আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


শ্রীরাধাষ্টমী

 

আগামীকাল শ্রী মঠে শ্রীশ্রীরাধাষ্টমী-উৎসব । শ্রীরাধা গৌড়ীয়েরই একমাত্র উপাস্য দেবতা—একমাত্র বলিবার কারণ এই যে, গৌড়ীয় না হইলে শ্রীরাধার ভজনের যোগ্যতা-লাভ বা মর্ম্ম-উপলব্ধি কোনওটিই হয় না । গৌড়ীয়া-নাথ এই গূঢ়তম ভজন-রহস্য জগতে আবিষ্কার করিয়াছেন,—

প্রেমা নামাদ্ভূতার্থঃ শ্রবণপথগতঃ কস্য নাম্নাং মহিম্নঃ
কো বেত্তা কস্য বৃন্দাবনবিপিন-মহামাধুরীষু প্রবেশঃ ।
কো বা জানাতি রাধাং পরমরসচমৎকারমাধুর্য্যসীমা-
মেকশ্চৈতন্যচন্দ্রঃ পরমকুণয়া সর্ব্বমাবিশ্চকার ॥

(চৈতন্যচন্দ্রামৃতম্ ১০।১৩০)

‘প্রেম’ নামক পরম পুরুষার্থ কাহারই বা শ্রবণগোচর হইয়াছিল ? কেই বা শ্রীনামের মহিমা জানিত ? কাহারই বা বৃন্দারণ্যের গহন-মহামাধুরী-কদম্বে প্রবেশ ছিল ? কেই বা পরম চমৎকার অধিরূঢ় মহাভাব-মাধুর্য্যের পরাকাষ্ঠা শ্রীবার্ষভানবীকে (উপাস্য-বস্তুরূপে) জানিত ? এক শ্রীচৈতন্যচন্দ্রই পরম ঔদার্য্য-লীলা প্রকট করিয়া এই সমস্ত আবিষ্কার করিয়াছেন ।

আবিষ্কার ও সৃষ্টি—এক কথা নহে । যাহারা সেই পরদেবতার ছায়া মায়ায় অভিভূত,—এরূপ প্রাকৃত সাহিত্যিক, পত্নতাত্ত্বিক, কিংবা যাবতীয় উপাধিক ব্যক্তিগণ শ্রীরাধিকাকে শ্রীচৈতন্যদেব বা তাঁহার পূর্ব্ববর্তী কোন কোন পদাবলী-লেখক বা পৌরাণিকের সৃষ্ট ব্যাপার বলিয়া মনে করেন! যদিও কোথায় কোথায় ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার-সমূহ উঁহাদের ধারণার সঙ্কীর্ণতাকে খানিকটা প্রশস্ত করিয়া দেয়, তথাপি জন্ম-মৃত্যুর অধীন অস্মিতা অপ্রাকৃতকেও অন্যরূপ ভাবিতে পারে না ।

কোন কোন সাহিত্যিক শ্রীরাধিকা-সম্বন্ধে এইরূপ কতকগুলি উক্তি লিখিয়া যেন তাঁহাকে অনেক বাড়াইয়া দিয়াছেন মনে করিয়া ফেলেন । কোন সাহিত্যিক লিিখয়াছেন,—“ভক্তি ও প্রেমের উপকরণ দিয়া শ্রীমতী রাধিকাসুন্দরী সৃষ্ট;—তিনি ‘আয়েসা’ কি কুন্দনন্দিনী নহেন, তাঁহার বিরহের এক কণিকা কষ্ট বহন করিতে পারে,—তাঁহার সুখের এক লহরী ধারণ করিতে পারে, এরূপ নারী-চিত্র পৃথিবীর কাব্যোদ্যানে নাই ।” আবার এই জাতীয় সাহিত্যিকই স্বৈরিণী-লেখনী চালাইয়া লিখিয়া ফেলিয়াছেন—“শ্রীমতী রাধা প্রথমতঃ ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ ও আর কয়েকখানি সংস্কৃত গ্রন্থ আশ্রয় করিয়া শুভদিনে আর্য্যাবর্ত্তের দেবমণ্ডপে প্রবেশ লাভ করিয়াছিলেন; চিরশ্রদ্ধেয় দেবদেবীগণ প্রকৃতির এই আবরণহীনা নগ্ন সৌন্দর্য্যময়ীর অন্তরালে পড়িয়া গেলেন; সদ্যশ্চুত অনাঘ্রাত মালতী পুষ্পের ন্যায় এই দেবীকে পাইয়া কবি ও ভক্ত আনন্দিত হইল; চিরাধার্য্যা দুর্গা ও কালীর উদ্দেশ্যে আহৃত পুষ্পমালা শ্রীরাধিকার কণ্ঠে দোলাইয়া দিল ।”

