অভিমানের পরিবর্তন

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
২২ মে ২০১৮

 

অভিমানটা ছাড়তে হবে । তা না ছাড়লে হবে না । ভজন করতে করতে সেবা করতে করতে অভিমান চলে যাওয়া উচিত । যদি সেবা করতে করতে অভিমান চলে না যায়, তাহলে সেবা হচ্ছে না বলতে হবে । আমাদের অভিমান কেন ছেড়ে দিতে হবে ? অভিমান-বুদ্ধি সব কিছু আমাদের নষ্ট করে দেয় এবং সেবা থেকে বিচ্যুত করে দেয় । কেউ এতদিন ধরে সেবা করে ভাবছেন, “আমি অনেক দিন ধরে মঠের মালিক ছিলাম ! আমি এত বড় সেবা করেছি !” কিন্তু আসলে আমাদের ভাবতে হবে, “প্রভু, আমি তোমার সেবক মাত্র ।”

আমরা ভোগীও নই, ত্যাগীও নই : আমরা ভোগও করব না, ত্যাগও করব না । মাঝখানেতে আমরা সেবী—সেবক । আমাদের নিজেকে সেবক বলে ভাবতে হবে । আমি ম্যানেজারও নই, মঠের ইন-চার্জও নই, আমরা সবাই সেবক—ভগবান কৃপা করে সেবা নিচ্ছেন, তাই ভাল । এটা না বুঝলে আমাদের কিন্তু বিপদ আছে ।

আপনারা অনেক দিন ধরে এখানে অনেক কিছুই পাঠে শুেনছেন, কিন্তু এখনও ঠিক মত সঠিক নিষ্ঠা ও সতীত্বতা (চেষ্টিটি) আপনাদের মধ্যে আসেনি  । প্রথমে নিষ্ঠা আসতে হবে, নিষ্ঠার পরে অাসক্তি, অাসক্তির পরে রুচি । এইসব করতে করতে তারপর সতীত্ব (চেষ্টিটি) হয় । সেইটা খুবই কম লোকের থাকে । খুবই কম লোকই আছেন যে তাঁর ছাড়া কিছুই জানেন না, তাঁর ছাড়া কিছুই বুঝেন না, এইরকম ভাব । ব্রজগোপীদের সেইরকম ভাব, সেইরকম ভাবটা আমাদের হৃদয়েও আসতে হবে ।

আপনারা নিজেরাই একটু চিন্তা ভাবনা করতে পারেন : কেন এই পথে আসব ? কেন হরিনাম করব ? কেন ভজন করব ? কেন ভগবানের সেবা করব ? এটা নিজেকে দিয়ে বিচার করতে হবে ।

আপনারা চিন্তা করুন । আমি আপনাদের কাছেই একটা প্রশ্ন রাখতে পারি : আপনারা এই জগতে প্রত্যেক দিন কত লক্ষ লক্ষ জীবকে হত্যা করে বেঁচে আছেন, বলুন ? যখন আমরা শ্বাসপ্রশ্বাস করছি—শ্বাস নিচ্ছি, শ্বাস বেরিয়ে চলে যাচ্ছে—তখন কত জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, কত জীবন আমরা মেরে ফেলছি ! আপনারা যখন ভাত খাচ্ছেন বা সবজি কাটছেন, তখন কত গাছকে হত্যা করে বেঁচে আছেন । আপনারা বাঁধাকপিই খান, ফুলকপিই খান, ডাঁটাই খান, শাকই খান—কিন্তু আপনারা গাছকে হত্যা করে খেয়ে বেঁচে আছেন । জল পান করে কত জীবকে আমরা খেয়ে শেষ করে দিচ্ছি । যখন নিজের জন্য রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, তখন কত পিপীলিকা মেরে ফেলেছি বা যখন গাড়িতে করে যাচ্ছি গাড়ির তলায় কত পশুপাখি, কত কিছু সাপ ব্যাঙ ইত্যাদি মরে যাচ্ছে । এর জন্য আপনিই দায়ী ।

এসব পাপের ফল আপনাদের জন্মে জন্মে ভোগ করতে হবে । এই জন্মে যা আমরা পাপ করছি, পরের জন্মে সেই পাপের ফল ভোগ করতে হবে (সেটা এই জন্মে হতে পারে, পরের জন্মেও হতে পারে) । এই পাপ থেকে রেহাই পাওয়া একমাত্র উপায়টা কী আছে ? সেটাও শ্রীমদ্ভাগবতম্ বলেছেন (১/১/২):

পৃথিবীতে যত কথা ধর্ম্মনামে-চলে ।
ভাগবত কহে সব পরিপূর্ণ ছলে ॥

নিজের জীবন আপনারা পরিবর্তন করতে পারেন । আপনারা যেগুলো কাজ করছেন সেগুলো করতে বারণ করিনি (“গৃহে থাক, বনে থাক সদা ‘হরি’ বলে ডাক”) কিন্তু আপনাদের জীবনটাকে গোবিন্দের সেবায় লাগাতে পারেন। কেউ সংসারে আছেন, কেউ মঠে আছেন, কেউ একা বাস করেন—যদি রান্না করে ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে প্রসাদ পান তাহলে আপনাদের পরমকল্যাণ বস্তু লাভ হবে । ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে তাঁর প্রসাদ পেলে তাহলে আপনাদের যত পাপ আছে সেগুলো আর থাকবে না । “প্রসাদ-সেবা করিতে হয় সকল প্রপঞ্চ জয় ।” প্রপঞ্চ কী কী ? মনে আছে ?…

 


 

← গ্রন্থাগারে

অন্য রচনা:
শ্রীনৃসিংহদেবের কথা
দণ্ড মহৎসব
মায়ার চিন্তা বা কৃষ্ণের চিন্তা ?
আমাদের একমাত্র উপায়
ভক্তির অভাব
গৃহে আবদ্ধ
মায়ের পেট থেকে মায়ার পেটের মধ্যে
জীবকে সত্য দয়া কি ?
ভোগী নই ত্যাগীও নই
শ্রবণ-কীর্ত্তনে মতি
ভগবানের কৃপা ও আপনার চেষ্টা
শান্তির গুপ্ত কথা
পবিত্র জীবন
বামনদেবের কথা
ভক্ত ও নাপিত
ভগবানের চরণে পথ
পূজনীয় বিসর্জন
শিবজী মহারাজ : পরম বৈষ্ণব
শ্রীহরিনাম দীক্ষা : গুরুপাদপদ্মের দান
আমি তো সব ব্যবস্থা করি নাকি ?
চকচক করলেই সোনা হয় না
আমার শোচন
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