুর ধারাটা সঠিকভাবে জগতে প্রচার করতে পারবে । তুমি ওকে আমার কাছে পাঠাও ।” তখন সেই কথা জগন্নাথদেব শুনেছিলেন আর শোনার পরে তখন তাঁদের ষষ্ঠ সন্তানরূপে ওই বিমলা প্রসাদ এসেছিলেন (পরে তাঁর নাম হয়েছে শ্রীভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর) । তিনি আমাদের পরম গুরুদেবের গুরুদেব ।
(৩) নবদ্বীপে আচার্য্যগণের আগমন শ্রীল ভক্তিসদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর নারায়ণ ছাতার তলে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । তাঁর বাড়ি জগন্নাথ মন্দিরের পাশে ছিল (এখন সেখানে শ্রীল ভক্তি দয়িত মাধব মহারাজের শ্রী চৈতন্য গৌড়ীয় মঠ আর ওই সময় সেখানে কোন মন্দির ছিল না, একটা সাধারণ বাড়ি ছিল) । সেই জায়গাটা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভারা করে থেকে DM (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) চাকরি করতেন আর ওই সময়ও তাঁর ষষ্ঠ সন্তান হল । যখন শ্রীল প্রভুপাদের মাত্র ছয় বা চার মাস বয়স রথযাত্রা হচ্ছিল (তখন তাঁর নাম বিমলাপ্রসাদ ছিল—শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এই নামটা রেখেছেন কারণ তিনি তাঁকে পেয়েছিলেন বিমলা দেবীর প্রসাদে) । ওই সময় রথ তাঁর বাড়ি এসে হঠাৎ করে দাড়িয়ে গিয়েছিল । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর ছেলেকে কলে নিয়ে রথের জোর করে তাঁর মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছেন আর রথের উপর গিয়ে জগন্নাথের মালাটা খুলে ছেলেটির গলায় পড়ে গেল ! তখনই রথটা আবার চলতে শুরু করে দিল গুন্ডিচায় । সেটা দেখে সবাই বুঝতে পারলেন যে, এই ছেলেটি ভবিষ্যতে মহাপুরুষ হবেন । পরে, যখন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর কৃষ্ণনগরে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে চাকরি করতেন তিনি স্বরূপগঞ্জে একটা জায়গা পেলেন—এই গোদ্রুমদ্বীপের মধ্যে স্বানন্দ-সুখদা কুঞ্জে ও সুরভী কুঞ্জে, এই দুটো জায়গায়, এসে তিনি বাস করেছিলেন । আস্তে আস্তে করে বিমলাপ্রসাদকে নিয়ে এখানে থাকতে শুরু করলেন, যাকে বলে বানপ্রস্থ জীবনে । বানপ্রস্থ মানে তিনি স্ত্রী-কন্যাদের ত্যাগ করে খালি একটা পুত্রকে নিয়ে এখানে থাকতেন । ওই সমত তিনি বিমলাপ্রসাদকে সর্ব্বতভাবে শিক্ষা দিলেন—তাঁকে সংস্কৃত পড়াতেন, ইত্যাদি ।সমস্ত শিক্ষা দিলে কিন্তু তিনি তাঁকে নিজে দীক্ষা দেন নি । তিনি কোথায় দীক্ষা নিতে গিয়েছেন, জানেন ? শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের কাছে । শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজ ৩০টা বছর বৃন্দাবনে রাধা কুণ্ডে ছিলেন । এক দিন তিনি রাধারাণীর প্রেরণা পেলেনে যে, বৃন্দাবনে আর কিছু নেয়, রাধা-কৃষ্ণের সমস্ত লীলা এখন নবদ্বীপ ধামে (নবস্বীপধাম অভিন্ন বৃন্দাবনধাম), যেখানে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু আবির্ভূত করেছিলেন । তাই তিনি রাধারাণীর এই প্রেরণা পেয়ে এখানে চলে এসেছিলেন । কিছুক্ষণ ধরে তিনি