সাহিত্যিকগণের প্রবীণতার অবগুণ্ঠনে এই সকল অর্ব্বাচীনতার কোলাহলের সমালোচনা পরিস্ফুট করিয়া সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে গেলে অনেক কথা বলিতে হয় । যে গুহ্যতম মহানিধি কাম-ক্রোধাসক্ত জগতের হাটে প্রকাশ না করিয়া সযত্নে গুপ্ত সম্পদের মধ্যে সংরক্ষিত হইয়াছিল বলিয়া স্থূলবুদ্ধি সাহিত্যিক, পণ্ডিত, মনীষী বা সাধারণ ভক্ত-সম্প্রদায় শ্রীমদ্ভাগবতের মধ্যেও শ্রীরাধিকাকে দর্শন করিবার যোগ্যতা পান নাই, সেই গূঢ়তম বাস্তবতাকে জড়ত্বের বিরাট্ রূপের নিকট কি করিয়া বুঝান যাইতে পারে ? স্যর আইজাক নিউটন্ ইংলণ্ডের উল্ সথ্ রপ্ সহরের কোন বাগানে মাদ্যাকর্ষণশক্তি লক্ষ্য করিয়াছিলেন বলিয়া সেখানেই ঐ শক্তির প্রথম জন্ম, ইহার পূর্ব্বে কেহ সেই শক্তির বাস্তবতা আদৌ জানিতেন না, বা উহার অস্তিত্ব ছিল না,—এরূপ অনুমান জ্ঞানের রাজ্যে যবনিকা-পতনমাত্র । হয় ত’ ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে কলম্বসকর্ত্তৃক আমেরিকার আবিষ্কারের বহু পূর্ব্বে এই প্রদেশ অজ্ঞাত ছিল না; কিন্তু সেই বহু পূর্ব্বের প্রমাণ প্রত্নতত্ত্বের সমাধিগর্ভে এখনও হয় ত’ সমাহিত হইয়া রহিয়াছে । যে-কাল পর্য্যন্ত মহেঞ্জডারোর সভ্যতা প্রত্নতত্ত্বের সমাধিগর্ভ হইতে আবিষ্কৃত না হইয়াছে, সে-কাল পর্য্যন্ত সকলে ঐরূপ সভ্যতার কথা ভাবিয়া উঠিতে পারে নাই । জড়ের সৃষ্টি-সম্বন্ধেই মানবের জ্ঞানের দৌড় যখন অসম্পূর্ণ, তখন আধুনিক কালের প্রাপ্ত অসম্পূর্ণ উপকরণ এবং অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয় ও কাম-ক্রোধাদিত দ্বারা অভিভূত মস্তিষ্ক লইয়া অপ্রাকৃতের সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্ত করা কেবল বিপজ্জনক নহে, সত্যের প্রতি অজ্ঞাত বা জ্ঞাতসারে প্রবল প্রতিহিংসার চেষ্টা ।

