আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড)


সূচনা : উৎসবের সার্থকতা

(ওঁ বিষ্ণুপাদ জগদ্গুরু শ্রীলভক্তি সুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ কর্ত্তৃক)

 

আজ আমাদের শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীলভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজের শুভ আবির্ভাব তিথিতে আপনারা সকলে সমবেত হয়েছেন । আমাদের পরমসৌভাগ্য যে গতকালই শ্রীগুরুপাদপদ্ম বিগ্রহ রূপেতে শ্রীমঠেতে প্রকাশীত হয়ে আমাদের সকলের সেবা-পূজা গ্রহণ করছেন । আজকেও এখানেতেই ভগবান্ শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর এবং গান্ধর্ব্বা-গোবিন্দসুন্দর জীউ নাটমন্দিরেতে আমরা সকলে মিলে তাঁর শুভ আবির্ভাব তিথি উৎসব পালন করছি ।

বৈষ্ণব-ধর্ম্মেতে বা অন্যান্য ধর্ম্মে সর্বত্রই উৎসব যখন বলা হয় তখন আমরা ‘উৎসবের’ শব্দে সামাজিক অনুষ্ঠান বুঝি কিন্তু বৈষ্ণবের যে উৎসব সে তাকে মহোৎসব বলে বলা হয় । বৈষ্ণবরা মহোৎসব করেন । প্রাকৃত ভাষায় তাকে বলা হয় ‘মোচ্ছব’—“বৈষ্ণবদের মোচ্ছব হবে আজকে । চল, সেখানে গিয়ে প্রসাদ পাবে ।” এই জিনিস আমরা প্রাকৃত ভাষাতে দেখতে পাই, কিন্তু মহোৎসবের প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই আসে যেখানেতে বৈষ্ণব সেবা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় । অনন্তকাল ধরে অবৈষ্ণবের সেবা করলে সেটি মহোৎসব হবে না । মহোৎসব হবে বৈষ্ণবের সেবা দ্বারা । বৈষ্ণবের সন্তোষ বিধানই মহোৎসবের সার্থকতা আসে । এটি শাস্ত্রেতে আমরা দেখি ।

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই বিষয়টা আলোচনা করেছেন তাঁর গ্রন্থের মধ্যে । তিনি বলেছেন যে, বৈষ্ণব সেবা যদি হয়—সে দুটি-চারটি হলেও—শুদ্ধ বৈষ্ণবের সেবা করলে সেখানেই মহোৎসবের সার্থকতা হয় ।

আজকে আমাদের পরমসৌভাগ্য যে, সারা পৃথিবীব্যাপী যে কৃষ্ণকীর্ত্তন-সঙ্গে, কৃষ্ণ-অনুশীলন-সঙ্গে যা বিধান চলেছে তাতে আপনারা সকলে অংশ গ্রহণ করে নিজেদের ধন্যাতিধন্য করছেন । সেই সমস্ত বৈষ্ণব-হৃদয় আজকে এখানে সমুপস্থিত হয়েছে ।

বৈষ্ণবের আনুগত্য দ্বারা বৈষ্ণবের পরিচয় পাওয়া যায় । যেখানেতে আনুগত্য আছে সেখানে বৈষ্ণবতা আছে—যেখানে তৃণাদপি সুনীচেনতা আছে সেখানেই বৈষ্ণবতা, যেখানে তরোরিব সহিষ্ণুতা সেখানেই বৈষ্ণবতা । এইভাবেতে বৈষ্ণবের তিন বিভাগ আছে (ভাগবতে বা ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে আমরা সেগুলি দেখতে পাই)—উত্তম, মধ্যম এবং কনিষ্ঠ । এখানে বৈষ্ণবের প্রকার ভেদ করে গিয়েছে ।