থাকতেন কোথায় ? বাথরুমের কাছে (পাবলিক টয়লেটে) । লোকে তাঁকে জিজ্ঞাসা করত, “এখানে থাকেন কেন ? এখানে গন্ধ আছে, থাকতে কষ্ট হয় না ?” তিনি বলেনন, “এই বাথরুমের গন্ধ সহ্য করা যায়, কিন্তু বিষয়ীর লোকের যে গন্ধ সে গন্ধ সহ্য করা যায় না ।” এরকম ছিলেন বাবাজী মহারাজ । আর কী মালা করতেন ? এখন ত লোকে বলে, “এটা মালাটা ভেঙ্গে গেলে তখন কি হবে ?” আমার মালা আমি গুরুদেবের কাছ থেকে পেয়েছি—গুরুদেবের হাত থেকে যেটা এল, আমি কন দিন দেখি নি, “মালার কী আছে না আছে ?” গুরুদেব দিয়েছেন, ওইটা আমার মালা, ওইটা আমার সম্বল । আর এখন ত শিষ্য না মালা গনে, কী কাঠের, কী তুলসী, কী আছে, ওই সব মালা ভেঙ্গে গেলে চিন্তা করে যায় । এতো হরিনাম করে যে মালা ভেঙ্গে যায় ! আর বাবাজী মহারাজ কী করে হরিনাম করতেন জানেন ? কেউ মরে গেলে লোকে দেহটা শ্মশান ঘাটে পোড়ানোর জন্য নিয়ে এসে—দেহের কাপড়-চোপড় ছেড়ে দিয়ে দেহটা পুড়ে দেয় । বাবাজী মহারাজ একটা নেকড়া ছিঁড়ে একটা করে গিঁট দিতেন আর বলতেন, “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।” আর একটা গিঁট বেঁধে দিয়ে আবার এইকরম হরিনাম করতেন ।
(৪) শ্রীল প্রভুপাদের দীক্ষা শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের কোন ভাড়াবাড়ি ছিল না—তিনি শ্মশান ঘাটে ঝুপড়ির মধ্যে থাকতেন । রাতের বেলা লোকে মেয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেলে ভাবল যে, তিনি একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বললেন । ওই “মেয়েটি” ছিলেন শ্রীমতী রাধারাণী কিন্তু পাড়াছেলেরা ভাবল, “এই সাধু রাতের বেলা ঘরে কোন মেয়ে নিয়ে এসেছে !” সবাই পাহার দিতে লাগল—একদিন, দুইদিন, তিনদিন পাহার দিচ্ছে । দিন থেকে পাহার দিলেই কাউকে ঢুকতে দেখল না অথচ রাতের বেলা সে কুটিরের সামনে এসে শুনল : আবার মেয়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ! তখন সবাই বলল, “এবার ঢুকে দেখব !” গোলমাল করে বাবাজী মহারাজের কুটিরে ঢুকে পড়ে দেখল যে, বাবাজী মহারাজ সেখানে বসে নির্বিঘ্ন হরিনাম করছেন । ওরা অবাক হলে গেল, “কী ব্যাপার ?!” তখন সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে লাগল । বাবাজী মহারাজকে পাগল মনে করে লোকে আবার তাঁর গায়ে ঢিল মারত ! কিন্তু বাবাজী মহারাজ বলতেন, “বাবা, গোপাল ! মা যশোদাকে কিন্তু বলে দেব ! আমার সঙ্গে আর দুষ্টুমি কর না ! আমাকে বিরক্ত কর না, বাবা ।” তিনি দেখলেন যে, তা কৃষ্ণের ইচ্ছায় হচ্ছে । এইরকম ছিলেন শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজ । সেই বাবাজী মহারাজের কাছে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বিমলাপ্রসাদকে পাঠিয়ে দিলেন । ছেলেকে বললেন, “যাও, গঙ্গা পার করে চলে যাও, বাবাজী মহারাজের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে এসো ।” বিমলাপ্রসাদ তখন বড় হয়েছেন—আঠার বছরের বেশি বয়স তাঁর । ওঁরা কুঁড়েঘরে থাকতেন, তাই সেখান থেকে শ্রীল ভক্তিবিনোর ঠাকুর শ্রীলপ্রভুপাদকে বাবাজী মহারাজের কাছে