আমাদের শ্রীগুরুপরম্পরা :
শ্রীশ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীশ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ ভগবান্ শ্রীশ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর
              প্রভুপাদ
“শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠে সূর্যাস্ত কখনই হয় না” :
আমাদের মঠের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
 
আমাদের সম্পর্কে শ্রীউপদেশ শ্রীগ্রন্থাগার শ্রীগৌড়ীয় পঞ্জিকা ছবি ENGLISH
 

শ্রীনবদ্বীপধাম মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


শ্রীমোদদ্রুমদ্বীপ

 

শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের বাল্যলীলাভূমি

 

শ্রীনবদ্বীপধাম পরিক্রমা করতে করতে আমাদের শেষ জায়গা হচ্ছে এই শ্রীমোদদ্রুমদ্বীপ মামগাছি গ্রামে অবস্থিত সুন্দর মন্দির । এখানে পরম পূজনীয় ‘শ্রীচৈতন্যলীলার ব্যাস’ শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুর আবির্ভূত হয়েছিলেন—সেটা তাঁর জন্মস্থান । আমাদের শ্রীলগুরু মহারাজ ওঁবিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসুন্দর গোবিন্দ দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুর ও শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী প্রভুর প্রণাম মন্ত্র লিখেছেন :

দাসবৃন্দাবনং বন্দে কৃষ্ণদাস-প্রভুং তথা ।
ছন্নাবতার-চৈতন্যলীলা-বিস্তারকরিণৌ ॥
দ্বৌ নিত্যানন্দ পাদাব্জ-করুণারেণু-ভূষিতৌ ।
ব্যক্ত-চ্ছন্নৌ বুধাচিন্ত্যৌ বাবন্দে ব্যাস-রূপিণৌ ॥
শ্রীগুরু-গৌর-গান্ধর্ব্বা-গোবিন্দাশ্চ গণৈঃ সহ ।
জয়ন্তি পাঠকশ্চাত্র সর্ব্বেষাং করুণার্থিনঃ ॥

যখন আমরা শ্রীবাস পণ্ডিতের গৃহে গিয়াছিলাম, তখন আমরা নারায়ণীদেবীর কথা বলেছিলাম :

এক দিন মহাপ্রভু শ্রীবাস পণ্ডিতের গৃহে প্রসাদ গ্রহণ করছিলেন । হঠাৎ মহাপ্রভুর সামনে এগিয়ে গিয়ে নারায়ণী হাত পাতলেন । উনি তখন ৩-৪ বছর বয়স ছিলেন । মহাপ্রভু ওঁকে কিছু প্রসাদ দিয়ে বললেন, “এখন কাঁদতে কাঁদতে কৃষ্ণ নাম কর !” মহাপ্রভুর আজ্ঞার প্রভাবে নারায়ণী তখন কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে কাঁদতে শুরু করলেন ।

আর এক সময় শ্রীবাস পণ্ডিত ও ভক্তগণের রাত্রি কীর্ত্তন শুনে আশেপাশের লোকগুলো হিংসা করে ও বিরক্ত হয়ে নালিশ করতে লাগলেন—ওরা বললেন, “এটার জ্বালায় রাত্রে ঘুমোতে পারি না ! ওরা সারা দিন সারা রাত কীর্ত্তন করছে ! এই কীর্ত্তনটা বন্ধ করতে হবে,  নাহলে নিমাইকে মারতে হবে আর শ্রীবাসের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে হবে !” এসব কথা শুনে শ্রীবাস পণ্ডিত কীর্ত্তন বন্ধ করে দিলেন । ওই দিন শ্রীমন্মহাপ্রভু এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “আরে শ্রীবাস, কী হয়েছে ? তোমাদের কীর্ত্তনটা বন্ধ হল কেন ?”

শ্রীবাস পণ্ডিত বললেন, “তুমি আগে বস । চিন্তা কর না, বসো ।”

“বসব কেন ? কীর্ত্তন কেন বন্ধ হল ? বলে দাও ।”

“মাথা গরম করবে না, বসো । পাড়ার ছেলেগুলো বলছে যে, আমার ঘরবাড়ি গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে, আমার এটায় আপত্তি নেই, কিন্তু ওরা বলছে যে, ওরা তোমার গায়ে হাত দেবে—তোমার গায়ে হাত দিলে কী করে হবে ?”