“সকলেই স্বরূপে সবার হয় গোলোকেতে স্থিতি বৈকুণ্ঠে ক্ষীরোদকশায়ী কমলার পতি” : আমাদের সকলের স্বরূপটা হচ্ছে বৈষ্ণব, আমরা সবাই বিষ্ণুর সেবক । বিষ্ণু হচ্ছেন সর্ব্বেশ্বরেশ্বর ব্রজেন্দ্রনন্দন এবং আমরা সবাই তাঁর সেবক ও সেবিকা । অতএব স্বরূপটা আমরা “স্বরূপে সবার হয় গোলোকেতে স্থিতি” কিন্তু যেহেতু আজকের দিন কর্ম্মদোষেতে আমরা এই বিরুপতা প্রাপ্ত হয়েছি, আজকে মায়ার মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি । ভগবানের সেবা ভুলে গিয়ে আমরা নিজের আত্মসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে স্বর্গ, মর্ত, পাতাল আলোড়ন করে তুলেছি : সৎ-কর্ম্মের দ্বারাতে কখনও স্বর্গে যাচ্ছি, অসৎ-কর্ম্মের দ্বারাতে নরকে যাচ্ছি, এই ভাবেতে আমরা আমাদের জীবনটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা খেলছি । এবং এতে ভগবান্ সুখী নন । “লাভিং সার্চ ফর টি লস্ট সার্ভেন্ট” (Loving Search for the Lost Servant—‘প্রেমময় অন্বেষণ’) গুরুমহারাজের একটা বই আছে—তাতে বলছেন যে, ভগবান্ অপেক্ষা করছেন তাঁর লস্ট সার্ভেন্টের (হারানো সেবক) জন্যই ।

সারা দেশেতে জেলখানা আছে আর যেখানে দেশে ১২৫ কোটি লোক সেখানে হয়তো ১ লক্ষ লোক জেলখানায় থাকতে পারে কিন্তু সেই ১ লক্ষ দুষ্ট লোক জগতের পরিচয় নয় । প্রাকৃত চিন্ময়-ধামের একটা পরিচয় আছে এবং সেই পরিচয়টা হচ্ছে ভাগবত-সেবায় সকলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৪ ঘন্টাই নিজেকে নিয়োজিত রেখে সেই চিন্ময়-ধামেতে ভাগবত-সেবা করে চলা । এই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত স্বরূপের তীর্থ এবং স্বরূপের যাকে বলে অ্যাক্টিভিটি (কার্য) । কিন্তু আমরা যেহেতু আত্মসুখ অনুসন্ধান করছি—হঠাৎ আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা জেলখানায় এসে পড়েছি ।

এখানে সংশোধনের পথ আছে । সেই রাস্তা বেদাদি সমস্ত শাস্ত্রেতে নির্দেশ করা হয়েছে আর মাঝে মাঝে ভগবান্ নিজে আসেন বা ভাগবত-ভক্তগণ জগতে আবির্ভূত হন । তাঁরা আমাদের মত লোককে শিক্ষা দিয়ে আমাদের মত বদ্ধ-জীবকে করুণা করে তুলে নিয়ে গোলোক বৃন্দাবনে তাঁর সেবায় পুনরায় নিযুক্ত করেন বা করবার সুযোগ করে দেন । এই হচ্ছে গুরু-বৈষ্ণব-ভগবান্, এইতিনের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ হয় । এঁরা আসেন জেলখানায় মাঝে মাঝে যখন ধর্ম্ম অভ্যুত্থান হয় । প্রিজনেরদের (বন্দীদের) সংশোধন করার জন্য নানা রকমের পথ আছে—“বেদাদি-সর্ব্বশাস্ত্রানাং সামঞ্জস্য-বধায়কম্” : বেদাদি সমস্ত শাস্ত্র একটা অ্যাডজাস্টমেন্ট (সামঞ্জস্য বিধান) দিয়েছেন যাতে আমরা সেই দিকে চলতে পারি, তাঁরা পথ করে দিয়েছেন ।

সে রাস্তাটিই হচ্ছে শরণাগতির পথ ।
শরণাগতের, অকিঞ্চনের—একই লক্ষণ ।
তার মধ্যে প্রবেশয়ে ‘আত্মসমর্পণ’ ॥
শরণ লঞা করে কৃষ্ণে আত্মসমর্পণ ।
কৃষ্ণ তাঁরে করে তৎকালে আত্মসম ॥
সেই দেহ করে তার চিদানন্দময় ।
অপ্রাকৃত-দেহে তাঁর চরণ ভজয় ॥

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, ২/২২/৯৬, ৯৯ ; ৩/৪/১৯৩)

একবারে সোজাসুজিই গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড—পাহাড় কেটে রাস্তা করে দেওয়ার মত শাস্ত্রাদিতে এবং বৈষ্ণবগণের কৃপায় আমরা দেখতে পাই আর সেই রাস্তা যদি আমরা ধরে চলতে পারি, আমরা “ময়া স্যা হ্যকুতোভয়ঃ” (ভাঃ ১১/১২/১৫)—অকুতোভয় হয়ে যেতে পারি ।

ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যা-
দীশাদপেতস্য বিপর্য্যয়োঽস্মৃতিঃ ।
তন্মায়য়াতো বুধ আভজেত্তং
ভক্ত্যৈকয়েশং গুরুদেবতাত্মা ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/২/৩৭)

“যে ব্যক্তি ভগবানের প্রতি বিমুখ হয়, ভগবানের মায়াবলে তাহারই স্বরূপ-বিষয়ে বিস্মৃতি ঘটিয়া থাকে এবং তাহা হইতে আমি দেহ এই জ্ঞানরূপ বিপর্য্যয়, তাহা হইতে দ্বিতীয়াভিনিবেশ অর্থাৎ উপাধিভূত দেহেন্দ্রিয়াদিতে অহঙ্কার ও তাহা হইতে যাবতীয় ভয়ের উপস্থিতি হইয়া থাকে, সুতরাং বিবেকী ব্যক্তি গুরুদেবকে আরাধ্যদেবতা ও প্রিয়তমজ্ঞানে কামনান্তর রহিত হইয়া অনন্যভক্তি সহকারে সেই ভগবানকে আরাধনা করিবেন ।”

আমাদের যত কিছু উৎপাত, যত কিছু অসুবিধা আসে । ভয়টা হয় দ্বিতীয়াভিনিবেশ থেকে । দ্বিতীয়াভিনিবেশের ব্যাখ্যা করে বলা হয় : যে কৃষ্ণ ছাড়া আলাদা করে বিষয়ে অভিনিবেশ, তাকে বলা হয় দ্বিতীয়াভিনিবেশ । কৃষ্ণভজনের যেখানে সম্বন্ধ আছে, সেখানে আর দ্বিতীয়াভিনিবেশের কোন স্থান নেই । নিজের একটা আলাদা করে অ্যাকাউন্ট (account, হিসাব) খোলা থাকলে এবং সেই অ্যাকাউন্টের মধ্যে ভালমন্দ সব জিনিসটা এসে আমার ঘাড়ে চেপে যায় । আর আমার তো এমনই একটা দুর্ভাগ্য যে, আমি সেই অ্যাকাউন্টটা খুলে হঠাৎ একবারে ব্যানক্রপ্ট (bankrupt, দেউলিয়া) হয়ে বসি আছি ।

কোথায় আমার স্বরূপের স্থিতি ? ভগবান্ কৃপা করে আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন তাঁর সেবা করবার জন্যেই, তাঁর ভজনা করবার জন্যেই । উইলিং (willing, ইচ্ছা), ফিলিং (feelng, ভাব), থিংকিং (thinking, ভাবনা)—এই তিনটা উপাদান দিয়ে আমার স্বরূপ তৈরি হয়েছে আর সেইটিকে আমি মিসইউজ (misuse, অপব্যবহার) করেছি । আমি সেই আমার স্বরূপ থেকে নিজেকে বিরূপের দিকে টেনে দিয়েছি আর এখন ভোগ করে মরছি । কিন্তু আমাদের আশা আছে—আলোক দেখাচ্ছেন সাধু-গুরু-বৈষ্ণবগণ ।

ভগবান্ নিজে বলেছেন, “আমি মাঝে মাঝে আসি” :

যদা যদা হি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্ম্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥৮॥

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৪/৭-৮)

তিনি নিজে আসেন, কিন্তু ভগবানের চেয়ে বড় বস্তু কী আছে ? ভাগবৎভক্ত । তিনি নিজে আসেন বা তাঁর ভক্ত পাঠিয়ে দেন, “তুমি যাও ! বাবা, ওর মতিগতিটাকে শোধন করে দাও । আমি ওকে যদি চতুর্ভুজ দেখা দেই, ওটা কি করে দেখবে ?” প্রথম চক্ষু দিতে হবে ।

অন্ধীভূত চক্ষু যার বিষয ধূলিতে ।
কেমনে সে পরতত্ত্ব পাইবে দেখিতে ॥

“আমি নিজেকে দেখালেই ও দেখতে পাবে ? তুমি দেখাবার ব্যবস্থা করে দাও, তবে ও দেখতে পাবে ।”

ভক্তগণ তখন দুঃখ ও কষ্ট সহ্য করে এই জগতে আসেন । ভগবানের সেবায় আমাদের নিয়ুক্ত করবার জন্যেই এবং তাঁদের আনন্দ-চিন্ময়ে রসের সন্ধান দেওয়ার জন্যেই সাধু-গুরু-বৈষ্ণব এই জগতেতে আবির্ভুত হন । কৃষ্ণ নিজে আসেন, নিজের ভক্তদের পাঠান এবং বৈষ্ণবদের সাহায্যতে আমরা সেই চিন্ময়ধামেতে দিব্যসেবার অধিকারী হয়ে নিজেদের প্রকৃত স্বরূপের কার্য ফিরে পাই ।

