হরি-ভজনের লক্ষণ

ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
উলুবেড়িয়া, ১৮ জানুয়ারি ২০২০, তৃতীয় অংশ

 

অনেকের গৌড়ীয় গীতাঞ্জলি নেই, তবু আপনারা বইটা এখানে নিয়ে নেবেন । শ্রীপদ ত্যাগী মহারাজ ছোট বই করে দিয়েছেন, ওর দামটা বেশি নয় । বট বই ৮০-টাকা কিনতে অনেকের কষ্ট হয় । বাজারে গেলে ৩০-৪০-টাকা চার জন্য খরচ করেন, নষ্ট করে দিন কিন্তু ২০-৫০-টাকা দিয়ে বই (গ্রন্থ !) নিতে পারেন না । গুরু-বৈষ্ণবের কথা, গুরু-বৈষ্ণেবের মুখনিঃসৃত বাণী, হরি-কথা, শাস্ত্রের কথা, সিদ্ধান্তের কথা, যে সব গ্রন্থের মধ্যে লেখা আছে, চৈতন্যচরিতামৃতের, চৈতন্যভাগবতের কথা, শ্রীমদ্ভাগবতের কথা—তার প্রতি আপনাদের রুচি আসছে না ।

পৃথিবীতে যত কথা ধর্ম্মনামে-চলে ।
ভাগবত কহে সব পরিপূর্ণ ছলে ॥

যে ভাগবতের কথা গ্রন্থের লেখা আছে, সেই গ্রন্থ আমরা পছন্দ করি না । আমাদের পড়তে ভাল লাগে না, আমাদের কিছু energy (শক্তি) আসে না, সেবা-উৎসাহ নেই । আমরা অনেক দিন ধরে হরিনাম নিয়েছি, অনেক দিন ধরে দীক্ষা নিয়েছি, কিন্তু আস্তে আস্তে ভজন-সাধন কমিয়ে এনেছি । আমরা সব সময় দেহের চিন্তা করি, কই দিন বাঁচব চিন্তা করি । আর যারা এই পথে আসেন নি, তারা আবার ভগবানের সঙ্গে cheating (ছলনা) করেন । কী রকম ছলনা হয় ? জানেন ? লোকে বলছে যে, এখন আমার সময় হয় নি, বৃদ্ধ কাল হলে, একটু বয়স হলে, ছেলেটিকে, মেয়েটিকে বিয়ে দিলে, তার পর হরিভজন করব । আর যদি ষাট বয়স হয়, তখন হাঁটু ব্যথা করবে, মাজা ব্যথা করবে, আরো ব্যথা করবে—তখন মুড়তেই পারব না, আমাকে একজায়গা থেকে একগায়গায় বসাতে হলে লকের ধরতে হবে । শরীর যদি ভাল না থাকে, তখন কি আর ভগবানের কথা ভাল লাগবে, বলুন ? তখন হরিনাম করতে ভাল লাগবে ? বৃদ্ধ কালে আমরা পূর্ব্ব পূর্ব্ব জন্মের আগের কথা, কী কাজ করেছেন, ইত্যাদি, সেই সব কাজের কথা চিন্তা করব । কত কষ্ট হবে—ছেলেটিকে এত কষ্ট করে মানুষ করলাম, ছেলেটি আমাকে দেখতে আসে না, নাতি-নাতনী দেখলাম, ওরাও আমাকে দেখতে আসে না । এই সব চিন্তার মধ্যে জীবন কেটে যাবে ।

দিন যায় মিছা কাজে নিশা নিদ্রাবশে ।
নাহি ভাবি মরণ নিকটে আছে বসে ॥

(শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, কল্যাণ-কল্পতরু)

কখনও ভাবি না যে, মরণটা আমাদের এই কাছে চলে এসেছে । কখনও এটা বুঝতে পারি না । এই জন্য, সাধু-সঙ্গ করতে হবে । প্রথমেই শরণাগতি আসতে হবে—শরণাগতি না হলে ভজন আরম্ভ হয় না । প্রভুপাদ বলতেন, শরণাগতের অপরাধ যদি হয়, ভগবান নিজে করে মার্জনা করে দেন ।

দৈন্য, আত্মনিবেদন, গোপ্তৃত্বে বরণ ॥
'অবশ্য রক্ষিবে কৃষ্ণ’—বিশ্বাস পালন ॥

(শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, শরণাগতি)

