আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

গুরুদেবের তিরোভাব তিথি (দুপুর)

শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁবিষ্ণুপাদ
শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত
ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজের তিরোভাব তিথি
শিলিগুড়ি, ২৪ এপ্রিল ২০২১, দুপুর

 

(১) গুরুদেবের তিরোভাব


আজকে মদীয় গুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ জগৎগুরু শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজের শুভ তিরোভাব তিথি । গুরুপাদপদ্ম এই দিনটাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন । খুব বিরহের দিন তবু আমরা আড়ম্বরভাবে গুরুদেবের তিরোভাব তিথি পালন করে থাকি । বৈষ্ণবের তিরোভাব আর আবির্ভাব একই বস্তু কারণ বৈষ্ণবগণ হচ্ছেন ভগবানের নিজজন । গুরুদেব ভগবানের নিজজন ।

সাক্ষাদ্ধরিত্বেন সমস্ত-শাস্ত্রৈ-
রুক্তস্তথা ভাব্যত এব সদ্ভিঃ ।
কিন্তু প্রভোর্যঃ প্রিয় এব তস্য
বন্দে গুরোঃ শ্রীচরণারবিন্দম্ ॥

আজকের দিনে, এই তিথিতে অবলম্বন করে, শ্রীগুরুপাদপদ্ম ৪:২০-৩০ সময় (ভোর বেলায়) এই পৃথিবী ছেড়ে আমাদের চোখকে চলে গিয়েছেন । তিনি সমাধিস্থ অবস্থায় আছেন কিন্তু তিনি ওখান থেকে আমাদেরকে কৃপা করছেন । ভগবান্ ও গুরুদেব সব সময় নিত্যলীলায় থাকেন । তাই গুরুদেব নিত্যলীলায় থেকে আমাদের কাছে ভগবানের বার্তা পৌঁছে দেন, আমাদেরকে ওখান থেকে কৃপা করেন । তিনি কৃপা না করলে আমরা এত দিন বেঁচে থাকতে পারতাম না, এত দিন হরিভজন করতে পারতাম না । গুরুদেব যদি কৃপা না করে আমরা হরিভজন থেকে ছুটি হয়ে যাই (হরিভজন আর থাকে না) । গুরুদেবের কৃপা ছাড়া আমরা হরিভজন কি, গুরুসেবা কি, কৃষ্ণানুশীলন কি আমরা কিছুই জানি না, কিছুই বুঝতে পারি না ।

এই দিনটা খুব করুণ, নিরাশ দিন আমার পক্ষে, সবাইয়ের পক্ষে । এইদিনটা খুবই অসহ্য দিন । আমি অনেক কিছু সহ্য করতে পারি কিন্তু যে দিন আমি শুনেছি যে, গুরুদেব দহ ত্যাগ করেছিলেন, সেই দিনটাকে আমি সহ্য করতে পারি না…

ওই দিনের আগের দিনে আমি গুরুদেবের কাছে সন্ধ্যার সময় চলে এসেছিলাম । ওই দিনকে একাদশী ছিল । গুরুদেবকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমি তখন বলেও বুঝতে পারি নি যে গুরুদেব আমাদেরকে ওই দিনকে ছেড়ে চলে যাবেন । গুরুদেব আমাকে ডেকেছিলেন, আমি তাই কলকাতায় গিয়েছিলাম, তারপর দিন আমার মেদিনীপুরে প্রচারে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যখন আমি খবর পেছিলাম (৪:৩০-৪৫ ভোর বেলায়), তখন আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, কী আমি করব, কী আমার করতে হবে । কেউ আমাকে বললেন যে, “আপনাকের কলকাতায় যেতে হবে ।” আমি কলকাতায় এসেছিলাম গুরুদেবকে দেখবার জন্য… তারপর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করা হয়েছিল । সবাই এখানে ছিল—গুরুদেবের মেয়ে ও নাতিও সেখানে ছিলেন, কিছু ভক্তগণও ছিলেন । অ্যাম্বুলেন্সে করে আমি গুরুদেবকে নবদ্বীপে নিয়ে গেলাম । দুপুর বেলায় নবদ্বীপে এসে আমি সব জায়গায় খবর দিলাম (টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ, ইত্যাদিতে) । সমস্ত মায়াপুরের বৈষ্ণব-সঙ্গে ও সমস্ত গৌড়ীয়মঠের আচার্য্যগণকেও খবর দিলাম—তাঁরা তাঁদের লোকজনকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের মঠে গুরুদেবকে দেখবার জন্য ।