পাঠিয়েছিলেন । কিন্তু যখন শ্রীল প্রভুপাদ বাবাজী মহারাজের কাছে এলেন, বাবাজী মহারাজ তাঁলে হঠাৎ করে বললেন, “দূর হও ! দূর হও !” শ্রীল প্রভুপাদ ফিরে এসে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরকের বললেন, “আমাকে দেখা মাত্রই তিনি ‘দূর হও’ বললেন, কথাও বলতে দিলেন না । আমি কে উনি চিন্তেই পারলেন না ।” শ্রীল ভক্তিবিনোর ঠাকুর বললেন, “আবার যাও কালকে ।” পরের দিন শ্রীল প্রভুপাদ আবার বাবাজী মহারাজের কাছে গেলেন । এইবার বাবাজী মহারাজ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে ? কোত্থেকে আসছ ?” “আমার বাবার নাম কেদারনাথ প্রভু (ভক্তিবিনোদ ঠাকুর),” শ্রীল প্রভুপাদ বললেন । “উহু, তুমি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলে না ? তোমার বাবা তো বিরাট পণ্ডত ! তুমি ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলে আর তুমি তাঁকে বাদ দিয়ে আমার কাছে দীক্ষা নিতে এসেছ ? যাও, যাও ! তোমার বাবার কাছ থেকে দীক্ষা নাও ।” “উনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিলেন, বললেন আপনার কাছ থেকে দীক্ষা নিতে ।” “আমার কাছে থেকে ? না, না, যাও ।” পরের দিন শ্রীল প্রভুপাদ আবার তাঁর কাছে এসেছেন । “আবার এসেছ ?” বাবাজী মহারাজ বললেন । “হ্যাঁ, বাবাই পাঠিয়ে দিলেন আপনার কাছে ।” “উনি পাঠিয়ে দিয়েছেন ? ঠিক আছে । কালকে এসো, আমি প্রভুর কাছে জিজ্ঞাসা করব ।” আর এক দিন গেল । পরের দিন শ্রীল প্রভুপাদ আবার এলেন । “উহু, তুমি ? আমি প্রভুর কাছে জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গিয়েছি ।” পরের দিন আবার এসছেন, তখন হাত জোড় করে বললেন, “প্রভু, আমাকে কৃপা করুন ।” “হ্যাঁ, জিজ্ঞাসা করেছি, এখন ত উত্তর পাই নি । উত্তর পেয়ে বলে দেব, পরে এসো ।” শ্রীল প্রভুপাদ আবার শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের কাছে ফিতে এসে বললেন, “আজকেও হয় নি ।” তখন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁকে বলেলেন, “ছাড়ো না । যতক্ষণ পর্যন্ত দীক্ষা নে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বে না ।” শেষে, শ্রীল প্রভুপাদ আবার বাবাজী মহারাজের কাছে ধটি, তিলক, গলায় মালা পড়ে এসে হাত জোড় করে, কাঁপতে কাঁপতে, ক্রন্দন করে বললেন, “প্রভু, আজকে দীক্ষা না দিলে আমি যাবই না ।” তখন বাবাজী মহারাজ বললেন, “ঠিক আছে । যখন যাবিই না, তখন ঠিক, বসো এখানে ।” বাবাজী মহারাজ তাঁকে দীক্ষা দিলেন । তিনি শুধু মাত্রা একজনকে দীক্ষা দিয়েছিলেন—সেই ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরকে । দীক্ষা নিয়ে তখন শ্রীল প্রভুপাদ ঘরে চলে এলেন ।