একদিন আধুনিক প্রাকৃত সাহিত্যিকগণের বর্ত্মপ্রদর্শকগুরু রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র শ্রীরাধিকার প্রকৃত স্বরূপ বুঝিতে অসমর্থ হইয়া তাঁহারই ছায়ার মায়ায় অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন! তাই তাঁহাকে অপ্রাকৃত শ্রীরাধা-সেবাসর্ব্বস্ব শ্রীল দাসগোস্বামী প্রভুর ভজনস্থান পুরীর সাতাসনমঠে বিরক্ত-বেষে ভজন করিবার অভিনয় করিয়াও বিরক্তের বেশ পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল এবং তিনি হীরা মালিনী, সোনামুখীর প্রাকৃত সৌন্দর্য্য, কুটনীর বশীকরণবিদ্যা প্রভৃতিকে অপ্রাকৃতের আনুকরণিক ছঁাচে ঢালিয়া কাব্যরস সৃষ্টি করিয়াছিলেন ও তদানীন্তন বঙ্গ-সমাজের ভাষা ও সাহিত্যের খাতে কামের বন্যা প্রবাহিত করিয়া ছিলেন । আমরা রায় গুণাকরের দোষ দিতেছি না, ইহা অঘটন-ঘটন-পটীয়সী মায়ারই প্রভাব! মায়া প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিক, প্রত্নতািত্ত্বক ও যাবতীয় প্রত্যয়ান্ত জাগতিকের চক্ষে এই ছানি সৃষ্টি করিয়াছে বলিয়াই আজও অখিলেশ্বরী দুর্গার অংশিনী স্বরূপশক্তি শ্রীরাধিকার অসমোর্দ্ধত্ব সুগোপ্য সম্পদে সংরক্ষিত হইয়া রহিয়াছে ।

শ্রীল প্রভুপাদ ইহাই গৌড়ীয়ের যোগ্য পরিভাষা ও সিদ্ধান্তধারার মধ্যে বিশেষ করিয়া জানাইয়াছেন । অপ্রাকৃত গোবর্দ্ধনের সেবা না করিলে গোবর্দ্ধনের নিকটস্থ প্রেমামৃতপ্লাবনক্ষেত্র শ্রীরাধাকুণ্ডের সর্ব্বশ্রেষ্ঠতা উপলব্ধি হয় না । যাঁহারা প্রাকৃত গোবর্দ্ধনের সেবা করেন অর্থাৎ (‘গো’ অর্থে ইন্দ্রিয় বা বিদ্যা) কেবল বহির্ম্মুখ ইন্দ্রিয় বৃদ্ধি বা বহির্ম্মুখ ইন্দ্রিয় পরিচালনা করিবার বিদ্যার সংস্কৃতি সাধন করিয়া থাকেন, তাঁহারা শ্রীরাধার ছায়াশক্তি মহামায়ার নিরয়কুণ্ডে নিমজ্জিত হইয়া থাকেন; আর যাঁহারা অপ্রাকৃত গো অর্থাৎ আত্মেন্দ্রিয়ের পরিপুষ্টি বা বিকাশ সাধন করেন, যাঁহারা পরাবিদ্যার অনুশীলন করেন, তাঁহারা কৃষ্ণেন্দ্রিয়তর্পণকেই গোবর্দ্ধন-সেবা বলিয়া জানেন । জড়যুক্তিবাদী অরিষ্টাসুর তাহার শৃঙ্গদ্বারা যখন গোবর্দ্ধনকে আক্রমণ করিয়া নিজ ভোগ বর্দ্ধন করিবার চেষ্টা করে অর্থাৎ যখন পরম আস্তিকতা—শান্ত-দাস্য-সখ্য-বাৎসল্য-মধুর রস-পঞ্চকের বিষয় বাস্তব সত্যকে ধ্বংস করিতে উদ্যত হয়, তখন কৃষ্ণ সেই অরিষ্টাসুরকে নিধন করিয়া সত্যের প্রতিষ্ঠা করেন । অরিষ্টাসুর (বৃষভাসুর) নিহত হইলে প্রৌঢ়া গোপী মদনিকা তৎকার্য্যের পুরস্কাররূপে শ্রীরাধিকা সুন্দরীকে শ্রীকৃষ্ণের হস্তে সমর্পণ করেন । অরিষ্টাসুর বৃষের আকৃতি । গো—যাহা ধর্ম্মাচারীর নিকট ধর্ম্মের প্রতীকরূপে বিবেচিত—যাহা প্রলয়কারী রুদ্রের বাহনরূপে বিদিত, সেইরূপ এক ধর্ম্মের ধ্বজা লইয়া অরিষ্টাসুর যুক্তিবাদিতা প্রদর্শন পূর্ব্বক বাস্তব সত্যকে আক্রমণ করিতে আসে । কৃষ্ণ এই যুক্তিবাদিতামূলক ধর্ম্মধ্বজিতাকে বিনাশ করেন । সেই বৃষবাহন রুদ্রের মস্তক স্বয়ংরূপ কৃষ্ণের স্বাংশতত্ত্ব বিষ্ণুর পাদপদ্ম-বাহিনী গঙ্গার বাহন, সেই রুদ্র মদনবিজয়ী হইলে যে অপ্রাকৃত মদনমোহনের রাস-বিলাসের তাৎপর্য্য উপলব্ধি করিবার জন্য গোপী-কৃপা চান, সেই রাস-নৃত্য সাধারণী ও সমঞ্জসা গোপীগণে পরিবৃত বলিয়া যিনি সেইরূপ রাসস্থলীও পরিত্যাগ করেন, শ্রীকৃষ্ণ সেই একমাত্র সর্ব্বশ্রেষ্ঠ আনন্দবিধায়িনীর প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া তৎপশ্চাৎ পশ্চাৎ অনুগমন করিয়া থাকেন এবং তখন সাধারণী গোপীগণ যাঁহার সম্বন্ধে এইরূপ বলিয়া থাকেন, তিনিই শ্রীমদ্ভাগবতের প্রধানা নায়িকা,—