এই জগতে যা করা হয়, সেটা হচ্ছে কর্ম্ম ; আর ভক্তি জগতে যেটা করা হয়, সেটা হচ্ছে সেবা । বৈরগ্যেরও প্রয়োজন নেই । এই কথা শাস্ত্রেতে বলছেন : “যুক্ত বৈরগ্য করবেন ।” কেন ? “তুমি যে দিকে যেতে যাবে, তোমার এমন কপাল খারাপ সেখানে তুমি একটা খোঁড়া রাস্তায় ফেলবে । যদি তুমি একবারে খুব দৃঢ় যাওয়ার চেষ্টা করবে, তাও তুমি যেতে পারবে না—তুমি হোঁচট খেয়ে পড়ে পা ভেঙে যাবে । আমি তোমাকে এবারে বাঁধানো রাস্তা দিয়ে দিচ্ছি, এই রাস্তা দিয়ে তুমি চলে এস ।” ভগবান্ বলেছেন (শ্রীমদ্ভাগবতম্, ১১/২/৩৪),

যে বৈ ভগবতা প্রোক্তা উপায়া হ্যাত্মলব্ধয়ে ।
অঞ্জঃ পুংসামবিদুষাং বিদ্ধি ভাগবতান্ হি তান্ ॥

“ভগবান্ অজ্ঞজনগণেরও অনায়াসে আত্মলাভের জন্য যে সকল উপায় নিরূপণ করিয়াছেন, তাহাই ভাগবতধর্ম্ম বলিয়া জানিবে ।”

“তুমি ভাগবতধর্ম্মের আশ্রয় কর, ভাগবতভক্তণনের চরণাশ্রয় কর, তাহলেই তুমি পরম-নিত্য-কল্যাণ লাভ করতে পারবে । ভগবান্ নিজের মুখে বলছেন যে, আমাকে পাওয়ার উপায় একমাত্র এটাই । আমাদের একটাই ডিউটি (কর্তব্য), একটাই অ্যাক্টিভিটি (কার্য)—ভগবানের চরণেতে নিজেকে সমর্পণ করে দেওয়া ।

সতাং প্রসঙ্গান্মম বীর্য্যসংবিদো ।
ভবন্তি হৃৎকর্ণরসায়নাঃ কথাঃ ।
তজ্জোষণাদাশ্বপবর্গবর্ত্মনি ।
শ্রদ্ধা রতির্ভক্তিরনুক্রমিষ্যতি ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ৩/২৫/২৫)

“সাধুদিগের প্রকৃষ্ট সঙ্গ হইতে আমার মাহাত্ম্যপ্রকাশক যে সকল শুদ্ধহৃদয়-কর্ণের প্রীতি-উৎপাদক কথা আলোচিত হয়, তাহা প্রীতির সহিত সেবা করিতে করিতে শীঘ্রই অবিদ্যানিবৃত্তির বর্ত্মস্বরূপ আমাতে যথাক্রমে প্রথমে শ্রদ্ধা, পরে রতি ও অবশেষে প্রেমভক্তি পর্যন্ত উদিত হইবে ।”

ভগবান্ নিজে বলছেন, “সাধুগণের সঙ্গেতে, সাধুগণের প্রসঙ্গে যেখানেতে আমার কথা আলোচিত হয়, আমার সেবা যেখানেতে সম্পন্ন হয়, সেই সাধুসঙ্গ তুমি কর এবং তাঁদের কৃপাতে তুমি সবকিছু পাবে ।” তাঁদের অন্য কোন ব্যবসা নেই, তাঁদের একটাই ব্যবসা একটাই ধারায় চলেন—আর অন্য কিছু তাঁরা বুঝেন না । যেখানে ভগবানের সেবা আছে, যেখানে ভাগবত-ভক্তের সেবা আছে, সেইখানে সাধুগণ নিজেকে নিযুক্ত করার চেষ্টা করেন । যা কিছু আমরা পাই, সেটা সব সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের কৃপায় আমরা পাই । অতএব একটাই মাত্র পথ আছে—সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের আনুগত্যে ভাগবত-আরাধনা করা ।