(৫) উজ্জ্বল প্রেমময় সেবা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মাঝে মাঝে মায়াপুরে হেঁটে গিয়েছেন । প্রথম নবদ্বীপে সবাই বলত যে, মহাপ্রভুর জন্মস্থান গঙ্গার বক্ষে চলে গিয়েছে (গঙ্গা তাকে নিয়ে গিয়েছে) । কিন্তু গঙ্গা নিতেও পারে আবার ফিরত দিতেও পারে । নবদ্বীপে এসে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের একান্ত ইচ্ছা ছিল, তিনি প্রার্থনা করতেন, “প্রভু, তুমি কৃপা করে তোমার জন্মস্থান দেখিয়ে দাও । তুমি কোথায় আবির্ভুত হলেন এই জগতে ? দেখাও আমাকে !” খুব করে তুমি হরিনাম করতে লাগলেন । হরিনাম করতে করতে একদিন যখন তিনি তাঁর স্বানন্দ-সুখদ-কুঞ্জে ছাদের মধ্যে বসে হরিনাম করতেন, তখন তিনি মায়াপুরের দিব্যজ্যোতি দেখতে পেলেন । সকাল বেলা উঠে, লোক-জনকে ও ঘোড়া-ঘোড়া নিয়ে একবারে যেদিক থেকে আলোটা দেখলেন, সে দিকে তিনি চলে গিয়েছেন । তাঁকে দেখে লোকে বলল, “কী ব্যাপার ? এত লোকজন এখানে কেন ?” জায়গায় এসে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর দেখতে পেলেন যে, ওখানে তো মুসলমান লোকেরা সবাই । যখন তিনি জায়গার নাম জিজ্ঞাসা করলেন, তখন একজন তাঁকে বললেন, “এই স্থানের নাম মিয়াপুর ।” তখন, অনেক তুলসী গাছ দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “এত তুলসীগাছ কেন এখানে ?” ওরা বলল, “এখানে তুলসীগাছ যেকারণ, আমরা এখানে এত গম-পাট লাগাই, কিছুই হয় না । সবই তুলসীগাছ উঠে যায় ।” শুনে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভাবলেন, “ব্যাপারটা কী ? আমি তো এই জায়গাই দেখলাম রাত্রে দিব্যজ্যোতির মত । এইটাই মনে করি স্থানটা ।” তখন তিনি নবদ্বীপে গিয়ে শ্রীল জগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজকে সেখানে নিয়ে এলেন । বিহারীদাস তাঁকে ঝুরিতে করে নিয়ে এলেন । বাবাজী মহারাজের তখন ১৩৭ বছর বয়স ছিল—বয়স্ক হয়ে জবুথবু হয়ে এসেছিলেন । মায়াপুরে এসে বাবাজী মহারাজ হঠাৎ করে ঝুরি থেকে লাফ দিয়ে বললেন, “এইটা প্রভুর স্থান ! এইটা প্রভুর স্থান, এইটা হয়ে গেল !” “হরি বল হরি বল” বলে তিনি নাচতে আরম্ভ করলেন ! এই ভাবে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আবিষ্কার করলেন যে, মায়াপুর নবদ্বীপেই আছে । তারপর বাবাজীরা কেস (মামলা) করে বলল, “যে জায়গা ‘প্রাচীন মায়াপুর’ বলে, সেটা হচ্ছে নবদ্বীপ,” কিন্তু তারা হারিয়েছে । শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ও অন্যান্য গ্রন্থে লেখা হয় যে, মায়াপুর নবদ্বীপে কিন্তু এখনও কিছু লোক বলে যে, নবদ্বীপ অন্য জায়গায় । এই অবস্থা । এটা সব ভুল কথা । এইটা মহাপ্রভুর জন্মস্থানের কথা । এখন প্রভুপাদের কথা বলব । আমাদের পরম গুরুদেব সুন্দর করে লিখেছেন, আপনারা সবসময় এই কীর্ত্তন করেন আর সব মঠও গায় :
সুজনার্ব্বুদরাধিতপাদযুগং “কোটি কোটি সুজনকর্ত্তৃক আরাধিত শ্রীপাদপদ্মযুগ, (কৃষ্ণসঙ্কীর্ত্তনরূপ) যুগধর্ম্মসংস্থাপক, (বিশ্ববৈষ্ণবরাজসভার) পাত্ররাজ, (নিখিল জীবের) ভয়হরণকারিগণের মনোঽভীষ্টপ্রদাতা সর্ব্বপূজ্য শ্রীপাদপদ্মে আমি প্রণাম করি—আমার প্রভুর পদনখজ্যোতিঃপুঞ্জকে আমি নিত্যকাল প্রণাম করি ।” (শ্রীশ্রীপ্রভুপাদপদ্ম-স্তবকঃ, শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ বিরচিত) শ্রীল শ্রীধর মহারাজ গুরুদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এই যে প্রভুপাদের স্তবকটা, তোমার এর মধ্যে কোন লাইনটা ভাল লাগে ?” গুরুদেব বললেন :