তার আগে তো আমি গুরুদেবকে প্রশ্ন করলাম, “কোন জায়গা আপনি পছন্দ করেন ?” আমার মনে ছিল মেইন গেটের সামনে, শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের ভজনকুটিরের কাছে কিন্তু গুরুদেব বললেন, “আমি গুরুমহারাজের সমাধি-মন্দিরের কাছে থাকতে পছন্দ করি ।” আসলে প্রথম তিনি আমাকে বললেন, “আমার দেহটা পুড়িয়ে গঙ্গায় ফেলে দিন,” কিন্তু আমি বললাম, “গুরুদেব, এটা অসম্ভব কারণ সমস্ত পৃথিবীতে যে ভক্তগণ আছেন তারা এই প্রস্তাব মানবেন না ।” তখন গুরুদেব বললেন, “ঠিক আছে, যদি মানবেন না, তাহলে গুরুমহারাজের কাছে রাখবে ।”

যেখানে গুরুদেবের সমাধি-মন্দির এখান আছে, সেখানে আমগাছ ছিল । ওই আমগাছ প্রায় মরে গেল (মরে যাচ্ছিল) । শেষ পর্য্যন্ত শুধু একটা কুঁদা রয়েছে । ওই কুঁদাটা বের করে আমরা সমাধির গর্তটা খনন শুরু করলাম । যখন আমরা গুরুদেবকে নবদ্বীপে নিয়ে এলাম, তখন ঘি-গঙ্গাজলাদি দিয়ে গুরুদেবের দিব্যদেহ স্নান করলাম । তখন প্রায় ৫ বেজেছিল । গুরুদেবের শরীরটা অপ্রাকৃত শরীর তো—যেভাবে তাঁর আত্মটা দেহ ছেড়ে চলে গেচ্ছেন, দেহটা সেইরকমই রহে গিয়েছে । কোন রঙ পরিবর্তন হয় নি, কোন দেহের শক্ত-টক্ত কিছু হয় নি । যেমন তুলা-তুলা করে নরম, খুব সুন্দর । একবারে তুলার মত নরম । সেটা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম । এইটা অপ্রাকৃত ভক্তের দেহ ।

সেইভাবে, শ্রীল শ্রীধর মহারাজের সমাধি-মন্দিরের উপরে গুরুদেবকে স্নান করিয়ে তারপর সমাধি বসানো হল । গর্ত বড় হল, সেখানে গর্তের মধ্যে সবাই ভক্তেরা তাঁকে বসাল । আমাকে কোনরকম সবাই বললেন যে, “গুরুদেবের বুকে ব্রহ্মগায়ত্রী এবং শ্রীঅঙ্গে তিলক চন্দন দিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে নিচে নামতে হবে ।” আমি সেইভাবে নিচে কোনরকম করে নেমে নিজেকে সংগ্রহ করতে পারছিলাম না সেই দিনটাকে… কোনরকম নিচে নেমে তারপর গুরুদেবের দেহটাকে মাটি দেওয়া হল । পুটটা ভর্তি করার পর্যন্ত আমি আর সেখানে থাকতে পারলাম না— একবারে পুটটা মাটি ভরাট করার পর্য্যন্ত আমি একটু দূরে চলে গেলাম, “ওই দৃশ্য আমি আর দেখতে পারব না ।” সেজন্য আমি আর বেশী ক্ষণ কাছে থাকলাম না ।

তারপর গুরুদেবকে ভোগ লাগিয়ে তাঁর আরতি করলাম । মাথার ওপর একটা তুলসী রাখলাম । আর নতুন টিন কিনে নিয়ে চারদিকটা বেড়া দিয়ে তার উপর একটা টিনের ছাউনি করে দিয়েছি ।

তারপর চল্লিশ দিন পরে আমি সমাধি আরম্ভ করে দিয়েছিলাম । ওইটাই নিয়ম যে চল্লিশ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরে সমাধি-মন্দির আরম্ভ করতে পারি । অনেকে এক বছর অপেক্ষা করতে বলেছিল কিন্তু আমি বললাম, “আমি এক বছর যদ না বেঁচে থাকি, তাহলে কে গুরুদেবের সমাধি-মন্দরিটা করবে ?” তাই চল্লিশ দিনের মাথায় গুরুদেবের সমাধি-মন্দির শুরু করে দিয়েছিলাম । তারপর তো সব কথাই আপনাদের জানা…

 

