আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


(১৩) ভক্ত ও নাপিত

 

বিশ্বাস করতে হয় । সাধুসঙ্গ না করলে হয় না । আমি এক উদাহরণ দিয়ে দেব ।

বাইরের লোক সপ্তাহ ধরে ব্যস্ত থেকে চাকরি করে, আর রবিবার দিনে (সপ্তাহের শেষে) চুল-দাড়ি থাকে । সেইজন্য রবিবার দিনে তারা চুল-দাড়ি কাটে—সবাই লাইন ধরে নাপিতের দোকানের ঘিরে বসে আছে । এক রবিবার দিন পূর্ণিমা ছিল—সাধুরা পূর্ণিমায় মস্তক মুণ্ডন করেন ।

এক মঠের সাধু নাপিতের দোকানে গিয়ে বলল, “বাবা, আমিও মস্তকটা মুণ্ডন করব ।”

নাপিতটা বলল, “এই তো লাইনে অনেক লোক আছে । ওখন বসুন ।”

সাধুটা একটা বেঞ্চের মধ্যে বসল । সবাই কাগজ পড়ছে, আলতু-ফালতু গল্প করছে আর সাধুটা চুপ করে বসে ছিল ।

একটু পর নাপিতটা বলল, “এই জগতে ভগবান নেই । দেখো খবরটা হচ্ছে—কত লোক গাড়ি দুর্ঘটনায় মরেছে, এখানে মারামারি হচ্ছে, এই ছেলে বাবাকে মেরে দিচ্ছে ! ভগবান্ থাকলেই সে কিছু দেখতে পায় না ! ভগবান্ নেই ।”

কথায় কান না দিয়ে সাধুটা চুপ করে বসে ভাবল, “আমি যদি এখানে প্রতিবাদ করব, তাহলে বাড়ির দল আমাকে ধরে মারবে । বরং এ সব উপেক্ষা করব, মাথা মুণ্ডন করে দিয়ে চলে যেতে পারব ।”

পরে ওখান থেকে চলে গিয়ে সাধুটা মনে মনে চিন্তা করল, “ওই লোকগুলোকে কি করে এই পথে আনা যায় ? বিশেষ করে যে দোকানের নাপিতটা, সে ওই দলে সায় দিচ্ছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ করছে । ওই নাপিতটাকে কি করে এই পথে আনা যায় ?”

এক দিন হেঁটে হেঁটে স্টেশনের দিকে চলে এসে সাধটা এক পাগল লোককে দেখল—ওর বড় দাড়ি হয়ে গেছে, অত বড় বড় চুল, নোংরা, কোন দিন স্নান করে নি । একজন আখ খাচ্ছেন, আখের ছোবলাগুলো ফেলছে আর ও এগুলো আবার ছুড়ছে—ড্রেন থেকে ময়লাগুলো খাচ্ছে … এইরকম পাগলামি করছে ।

সাধুটা তখন ওর কাছে এসে বলল, “বাবা, আমার সঙ্গে চলো !” ও যাবে না । সাধুটা তখন এক টুকরো চকলেট কিনে দিয়ে বলল, “আমি তোমাকে চকলেট দিয়ে দেব, চলো ! চলো, আমার সঙ্গে চলো ।” ওকে চকলেট-বকলেট দেখিয়ে দিয়ে দোকানের কাছে নিয়ে এল, বলল :

“এই দেশে নাপিত নাই ! এই দেশে নাপিত নাই ! এই দেশে নাপিত নাই !”

তখন নাপিতটা রাস্তায় বেরিয়ে বলল, “এ কী ! আপনি তো কালকেই আমার কাছে মস্তক মুণ্ডন করে গেলেন, দাড়ি কেটে গেলেন আর আজকে বলছেন নাপিত নেই ? আমি তো নাপিত !”

সাধুটা উত্তরে বলল, “আপনি যদি নাপিত থাকেন, তাহলে এর বিরাট চুল-দাড়ি কেন ?”

নাপিত বলল, “আপনি পাগল না কি ? এই লোকটা কি আমার দোকানে এসেছে কোনদিন চুল-দাড়ি কাটতে ? আসুন, আমি এইক্ষণেই ওর চুল-দাড়ি কেটে দেব !”

“অঃ, আপনার দোকানে আসতে হবে তারপর আপনি চুল-দাড়ি কেটে দেবে ? আর কালকে কী বলেছিলেন ? ভগবান্ নেই ! আপনি কি করে জানেন ? আপনি থাকেন বেগমপুরে আর এখান থেকে বলে দেন যে, কলকাতা বলতে একটা শহর নেই—আপনি কলকাতা দেখলেন না, ওখানে গেলেন না, বুঝতে পারলেন না কিন্তু এখান থেকে এই বলে দিলেন । আপনি কলকাতায় গিয়ে দেখতে পাবেন কলকাতা শহর আছেই । আর আপনি এই দোকানে বসে বলেন ভগবান্ তো নেই—আপনি ভগবানের মন্দিরে গিয়েছেন ? ভগবানের ভক্তের কাছে গিয়েছেন ? ভক্তের হৃদয়ে ভগবান্ অবস্থান করেন ! সাধু-সঙ্গের মধ্যে ভগবান্ থাকেন । যেখানে হরিকথা সেখানে ভগবান আসেন । আপনি কী সাধু-সঙ্গ করেছেন ? আপনি ভগবানের কথা শুনেছেন ? ভগবানের মন্দিরে গিয়েছেন ?”

“তা তো, যাই নি …”

“তারপর আপনি কি করে বললেন ? কাল থেকে মন্দিরে যাবেন !”

“ঠিক আছে, যাব ।”

তখন নাপিতটা মন্দিরে গেল আবার তার অনুভূতি হতে লাগল, “সত্যই তো, ভগবান্ বলতে কিছু আছে ।” সাধু-সঙ্গ করতে করতে ও ভক্ত হয়ে গেল ।

আমি হাতটা মুখের সামনে তুলে কী আঙ্গুলটা গুণতে পারব ? না, হাতটা একটু দূরে, একটু ডিস্টেন্সে রেখতে হবে । ভগবানের মন্দিরে গিয়ে ভগবানকে কী দেখব ? “ভক্তের হৃদয়ে গোবিন্দ বিশ্রাম করেন”—ভক্তের কাছে গেলে ভগবান্ দেখা দেবেন যে, তাঁর ভক্তের সঙ্গই করে যেতে হবে । অতি দূরেও নাই আবার অতি ভিতরেও নাই, নির্দিষ্ট ডিস্টেন্সে যেতে হবে ।

 

— • • • —

 

 

← (১২) পূজনীয় বিসর্জন (১৪) চকচক করলেই সোনা হয় না →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