আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীউপদেশ


(১৬) দণ্ড মহৎসব

 

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্ ।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রীগুরুং দীনতারণম্ ॥

(শ্রীভাবার্থদীপিকা)

“বোবা লোকও বাচাল হতে পারে, পঙ্গুলোকও পাহাড় উলঙ্ঘন করতে পারে যদি শ্রীগুরুপাদপদ্মের কৃপা হয় ।”

আপনারা বহু ভাগ্যের ফলে আজকে এখনে শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামীর দণ্ড মহৎসব করতে এসেছেন । ‘দণ্ড’ মানে কী ? শাস্তি । এই শাস্তি এই জগতের শাস্তি নয়—এই শাস্তি পেলে ভাগবৎধামে যাওয়া যায় । এই ‘শাস্তি’ নিত্যানন্দ প্রভু দিয়েছিলেন রঘুনাথদাস গোস্বামীকে ।

এক আদিসপ্তগ্রামে দুই ভাই জমিদার ছিলেন, হিরণ্য ও গোবর্ধন । তাঁদের একটা মাত্র পুত্র ছিলেন, তাঁর নাম রাঘুনাথ । যখন রঘুনাথ এখানে এসেছিলেন, তখন নিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে বললেন, “আয়, চোর, আয় ! তোকে আজ শাস্তি দেব !” চোর তাঁকে বললেন ! নিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে চোর বলেছিলেন কেন ? প্রভু জানতেন, “তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার বাদ দিয়ে, আমাকে না জানিয়ে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সঙ্গ করতে গিয়েছ । এইজন্যই তোমার গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কৃপা হয় নি ।”

আপনি জানেন যে, মহাপ্রভু সন্ন্যাস নিয়ে যাওয়ার পরে যখন শান্তিপুরে অদ্বৈত-অঙ্গনে এসেছিলেন, তখন রঘুনাথদাস গোস্বামী ওখানে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন । তারপর বারবার (একবার-দুবার না, হাজারবার !) তিনি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কাছে গিয়েছেন কিন্তু কৃপা কখনও পেলেন না । মহাপ্রভু তাঁকে সবসময় বললেন, “বাড়ি ফিরে যাও ! ঘরে যাও, বাতুল হও না ! ওই মর্কট বৈরাগ্য, লোক দেখানো বৈরাগ্য কর না ! ঘরে গিয়ে সংসার কর ।” এই সব প্রভু বললেন—কৃপা হয় নি ।

যখন পরে নিত্যানন্দ প্রভু সমস্ত ভক্তগণকে নিয়ে এখানে (শ্রীপানিহাটিতে) এসেছেন আর এই বড় গাছেন তলে বসেছিলেন, তখন রঘুনাথ তাঁর বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে এলেন । তাঁকে দেখে একজন নিত্যানন্দ প্রভুকে বলল, “দেখুন না, প্রভু, ওই যে রাঘুনাথ আসছে !”

প্রভু বললেন, “কই ? কোথায় ? কোথায় ? আয়, চোর, আয় ! তোকে আজকে শাস্তি দেব !”

তখন রঘুনাথদাস গোস্বামী নিত্যানন্দ প্রভুকে দণ্ডবৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, “কী শাস্তি, প্রভু ? বলুন ।”

নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “এই যে ভক্তগণ এখানে আছে, তোমার সব ভক্তগণকে আজকে চিড়া, দধি, আম, ইত্যাদি খাওয়াতে হবে ।”

রঘুনাথ বললেন, “এটা আমার শাস্তি নয় ! এটা আমার ভাগ্যের কথা ।”

তখন তিনি দোকান থেকে সব পাতা, খাবার ইত্যাদি কিনে নিয়ে এসে সব লোককে দিয়ে দিলেন— ওই প্রসাদ পাওয়ার জন্য অনেক লোক গঙ্গায়ও নেমে গেল । কত লোক ছিল ! আজকেও আপনারা দেখছেন কত লোক এখানে এসেছিল ।