কৃপয়া হরিকীর্ত্তনমূর্ত্তিধরং “জীবের প্রতি কৃপা করিয়া যিনি মূর্ত্তিমান্ হরিকীর্ত্তন-স্বরূপে প্রকাশিত, ধরণীর অপরাধভার-বিদূরণকারী শ্রীগৌরপার্ষদ এবং জীবের প্রতি জনকাপেক্ষাও অধিক বাৎসল্যের সুকোমল আকরকে আমি প্রণাম করি; আমার প্রভুর পদনখজ্যোতিঃপুঞ্জকে আমি নিত্যকাল প্রণাম করি ।” (শ্রীশ্রীপ্রভুপাদপদ্ম-স্তবকঃ, শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ বিরচিত) গুরুদেব এই লাইনটা বলে দিযেছেন, আমারও এটা ভাল লাগে । “কৃপয়া হরিকীর্ত্তনমূর্ত্তিধরং” শ্রীল প্রভুপাদ বেশি (সুর দিয়ে) কীর্ত্তন করতেন না, পছন্দ করতেন না কিন্তু তিনি হরিকথার মধ্যামে কীর্ত্তন করতেন, তাই তিনি হরিকীর্ত্তনের মূর্ত্তিস্বরূপ । যে খোল-করতাল বাজে কীর্ত্তন সেটা নয়, তিনি হরিকীর্ত্তনের মূর্ত্তিস্বরূপ । “ধরণী-ভরহারক-গৌরজনম্” : পৃথিবীর ভর তিনি বহন করেছেন । “জনকাধিক-বৎসল-স্নিগ্ধপদং” : শ্রীল শ্রীধর মহারাজ লিখেছেন যে, শ্রীল প্রভুপাদ এত ভালোবাসতেন, বাবাও এত ভালোবাসে না । “জনক” মানে “পিতা” : পিতার চাইতে অধিক ভালোবাসা । আমার গুরুদেবও সেরকম । তিনি আমাকে খুব বকতেন আবার খুব ভালবাসতেন । আমি কখনও বাবার জন্মদিন করছি না কিন্তু আমি আমার গুরুদেবের জন্মদিন করছি । আমার জন্মদিন আমি করতে বলেছি না, আমি বলেছি, “না করে চলবে ।” কিন্তু আমি শিষ্যদেরকে দেখিয়ে দিলাম কী করে গুরু-সেবা ও বৈষ্ণব-সেবা করতে হবে । এবার আমি সারা কৃষ্ণনগর খুঁজে কোথাও কলা-পাতা পাই নি । তখন একটা লোকে ঠিক করে দিলাম কলাপাতা কাটিয়ে নিয়ে আসতে । মঠে কিছু পাতা আছে কিন্তু ওটা ছোট কিন্তু সাধুদেরকে বড় করে প্রসাদ দিতে হবে । বৈষ্ণব-সেবা করে বড় করে পাতায় দেওয়া হয় ।
(৬) শ্রীল শ্রীধর মহারাজের কীর্ত্তন আর শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ কী লিখেছেন ?
ভয়ভঞ্জন-জয়শংসন-করুণায়তনয়নম্ । “যিনি সুবর্ণ কমল-উৎপাদনকারী (অপ্রাকৃত, উন্নত) উজ্জ্বল-রসসাগর হইতে উত্থিত (মূর্ত্তি), যাঁহার বিশাল ও কারুণ্যপূর্ণ লোচনযুগল (আর্ত্তগণের) ভয় নিবারণ ও (আশ্রিতগণের) বিজয় ঘোষণা করিতেছে, যাঁহার রসনা সমগ্র পৃথিবীকে শ্রীকৃষ্ণ-সঙ্কীর্ত্তনে (সর্ব্বদা) মুখরিত করিতেছে এবং যিনি জগৎপবিত্রকারী ও ভবতাপবিদূরণকারী অরুণ (কাষায়) বসন পরিধান করিয়া শোভা পাইতেছেন, শ্রীচরণানুচরগণের সহিত শ্রীবৃষভানুনন্দিনীর সেই নিজ প্রিয়জনকে তদীয় শুভ প্রকট-বাসরে আমি পুনঃ পুনঃ প্রণাম করিতেছি ।” (শ্রীদয়িত-দাস-প্রণতি-পঞ্চকম্, শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ বিরচিত) শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীল শ্রীধর মহারাজকে কিজন্য পছন্দ করেছেন ? তিনি শ্রীল শ্রীধর মহারাজের ‘শ্রীরূপমঞ্জরী-পদ’ কীর্ত্তন শুনে পছন্দ করেছেন । তিনি লাস্টে সময় বলে গেলেন যে, “আমার পরেও আমি একজনকে রেখে গেলাম আমার কথা বলবার জন্য । আমি এখন নিশ্চিন্তা যেতে পারছি ।” তিনি ১ জানুয়ারি ১৯৩৭ সালে এই জগৎ থেকে চলে গিয়েছিলেন । আমি গুরুদেবের কাছ থেকে শুনেছি