আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি প্রণামী ENGLISH
 

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


—: শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য :—

সপ্তম অধ্যায় :
শ্রীসুবর্ণবিহার ও শ্রীদেবপল্লী বর্ণন

(শ্রীশ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর রচিত)

 

জয় জয় শ্রীচৈতন্যচন্দ্র, জয় প্রভু নিত্যানন্দ,
জয়াদ্বৈত জয় গদাধর ।
জয় শ্রীবাসাদি ভক্ত,গৌরপদে অনুরক্ত,
জয় নবদ্বীপধামবর ॥
ছাড়িয়া বিশ্রামস্থান, শ্রীজীবে লইয়া যান,
যথা গ্রাম সুবর্ণবিহার ।
ওহে জীব প্রভু কয়,অপূর্ব্ব এস্থান হয়,
নবদ্বীপ প্রকৃতির পার ॥
সত্যযগে এইস্থানে, ছিল রাজা সবে জানে,
শ্রীসুবর্ণসেন তার নাম ।
বহুকাল রাজ্য কৈল, পরেতে বার্দ্ধক্য হৈল,
তবু নাহি কার্য্যেতে বিশ্রাম ॥
বিষয়ে আবিষ্ট চিত্ত, কিসে বৃদ্ধি হয় বৃত্ত,
এই চিন্তা করে নরবর ।
কি জানি কি ভাগ্যবশে, শ্রীনারদ তথা আইসে,
রাজা তাঁরে পূজিল বিস্তর ॥
নারদের দযা হৈল, তত্ত্ব উপদেশ কৈল,
রাজারে ত লইয়া নির্জ্জনে ।
নারদ কহেন রায়, বৃথা তব দিন যায়,
অর্থ চিন্তা করি মনে মনে ॥
অর্থকে অনর্থ জান, পরমার্থ দিব্যজ্ঞান,
হৃদয়ে ভাবহ একবার ।
দারা পুত্র বন্ধুজন, কেহ নহে নিজ জন,
মরণেতে কেহ নহে কার ॥
তোমার মরণ হলে, দেহটী ভাসায়ে জলে,
সবে যাবে গৃহে আপনার ।
তবে কেন মিথ্যা আশা, বিষয় জল পিপাশা,
যদি কেহ নাহি হৈল কার ॥
যদি বল লভি সুখ, জীবনে না পাই দুঃখ,
অতএব অর্থ চেষ্টা করি ।
সেহ মিথ্যা কথা রায়, জীবন অনিত্য হায়,
নাহি রহে শত বর্ষোপরি ॥
অতএব জান সার, যেতে হবে মায়াপার,
যথা সুখে দুঃখ নাহি হয় ।
কিসে বা সাধিব বল, সেই ত অপূর্ব্ব ফল,
যাহে নাহি শোক দুঃখ ভয় ॥
কেবল বৈরাগ্য করি, তাহা না পাইতে পারি,
কেবল জ্ঞানেতে তাহা নাই ।
বৈরাগ্য জ্ঞানের বলে, বিষয় বন্ধন গলে,
জীবের কৈবল্য হয় ভাই ॥
কৈবল্যে আনন্দ নাই, সর্ব্বনাশ বলি তাই,
কৈবল্যের নিতান্ত ধিক্কার ।
এদিকে বিষয় গেল, শ্রেষ্ঠ কিছু না মিলিল,
কৈবল্যের করহ বিচার ॥
অতএব জ্ঞানীজন, ভুক্তি মুক্তি নাহি লন,
কৃষ্ণ ভক্তি করেন সাধন ।
বিষয়েতে অনাশক্তি, কৃষ্ণ পদে অনুরক্তি,
সম্বন্ধাভিধেয় প্রয়োজন ॥
জীব সে কৃষ্ণের দাস, ভক্তিবিনা সর্ব্বনাশ,
ভক্তিবৃক্ষে ফলে প্রেম ফল ।
সেইফল প্রয়োজন, কৃষ্ণপ্রেম নিত্যধন,
ভুক্তি মুক্তি তুচ্ছ সে সকল ॥
কৃষ্ণচিদানন্দ রবি, মায়া তাঁর ছায়া ছবি,
জীব তাঁর কিরণানুগণ ।
তটস্থ ধর্ম্মের বশে, জীব যদি মায়া স্পর্শে,
মায়া তারে করয় বন্ধন ॥
কৃষ্ণবহির্ম্মুখ যেই, মায়াস্পর্শী জীব সেই,
মায়া স্পর্শে কর্ম্ম সঙ্গ পায় ।
মায়া জালে ভ্রমি মরে, কর্ম্ম জ্ঞানে নাহি তরে,
কষ্টনাশ মন্ত্রণা করায় ॥
কভু কর্ম্ম আচরয়, অষ্টাঙ্গাদি যোগময়,
কভু ব্রহ্ম জ্ঞান আলোচন ।
কভু কভু তর্ক করে, অবশেষে নাহি তরে,
নাহি মানে আত্মতত্ত্ব ধন ॥
ভ্রমিতে ভ্রমিতে যবে, ভক্তজন সঙ্গ হবে,
তবে শ্রদ্ধা লভিবে নির্ম্মল ।
সাধু সঙ্গে কৃষ্ণ ভজি, হৃদয় অনর্থ ত্যজি,
নিষ্ঠা লাভ করে সুবিমল ॥
ভজিতে ভজিতে তবে, সেই নিষ্ঠা রুচি হবে,
ক্রমে রুচি হইবে আসক্তি ।
আসক্তি হইবে ভাব, তাহে হবে প্রেমলাভ,
এই ক্রমে হয় শুদ্ধভক্তি ॥
শ্রবণ কীর্ত্তন মতি, সেবা কৃষ্ণার্চ্চন নতি,
