আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড)


৪। কসাধ্যবস্তুর মূল : ছয় দোষ

 

ছয় বেগটা কী আপনারা শুনলেন । আরও ছয় দোষটা আছে ।

এক নম্বর দোষ হচ্ছে অত্যাহার—বেশি খাওয়া । তারপর প্রয়াস—ভক্তি-বিরোধীচেষ্টা । “টাকা সঞ্চয় করব”, “আরও চাই, আরও চাই, আরও চাই”—বিষয়ে মোহিত, বিষয়োদ্যম কাজ, ইত্যাদি । কিন্তু ভগবান্ যদি পয়সা আপনাদের দেন, তা দিয়ে ভগবানের সেবা ও ভক্তসেবা করতে হবে । তাঁর সেবার জন্য ভগবান্ আপনাদের সব দেবেন । আপনারাও বিরক্ত হয়ে যাবেন যদি কেউ আপনাদের কাছে লোভের জন্য সব সময় “চাই”, “চাই”, “চাই” করেন । যদি আপনারা “চাই”, “চাই” করেন ভগবান্ আপনাদেরকে কিছুই দেবেন না । সবসময় কেউ যদি ভগবানকে বলেন, “আরও চাই, আরও চাই, আরও চাই,” ভগবান্ বলছেন, “বাবা, আমি ওর কাছ থেকে দূরে থাকি !” শাস্ত্রে এইভাবে বলেছেন ।

একবার রামানন্দ রায়ের সঙ্গে মহাপ্রভুর কৃষ্ণ-কথা হল । প্রথমে রামানন্দ রায় বললেন বিষ্ণুভক্তির কথা—

প্রভু কহে,—পড় শ্লোক সাধ্যের নির্ণয় ।
রায় কহে—স্বধর্ম্মাচরণে বিষ্ণুভক্তি হয় ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৫৭)

“পরমেশ্বর বিষ্ণু বর্ণধর্ম্ম ও আশ্রম-ধর্ম্মের আচারযুক্ত পুরুষ-কর্ত্তৃক আরাধিত হন । বর্ণাশ্রমাচার ব্যতীত তাঁহাকে পরিতুষ্ট করিবার জন্য কোন কারণ নাই ।”

প্রভু কহে, এহো বাহ্য, আগে কহ আর ।
রায় কহে, কৃষ্ণে কর্মাপণ—সর্ব্ব সাধ্যসার ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৫৯)

শ্রীমদ্ভগবতগীতায়ও (৯/২৭) বলেছেন,

যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ ।
যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্ ॥

“হে কৌন্তেয়, যাহাই কর, যাহাই ভক্ষণ কর, যাহাই হবন কর, যাহাই দান কর এবং যে তপস্যাই কর, সে সমস্তই, আমি কৃষ্ণ, আমাতে অর্পণ কর ।”

এটাই হচ্ছে সত্যিকারের কর্মমিশ্রা ভক্তি ।

আর জড়জগতের লোকের কর্ম্মমিশ্রা ভক্তি কী রকম ? আমি ভগবানের কাছে প্রণাম করে গিয়ে বলি, “আমার শরীরটা ভাল রাখ”, “আমার ছেলেকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দাও”, “আমার মেয়ের ভালো জায়গায় বিয়ে হোক” । ভগবানকে প্রণাম করার পরিবর্তে, দুইটাকা দেওয়ার পরিবর্তে কিছু চাওয়া, এটা হচ্ছে কর্ম্মমিশ্রা ভক্তি । মহাপ্রভু বললেন, “এহো বাহ্য, অগে কহ আর—এটা ছেড়ে দাও, আগে কহ আর ।”

প্রভু কহে, এহো বাহ্য, আগে কহ আর ।
রায় কহে, স্বধর্মত্যাগ—এই সাধ্য সার ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৬১)

“ধর্ম্মশাস্ত্রে আমি ভগবান্ যাহা ‘ধর্ম’ বলিয়া আদেশ করিয়াছি, তাহার গুণদোষ বিচার-পূর্ব্বক সেই সকল ধর্ম্মপ্রবৃত্তি ছাড়িয়া যিনি আমাকে ভজন করেন, তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট (সাধু) ।”