মহাপ্রভু বললেন, “তাই না কি ?” তখন উনি নিজের সিদ্ধি দেখিয়ে দিলেন—উনি নারায়ণীর মাথায় একটু হাত দিয়ে আশীর্বাদ দিলেন, “তোমার কৃষ্ণভক্তি হোক !” আর নারায়ণী তখন একবারে ‘হা কৃষ্ণ ! হা গৌর !” বলে মেঝেতে গড়াগড়ি যেতে লাগলেন  । তখন মহাপ্রভু সব ভক্তগণকে বললেন, “তোমাদের কি এখন বিশ্বাস হয় ? তোমাদের ঘরবাড়ি কি কেউ ভেঙ্গে দিতে পারবে ?”

সবাই সেটা স্বীকার করলেন এবং আর কীর্ত্তন বন্ধ করলেন না ।

এই সব হিসাবে নারায়ণী ‘গৌরাঙ্গের অবশেষ-পাত্র নারায়ণী’র নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন আর কিছু বছর পরে শ্রীবাস পণ্ডিতের সহধর্মিণী মালিনী দেবীর বাবার বাড়ী মাম­গাছিতে ঘটকালী দ্বারা নারায়ণীকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল । তারপর ওঁর গর্ভে পরমবৈষ্ণব শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । সেই রকম ছিল ওঁর ভাগ্য ।

যখন শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুর বড় হয়েছেন, তিনি সব সময় নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে প্রচার ও সেবা করতেন । সন্ন্যাস গ্রহণ করবার পর মহাপ্রভু শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুকে বললেন, “তুমি রাঢ়দেশ গিয়ে প্রচার কর !” সেই আদেশ অনুসারে শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু রাঢ়দেশে ফিরে এসে বিভিন্ন ভাবে প্রচার করতেন এবং বছরের মধ্যে একবার সমস্ত নবদ্বীপবাসী ভক্তগণকে শ্রীপুরীধামে নিয়ে যেতেন ।

এক দিন শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু ভক্তগণকে নিয়ে নবদ্বীপ থেকে যাত্রা শুরু করলে হেঁটে হেঁটে দেনুড় গ্রামে এসেছিলেন । সেখানে একটি আম বাগানে তাঁরা থেমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েছিলেন । ওই দেনুড় গ্রামের জমিদার ছিলেন রামহরি চক্রবর্তী । তিনি একজন ব্রাহ্মণ এবং নিত্যানন্দ প্রভুর বড় ভক্ত হয়ে সব সময় ভাবতেন, “কবে আমি নিত্যানন্দ প্রভুর দর্শন পাব ? কবে নিত্যানন্দ প্রভু আসবেন ?” তাই ওই দিন রামহরি চক্রবর্তী হঠাৎ করে কিছু দূরে বিরাট রঙিন ভিড় দেখতে পেলেন—কেউ হলুদ কাপড় পরছেন, কেউ নীল, কেউ লাল, কেউ সাদা, ইত্যাদি । অবাক হয়ে তিনি ভাবলেন, “সে কী ? আমি ওখানে গিয়ে একবার দেখব ।” ওই আম বাগানে এসে তিনি দেখলেন যে, ওখানে স্বয়ং শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু এসে দাঁড়িয়ে আছেন ! তাঁর গুরুদেবকে দেখে রামহরি চক্রবর্তী একবার মাটিতে পড়ে তাঁকে দণ্ডবৎ প্রণাম জানিয়ে বললেন, “প্রভু, আমি সব সময় আপনার চিন্তা করি । কৃপ করে, আমার বাড়িতে চলুন । আমি সবাইকে প্রসাদ দিয়ে দেব ।”

নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “সেটা কী করে হবে ? আমাদের এত বেশী লোক এখানে আছে, আমরা সবাই কি করে তোমার বাড়িতে যাব ? তুমি কাজ কর—বরং চাল, ডাল, যা আছে, সব নিয়ে এস, আমরা এখানে পিকনিক করতে পারি ।”

উত্তেজিত হয়ে রামহরি চক্রবর্তী সব কিছু ব্যবস্থা করে দিলেন । তিনি সব ভক্তগণকে সুন্দর ভাবে প্রসাদ পরিবেশন করেছিলেন ।