দাস্য সখ্য আত্ম নিবেদন ।
নবধা সাধন এই, ভক্ত সঙ্গে করে যেই,
সেই লভে কৃষ্ণ প্রেম ধন ॥
তুমি রাজা ভাগ্যবান, নবদ্বীপে তব স্থান,
ধামবাসে তব ভাগ্যোদয় ।
সাধুসঙ্গে শ্রদ্ধা পেয়ে, কৃষ্ণনাম গুণ গেয়ে,
প্রেমসূর্য্যে করাও উদয় ॥
ধন্যকলি আগমনে, হেথা কৃষ্ণ লয়ে গণে,
শ্রীগৌরাঙ্গ লীলা প্রকাশিবে ।
যেই গৌরনাম লবে, তাতে কৃষ্ণ কৃপা হবে,
ব্রজে বাস সেই ত করিবে ॥
গৌরনাম না লইয়া, যেই কৃষ্ণ ভজে গিয়া,
সেই কৃষ্ণ বহুকালে পায় ।
গৌরনাম লয় যেই, সদ্য কৃষ্ণ পায় সেই,
অপরাধ নাহি রহে তায় ॥
বলিতে বলিতে মুনি, অধৈর্য্য হয় অমনি,
নাচিতে লাগিল গৌর বলি ।
গৌর হরি বোল ধরি, বীণা বলে গৌরহরি,
কবে সে আসিবে ধন্যকলি ॥
এই সব বলি তায়, নারদ চলিয়া যায়,
প্রেমোদয় হইল রাজার ।
গৌরাঙ্গ বলিয়া নাচে, সাধু হৈতে প্রেম হাচে
বিষয় বাসনা ঘুচে তার ॥
নিদ্রাকালে নরবর, দেখে গৌর গদাধর,
সপার্ষদে তাঁহার অঙ্গনে ।
নাচে হরে কৃষ্ণ বলি, করে সবে কোলাকুলি,
সুবর্ণ প্রতিমা গৌর সনে ॥
নিদ্রাভাঙ্গি নরপতি,কাতর হইল অতি,
গৌর লাগি করয় ক্রন্দন ।
দৈববাণী হৈল তায়, প্রকট সময়ে রায়,
হবে তুমি পার্ষদে গণন ॥
বুদ্ধিমন্তখাঁন নাম,পাইবে হে গুণধাম,
সেবিবে গৌরাঙ্গ রীচরণে ।
দৈববাণী কাণে শুনি, স্থির হৈল নরমণি,
করে তবে গৌরাঙ্গ ভজন ॥
নিত্যানন্দ কথা শেষে, নারদের শক্ত্যাবেশে,
শ্রীবাস হইল অচেতন ।
মহাপ্রেমাবেশে তবে, গৌরনামামৃতাসবে,
ভূমে লোটে শ্রীজীব তখন ॥
আহা কি গৌরাঙ্গরায়, দেখিব আমি হেথায়,
সুবর্ণ পুতলী গোরামণি ।
বলিতে বলিতে তবে, শ্রীগৌর কীর্ত্তন সবে,
নয়নেতে দেখয় অমনি ॥
আহা সে অমিয় জিনি, গৌরাঙ্গের রূপ খানি,
নাচিতে লাগিল সেই মানে ।
তবে নিত্যানন্দ রায়, গৌরাঙ্গের গুণগায়,
অদ্বৈত সহিত সর্ব্বজনে ॥
মৃদঙ্গ মন্দিরা বাজে, সঙ্কীর্ত্তন সুবিরাজে,
পূর্ব্বলীলা হইল বিস্তর ।
কত যে আনন্দ হয়,বর্ণিতে শকতি নয়,
বেলা হৈল দ্বিতীয় প্রহর ॥
তবেত চলিল সবে, গৌর গীত কলরবে,
দেবপল্লী গ্রামের ভিতর ।
তথায় বিশ্রাম কৈল, দেবের অতিথি হৈল,
মধ্যাহ্ণ ভোজন অতঃপর ॥
দিবসের শেষ যামে, সকলে ভ্রময় গ্রামে,
প্রভু নিত্যানন্দ তবে কয় ।
দেবপল্লী এই হয়,শ্রীনৃসিংহ দেবালয়,
সত্যযুগ হৈতে পরিচয় ॥
প্রহ্লাদেরে দয়া করি, হিরণ্যে বধিয়া হরি,
এইস্থানে করিল বিশ্রাম ।
ব্রহ্মা আদি দেবগণ, নিজ নিজ নিকেতন,
করি এক বসাইল গ্রাম ॥
মন্দাকিনী তট ধরি, টিলায় বসতি করি,
নৃসিংহ সেবায় হৈল রত ।
শ্রীনৃসিংহক্ষেত্র নাম, নবদ্বীপে এই ধাম,
পরমপাবন শাস্ত্রমত ॥
সূর্য্যটিলা ব্রহ্মটিলা, নৃসিংহ পূরবে ছিলা,
এবে স্থানে হৈল বিপর্য্যয় ।
গণেশের টিলা হের,ইন্দ্রটিলা তারপর,
এইরূপ বহু টিলাময় ॥
বিশ্বকর্ম্মা মহাশয়,নির্ম্মিল প্রস্তরময়,
কতশত দেবের বসতি ।
কালে সব লোপ হৈল, মন্দাকিনী শুকাইল,
টিলামাত্র আছয় সম্প্রতি ॥
শিলাখণ্ড অগণন, কর এবে দরশন,
সেই সব মন্দিরের শেষ ।
পুন কিছুদিন পরে, এক ভক্ত নরবরে,
পাবে নৃসিংহের কৃপালেশ ॥
বৃহৎ মন্দির করি, বসাইবে নরহরি,
পুনসেবা করিবে প্রকাশ ।
নবদ্বীপ পরিক্রমা, তার এই এক সীমা,
ষোলক্রোশ মধ্যে এইবাস ॥
নিতাই জাহ্ণবা পদ, যে জনার সম্পদ,
সেই ভক্তিবিনোদ কাঙ্গাল ।
নবদ্বীপ সুমহিমা, নাহি তার কভু সীমা,
তাহা গায় ছাড়ি মায়াজাল ॥