শ্রীমদ্ভগবতগীতায় (১৮/৬৬) বলেছেন,

সর্ব্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

“একমাত্র আমিই ভগবান্ । সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ পূর্ব্বক আমার শরণাপন্ন হও, তাহলে আমি তোমাকে সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত করব । তুমি শোক করিও না ।”

তারপর জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি—

প্রভু কহে, এহো বাহ্য, আগে কহ আর ।
রায় কহে, জ্ঞানমিশ্রাভক্তি—সাধ্যসার ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৬৪)

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় বলেছেন (১৮/৫৪),

ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি ।
সমঃ সর্ব্বেষু ভুতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ ॥

“অভেদব্রহ্মবাদরূপ জ্ঞানচর্চাদ্বারা স্বয়ং প্রসন্নাত্মা, শোক ও বাঞ্ছা-রহিত ও সর্ব্বভূতে সমভাবযুক্ত ব্রহ্মতা লাভ করিয়া পরে আমার পরা-ভক্তি প্রাপ্ত হয় ।”

কিন্তু মায়াবদ্ধ জীবের জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি হচ্ছে, “আমাকে একটু জ্ঞান দাও”, “আমার ছেলেকে একটু জ্ঞান দাও”, “আমার বুদ্ধি দাও”—এসব করা । মহাপ্রভু বললেন, “এহো বাহ্য, অগে কহ আর । এসব ছেড়ে দাও, আরও সামনে আগাও ।” তখন রামানন্দ রায়ের বললেন জ্ঞানশূন্য ভক্তির সম্বন্ধে ।

প্রভু কহে এহো বাহ্য আগে কহ আর ।
রায় কহে জ্ঞানশূন্যভক্তি—সাধ্য সার ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/৮/৬৬)

শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/১৪/৩) বলেছেন—

জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য নমন্ত এব
জীবন্তি সম্মুখবিতাং ভবদীয়বার্ত্তাম্ ।
স্থানে স্থিতাঃ শ্রুতিগতাং তনুবাঙ্মনোভি-
র্যে প্রায়শোঽজিত জিতোঽপ্যসি তৈস্ত্রিলোক্যাম্ ॥

ব্রহ্মা ভগবানকে বললেন, “হে ভগবান্, নির্ভেদব্রহ্মচিন্তারূপ জ্ঞান-চেষ্টাকে সম্পূর্ণরূপে দূর করিয়া ভক্তগণ সাধু-মুখবিগলিত আপনার কথা শ্রবণ করেন ও কায়মনোবাক্যে সাধুপথে স্থিত হইয়া জীবন-যাত্রা নির্ব্বাহ করেন, ত্রৈলোক্য মধ্যে আপনি দূর্ল্লভ হইয়াও তাঁহাদের নিকট সুলভ হইয়া পড়েন ।”

এখন মহাপ্রভু বললেন, “এহো হয়—এইটা হয় ।”

“আমি কিছু জানি না, কিছু বুঝি না, আমার লেখাপড়া নেই, জ্ঞান নেই, বুদ্ধি নেই—আমি শুধু তুলসীপাতা ও গঙ্গাজল দিয়ে ভগবানের একটু সেবা করি, আর যা খাই ভগবানকে ভোগ লাগাই, তা দিয়ে প্রসাদ পাই । যা জোটে তা দিয়ে আমার চলে যায় (যেমন ডাল সিদ্ধ ও আলু সিদ্ধ) ।” এটা হচ্ছে জ্ঞানশূন্য ভক্তি । মহাপ্রভু বললেন, “এহো হয়, এভাবে চলবে ।”

এই ভাবে করতে করতে একেবারে রামানন্দ রায় প্রেম-ভক্তি সাধ্যসাধন তত্ত্ব পর্যন্ত নিয়ে গেলেন । তাঁর কথা শুনে মহাপ্রভু বললেন, “হ্যাঁ হয়েছে । প্রথম আমি ইক্ষু পেলাম, ইক্ষু থেকে রস পেলাম, রস থেকে চিনি পেলাম, চিনি থেকে মিছরি, আর অবশেষে খণ্ড পেলাম !” আস্তে আস্তে করে রামানন্দ রায় কৃষ্ণতত্ত্ব, রাধাতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, লীলাতত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন ।

তাই, আর কী লী দোষটা আছে ?