প্রসাদ নেওয়ার পর শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর সেবককে (শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুরকে) বললেন, “আমার জিনিস কোথায় ?” বৃন্দাবনদাস ঠাকুর তখন বুঝতে পেরেছিলেন, কী প্রভু চাইছেন—ওই জিনিসটা কী বলতে দরকার ছিল না । বৃন্দাবনদাস ঠাকুর নিত্যানন্দ প্রভুকে হরিতকি ফল দিলেন (খাওয়ার পর তিনি হরিতকি মুখশুদ্ধির মত খেতেন) । ওই হরিতকি দেখলে অক্রোধ-পরমানন্দ নিত্যানন্দরায় একবার ক্রোধ অভিনয় করলেন । তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা হঠাৎ করে তুই কোত্থেকে পেয়েছিস ?” বৃন্দাবনদাস ঠাকুর বললেন, “প্রভু, আপনি সকাল বেলায় প্রসাদ পেলেন আর একজন ভক্ত কয়েকটি হরিতকি ফল দিলেন, তিনি জানেন যে, আপনি হরিতকি প্রতি দিন পান । আমি আপনাকে কিছু সকাল বেলায় দিলাম আর কিছু আমার কাছে পরের দিনের জন্য রাখলাম ।” তিনি সত্য কথা বললেন কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু সেটা শুনে রেগে গেলেন, “তোমার সঞ্চয় বুদ্ধি একদম গৃহস্থের মত ! তুই কালকের জন্য জিনিস সঞ্চয় করেছিস !”

গৃহস্থলোক সব সময় পরের দিনের জন্য সব কিছু রাখেন, “আমি কালকে কী খাব ? কালকে কী পরব ?” তারা সব সময় চিন্তা করেন, “আমি যখন বৃদ্ধ হব, তখন আমার কে দেখবে ?” আর নিত্যানন্দ প্রভু তখন কী বললেন ? “তোমার যদি এইরকম বুদ্ধি, তাহলে তুমি আমার সঙ্গে যাবে না ! তুমি এই রামহরির বাড়িতে থাক, এখানে প্রচার কর ।”

সেটা খুব সহজ জিনিস—কেন নিত্যানন্দ প্রভু এত রেগে গিয়েছিলেন ? বৃন্দাবনদাস ঠাকুর অন্যায্য করেন নি । তিনি তাঁর গুরুর জন্য ফল রেখেছিলেন, তাঁর দোষ কী ? কিন্তু এখানে মূল কথা হচ্ছে যে, নিত্যানন্দ প্রভু একাই সর্ব্বত্র প্রচার করতে পারেন না, তাই ওই অজুহাতের সুবিধা নিয়ে তিনি বৃন্দাবনদাস ঠাকুরকে ওখানে রেখেছিলেন । বৃন্দাবনদাস ঠাকুর নিত্যানন্দ প্রভুর আজ্ঞা মাথায় রেখে অনুসরণ করলেন এবং তাঁর নিজের সুখ-দুঃখ বিলিয়ে দিয়ে দেনুড় গ্রামে বাস করতে লাগলেন । ওখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত শ্রীচৈতন্যভাগবত লিখেছেন, ওখানে তাঁর সেবিত নিত্যানন্দ প্রভু ও মহাপ্রভুর শ্রীবিগ্রহ আছেন, ওখানে তাঁর শ্রীসমাধিমন্দিরও আছে । সেই রকম ছিল তাঁর জীবন ।

শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্যভাগবত রচনা করেছেন আর সবাই দেখে বলছেন, গ্রন্থের নামটা ভুল হয়ে গিয়েছে—তার নাম দেওয়া উচিত ছিল ‘শ্রীনিত্যানন্দ-ভাগবত্’ কারণ তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর কথা ওখানে বেশী লিখেছেন । এইরকম ছিল তাঁর নিত্যানন্দ প্রভুর শ্রীচরণের প্রতি আসক্তি ।

এই তীর্থ একশো বছর আগে একদম পরিত্যক্ত হয়েছিল । যখন পূজ্যপাদ ভগবান্ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ শ্রীনবদ্বীপধামে পরিক্রমা প্রথম স্থাপন করেছিলেন, তখন তিনি এক এক করে প্রায় সমস্ত তীর্থ পুনরায় আবিষ্কার করেছিলেন । ১৯২১ সালে তিনি শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুরের জন্মস্থানে জমি সংগ্রহ করে একটি ছত্র নির্ম্মাণ করেছিলেন আর কয়েক বছর পর, ১৯৩৪ সালে, তিনি এখানে এই সুন্দর মন্দির ও শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তাঁর পাদপদ্মের কৃপায় আমরা এখানে আজকে আসতে পারি এবং শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুরের লীলা ও মহিমা স্মরণ করতে সুযোগ পাই ।