(২) সবকিছু অন্ধকারে ডুবে গেল


আমার মত পতিত-অধম জীবকে গুরুদেবের মহিমা-কীর্ত্তন করার অসম্ভব, তাঁর মহিমা-কীর্ত্তন করবার জন্য আমার কোন গুণ বা যোগ্যতা নেই । কটি মুখ, কটি জিহ্বা দিয়েও গুরুদেবের মহিমা-কীর্ত্তন করবার অসম্ভব তাই আমার মত পতিত জীবকে কি করে সেটা সম্ভব হতে পারে ? কিন্তু গুরুদেব সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকেন । তিনি সব সময় আমাদেরকে দেখাশোনা করে থাকেন । আমি সব সময় দেখতে পাই যে, গুরুদেব আমাকে রক্ষা করে চলছেন । বিপদে-আপদে, সম্পদে-বিপদে যখনই যে অবস্থায় থাকি না কেন গুরুদেবকে স্মরণ করি । গুরুদেব সব সময় আমাদেরকে কৃপা করে থাকেন ।

গুরুদেব এই জগৎ থেকে চলে গিয়েছেন । আমি বুঝতে পারি যে মাথার উপরে একটা ছাতা ছিল কিন্তু এখন এই ছাতাটা চলে গিয়েছে… গুরুদেব যেমন বটবৃক্ষ — যেরকম একটা বটবৃক্ষ সবাইকে ছায়া দেয়, সেরকম গুরুদেবও সবাইকে ছায়া দেন, কোন রকমের কষ্টের আঁচ লাগতে দেন না । যার সঙ্গে গুরুদেবের সম্বন্ধ হয়েছে, সে একমাত্র বুঝতে পারে বিরহের জ্বালা কী । বিরহের জ্বালা কতটা কষ্টকর ! সেটা যার একমাত্র বিরহ হয়েছে, সেই বুঝতে পারে ।

১৯৯১ সাল থেকে গুরুদেবের কাছাকাছি আছি । গুরুদেবের আদেশ পালন করে তাঁর সেবা করার চেষ্টা করেছি মাত্রা । তাঁর শ্রীচরণে এসে আমি সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর আদেশ পালন করতে চেষ্টা করেছি । তাঁর ইচ্ছা পূরণ করলাম কি না, জানি না কিন্তু গুরুদেব আমাকে খুব সহ্য করেছেন । আমি অনেক সময় কাজ করেছি যার দিয়ে গুরুদেবের মনঃপূত হয় নি । তিনি আমাকে বকাঝকা করেছেন, সেটা আমার কাছে খুব ভালো লাগত । গুরুদেব সব সময় বলতেন, “সবাইকে বকাঝকা করলে সবাই আমার কাছ থেকে পালিয়ে যেত, কিন্তু আচার্য্য মহারাজকে বকাঝকা করলে সব সময় সে আমার কাছেই থাকত, কখনও আমার কাছ থেকে চলে যেত না ।” এসব কথাগুলো গুরুদেব সব সময় বলতেন ।

সুখ-দুঃখের কথা গুরুদেবের সঙ্গে আলাপ করতাম । রাত দুটা-আড়াইটা সময় গুরুদেবের কাছে চলে যেতাম । দুটা, তিনটা সময় তিনি আমাকে ডাকতেন । গুরুদেব যখন ডাকতেন আমি গামছা পরার অবস্থায় শুয়ে আছি, তবু রাতের বেলায় তিনটা সময় গুরুদেব ফোন করতেন এবং আমি চলে যেতাম তাঁর কাছে । কাপড় পরার চিন্তাও করি নি । “কখন যে কাপড়টা পরে গুরুদেবের কাছে যাই”—সে সব কোন দিন মনে হয় নি । গুরুদেবকে মনে হত যে তিনি আমার নিজের জন… “জনকাধিক-বৎসল-স্নিগ্ধ-পদং । তিনি আমার কাছে জনকের চাইতে অধিক প্রিয় ।” পিতামাতার কাছ থেকে যা স্নেহ না পেয়েছি, তার চাইতে অনেক স্নেহ আমার গুরুদেবের কাছ থেকে পেয়েছি । যখন গুরুদেব এই জগৎ থেকে চলে গেলেন তখন মনে হচ্ছিল আর বকা দেওয়ার কেউ থাকল না । সুখ-দুঃখের কথা সব সময় গুরুদেবের সঙ্গে আলাপ করতাম আর গুরুদেব যখন এই জগৎ থেকে চলে গেলেন, একটা ছায়া—যেন একটা আবরণ—চলে গেল । কি হচ্ছে, কি হবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । মনে হচ্ছিল যে, আমি একা ! কিন্তু যখন অনেক বিদেশি ভক্তহণ আমার কাছে আসল, তখন মনে হল যে, “একা নই আরো । এই সুখ-দুঃখের দিনটা তাদের সবাইকে নিয়ে বহে বেড়াব ।”