প্রজল্প—অনাবশ্যক কথাবার্তা বলা । যেটা প্রয়োজন নাই, সেই কথাবার্তা কম বলবেন, তখন হরিনাম করতে এনার্জি (শক্তি) পাবেন । কথা কম বলতে হবে । কথা বলব—ভগবান্ মুখ দিয়েছেন, কিন্তু মুখটা তিনি দিয়েছেন কৃষ্ণকথা বলবার জন্য ।

বাড়িতে যখন রান্নাবান্না হয়ে গেছে বিকালবেলা হলে পরের বাড়িতে গিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে গিয়ে গল্প করা, “তোর বাড়িতে কী রান্না হয়েছে ?”, “তোর স্বামী তোকে কী বলেছে ?”, “তুমি আজকে কী করেছ ?” এসব গল্প লোকে করে । কাজ থেকে সন্ধ্যার সময় বাড়িতে ফিরে এসে হরিনাম করতে পারেন, সময় নষ্ট না করে বাড়িতে থাকতে পারেন । এদিকে কেহ কেহ চা দোকানে বসে থাকেন, গল্প করেন : “কে টাকা চুরি করেছে ?”, “কে গম চুরি করেছে ?”, “কে রাস্তার টাকা মেরে দিয়েছে ?” এই সব আজেবাজে কথা । এসব কথা বললে লাভ হবে না ।

প্রজল্প করে এনার্জি নষ্ট হলে হরিনাম করতে শক্তি পাবেন না । স্বাভাবিক কথা । আমি যদি দশ মাইল হাঁটে যায়, তাহলে আমি আর উঠতে পারব না—এমন কি তুলসী পরিক্রমাও করতে পারব না । তাহলে, আমি যদি বেশি কথা বলি, আজেবাজে কথা বলি, তাহলে আমার ভগবানের কথা বলার জন্য যে এনার্জি (শক্তি) আছে সেটা আমি হারিয়ে ফেলব—আমি ভগবানের কথা বা ভগবানের কীর্ত্তন করতে পারব না । এটা হচ্ছে প্রজল্প । এটা বন্ধ করতে হবে ।

নিয়মাগ্রহ—উচ্চাধিকার প্রাপ্ত সময়ে নিম্নাধিকারগত নিয়মে আগ্রহ এবং ভক্তি পোষক নিয়মের অগ্রহণ ।

জনসঙ্গ হচ্ছে কৃষ্ণভক্ত ছাড়া অন্য সঙ্গ করা । এটা করবেন না । হ্যাঁ, মাঝে মাঝে সেটা করার দরকার আছে—বাজারে যেতে হবে, চাল, ডাল, সবজি কিনতে হবে, ইত্যাদি । সেটা যথাযথ প্রয়োজন অনুসারে করতে পারেন । আলুর দাম ১০টাকা, আপনাদের যদি পছন্দ ৫টাকা বলতে পরেন, তাড়াতাড়ি দামাদামি করে সব নিয়ে চলে আসুন । এটা সঙ্গ হবে না, এটা প্রয়োজনের জন্য ।

