আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড)


৬। কুটীনাটী ছেড়ে শুদ্ধ আচরণ করুন

 

একটা মোবাইল কিনে যদি ঘরে ফেলে রাখলে কয়েক দিন পর চার্জটা ফুরিয়ে যাবে । মোবাইলের ব্যাটারিকে চার্জ দিতে হবে । মাইকের ব্যাটারিও চার্জ না দিলে কত দিন মাইক চলবে ? তাকে চার্জ দিতে হবে, তা না হলে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে । সেইরকমই হরিকথা শুনতে শুনতে আপনাদের ব্যাটারিকে চার্জ দাওয়া হয়, তা না হইলে যদি আমরা ব্যাটারিকে কয়েক দিন চার্জ না দেই, মায়া আমাদের আক্রমণ করতে পারেন—আমরা আবার কৃষ্ণবহির্মুখ হয়ে যাব ।

মায়া অত্যন্ত শক্তিশালী । যদি আপনারা দুর্বল হয়ে যান, মায়া আপনাদের আক্রমণ করতে পারে । সেইজন্য সবসময় সাধুসঙ্গ চাই : ভক্তসঙ্গ করলে মায়া চট্ করে আসতে পারবে না । যেখানে কৃষ্ণনাম করা হয়, সেখান থেকে মায়া অত্যন্ত দূরে পালিয়ে যায় । সবসময় চারদিকে ঘুরঘুর করে মায়া আপনাদের ধরতে চেষ্টা করে থাকে, যাহাতে আপনারা কৃষ্ণবহির্মুখ হয়ে যান । শুধু তাই নয়, আপনারা ভগবানের সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন ।

লোকে বলে, “মহারাজ, আমাকে কৃপা করুন ।” কিন্তু “কৃপা” শব্দের অর্থ হচ্ছে “সেবা পাওয়া” । গুরু মহারাজও বলতেন, “সেবা থাকলে কৃপা আছে ; সেবা না থাকলে কৃপা নেই ।” সেটা মনে রাখতে হবে । আপনাদের কাছে সেবা চলে এসেছে বহু ভাগ্যের ফলে, তাই ভগবানের সেবায় অংশ গ্রহণ করুন । এই সেবা এখানে অভ্যাস করতে করতে আমরা গোলোক বৃন্দাবনে গিয়েও এই সেবা পাব । এখানে ভৌম বৃন্দাবন আর ওখানে গোলোক বৃন্দাবন—সেই গোলোক বৃন্দাবনে আমরা রাধা-গোবিন্দের সেবায় অংশ গ্রহণ করতে পারব ।

“জীবন অনিত্য জানহ সার, তাহে নানাবিধ বিপদ ভার ।” জীবনটা অনিত্য । যেকোন সময় চলে যেতে পারে । মহাজনের শ্রীমুখ থেকে শ্রবণ করেছেন যে, ’মৃত্যু অতি আসন্ন’, মানে মৃত্যু অত্যন্ত কাছেই আছে । যেকোন সময় আমাদের নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে যেতে পারে । খট্বাঙ্গ মহারাজ বা পরীক্ষিত মহারাজের মত এত ভাগ্য জন্মায় নি যাতে আমরা জানতে পারব আমরা কত দিন আরও বাঁচব । খট্বাঙ্গ মহারাজ জানতে পেরেছেন যে, আটচল্লিশ মিনিট তিনি বাঁচবেন জগতে (তাঁর বাকি আয়ু ছিল আটচল্লিশ মিনিট) । পরীক্ষিত মহারাজ জানতে পেরেছেন যে, তাঁর আয়ু সাত দিন । এইরকম মুনি-ঋষিগণ জানতে পারেন তাঁদের কত দিন আয়ু আছে কিন্তু আমাদের এত ভাগ্য হয় নি যে, আমরা জানতে পারব সাত দিন বা সাত সপ্তাহ বা সাত বছর বাঁচব কি না । কোন গ্যারান্টি নেই—যেকোন সেকেন্ডে চলে যেতে পারি । কিন্তু সময় নষ্ট না করে আমরা যদি গোবিন্দের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করি, তাহলে আমাদের পরমকল্যাণ বস্তু, পরম তত্ত্ববস্তু লাভ হবে—তাহলে আমরা ভগবত-ধামে রাধা-গোবিন্দের সেবায় অংশ গ্রহণ করতে পারব ।