গুরুদেবের অনেক অনেক কাজ, অনেক অনেক সেবার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন । অনেক কঠিন কঠিন সেবার দায়িত্ব দিয়েছেন কিন্তু কখনও গুরুদেবকে না কথাটা বলি নি । এবং গুরুদেবের কৃপা নিয়ে সেটা প্রত্যেকটা কাজে সফল হয়েছি । তিনি আমাকে দেশে প্রচারে পাঠিয়েছেন । বিদেশেও গুরুদেবের সঙ্গে অনেক বার গিয়েছি, একাও গিয়েছি—গুরুদেব আমাকে পরীক্ষা করেছেন, “ও পারে কি না ?” কিন্তু সেটা সব সম্ভব ছিল না যদি গুরুদেবের কৃপা না হত । গুরুদেব আমাকে বাংলায় প্রচারে যেতে পাঠিয়েছেন, চাল ও আলু ভিক্ষা করতে পাঠিয়েছিলেন এবং আমি সফল হয়েছি তাঁর কৃপার জন্য । কঠিন কঠিন সেবা গুরুদেব দিয়েছেন—অনেক বছর ধরে নবদ্বীপ-ধাম পরিক্রমা (আমাদের মূল উৎসব), গুরুদেবের আবির্ভাব তিথি, পরমগুরুমহারাজ শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব মহোৎসব আয়োজন করার তিনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন । ভ্ক্তগণকে দেখাশোনা করার, অনেক গেস্টহাউস, গোবিন্দ কুণ্ড, অনেক চৈতন্যসারস্বত মঠের শাখা—এই সব দায়িত্ব গুরুদেব আমাকে দিয়েছেন এবং তিনি খুব খুশি ছিলেন । আমার এই সব দায়িত্ব দিয়ে তিনি সব সময় সুখে থাকতেন । সে বাংলায় বা বিদেশে প্রচারই হোক, চাল ভিক্ষায় হোক, আলু ভিক্ষায় হোক বা কোন মঠের গেস্টহাউস করা হোক, গোবিন্দ কুণ্ড সংস্কার করা হোক—সমস্তা কাজ আমাকে দিয়ে তিনি দেখতেন । আমি গুরুদেবের কোন কাজ থেকে পিছপা হই নি ।

গুরুদেব আমাকে বলতেন, “বেরিয়ে যাও এখান থেকে !” আমি বেরিয়ে যেতাম আবার একঘণ্টা পর চলে এসে বলতাম, “আমার দু’লাখ টাকা চায় ।” তিনি বলতেন, “তোমাকে চলে যেতে বলেছি !” আমি বলতাম, “আপনি আমাকে চলে যেতে বলেছেন, আসতে তো বারণ করেন নি ।” এই ভাবে গুরুদেবের কাছে সব সময় আসতাম । যেমন গোরুর কাছে বাছুর সব সময় বসে থাকে চুপচাপ, আমিও বাছুরের মত চুপচাপ গুরুদেবের কাছে বসতাম । যখন সেবা থাকত, সেগুলো করতাম আর বাকি সময় গুরুদেব যখন নবদ্বীপে থাকতেন, আমি তাঁর কাছে গোরুর বাছুরের মত থাকতাম । কোন প্রশ্ন করতাম না । আর সব সময় অপেক্ষা করতাম, “কখন তাঁর আদেশ আসবে ?” চাতক পাখি যেমন একটা বৃষ্টির জলের জন্য বসে থাকে, তেমন আমিও গুরুদেবের আদেশের অপেক্ষায় বসে থাকতাম ।

 

(৩) সেবার দিকে খেয়াল


যখন গুরুদেব কলকাতা থেকে বেরতেন, তিনি আমাকে ফোন করে বলতেন, “যে আমি আসব, কাউকে বলবেন না ।” আমি গোপনে গোপনে দুই-এক জনকে বলতাম যে, “ঘোরটা একটু পরিষ্কার করে রাখা হবে ।” যখন গুরুদেব কৃষ্ণনগরে আসতেন (তিনি সব সময় ওই রাস্তায় যেতেন কারণ ওই সময় কালনা রড় ছিল না), তখন তিনি আমাকে ফোন করে বলতেন, “আমি কৃষ্ণনগরে” এবং আমরা কীর্ত্তনাদি তাঁকে স্বাগত জানাতে সব প্রস্তুতি করতাম । তারপর আমরা সঙ্কীর্ত্তন করতে করতে তাঁকে তাঁর ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে এসে ও আরতি ইত্যাদি করে আবার চলে আসতাম ।