সেব্যের সেবা করে দেওয়াই, সেব্যকে খুশি করে দেওয়াই আমাদের ভজন । গুরু-বৈষ্ণবকে, ভগবানকে খুশি বিধান করার নামই হল ভজন । আমি গুরুদেবকে বিশ্বাস করি—ভগবানের চাইতেও গুরুদেবকে বেশী বিশ্বাস । পৃথিবীর সারা লোক বলে যে, সূর্য্য পূর্ব্ব দিকে উঠবে, আর যদি আমার গুরুদেব বললেন যে, আজকে সূর্য্য পশ্চিম দিকে উঠেছে, আমি সেইটা বিশ্বাস করি—জবাব দিতে হবে, “হ্যাঁ, ঠিক, পশ্চিম দিকে উঠেছে ।” গুরুদেবের প্রতি নিষ্ঠা ভক্তি সব সময় থাকতে হবে । আমি অনেকবার বলেছি যে, একদিন শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী প্রভু একজন ব্রজবাসীকে মাঠা (ঘোল) রাধা কুণ্ড থেকে নিতে বললেন আর উনি ঘোল অন্য জায়গা থেকে নিলেন—সেটা দেখলে শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী প্রভু ঘোলটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন । তার এত বেশী শ্রীরাধার প্রতি নিষ্ঠা ছিল । রাধারাণীর কেন নাম হয়েছে ? তিনি আরাধনা সবচেয়ে বেশী করেছেন । এই শ্রীমতী রাধিকার জন যারা—শ্রীল প্রভুপাদ, শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, আমাদের গুরুবর্গ এবং গুরুদেব—তারা এই জগতে ভগবানের কথা নিরন্তর প্রচার করেছেন এবং নিরন্তর ভগবানের কথা প্রচার করবার জন্য সারা পৃথিবীতে মঠ-মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই গুরুবর্গের আরাধনা করতে হবে ! সেই গুরুবর্গের কাছে যেতে হবে, তাহলে পরম কল্যাণ, প্রকৃত বস্তু আমাদের লাভ হবে ।

পরম কল্যাণের লাভ উপায় কী ? কিসের আমাদের মঙ্গল হবে ? সেইটা আমরা বুঝি না । আমরা নিজেকেই জানি না । ইন্দ্রিয়গুলাকে জয় করতে পারি নি, নিজের মনটাকে জয় করতে পারি না কিন্তু মাঝে মাঝে বলি যে, “সারা দুনিয়া জয় করে ফেলেছি !” চক্ষু, কর্ণ, নাসিক, জিহ্বা, ত্বক, মন, বুদ্ধি অহঙ্কার— এই সব যে ইন্দ্রিয়গুলা আছে, এগুলাকে আমরা জয় করতে পারি নি, control (দমন) করতে পারি না, তাহলে কি করে আমাদের হরি-ভজন হবে ? “কিসে ভাল হয় কভু না বুঝিনু”—আমাদের কিসের ভাল হয় জানি না, এটা হচ্ছে শরণাগতের লক্ষণ । শরণাগতের লক্ষণটা বুঝতে হবে । যে শরণাগত, সে অনুভব করে যে, সে কিছু জানে না, কিছু বুঝে না—

শক্তিবুদ্ধিহীন আমি অতি দীন
কর মোরে আত্মসাথ ॥

(শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

শুধু মুখে বললে হবে না । নিষ্কপট ভাবে বলতে হবে, নিষ্কপট ভাবে মনে রাখতে হবে । “আমি শক্তিবুদ্ধিহীন আমি অতি দীন কর মোরে আত্মসাথ ।” “সকলে সম্মান করিতে শকতি দেহ' নাথ যথাযথ”—গুরুদেব, তুমি আমাকে এমন শক্তি দাও যেন আমি সকলকে সম্মান করতে পারি । কেউ আমাকে সম্মান দেন বা না দেবেন, আমি সকলকে সম্মান করব ।

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা ।
অমানিনা মানদেন কীর্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ ॥

(চৈঃ চঃ ৩/৬/২৩৯)

তৃণাদপি সুনীচেন মানে তৃণার মত নিচু হতে হবে । আমরা সব সময় কীর্ত্তনেও করি, “দাঁতে তৃণা করি”—তৃণা মানে ঘাস ; যে গোরু ঘাস খায়, আমি ওর চাইতে অধম, আমি সকলের চাইতে অধম । এটা মনে রাখতে হবে । এই ভজনটা বুঝতে হবে । আমাকে সম্মান কেউ করে বা না করে কিন্তু আমি সবাইকে সম্মান করব । যে আমাকে সম্মান দেবেন না, আমি তাকেও সম্মান দেব । সেটা মনে রাখতে হবে ।

তৃণাধিক হীন দীন অকিঞ্চন ছার ।
আপনে মানবি সদা ছাড়ি অহঙ্কার ॥
বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন ।
প্রতিহিংসা ত্যজি অন্যে করবি পালন ॥
জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে ।
পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥

(শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর)

পরের উপকারকে নিজের সুখটাকে বিলিয়ে দিতে হবে । আমার থাকার জায়গার চিন্তা করলে হবে না—আমার বৈষ্ণবগণ আছেন, আমার গুরু-ভ্রাতা আছে, তাদের জায়গার ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেব । লোকে বলে, “না, আমি ওর ছোড়দি, আমাকে আগে খেতে দিতে হবে”—না, এটা করলে চলবে না । এটা হরিভজনের লক্ষণ নয়—সব সময় সেবা প্রবৃত্তি থাকতে হবে ।

 


 

 

← গ্রন্থাগারে

বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