কাঙ্গালী ভোজন কবে হ’বে ?

(ভগবান ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ)

শ্রীগৌড়ীয়-মঠে বাৎসরিক মহোৎসব আরম্ভ হইয়াছে । নানাদেশ হইতে অকৈতব ভাগবত-ধর্ম্ম-প্রচারক, স্বয়মাদর্শ সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারিগণ সকলেই সগণ প্রত্যাগমন করিতেছেন । নিমন্ত্রিত ভদ্রসন্তান ও ভদ্রমহিলাগণও ভগবদ্­ভক্তি-রস-পিপাসা লইয়া আশ্রমে আগমন করিতেছেন । নিঃস্বার্থ, সেবাপরায়ণ সেবকমণ্ডলী, সকলেই অনাবিল আনন্দে, অকপট সেবাবৃত্তিতে, অবিরাম পরিশ্রমে,—আহূত, অনাহূত, ভক্ত, অভক্ত, বিষয়ী ও বিরক্ত—সেবোন্মুখ, সকলকেই হরিকীর্ত্তনদ্বারা সমৃদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছেন । সর্ব্বত্রই কৃষ্ণ-কথায়, কৃষ্ণগুণ-গাথায় ও নাম-সংকীর্ত্তনে সকল হৃদয়ের আনন্দ-উৎস উছলিয়া উঠিতেছে ! বিস্ময়া-বিষ্ট পথিকও তাহাতে আকৃষ্ট হইয়া, গন্তব্য ভুলিয়া স্তব্ধ হইতেছেন ।

এমন সময় সহসা কে আসিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,—“বলি, হাঁ গা, মঠে কাঙ্গালী ভোজন কবে হ’বে ?” উত্তর দিব কি ! অহো, এই প্রশ্নেই, আমি অপর ভাবে আপনাকে যে হারাইয়া ফেলিলাম ! আপনার মনের দিকেই চাহিলাম । তাহারই সঙ্গে ইহার একটু বুঝা-পড়া আরম্ভ হইল ।

বলি হাঁ রে অবোধ মন, সত্য বল্ দেখি,—তুই কিসের কাঙ্গাল ; কি তোর অভাব ; কি চা’স্ ? হায়, হায়,—তুই যে তোর এই জড় ইন্দ্রিয়গুলিকেই কেবল পরিতৃপ্ত কর্ত্তে চাস্ ; তাদের দুষ্ট ক্ষুধায় ইচ্ছামত ভোগ-সুখেরই অভাব অনুভব করিস্ ; আর, তাহা যথেষ্টরূপ যোগাইতে না পারিয়া তাহারই তরে আপনাকে কাঙ্গাল ভাবিস্ ! সত্য নয় কি ? কবে কাঙ্গালী ভোজন হইবে ; কবে বিবিধ উপচারে, বিবিধ উপাদেয় উপাদানে রসনার সুখ-সাধন করিতে পারিব,—অন্বেষণ কেবল তাহারই ! সুপক্ক-সুফল-শোভিত সুন্দর রসাল-তরুমূলে আসিয়া, তোর অনুসন্ধান পড়িয়াছে পক্ক আম্­ড়ার ! তুই তাহাই জানিস্ ; তাহারই রসে তোর রসনা মজিয়া আছে । তুই মনে করিতেছিস্,—তাহাতেই তোর তৃপ্তিলাভ হইবে ; রোগ-জনিত অরুচিটা কাটিবে ; খাইয়া মাখিয়া সুস্থ হইবি । কিন্তু, ভুল তোর এ’টা ; মহাভুল ! তুই ভাবিস্ না,—ঐ অপথ্য অম্লরসে তোর দাঁত আম্­লাইয়া যাইবে ; রোগ বাড়িবে ; আর কোনও উপাদেয় বস্তুর আস্বাদ লইতে পারিবি না, মরিবি ! ভোগ-বাসনার বশে মহাপ্রসাদকে সামান্য রসনা-সুখ ভোজ্য-জ্ঞানে ভোজনের ফলও তাহাই ! অবোধ মন, এখানে তোর কাঙ্গালী-বিদায়ের সন্ধান লওয়া বৃথা ! তুই যার কাঙাল, তাহা ত পথে ঘাটেও মিলে ; পশুতেও উপভোগ করে ; তার জন্য মঠে আসিতে হইবে কেন ? হাঁ রে,—কৃষ্ণৈক-শরণ মহাজন-সেবিত, মহাতীর্থ ঐ মঠের যে আহ্বান, ঐ মঠের যে নিমন্ত্রণ, তাহা কি তোর জড়ীয় রসে জড়-ইন্দ্রিয়-তর্পণ জন্য ? শিশুকে রোগনাশন ঔষধ সেবন করাইতে পুত্ত্রবৎসলা কর্ম্মকুশলা মাতা লড্ডুকের লোভ দেখান্ ; তথায় কি সেই লড্ডুকই লক্ষ্য ? তা’ নয় রে, তা’ নয় ! মূল লক্ষ্য তাহার অন্তরালে অবস্থিত ! এখানেও, ঐ বিষ্ণুক্ষেত্রে, ঐ মহাতীর্থে, শ্রীগৌর-মুখামৃত-মধু মহাপ্রসাদ ভোজনের অভ্যন্তরেও, মহাপ্রভুর ভজনই সর্ব্বময় হইয়া বিরাজমান ! তাহাই অখিল জগতের মূল লক্ষ্য, মূল প্রয়োজন ! তাই বলি, আয় মন, আয়, যাদি শ্রেয়ঃ লাভ করিবি,—আয়,—ভোজনের কাঙ্গাল হইয়া নয়, ভজনের কাঙ্গাল হইয়া আয়, আর পরমপাবন ভাগবত-জনের চরণে লুঠিয়া মাথায় তুলিয়া নে,—

“ভক্ত-পদধূলি আর ভক্তপদ-জল । ভক্তভুক্ত-শেষ তিন সাধনের বল ॥”

 


 

← গ্রন্থাগারে ফিরে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