গুরুদেব কী খেতে পছন্দ করতেন, কী ভালোবাসতেন, আমি সেটা জানতাম । সব বাজার থেকে নিয়ে আসতাম (সব কিছু তাঁর তাঁর রান্নাঘরে প্রস্তুত ছিল : গুরুদেব এসে তাঁর সেবক রান্না করবে) । উনি সব সময় খুব ভোর বেলায় বেরতেন আর নবদ্বীপে নটার মধ্যে চলে আসতেন । আমি সব আগের দিনে বাজার করে তাঁর ঘরে রাখতাম । যেমন গুরুদেব চামরমনি চাল পছন্দ করতেন । আতপ চাল খেতে পারতেন না কারণ সেটা খেয়ে পেটের গন্ডগোল শুরু থাকত । চামরমনি সিদ্ধ চাল খুব ভাল চাল । বেগুন ভাজা খেতেন (যে বেগুনে বিচি নাই, সেই বেগুন কিনতে হত) । এবং খুব ঝাল দিয়ে একটুখানা আলু সিদ্ধ নিতেন । কড়া ঝাল ! দুই-চারটা লঙ্কা দিতে হত (লঙ্কা পুড়িয়ে সেটা কড়া ঝাল) । মাঝে মাঝে ছোলার বা মুগ ডাল পছন্দ করতেন, একটা কোন সবজি নিয়ে । বেশি আইটেম পছন্দ করতেন না । সুগারও থাকত, কিন্তু উনি বলতেন, “আইসক্রিম খাব !” ThumbsUp খেতেন । আর আম পছন্দ করতেন । আমের সুগার বেশি, কিন্তু উনি বলতেন, “সুগার আজকে ১২০, তবে একটা আম খাব !” গুরুদেব এই সব প্রসাদ পছন্দ করতেন । আলু খাওয়া বন্ধ করে দিলেন, কিন্তু আলু পোস্ত খেতেন, খুব পছন্দ করতেন ।

এই ভাবে গুরুদেবের এই সব দিকটা খেয়াল রাখতাম—আমি সব দিকটায় জানতাম কি করে গুরুদেবকে খেয়াল রাখতে হবে ।

যে বিগ্রহ এখানে (শিলিগুড়িতে) দেখেন, সেটা গুরুদেবের পছন্দ করা বিগ্রহ । গুরুদেব আমায় একদিন বললেন, “চলুন, ঘুরি আসি ।” আমি তাঁর সঙ্গে ঘুরতে গেলাম এবং হঠাৎ যেখানে বিগ্রহ তৈরি করা হয়, সেখানে গিয়েছিলাম । মিস্ত্রি বললেন, “এই বিগ্রহটা অনেক দিন ধরে করেছি । ২০০০ সালের বন্যা এটা খেয়েছে কিন্তু কোন অসুবিধা হল না । এটা বিগ্রহ খুব ভালো ।” গুরুদেব আমাকে জিজ্ঞাসাা করলেন, “আপনার এটা পছন্দ ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, গুরুদেব, পছন্দ ।” “তাহলে অর্ডার দিয়ে দেন । নিয়ে চলুন ।” মিস্ত্রি বললেন, “অন্য রঙ করে দিতে হবে, তাই দুই-চার দিন পরে পাঠিয়ে দেব ।” গুরুদেব আমাকে জিজ্ঞাসাা করলে, “কোথায় বিগ্রহটা পাঠাবেন ?” আমি বললাম, “মালয়েশিয়ায় ।” কিন্তু মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয় নি, তারপর এখানে মন্দির হল, তাই এখানে প্রতিষ্ঠা করলাম । এটা গুরুদেবের পছন্দ করাই বিগ্রহ—শ্রীশ্রীগুরু-গৌরাঙ্গ-গান্ধর্ব্বা-গোবিন্দসুন্দর গুরুদেবেরই দাওয়া নাম গুরুদেবই পছন্দ করে দিয়েছিলেন ।

যখন আমি প্রথম শিলিগুড়িতে এসেছি, এখানে মঠটা হয় নি । ওই সময় গুরুদেব বিদেশে আমেরিকায় ছিলেন । আমি দেবানন্দ গৌড়ীয় মঠে উৎসবে এসেছিলাম, আর ভক্ত দেখে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল । তখন গুরুদেবকে বললাম “শিলিগুড়িতে মঠ করব ?” গুরুদেব বললেন, “আমি অসুস্থ, অপারেশন হবে । আপনি যদি ইচ্ছা করেন শিলিগুড়িতে মন্দির করতে, করতে পারেন ।” তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছিলেন । এই মন্দিরের চূড়াটা তিনি দেখে গিয়েছিলেন । চূড়াটা যখন হয়েছিল, তখন উনি ছবি দিয়ে দেখিছেলেন, “চুড়াটা হয়ে গিয়েছিল ।” এই তিনতলার বিল্ডিংটা দেখেন নি, এটা অনেক পরে হয়েছিল । যে একতলা বাড়ি কিনেছিলাম এবং যে এই বিল্ডিংটাও হয়েছে, সেটা তিনি ছবিতে দেখেছেন । আমি যখন এই বিল্ডিংটার উপরে চূড়া করেছি, তখন উনি বললেন, “ভিত কেমন আছে ?” যা ঠাকুরের ইচ্ছা হয়ে যাবে, আজ পর্যন্ত কোন অসুবিধা হয়ে নি । (আমি তিনতলা বিল্ডিং কিনেছিলাম, তার উপরে চূড়াটা করেছিলাম ।)