যে, শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীল শ্রীধর মহারাজের কাছ থেকে ভোর চারটা সময় ওই কীর্ত্তনটা শুনে বললেন, “আমার কথা বলবার জন্য একজন থাকল ।” এটা বলে তিনি চলে গিয়েছিলেন । সবাই শ্রীল শ্রীধর মহারাজকে গৌড়ীয় মঠের আচার্য্য করতে চেয়েছিলেন কিন্তু শ্রীল শ্রীধর মহারাজ রাজি হলেন না । তিনি বললেন, “আপনারা আমাকে গুরু বলে মানতে পারবেন ? এটা সম্ভব নয় । আমিও কোন দিন এইসব মঠ-মন্দির, ইট বিল্ডিং চাই নি ।” মঠ-মন্দির তো শ্রীল শ্রীধর মহারাজ করেন নি । আপনারা জানেন তাঁর আমলে মঠের অবস্থা কী ছিল ? তখন এইসব দালান বিল্ডিং ছিল না । আমরাও কী গুরুদেবের কাছে এসেছিলাম দালান বিল্ডিং দেখে ? আমরা তো গুরুদেবকে দেখে এসেছিলাম । দালান বিল্ডিং দেখে যারা এসেছে, তারা ওই জন্য এখন মারামারি করছে । তারা ওইসব নিতে পারে । গুরুদেবের dead bodyটা (মৃতদেহটা) ওখানে মঠে রয়েছে এবং আমি তাঁর সমাধি-মন্দির করে দিয়েছি, কিন্তু গুরুদেবের আত্মাটা কথায় আছে, সেটা আমি জানি । সোজা কথা । পরম গুরু মহারাজ ‘সুজনার্ব্বুদ-রাধিত-পাদযুগং’ রচনা করেছেন, সেটা সব মঠে গাই । আর শ্রীল প্রভুপাদের আবির্ভাব দিনে একজন ভক্ত (তাঁর নামটা উল্লেখ নেই) তাঁর সম্বন্ধে মহিমা-কীর্ত্তন করেছিলেন : “জয়রে জয়রে জয় পরমহংস মহাশয় শ্রীভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী” (“আচার্য্য-বন্দনা”) । কত সুন্দর । প্রথম মায়াপুরে এই কীর্ত্তনটা করেছি । প্রভুপাদরে আবির্ভাব তিথিতে আমি যখন মায়াপুরে যাই, তখন ওই সময় শ্রীচৈতন্য মঠে গিয়ে ওই কীর্ত্তনটা করি : “জয়রে জয়রে জয় পরমহংস মহাশয় শ্রীভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ।” আর প্রত্যেকটা মঠেই গাই প্রভুপাদের আরতি (“শ্রীসারস্বত-আরতি”) : “জয়রে জয়রে জয় গৌর-সরস্বতী ।” যেখানে শ্রীশ্রীরাধা-কৃষ্ণ বিগ্রহ আছে, সেখানে আমরা এই কীর্ত্তনটা গাই । কোথাও আরাতির সময় আমরা কীর্ত্তন করিয়ে যাচ্ছি আর এই কীর্ত্তনটা শেষ করার আগে ওরা এসে শঙ্খ বাজায় (আরাতি শেষ করে দেয়) । আমি কী করব ? আমি এদেরকে বললাম যে, “কীর্ত্তন শেষ হয়, তখন আরতি শেষ করে দেবে ।” কিন্তু আমার দুটো কীর্ত্তন শেষ না হল ওরা সব শেষ করছে । কি বলব ?
জয়রে জয়রে জয় গৌর-সরস্বতী । (শ্রীসারস্বত-আরতি, শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ বিরচিত) এই চারটা লাইন শ্রীল প্রভুপাদের কথা, তার পরে অন্যান্য মঠে গায় “শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণের যুগল মিলন” আরতি কিন্তু শ্রীল শ্রীধর মহারাজ বললেন যে, ওটা high standard (হাই স্ট্যান্ডার্ড, উচ্চ স্তর), আর আমরা সবসময় নিচু থাকতে চাই । এত high (উচ্চ) আমরা যেতে পারি না ।
|
সম্পূর্ণ পাঠ ডাউনলোড / শুনুন | ||||||
| বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥ | |||||||
|
© Sri Chaitanya Saraswat Math, Nabadwip, West Bengal, India. For any enquiries please visit our contact page. { ফোনে আপডেট পেতে WhatsApp গ্রুপে যোগ দিন } |
|||||||