![]() |
|||||||
| |||||||
|
|||||||
|
শ্রীউপদেশ (দ্বিতীয় খণ্ড) ৭। শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজের চিত্তবৃত্তি
শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজের কীরকম চিত্তবৃত্তি ছিল ? অনেকই গুরুদেবের জন্য রান্না করে এসে বলে, “গুরুদেব আমাকে একটু প্রসাদ দিন ।” এটা সব সহাজিয়ারা করে । ওরা এসে বলে, “একটু প্রসাদ দিন” । গুরুদেব তখন বিরক্ত হন—যে সত্যিকারের গুরু হন, তিনি বিরক্ত হন আর কখনও নিজের প্রসাদ দিতে চান না । আপনাদের যদি প্রসাদ পাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে আপনাদেরকে লুকিয়ে থাকতে হবে । যখন গুরুদেবের প্রসাদ পাওয়া হল আর যদি তিনি কিছু প্রসাদ থালায় রাখলেন, তাহলে আপনারা পরে সেখান থেকে হাতে করে লুকিয়ে কিছু নিতে পারেন । তাঁর কাছ থেকে যে নিতে হবে এমন কোন কথা নেই । আর “নিমন্ত্রণ করে গুরুদেবকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসব, আমি তাঁর একটু প্রসাদ পেতে চাই”—অনেকই দেখবেন জোর করে খাওয়ায় । জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজকে একবার কালনার কাছে ধাত্রিগ্রামে একজন নিমন্ত্রণ করেছিলেন । বাবাজী মহারাজের সেবক ছিলেন বিহারীদাস । একদিন এই বিহারীদাসের কাছে একটি মহিলা এসে বললেন, “আমি আপনাকে আর আপনার গুরুদেবকে একবার নিমন্ত্রণ করে আমার বাড়িতে একটু রান্না করে প্রসাদ দিতে চাই ।” বিহারীদাস বললেন, “ঠিক আছে । আমি বাবাজী মহারাজকে জিজ্ঞাসা করব ; তিনি যদি রাজি হন, তাহলে ডেট দিয়ে দেব আর সেই ডেট অনুসারে করবেন ।” বাবাজী মহারাজের কাছে গিয়ে বিহারীদাস বললেন, “বাবাজী মহারাজ, একজন ভদ্র মহিলা (বয়স্ক বিধবা) এসেছেন । সে বলছেন তাঁর বাড়িতে আপনি একটু যাবেন, উনি একটু রান্না করে আপনাকে ভোগ লাগিয়ে প্রসাদ দেবেন । আপনি কি যাবেন ?” বাবাজী মহারাজ রাজি হয়ে বললেন, “ঠিক আছে ।” “বলতে পারবেন কোন দিন ?” “তুমি যে ডেট দিয়ে দেবে, আমি সেই দিন যাব ।” তখন বিহারীদাস ডেট দিয়ে দিলেন আর বাবাজী মহারাজকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সেই দিন যেতে পারবেন ?” বাবাজী মহারাজ বললেন, “হ্যাঁ, পারব ।” তখন সেই দিন হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে (আগের কালে তো কোন ট্রেন ছিল না) তাঁরা ভদ্র মহিলার বাড়িতে উঠলেন । ভদ্র মহিলা বিহারীদাসকে বললেন, “আমার রান্না রেডি (প্রস্তুত) । আপনি ভোগটা লাগিয়ে দেন ।” বিহারীদাস ভোগ লাগিয়ে দিলেন, তখন ভদ্র মহিলা বললেন, “আপনারা বসুন, আমি প্রসাদ আপনাদের দুজনকে দেব ।” তিনি কলাপাতায় প্রসাদ দিয়েছেন আর যা দিয়েছেন বাবাজী মহারাজ সব পাতা চুষে খেয়ে নিয়েছিলেন । মহিলাটি ভাবলেন, “বাবাজী মহারাজকে এত কষ্ট করে নিমন্ত্রণ করলাম… আমার ইচ্ছা ছিল তাঁর একটু প্রসাদ নেব কিন্তু আমি তো দেখছি উনি কিছুই রাখেননি । আমি আরও কিছু তাঁকে দেব !” মনে মনে ইচ্ছা করে তিনি আর একটু জোর করে দিতে গেলেন কিন্তু বাবাজী মহারাজ বললেন, “না, না, না ! কিছু লাগবে না ! আমি শেষ করে দিচ্ছি, আর লাগবে না । আমার প্রসাদ পাওয়া হয়ে গেছে, আর পাব না ।” মহিলাটি জোর করে বললেন, “না, একটু নিন, একটু নিন ।” শেষে জোর করে আবার কিছু প্রসাদ দিয়ে দিলেন—সবজি, তারকারি, অন্ন, প্রভৃতি । তখন সব বুঝতে পেরে বাবাজী মহারাজ মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেন, “তুমি আমাকে জোর করে খাওয়াচ্ছ কারণ তুমি নিজে প্রসাদ পেতে চাও ! তোমার মনের কথা আমি বুঝতে পারছি ।” তিনি কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ রইলেন আর তারপর কী করলেন ? পুনরায় ওই মহিলাটি তাঁকে যা দিলেন তিনি আবার সব খেয়ে নিয়ে একবারে কলাপাতাও খেয়ে নিলেন ! মহিলাটি এটা দেখে বললেন, “হায় কপাল !” বিহারীদাসও বললেন, “হায় কপাল ! প্রভুর এত কষ্ট হল ! আমি আর কোনদিন এইরকম নিমন্ত্রণ নেব না ।” বাবাজী মহারাজ কিন্তু কিছু বললেন না । এইরকম ছিলেন শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজী মহারাজ । যখন বাবাজী মহারাজ ও বিহারীদাস এই মহিলার বাড়ির দিকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন একটি ধনী লোক তাঁদের দেখে ভাবলেন, “উহু, সাধুটি খুব গরিব—খালি পায়ে চলে যাচ্ছে, কাপড় সব ছেঁড়া… আমি তাকে কিছু টাকা দিয়ে দেই, তাহলে ও অন্তত একটা ভাল কাপড় কিনতে পারবে ।” আসলে ধনী লোকটির অহঙ্কার, অভিমান ছিল—টাকা আছে, বেশী টাকার গরম আছে । তখন এটা মনে করে তিনি বাবাজী মহারাজকে কিছু টাকা দিলেন । বাবাজী মহারাজ টাকাটা নিয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে চললেন । কিছু দূর, তিন কিলোমিটারের মত, গিয়ে তিনি বিহারীদাসকে বললেন, “বিহারীদাস, আবার সে দিকে চল ! যে দিক থেকে এসেছ, সে দিকে চলবে ।” “কেন ?” “চল, তুমি সেখানে চল ।” সেই ধনীর লোকের বাড়িতে গিয়ে দেখলেন যে, লোকটি ছাদে বসে ছিলেন । বিহারীদাস ওনাকে ডাকলেন (বাবাজী মহারাজের বয়স হয়েছে বলে আস্তে আস্তে কথা বলতেন, জোরে ডাকতে পারতেন না) : “বাবু, বাড়িতে আছেন আপনি ?” লোকটি ছাদ থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাঁ, আছি । কেন ?” “আপনি একটু নিচে আসুন ।” “কেন ? কী হল ?” “বাবাজী মহারাজ আপনার সঙ্গে কথা বলবেন ।” বললেন বিহারীদাস । লোকটি নিচে গিয়ে মনে ভাবছিলেন, “আমার মনে হয় তিনি আর একটু চাইতে এসেছে ।” এইরকম অনেকই করে—ওদের কিছু একবার দিলে ওরা আবার মাসে-মাসে আসবে । কিন্তু বাবাজী মহারাজ কী করলেন ? তিনি ওইটাকাটা ফেরৎ দিয়ে দিলেন । “এটা কী ?” লোকটি অবাক হয়ে গেলেন—“প্রথমে নিলেন, তবে এখন ফেরৎ দিচ্ছেন ?” বাবাজী মহারাজ তখন বুঝিয়ে দিলেন, “বাবা, দেখ, এতগুলোর টাকার ভার আমি সইতে পারছি না । আমি যখন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন আমার মনে মনে হচ্ছিল যে, আমি এই টাকা দিয়ে কী কিনব, কী করব, কী হবে—সব সময় এই টাকার চিন্তা করলাম বলে আর হরিনাম করতে পারছিলাম না । বাবা, এই ঝামেলা আমার মাথায় আসছে, তুমি টাকাটা নিয়ে নাও ।” লোকটা বুঝতে না পেরে বললেন, “আমি লক্ষ লক্ষ টাকার ভার সইতে পারি, আর আপনি কী বলছেন ?” “আপনার মাথা খুব বড়, আপনি সব নিতে পারেন কিন্তু আমার মাথা ছোট, আমি অত ঝামেলা সইতে পারি না । বাবা, তুমি আমাকে রেহাই দাও, টাকাটা নিয়ে নাও । আমি চলি, বাবা ।” টাকা ফেরৎ দিয়ে তিনি চলে গেলেন । আমাদের সব মন্দিরে গুরুপরম্পরার মধ্যে শ্রীল বাবাজী মহারাজের ছবি লাস্টে দেখবেন । এইটা বৈষ্ণবতা আর এইভাবে বৈষ্ণবতা আমাদের মধ্যেও আসতে হবে । “আমি ত’ বৈষ্ণব’, এ বুদ্ধি হইলে অমানি না হব আমি ।” “আমি বৃহৎ গুরু হয়ে গিয়েছি তাই এখন আমার পা ধুয়ে দাও, আমার এই করে দাও, সেই করে দাও, আমাকে আরতি করতে হবে, এই করতে হবে, সেই করতে হবে” — এসব সহজিয়া গুরুরা করে, আর নিজের প্রসাদ বিতরণ করে । ভগবানের সংজ্ঞা হচ্ছে এইরকম : তিনি হচ্ছেন ভগবান্ য়াঁর সমগ্র ঐশ্বর্য, সমগ্র বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র শ্রী, সমগ্র জ্ঞান, সমগ্র বৈরাগ্য আছে । ভগবানকে কে দিতে পারেন ? বৈষ্ণব ঠাকুর । সেইজন্য বৈষ্ণব ঠাকুরের কাছে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করতে হবে, “হে বৈষ্ণব ঠাকুর, তুমি আমাকে কৃপা করো আমি যেন তোমার সেবা করতে পারি ।” “সুখে দুঃখে ভুলো নাক, বদনে হরিনাম কর রে” : সুখে দুঃখে ভুললে হবে না, বদনে হরিনাম করতে হবে । সব সময় হরিনাম করবেন, ভগবানের সেবা করবেন । প্রত্যেক দিন মঠে আসবেন, প্রসাদ পাবেন, অভিমান ছেড়ে দিয়ে ভগবানের সেবা করবেন ।
— • • • —
|
|||||||