গুরুদেব এখানে আসতে পারেন নি একটা লোকের জন্য । আপনারা ভালো করেই জানেন । গুরুদেবের ইচ্ছা ছিল এখানে গরম কালে আসতে কিন্তু একটা লোকের betray (বিশ্বাসঘাতকতা) করল । শিষ্য হয়েও সে গুরুদেবের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল । মন খারাপ হয়ে গুরুদেব বললেন যে, “দীক্ষা নিয়ে যদি শিষ্যর এইরকম অবস্থা হয়, আমি যাব না । আপনি ওখানে থাকবেন ।” সেইজন্য তিনি রাগ করে আসেন নি । শিষ্য হয়েও গুরুদেবের সঙ্গে এইরকম প্রতারণা করতে পারে ? চিটিংবাজি করতে পারে ? কল্পনা করা যায় না । সেই জন্য গুরুদেব তাকে বলেছিলেন “রক্ত চুষা মশা” । “মশা যেমন মনুষের রক্ত চুষে, সেরকম আমার শিষ্য আমার রক্ত চুষছে ।”

গুরুদেবের এই কথাগুলা অনেক সময় মনে পরে । কথাগুলা সব তো সত্য । গুরুদেবের যদি কৃপা বঞ্চিত হয়, সে কতটা অপরাধী হয়ে যেতে পারে ! রামচন্দর পুরীর কথা শুনেছেন—তিনি বৈষ্ণবের চরণে অপরাধ করে, গুরুদেবের চরণে অপরাধ করে, শেষ পর্যন্ত ভগবানের (মহাপ্রভুর) চরণে অপরাধ করেছেন এবং জগন্নাথ ছাড়া হয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ পুরী ছাড়া কোথায় যে চলে গেল তাদের কোন হাজির পাওয়া যায় নি ।

গুরুদেব সব সময় গাছ পছন্দ করতেন । একটা গাছও তিনি কাটতে পছন্দ করতেন না । গরুও ভালোবাসতেন, গাছও ভালোবাসতেন । একসময় বিদেশী মেয়েরা বা কাজের মেয়েরা এসে গাছের তালায় পাতা জোর করে পুড়াছে—গুরুদেব বলছেন তখন, “এই গাছের তলায় তুমি পাতাগুলা পুড়াছো ! গাছটার গায়ে তাপ লাগছে, ভগবান তোমাকে এইরকম তাপ দেবে । তুমি গাছটাকে এত কষ্ট দিচ্ছো !” গোশালায় তিনি একা গরুকেও বিক্রি দিতেন না । তিনি বলেছেন, “গরু বিক্রি করলে মুসলমানরা গরুকে খেয়ে নেবে আর তার যে reactionটা (প্রতিক্রিয়াটা) হবে, সেটা আপনাকে ভোগ করতে হবে । সুতরাং এসব কাজ করবেন না ।” পুকুরের মাছও বিক্রি করতে দিতেন না । এখন, আমার নবদ্বীপ থেকে ছেড়ে আসার পরে, ওরা সব গরু ও মাছ বিক্রি করে দিয়েছে, গাছ কেটে বিক্রি করে দিয়েছে । অপরাধী হলে যা হয় । বড় বড় গাছ সে কেটে বিক্রি করে দিয়েছে ।আমি কঠিন ইট (সক্ত সক্ত ইট) দিয়ে বিল্ডিংগুলা করেছিলাম—ইট ভাঙার যদি চেষ্টা করবে, পারবে না, ইট আসতে বেরবে না । তা না হলে বিক্রি করে খেয়ে নিত । বিছানা, ফ্যান, ফ্রিজ সব বিক্রি করেছে । গুরুদেবের TVও বিক্রি করেছে । এই দশা চলছে । আমি তো কোন অসুবিধায় নেই—তারাই অসুভিধায় পড়েছে বলে তাদের এই দশা হয়েছে ।

 