রঘুনাথদাস গোস্বামী উত্তম ভক্ত ছিলেন—উত্তম মানে আসল, শুদ্ধ ভক্ত । সেটা কি করে হল ? সেটা অনুশীলন করতে করতে হয় । রঘুনাথদাস গোস্বামীর উত্তম, আসল সতীত্ব ছিল (সতীত্ব মানে যেমন মেয়ের বড় নিষ্ঠা বা সতীত্ব) । কি রকম তাঁর সতীত্ব ছিল ? তিনি রাধারাণীর জন—তাঁকে ছেড়ে তিনি কিছু বুঝতেন না ।

যখন রঘুনাথদাস গোস্বামী বৃন্দাবনে ছিলেন, তখন প্রত্যেক দিন জানেন কী খেতেন ? মাঠা (আমরা বলি ‘ঘোল’) । দই দিয়ে ঘোল হত—ওইটা তিনি প্রত্যেক দিন খেতেন । এক জন ব্রজবাসী প্রত্যেক দিন এক পদ্ম পাতায় দোনা করে তাঁর কাছে ঘোল নিয়ে আসত । রঘুনাথদাস গোস্বামী ভাবতেন, “রাধাকুণ্ড বিনা অন্য দিকে মতি নাই—যেই দিকে আমার মন, প্রাণ দিয়ে দেব, সেই দিক থেকে সব কিছু নিয়ে নেব ।” সেইরকম প্রত্যেক দিন এই ব্রজবাসী রাধাকুণ্ডের পদ্মের দোনায় মাঠা নিয়ে আসত, কিন্তু এক দিন হঠাৎ করে ওই পাতাটা দেখে রঘুনাথদাস গোস্বামী লোককে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, পাতাটা কোথা থেকে নিয়ে এসেছ ?”

ব্রজবাসী বলল, “আজকে রাধাকুণ্ডে যেতে পারি নি । আজকে আমি ওই চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে গেয়েছি ।”

(চন্দ্রাবলীর সাথে রাধারাণীর কী সম্পর্ক ? তারা শত্রু । রাধারাণীর ভাবটা বাম্য-ভাব আর তাঁরা পস্পর্কে সহ্য করতে পারেন না । রাধারাণী কৃষ্ণকে প্রিয় বলে চন্দ্রাবলী তাঁকে হিংসা করেন ।)

যখন রঘুনাথদাস গোস্বামী শুনলেন, “চন্দ্রবলীর-কুঞ্জে গিয়ে ওখান থেকে নিয়ে এসেছি,” তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই পাতাটা মাঠার সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিলেন—প্রসাদ নিলেন না ! এটা বলা হচ্ছে সতীত্ব (চ্যাস্টিটি) ।

এইটা সবসময় গুরু মহারাজ বলতেন । আমাদের লাইনটাও হচ্ছে এইরকম—আমরা সব জায়গায় মিশি না, আমরা সব জায়গায় যাই না, সব জায়গায় খাই না, সব জায়গায় চলি না, সবার সঙ্গে মিশি না, সবাইয়ের প্রসাদ খাই না, পরদেবদেবীর প্রসাদ পাই না, পরদেবদেবীর পূজা করি না । আমাদের লাইনটা হচ্ছে রাধারাণীর লাইন, শ্রীরূপানুগ লাইন (রূপ গোস্বামীর লাইন) আর সেই লাইনে আমাদেরকে চলতে হবে । সেই লাইন ছাড়া অন্য লাইন আমরা চলতে পারব না ।

রঘুনাথদাস গোস্বামীর চ্যাস্টিটি (সতীত্ব) আপনারা মনে রাখবেন ।

 

— • • • —

 

 

← (১৫) আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ? (১৭) শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব →

 

সূচীপত্র:
সূচনা : আমাদের একমাত্র কৃত্য
১। ভক্তির অভাব
২। গৃহে আবদ্ধ
৩। মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
৪। জীবকে সত্য দয়া কি ?
৫। ভোগী নই ত্যাগীও নই
৬। শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
৭। ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
৮। ভগবানের চরণে পথ
৯। শান্তির গুপ্ত কথা
১০। শ্রীবামনদেবের কথা
১১। শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
১২। পূজনীয় বিসর্জন
১৩। ভক্ত ও নাপিত
১৪। চকচক করলেই সোনা হয় না
১৫। আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
১৬। দণ্ড মহৎসব
১৭। শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
১৮। মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
১৯। আমাদের একমাত্র উপায়
২০। পবিত্র জীবন
২১। শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
২২। আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