অনয়ারাধিতো ন্যূনং ভগবান্ হরিরীশ্বরঃ ।
যন্নো বিহায় গোবিন্দঃ প্রীতো যামনয়দ্রহঃ ॥

(ভাঃ ১০।৩০।২৪)

হে সহচরি, আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া শ্রীকৃষ্ণ যাঁহাকে নিভৃতে লইয়া গেলেন, তিনিই ঈশ্বর হরিকে অবশ্যই অধিক আরাধনা করিয়াছেন । গূঢ় অর্থ এই যে, তিনি কৃষ্ণকান্তাগণেরও শিরোমণি বলিয়া তাঁহার নাম ‘রাধিকা’ হইয়াছে । অরিষ্টাসুর বা বৃষভাসুরের নিধন-প্রসঙ্গক্রমেই শ্রীশ্যামকুণ্ড ও শ্রীরাধাকুণ্ডের আবির্ভাবের প্রসঙ্গ শুনিতে পাওয়া যায় । এই রাধাকুণ্ডেই শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকার যুথের সহিত মধ্যাহ্ণকালে রাসবিলাস করিয়া থাকেন । নৈশ-বিলাসে অপেক্ষা

এই মাধ্যাহ্ণিক বিলাসে অধিকতর চমৎকারিতা আছে । এখানে কিন্তু সাধারণী গোপীগণের প্রবেশাধিকার নাই । যাঁহারা শ্রীকৃষ্ণের বংশীরবে আকৃষ্ট হইয়া শ্রীরাধিকার অনুগত্য অপেক্ষা না করিয়াই ‘ধীর সমীরে’ কৃষ্ণের সহিত রাসক্রীড়া করেন, তাঁহারা রাধাকুণ্ড-তটস্থিত রাসস্থলীতে প্রবেশের অধিকার পান না । চন্দ্রাবলীর এই স্থানে প্রবেশের অধিকার নাই ।

রসরাজ শ্রীকৃষ্ণের রাস-নৃত্য নটরাজমূর্ত্তি রুদ্রের তাণ্ডব বা তদনুকরণে প্রাচীন বা আধুনিক-কালে কল্পিত বিভিন্ন দেশীয় নৃত্যের ন্যায় নহে । বস্তুতঃ এই রাসমণ্ডলীতে গোপীশ্বর সদাশিব যে নৃত্য-দীক্ষা লাভ করিয়াছিলেন, তাহা হইতে তদংশভূত রুদ্র তাঁহার নটরাজমূর্ত্তি প্রকাশ করিয়াছে । আমরা বৃহদ্ভাগবতামৃতে দেখিতে পাই,—সঙ্কর্ষণ-সেবক রুদ্র রামনামে বিভোর হইয়া জগদুন্মাদক তাণ্ডব রচনা করিতেছেন । তাঁহার নৃত্যেরই ভোগবর্দ্ধন অনুকরণ করিয়া জগৎ প্রলয়ের অভিসারে চলিয়াছে ।

চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, কর্ণামৃত, শ্রীগীতগোবিন্দ প্রভৃতি রস-গ্রন্থে শ্রীরাধিকার যে সেবা-বিলাসের কথা অনর্থমুক্ত ভক্ত সম্প্রদায়ের নিকট প্রকাশিত হইয়াছে, শ্রীরাধার ভাব-কান্তি-মণ্ডিত শ্রীগৌরসুন্দরের অনুগত নিজ-জনগণ তাহা অপেক্ষা অধিকতর সেবা-চমৎকারিতার কথা তত্তৎ গ্রন্থে দর্শন করিতে পারেন; এইজন্যই শ্রীরায় রামানন্দ শ্রীজগন্নাথবল্লভ-নাটক-গীতি রচনা করিয়াছিলেন । শ্রীরূপগোস্বামী প্রভু ‘বিদগ্ধমাধব’, ‘দানকেলিকৌমুদী’, ‘স্তবমালা’ এবং শ্রীরূপানুগবর শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী প্রভু ‘মুক্তাচরিত’, ‘স্তবাবলী’ ও শ্রীরূপরঘুনাথানুগ শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী প্রভু ‘শ্রীগোবিন্দলীলামৃত’ প্রভৃতি অপ্রাকৃত রসগ্রন্থ রচনা করিয়াছেন । গৌড়ীয়গণের গীতগোবিন্দ, ‘কর্ণামৃত’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘চণ্ডীদাস’ পাঠ ও অগৌড়ীয়গণের তত্তৎ গ্রন্থ-পাঠ—আকাশ-পাতাল প্রভেদ—জাগতিক উদাহরণের দ্বারা উহা বুঝাইবার নহে । বর্ণপরিচয় মাত্র লাভ করিয়া শেক্সপীয়ার বা কালিদাস পাঠ অভিজ্ঞ অধ্যাপকের তত্তদ্ গ্রন্থপাঠে প্রভেদের উদাহরণও ঐস্থলে অসম্পূর্ণ ।

নন্দীশ্বর-পর্ব্বতের দক্ষিণে ‘বরসানু’ নামে এক গিরিরাজ শোভিত রহিয়াছে । সেই বরসানু-পর্ব্বতের অধিত্যকায় গোপরাজ বৃষভানু সহধর্ম্মিণী কৃত্তিকার সহিত বাস করিয়া শ্রীহরির আরাধনা করিতেছিলেন । ভাদ্রমাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে, বিশাখা-নক্ষত্রে, মধ্যাহ্ণকালে, বৃষভানু রাজার গৃহে এক কন্যারত্ন আবির্ভুত হইয়া গৃহ, পুর, দশদিক্ উদ্ভাসিত করিয়া দিলেন । বৃষভানুপুরে গোপরাজ বৃষভানু, রত্নভানু ও সুভানু ভ্রাতৃগণের সঙ্গে আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিলেন । মহাভাগ্যবতী কৃত্তিকা চন্দ্রকলিকা-দুহিতার দর্শনে আনন্দে আত্মহারা হইলেন । সুরপুরে ও ব্রজপুরে আনন্দের লহরী প্রবাহিত হইল । এই অপ্রাকৃত কন্যারত্নই বৃষভানু-নন্দিনী শ্রীরাধিকা-নামে খ্যাতা হইলেন ।

“তত আরভ্য নন্দস্য ব্রজঃ সর্ব্বসমৃদ্ধিমান্ ।
হরের্নিবাসাত্মগুণৈ রমাক্রীড়মভূন্নৃপ ॥”

(ভাঃ ১০।৫।১৮)