সেইজন্য আমাদের এই কথাগুলো সবসময় শ্রবণ করতে হবে । শ্রবণ না করলে আমরা কিছু পাব না । শ্রবণ মানে ‘শ্রেয় + বন’ । দুটি কথা আছে : ‘শ্রেয়’ এবং ‘প্রেয়’ । প্রিয় কথা মানে নাচ, গান, হারমোনিয়াম বাজনা, ইত্যাদি । আপনারা অনেক কীর্ত্তন দেখছেন—অষ্টপ্রহর, চব্বিশপ্রহর, লীলাকীর্ত্তন কিন্তু এমন কীর্ত্তন সারা জীবনই করলেও ভগবানকে লাভ হবে না । “কোটি জন্ম যদি করে শ্রবণ কীর্ত্তন, তবু না পায় ব্রজের নন্দের নন্দন ।” ওইরকম কোটি জন্ম কীর্ত্তন করলে ভগবানকে পাবেন না । ভাড়াটিয়া কীর্ত্তন শুনতে গিয়া লোককে বলা হয়, “যা ইচ্ছা তাই করবে, যা খুশি তাই করবে ।” ওরা আচার-আচরণ কিছু শুদ্ধ ভাবে করে না—গৌরের কথা মুখে বলে কিন্তু গৌরের আচরণ করে না ।

“গোরার আমি, গোরার আমি” মুখে বলিলে নাহি চলে ।
গোরার আচার, গোরার বিচার লইলে ফল ফলে ॥
লোক দেখান গোরা ভজা তিলক মাত্র ধরি ।
গোপনেতে অত্যাচার গোরা ধরে চুরি ॥

(শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত, ৮/৬-৭)

আপনারা ভাবছেন, “আমি আজকে নির্জ্জলা একাদশী করছি, সবাই তা জানেন !” কিন্তু এদিকে আপনারা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে কিছু জল খেয়ে নিলেন, ভাবছেন, “কেউ এটা দেখতে পেলেন না” কিন্তু ভগবান্ দেখতে পাবেন যে, আপনারা চুরি করে জল খাচ্ছেন । এটাকেই বলে “গোপনেতে অত্যাচার” । আপনারা কী করছেন না করছেন “গোরা ধরে চুরি” । গোরা জানেন আপনারা চোর, তিনি আপনাদের চুরি ধরতে পারেন । ভগবানের কাছে, মহাপ্রভুর কাছে কিছু লুকানো যাবে না । ওইরকম, গুরুদেবের কাছেও কিছু লুকানো যাবে না । গুরুদেব সব জানতে পারেন । যখন গুরুদেব নবদ্বীপ থেকে কলকাতা, পুরী বা বৃন্দাবনে বেড়িয়ে যান, তখন আমরা এখানে বসে ভাবছি, “আমি এখানে কী করছি না করছি গুরুদেব কী করে জানতে পারবেন ?” তবু তিনি তো অন্তর্যামী, তিনি সব বুঝতে পারেন । আপনারা কী করছেন না করছেন, গুরুদেব সব জানতে পারেন । লুকিয়ে রাখলে কিছু হবে না । যে ভাবছে “গুরুদেব জানতে পারবেন না”, সে গুরুকে মর্ত্ত্যবুদ্ধি করে । এটা হচ্ছে নামাপরাধ । গুরুদেবে মর্ত্ত্যবুদ্ধি, তিনি আমাদের মত মানুষ, সে কিছু বুঝতে পারছেন না, সে কিছু জানতে পারছেন না—এটা হচ্ছে নামাপরাধ ।

গুরুদেব সব জানতে পারেন, সব বুঝতে পারেন । এটা আপনাদের সবসময় মনে রাখতে হবে । কৃষ্ণোন্মুখ হয়ে শুদ্ধ আচরণ করবেন—শ্রীল সনাতন গোস্বামী, শ্রীল রূপ গোস্বামী যে শিক্ষা দিয়েছেন (রূপ-শিক্ষা, সনাতন-শিক্ষা), শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে মহাপ্রভু যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই শিক্ষাগুলো আপনাদের আচরণ করতে হবে । সেই শিক্ষা যদি নিজে আচরণ করবেন, তাহলে আপনাদের পরমকল্যাণ হবে ।

 

— • • • —

 

 

← ৫। সাধ্যবস্তুর মূল : ছয় গুণ ৭। শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজের চিত্তবৃত্তি →