আমি বারবারই বলেছি যে, আমরা এই জগতে প্রত্যেক দিন কী অবস্থায় বেঁচে আছি ? প্রত্যেক দিন আমাদের লক্ষ লক্ষ জীবকে হত্যা করে বেঁচে থাকতে হবে । কত পাপ আমরা করি ! এই জল খাচ্ছি, কিন্তু এই জলের মধ্যেও অনেক জীবাণু । শ্বাস-প্রশ্বাস করছি, শ্বাস নিচ্ছি আর শ্বাস ছাড়ছি—কত জীবাণু (এটা বলা হচ্ছে living entity, “লিভিং এনটিটি”) চলে যাচ্ছে আর কত জীবাণু মরে যাচ্ছে । রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, পায়ের তলায় কত পিপীলিকা, কত কিছু মরে যাচ্ছে । গাড়ি গিয়ে তার তলায় কত কিছু পোকা, মাকড়, সাপ, ব্যাঙ মরছে ও চলে যাচ্ছে । ভাত বা আলু আমরা খেয়ে আমাদের কতগুলা ধানগাছ বা আলুগাছ কাটতে হচ্ছে । এগুলো কী পাপ হচ্ছে না ? একটা জীবকে একদিন বেঁচে থাকতে হলে লক্ষ লক্ষ জীবকে হত্যা করে বেঁচে থাকতে হয় । আর গরুর দুধ আমরা খাচ্ছি—গরুটা ঘাসগুলো খাচ্ছে, ঘাসটার কী প্রাণ আছে না ? তার কী কষ্ট হচ্ছে না ? আমাদের শরীরে কাঁটা ফুড়ে দিলে আমরা ব্যথা পাচ্ছি, আর সেই ঘাসটা গরু যখন খাচ্ছে তখন ঘাসটাও ব্যথা পাচ্ছে । এতো মুশকিল হয়ে গেল । কিন্তু আসলে না—কোন মুশকিল নেই । ভগবান্ এটা সুন্দর ভাবে শাস্ত্রে বুঝিয়ে দিয়েছেন :

কোন অসুবিধা হবে না যদি আপনাদের জীবনটা আপনারা গোবিন্দের সেবায় লাগিয়ে দিন । আপনারা আলু, ধান, গম, যাই চাষ করুন, আপনাদের সব জিনিসটা গোবিন্দের সেবায় লাগাতে হবে, তাহলে আপনাদের জীবনটাও গোবিন্দের সেবার জন্য হল—আপনারা যা ভোগ লাগান সবসময়, গোবিন্দের সেবার জন্য হল । ভগবান্ কী বলেছেন ? “যা ধ্যান কর, আমার ধ্যান কর । যা যজ্ঞ কর, আমার যজ্ঞ কর । চুরিও যদি কর, আমার জন্য চুরি কর !” যেমন আপনারা মঙ্গলারতি করতে গিয়ে দেখছেন যে, বাড়িতে ঠাকুরকে ফুল দেওয়ার জন্য ফুল নেই । আর পাশের বাড়িতে কিছু ফুলগাছ আছে—তখন আপনারা পাশের বাড়িতে গিয়ে সেখান থেকে একটা ফুল চুরি করে নিয়ে এসে আরতি করেন । ওই বড়ির লোকটি আপনাদেরকে গালাগাল দিতে পারেন—সে বলছে বলছে, কিন্তু আপনারা কী করেছেন ? ভগবানের সেবা করেছেন । আর ভগবান্ বলছেন যে, “তুমি গোবিন্দের সেবা করার জন্য চুরি করলে, তাহলে তোমার কোন পাপ, কোন অপরাধ হবে না ।” এই কথাগুলা মনে রাখতে হবে ।

আর লৌল্য মানে চাঞ্চল্য বুদ্ধি ।

“ছয় বেগ দমি’, ছয় দোষ শোধি, ছয় গুণ দেহ দাসে ।” ছয় বেগ আর ছয় দোষটা ছাড়তে হবে কিন্তু আপনারা যদি ভাবছেন, “দুটাই করব,” এটা ঠিক নয় । দুধ খেলে পুষ্টি হয় (দুধের মধ্যে দশ প্রকার ভিটামিন আছে), আর তার সঙ্গে তামাক খেলে, তাহলে কী হবে ? দুধের গুণ সব চলে যাবে । সেইজন্য কৃষ্ণনাম করতে হবে কিন্তু আপনারা যদি ভাববেন যে, আমি যেগুলো বন্ধ করতে বললাম সেগুলাও করবেন, তাহলে চলবে না । দুটা একসঙ্গে থাকবে না । ভক্তির অনুকূলটা স্বীকার করতে হবে আর ভক্তির প্রতিকূলটা বর্জন করতে হবে ।

 

— • • • —

 

 

← ৩। সাধ্যবস্তুর মূল : ছয় বেগ ৫। সাধ্যবস্তুর মূল : ছয় গুণ →