শ্রীহরির নিবাসভূমি নন্দগোকুলে শ্রীনন্দ-নন্দন যাবৎ নিগূঢ়ভাবে বিহার করেন, তাবৎ শ্রীরাধাপ্রমুখা ব্রজরামাগণও নিগূঢ়ভাবে বিহার করিয়া থাকেন ।

শ্রীনন্দকুমার যখন প্রকটরূপে বিহার করেন, তখন ব্রজরামা-শিরোমণি শ্রীরাধিকাও তাঁহার কায়ব্যূহ গোপ-রামাগণের সহিত প্রকটরূপে বিহার করিয়া থাকেন ।

যাঁহারা মনে করেন,—জগদারাধ্যা দুর্গা ও কালীর উদ্দেশ্যে আহৃত পুষ্পমালা শ্রীরাধিকার কণ্ঠে দোলাইয়া দেওয়া হইয়াছে, যাঁহারা মনে করেন,—ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ আশ্রয় করিয়া শ্রীরাধিকা আর্য্যাবর্ত্তের দেবমণ্ডপে প্রবেশ লাভ করিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক যবনিকাপাতমাত্র হয় নাই, শাস্ত্রীয় সন্ধান হইতেও তাঁহারা বঞ্চিত রহিয়াছেন । যে ভুবনমোহিনী সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়সাধিকা দুর্গাকে ব্রহ্মসংহিতায় গোবিন্দের স্বরূপশক্তি—ভুবনমোহন গোবিন্দের মনোমোহিনী শ্রীরাধার ছায়া-শক্তি বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে, সেই স্বরূপশক্তি অংশিনীর নিত্যবিগ্রহ অধোক্ষজ-সেবায় পূর্ণদীক্ষা লাভ না হইলে কিছুতেই বুদ্ধি বা মনীষার হস্তামলক হইতে পারে না । ইহা বন্ধ্যাযুক্তি নহে, সাহিত্যিকগণের বুদ্ধি শোধিত হইলে তাঁহারাও এই বাস্তবসত্যের মর্ম্ম উপলব্ধি করিতে পারিবেন । বস্তুতঃ যাঁহাকে লইয়া সাহিত্য—যিনি সাহিত্যের বিগ্রহ, সেই বৃষভানুনন্দিনীকে অনর্থযুক্ত জীব চিনিতে না পারিয়াই ভোগময় সাহিত্যপঙ্কে আত্মপাত বরণ করিতেছেন । তাই অপ্রাকৃত সাহিত্যিকশ্রেষ্ঠ শ্রীরূপানুগবর শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী প্রভু গাহিয়াছে,—

“তস্যা অপাররসসারবিলাসমূর্ত্তে-
রানন্দকন্দপরমাদ্ভুতসৌখ্যলক্ষ্ম্যাঃ ।
ব্রহ্মাদিদুর্ল্লভগতের্বৃষভানুজায়ায়াঃ
কৈঙ্কর্য্যমেব মম জন্মনি জন্মনি স্যাৎ ॥”
“অপার রসের সার বিলাস-মূরতি ।
পরম অদ্ভুত সৌখ্য আনন্দ নির্বৃতি ॥
ব্রহ্মাদির সুদুর্ল্লভ বৃষভানুকন্যা ।
জন্মে জন্মে তাঁর দাস্যে হই যেন ধন্যা ॥”
“হা দেবি কাকুভরগদগদয়াদ্য বাচা
যাচে নিপত্য ভুবি দণ্ডবদুদ্ভটার্ত্তিঃ ।
অস্য প্রসাদমবুধস্য জনস্য কৃত্বা
গান্ধর্ব্বিকে তব গণে গণনাং বিধেহি ॥”
“বহু দণ্ডবৎ পড়ি বহু আর্ত্তিস্বরে ।
কাকুভরে গদগদবচনে যোড়করে ॥
প্রার্থনা করি গো দেবি এ অবুধজনে ।
তব গণে গণি কৃপা কর অকিঞ্চনে ॥”

 

— • • • —

 

 

☜ Main page-এ ফিরে
☜ গ্রন্থাগারে ফিরে

 

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