 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 


শ্রীনবদ্বীপধাম
মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


এইগ্রন্থশিরোমণি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্য এবং তাঁর শ্রীচরণের তৃপ্তির জন্য তাঁর অহৈতুক কৃপায় শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ হইতে প্রকাশিত হয় শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শুভার্বিভাব তিথিতে শ্রীগৌরাব্দ ৫৩৪, বঙ্গাব্দ ১৪২৬, খৃষ্টাব্দ মার্চ্চ ২০২০ ।


সূচীপত্র:

শ্রীগৌরধাম ও শ্রীভক্তিবিনোদ

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য
(১) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের সাধারণ মাহাত্ম্য কথন
(২) শ্রীশ্রীগৌড়মণ্ডল ও শ্রীশ্রীনবদ্বীপধামের বাহ্যস্বরূপ ও পরিমাণ
(৩) শ্রীশ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমার সাধারণ বিধি
(৪) শ্রীজীবের আগমন ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁহাকে শ্রীনবদ্বীপতত্ত্ব বলেন
(৫) শ্রীমায়াপুর ও শ্রীঅন্তর্দ্বীপের কথা
(৬) শ্রীগঙ্গানগর, শ্রীপৃথুকুণ্ড, শ্রীসীমন্তদ্বীপ, শ্রীবিশ্রামস্থানাদি দর্শন
(৭) শ্রীসুবর্ণবিহার ও শ্রীদেবপল্লী বর্ণন
(৮) শ্রীহরিহরক্ষেত্র, শ্রীমহাবারাণসী ও শ্রীশ্রীগোদ্রুমদ্বীপ বর্ণন
(৯) শ্রীমধ্যদ্বীপ ও নৈমিষ বর্ণন
(১০) শ্রীব্রাহ্মণপুষ্কর, শ্রীউচ্চহট্টাদি দর্শন ও পরিক্রমা-ক্রম বর্ণন
(১১) শ্রীশ্রীকোলদ্বীপ, শ্রীসমুদ্রগড়, শ্রীচম্পাহট্ট ও শ্রীজয়দেব-কথা বর্ণনা
(১২) শ্রীশ্রীঋতুদ্বীপ ও শ্রীরাধাকুণ্ড বর্ণন
(১৩) শ্রীবিদ্যানগর ও শ্রীজহ্ণুদ্বীপ বর্ণন

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজনকুটির (স্বানন্দ-সুখদা-কুঞ্জ)
শ্রীনৃসিংহপল্লী
শ্রীকোলদ্বীপ


বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