(৪) সেবার মাইলস্টোনগুলো


গুরুদেব আমাকে মানুষ করেছেন । কামার যেমন একটা লোহাকের পুড়িয়ে হাতুড়ি বা দা বা কাঁচি তৈরি করে, তদ্রূপ আমাকেও গুরুদেব অল্প বয়স থেকে তৈরি করেছিলেন । আমি ত্রিশ বছর নিচে মঠে এসেছি । গুরুদেবের এক কথায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে মঠে চলে এসেছিলাম । মঠ আসার পরেও চাকরিটা ছিল, তবু গুরুদেব বলেছিলেন, “চাকরিটা ছেড়ে দিন ।” তাঁর এক কথায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম । আমার লোভনীয় চাকরি ছিল : কলেজে প্রফেসরি করতাম, ৭০-৮০,০০০ (এখন ২০০,০০০) টাকা মাহিনা । কিন্তু সেটা ছেড়ে দিয়েছিলাম এক কথায় । গুরুদেব আমাকে বলতেন, “বৃহৎ স্বার্থ পেতে হলে ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ আপনাকে ছাড়তে হবে ।” সেই কথা আমি মনে রেখেছি ।

মনে রেখেছিও কি করে বৈষ্ণব-সেবা, ভক্ত-সেবা করতে হয়, কি করে শাসন করতে হয় । সে সব গুরুদেবের কাছ থেকে শিখেছি । আর সহ্য ক্ষমতা গুরুদেব যেভাবে শিখিয়েছেন, সেইভাবে এখন দেখছেন তো কত সহ্য করে আছি ।

মঠে গরু-বাছুরগুলা দেখাশোনা করতাম, বিল্ডিং-কনস্ট্রাকশন দেখাশোনা করতাম । গুরুদেব বলেছিলেন, “এত করবেন কি করে ? যদি পারেন, তাহলে করবেন ।” আর ৫০বিঘা মঠের জমি চাষ করতাম : দুবার করে গম, তিল ও সরিষা করতাম (তিনবার চাষ হত) । তারপর বিভিন্ন মঠের শাখা হয়েছিল । বামুনপাড়ায় ও শিলিগুড়িতে মঠগুলা এবং একচাক্রায় মঠ অর্ধেকটা করেছিলাম গুরুদেবের সময় । তারপর যেগুলো হয়েছে, পরে হয়েছে । গঙ্গাসাগর ও বাঁকুড়া গুরুদেব শুনে গিয়েছিলেন কিন্তু মন্দিরগুলা দেখেন নি । কিন্তু এখম সমাধি বসে বসে তিনি এখান থেকে কৃপা করছেন আর সব কিছু দেখতে পারেন ।

গুরুদেব এখানেও বসে আছেন । আপনারা ভাবছেন, “এটা বিগ্রহ, মুর্ত্তি ।” না । তিনি ভগবান্ আছেন, গুরুদেব বসে আছেন । তিনি সব শুনতে ও দেখতে পারছেন কিন্তু সমাধির মত বসে আছেন, কিছু বলছেন না । এই অনুভূতিটা আমাদের আসতে হবে যে, গুরু জগৎ থেকে কখনও চলে যান নাই । গুরু নিত্য অবস্থান করেন, নিত্য-সেবায় বিরাজ করেন ।

শ্রীল শ্রীধর দেব-গোস্বামী মহারাজের অনেক শিষ্য ছিল, অনেক ত্যাগী-শিষ্য, অনেক ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী-শিষ্য ছিল, হাজার হাজার শিষ্য ছিল । গুরুদেব গৃহস্থ হলেও শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ তাঁকে গৃহ থেকে টেনে নিয়ে এসে সন্ন্যাস দিয়ে আচার্য্য করেছিলেন । প্রথম ব্রহ্মচার্য্য পালন করেছেন, তারপর গৃহে চলে গিয়েছেন, সংসার ধর্ম্ম পালন করেছেন । তারপর ১৯৮৫ সালে শ্রীল শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ গুরুদেবকে সংসার থেকে টেনে নিয়ে এসে আবার তাঁকে সন্ন্যাস দিয়ে গুরুপদে বসিয়ে দিয়েছেন । শ্রীধর মহারাজ আড়াই বছর ছিলেন আর আগস্টে ১৯৮৮ সালে তিনি এই জগৎ থেকে চলে গিয়েছিলেন ।

আমি জীবনে কোন দিন কঠিন কষ্টেও চোখের জল ফেলি নি, কিন্তু যে গুরুদেব যাওয়ার দিন, সে দিন শুধু চোখের জল ফেলেছি । আর এই গুরুদেবের বিরহ তিথি হলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না । নিজেকে control (সংযম) করতে পারি না । অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করেছি, গুরুভাইদের অনেক জ্বালা । আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ওরা আমাকে জেলে ছুড়ে দিয়েছে, তাও কোন কষ্ট হয় নি । জেলে বসে আমি হরিনাম করতাম, প্রসাদ পেতাম, বই-গ্রন্থ পড়তাম । আমি কোন দিন কষ্ট পাই নি যে কষ্ট আমি পেয়েছিলাম গুরুদেবের কাছে থাকতে ।