 

১৯৬৭ সালে আমাদের পরম গুরু মহারাজ শ্রীল ভক্তিরক্ষক শ্রীধর দেবগোস্বামী মহারাজ শ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুরের সম্বন্ধে একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলেন । আমরা ওই প্রবন্ধ এখানে নিম্নে উপস্থাপন করলাম :

 

শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর

 

“আমার প্রভুর প্রভু গৌরাঙ্গ সুন্দর” উপদেশ করিলেন “তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা আমানিনা মানদেন কীর্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ” ; আর “শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস বৃন্দাবন দাস” মহাশয় বলিলেন—“এত পরিহারেও যে পাপী নিন্দা করে, তবে লাথি মারোঁ তার শিরের উপরে !” ইহার সামঞ্জস্য কোথায় ? মনে করিয়াছিলাম ভক্ত আবেগভরে মনের দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন—ইহা এমন ধর্ত্তব্য নয় । কিন্তু একি ! বৈষ্ণবাচার্য্য বলিলেন—ইহাতে ঠাকুরের জীবের প্রতি অত্যধিক করুণারই কথা প্রকাশিত হইয়া রহিয়াছে । এ আবার কি ? অবাক বিস্ময়ে উৎকর্ণ হইলাম । আচার্য্য বলিয়া চলিলেন—শ্রীভগবান্ বা অন্যান্য আচার্য্যগণও যে মহাপরাধিগণকে উপেক্ষা করিয়াছেন—ঠাকুর বৃন্দাবন সেই সব অতি পাতকী পাষণ্ডকুলকেও উপেক্ষা না করিয়া নিজ দায়িত্বে দণ্ডদান করিয়াছেন । ইহাতে “অস্পৃশ্য অদৃশ্য সেই হয় যমদণ্ড্য” দলের সঙ্গে যাহা হয় একটী ভাল মন্দ সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া শ্রীভগবানের দরবারে তাহাদিগকে টানিয়াছেন । শ্রীভগবান্ তাঁর ভক্তের মর্য্যাদা লড়াইএ আপাত মধুর করিতে গিয়া বিক্ষোভকারী সম্প্রদায়কে কিছু কন্­সেসান (বিশেষ অধিকার সুবিধা) দিলেন, তা ছাড়া বুঝাইলেন তাঁদের অজ্ঞাতসারে পূর্ব্বেই একটী গ্রাণ্ট্ (অনুদান) হইয়া যাওয়া—তাদের চির দারিদ্রের অবসানের ব্যবস্থা হইয়া গিয়াছে—“ভক্তপদ ধূলি আর ভক্তপদ জল, ভক্ত ভুক্ত শেষ এই তিন সাধনের বল”—এই ফরমূলাটীর অনুধ্যান করিতে পারিলেই তাদের কার্য্যসিদ্ধি হইবে । যে কোনরূপে “লাঠি-চার্জ” বা “লাথি চার্জ” যখন হয়েছে তখন কর্তৃপক্ষ কিছু না দিয়া যান্ কোথায় ! ‘নাস্তি যুদ্ধং নিরামিষম’ কর্তৃপক্ষের নিকট পুলিশের বিরুদ্ধে একটী ভাল মন্দ অভিযোগ খাড়া করিতে পারিলেই (নাড়া দিলেই গুঁড়া পড়ে—ন্যায়ে) লাভের সম্ভাবনা—ইহা কি আজকালকার কালে আবার নূতন করিয়া শিখাইতে হইবে ? সুতরাং শ্রীবৃন্দাবন ঠাকুর তোমাদের একটী হুজ্জুত বাধাইবার যে বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছেন—তাতে তাঁর কাছে তোমরা কত ঋণী মন দিয়ে বুঝ ত ! সর্দ্দার বলিলেন—ঠিক বলিয়াছেন ; আমরা—শ্রীবৃন্দাবনের সম্পত্তি লুট করিয়া আরও জোড়দার বিক্ষোভ করিব । আচার্য্য কহিলেন—সেখানে তারা লুটের মালে এত মহামূল্য সম্পদ পাইল যে আর কর্ত্তৃপক্ষকে না জানাইয়াই চুপি চুপি ভরপুর হৃদয়ে নৃত্য কীর্ত্তন মহোৎসব আরম্ভ করিয়া দিল । শ্লোগান হইল “আমার ভক্তের পূজা আমা হইতে বড়” । ভক্তপদ ধূলি আর ভক্তপদ জল, ভক্ত-ভুক্ত-শেষ—এই তিন সাধনের বল ।