ভগবান্ যখন গুরু রূপেতে আসেন, তিনি স্বয়ং আসেন । গুরুরূপ ভগবান্ থেকে অভীন্ন ।

শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের লেখা আছে (১/১/৪৭) : “শিক্ষাগুরুকে ত’ জানি কৃষ্ণের স্বরূপ” । মাথা ঘুরিয়ে দেবে এই একটা কথা থেকে । “অন্তর্যামী, ভক্তশ্রেষ্ঠ—এই দুই রূপ ।” আমি তো বীজটা পেলাম, কিন্তু তারপরে বীজটা কি করে তৈরি করতে হয় ? বীজটা থেকে কি করে গাছ বেরবে ? এবং সেই বীজ থেকে যে ফুলে ফলে লতা সুশোভিত হয়ে চরম মঙ্গল, চরম ফল আমাকে দেবে—সেটা কি করে হবে ? কে আমাকে বুঝিয়ে দেবে ? অতএব সাক্ষাৎ কৃষ্ণ তিনি এলে আমি শিখতে পারি ।

ভগবান্ শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/২/৩৪) সোজাসুজি বলে দিলেন :

যে বৈ ভগবতা প্রোক্তা উপায়া হ্যাত্মলব্ধয়ে ।
অঞ্জঃ পুংসামবিদুষাং বিদ্ধি ভাগবতান্ হি তান্ ॥

“ভগবান্ অজ্ঞজনগণেরও অনায়াসে আত্মলাভের জন্য যে সকল উপায় নিরূপণ করিয়াছেন, তাহাই ভাগবত-ধর্ম্ম বলিয়া জানিবে ।”

ভগবান্ নিজেকে পাওয়ার উপায় (শর্টকাট রাস্তা) নিজের মুখে বলে দিলেন । আমি চানা ডাল ভালোবাসি বা রসগোল্লা ভালোবাসি আর তুমি যদি আমাকে শুক্তো দিয়ে দাও আমি সেটা কি খাব ? আমার কি সেটা ভাল লাগবে ? আমার ভালোবাসা কোনটা, সেটা তো আমি চাই । সুতরাং ভগবান্ নিজের মুখে বলছেন যে, “আমি ভক্তের বদ্ধ—ভক্তিযোগেতে আমি সর্বাপেক্ষা সন্তুষ্ট হই । আমি ভাগবতগণের অনুগত ।”

সাধবো হৃদয়ং মহ্যং সাধুনাং হৃদয়ন্ত্বহম্ ।
মদন্যত্তে ন জানন্তি নাহং তেভ্যো মনাগপি ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ৯/৬/৬৮)

“সাধুগণ আমার হৃদয় এবং আমিও সাধুদিগের হৃদয় । তাঁহারা আমা-ব্যতীত অন্য কাহাকেও জানেন না, আমিও তাঁহাদের ছাড়া আর কিছু জানি না ।”

সোজা বাংলা কথাটা । ভগবান্ নিজে বলছেন যে, “সাধুগণ আমার হৃদয়, আমি সাধুগণের হৃদয় । আমাকে ছাড়া তাঁরা কিছু জানেন না, তাঁদের ছাড়া আমি কিছুই জানি না ।”

যে দারাগারপুত্রাপ্ত-প্রাণান্ বিত্তমিমং পরম্ ।
হিত্বা মাং শরণং যাতাঃ কথং তাংস্ত্যক্তুমুৎসহে ॥

(শ্রীমদ্ভাগবতম্, ৯/৪/৬৫)

“যে সকল সাধু গৃহ, দারা, পুত্র, আত্মীয়স্বজন, ধন, প্রাণ ইহপরলোক পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র আমাকেই আশ্রয় করিয়াছে, আমি তাহাদিগকে কিরূপে পরিত্যাগ করিব ?”

“দারা, প্রাণ, পুত্র, বিত্ত, সর্বস্ব পরিত্যাগ করে যাঁরা আমার শরণাগত হয়ে আমার ভজনা করছেন, তুমি কি মনে কর আমি এত বড় দাতাকে কখনও ছেড়ে দেব ?”

এইভাবেতে ভগবান্ নিজে বলে দিয়েছেন শাস্ত্রেতে : “যা পেলে আমি খুশি হব, তোমরা সেই ভাবেতে আমাকে ভজনা কর তাহলে আমার সম্পূর্ণ সম্পত্তি তোমরা পাবে ।”

 

— • • • —

 

 

গ্রন্থাগারে ফিরে →