যখন যা বলতেন । এক দিন বিকাল বালয় গুরুদেব আমাকে বলছেন, “আমি একটা শিঙ্গাড়া খেতে ইচ্ছা করছি । যান মিষ্টি দোকান থেকে শিঙ্গাড়া কিনে নিয়ে আসুন ।” শিঙ্গাড়া নিয়ে আসলাম । তিনি বলছেন, “এ গাছের বেলগুলা সব পেকে যাচ্ছে ও পড়ছে, একটা বেল তো আমাকে দিচ্ছেন না ? আমাকে বেলের শরবত করে দিন ।”

গুরুদেবের ঘরে বাথরুম থেকে প্লাস্টার খুলে খুলে পড়ছিল । ১৯৯৬ সালে (আমি তখন সন্ন্যাস নেই নি, ব্রহ্মচারী ছিলাম, বিনদ রঞ্জন নাম আমার ছিল) গুরুদেব অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন, তার আগে আমি তাঁর ঘরের চাবি আমার কাছে রেখে দিয়েছিলাম । যখন আমি গুরুদেবের বাথরুমটা ঠিক করে যাচ্ছিলাম, আমি ভাবলাম যে, গুরুদেবের ঘরটা খুব ছোট । তাই আমি ঘরটাকে কিছু বিস্তৃত করে দিলাম । একজন লোক গুরুদেবের কাছে নালিশ করেছিলেন বলে গুরুদেব শুনে গিয়েছিলেন যে, আমি তাঁর ঘর ভেঙ্গে দিয়েছিলাম । মন খুব খারাপ হয়ে তিনি আমার সাথে কথা বলতেন না । অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে এসেও তিনি আমার সাথে কথা বলতেন না । তিনি সেবক-কুঞ্জ ভবনে থাকলেন । তারপর একদিন তিনি আগের ঘরটা দেখতে ইচ্ছা করলেন । গিয়ে ঘরটা দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, “ভালো কাজ হয়েছে ! কালকেই ঘরে ফিরে আসব ।” আমি আরো একটু বেশি খরচ করেছিলাম । যখন গুরুদেব গোশালায় যেতে ইচ্ছা করলেন, তিনি গোশালার পিছনে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, আমি পিছনে একটা বড় গোশালা করেছিলাম । “এত বড় গোশালা হয়েছে ? আঃ এখন আমি দেখছি যার জন্য পয়সা খরচ হয়েছিল । এই কাজটা হয়েছে । আমি জানতাম না ।”

আর এক দিন একজন লোক গুরুদেবের কাছে এসে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন যে, “আচার্য্য মহারাজ আপনার পয়সা চুরি করছেন !” গুরুদেব বললেন, “হ্যাঁ, আমি জানি উনি পয়সা চুরি করছেন, কিন্তু আপনি বলতে পারেন কোথায় উনি পয়সাটা রেখে দিচ্ছেন ?” পরের দিন কিছু অস্ট্রেলিয়ান ভক্তেরা আমার সঙ্গে বামুনপাড়ায় গিয়েছিলেন আর যে মন্দিরটা ওখানে তৈরি করা হচ্ছিল, তার গোপনে গোপনে কিছু ছবি তুলে নিয়েছিলেন । পরে ওরা গুরুদেবকে ছবিগুলো দেখা দিয়েছিলেন । বামুনপাড়ার ছবিটা দেখে গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কী ? কোথায় এটা ?” ভক্তেরা বললেন, “বামুনপাড়ায় ।” গুরুদেব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, “বামুনপাড়ায় ? ওখানে মন্দির করা হচ্ছে ?! আমি ভাবলাম যে, গেস্ট-হাউস করা হচ্ছে ! আমি জানতাম না যে, আচার্য্য মহারাজ ওখানে মন্দির তৈরি করছেন !” তারপর যে লোকটা আমার বিরুদ্ধে গুরুদেবের কাছে নালিশ করতে এসেছিলেন, ওকে ডেকে গুরুদেব কম্পিউটারে ছবিটা দেখালেন ।

“দেখছেন তো ছবিটা ? কী দেখছেন তো ?” গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন ।

“জানি না সেটা কী ।”

“আপনি নবদ্বীপে থেকেও কিছু জানেন না ! এটা বামুনপাড়ায় ! উনি ওখানে মন্দির তৈরি করছেন ! কালকে আপনি বললেন যে, উনি পয়সা চুরি করেছেন, কিন্তু যা চুরি করেছেন এই জন্য করেছেন ।”

গুরুদেব খুশি ছিলেন ।

 

 

 


 

 

← ফিরে

সম্পূর্ণ পাঠ ডাউনলোড / শুনুন
(16.4 Mb, 40 min)

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