* * * * * * * * *

আর একটি অমূল্য প্রবন্ধ আমরা স্বয়ং ভগবান্ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছ থেকে পাই :

 

—শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের জীবনী—

(প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বিলিখিত)

বর্দ্ধমান-জেলার পূর্ব্বাংশে পূর্ব্বস্থলী-থানার অন্তর্গত মামগাছী-নামে একটী প্রাচীন পল্লী অদ্যাপি বর্ত্তমান আছে । এই মামগাছী-গ্রামকে প্রাচীনগণ ও ‘ভক্তরত্নাকরে’র লেখক নবদ্বীপের অন্তর্গত মোদদ্রুম-দ্বীপ বলিয়া নির্দ্দেশ করেন । মামগাছী-গ্রামের প্রান্তদেশেই ভাগীরথী প্রবহমান । এই গ্রামে এখনও ঠাকুর শ্রীবৃন্দাবনদাসের সেবা শ্রীগৌরনিত্যানন্দের শ্রীমূর্ত্তির নিত্যপূজা সাধিত হইতেছে । কথিত হয় যে, ঠাকুর বৃন্দাবন এইগ্রামে জন্ম-গ্রহণ করেন । আজও বৃন্দাবনদাসের বাল্যকালের বিচরণভূমি বলিয়া ঠাকুর মহাশয়ের বাড়ীটি নির্দ্দিষ্ট হয় ।

শ্রীবাসের গৃহিণী মালিনী দেবীর মামগাছী-গ্রামে পিত্রালয় ছিল । শ্রীনবদ্বীপ-নগরের শ্রীগৌরাঙ্গদেবের প্রিয়ভক্ত শ্রীবাসপণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীনারায়ণী দেবীর মামগাছী-গ্রামে বিবাহ হয় । মালিনী শেষ বয়সে স্বীয়-পিত্রালয়ে আসিয়া বাস করেন । ঐ বংশের কাহারও সহিত নারায়ণী দেবীর বিবাহ হয় । শ্রীনারায়ণীর গর্ভেই শ্রীবৃন্দাবনদাস জন্মগ্রহণ করেন ।

শিশুকালেই ঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হওয়ায় এবং পিতাঠাকুর মহাশয় শ্রীভগবান্ চৈতন্যচন্দ্রের সেবানিরত হইবার পূর্ব্বেই দেহত্যাগ করায় তাঁহার কথা বিশেষভাবে কোথাও উল্লিখিত হয় নাই । কেহ কেহ বলেন, তিনি সর্ব্বতোভাবে হরিপাদপদ্ম আশ্রয় না করায় পিতৃবংশের পরিচয়ে শ্রীবৃন্দাবনদাসের পরিচয় হয় নাই ।

আজও শ্রীবাসপত্নী মালিনীর ভিটাস্থিত শ্রীবৃন্দাবনদাস-প্রতিষ্ঠিত শ্রীগৌরনিত্যানন্দ-শ্রীবিগ্রহ স্থানান্তরিত হইয়া যথাবিধি সেবিত হইলেও সেবাটী তাদৃশ সমৃদ্ধিসম্পন্ন ও উজ্জ্বল নাই ।

শ্রীবৃন্দাবনদাস ঠাকুর মহাশয় অনেক সময় দেনুড়েই ছিলেন । শ্রীঠাকুর মহাশয়ের সংসার-পরিগ্রহের কোন কথা আমরা শুনিতে পাই নাই । তিনি চারিটী শিষ্যের মধ্যে শ্রীরামহরি-নামক একটী উত্তর-রাঢ়ীয় কায়স্থকুলোদ্ভূত ব্যক্তিকে স্বীয় দেনুড়াস্থিত সম্পত্তিসমূহের উত্তরাধিকারী করিয়া যান । তাঁহার বংশধরগণই এখনও শ্রীঠাকুর মহাশয়ের দেনুড়পাট বাটীতে অবস্থান করিয়া সেবা নির্ব্বাহ করিয়া আসিতেছেন । রামহরি স্বয়ং সংস্কারসম্পন্ন হইয়া দীক্ষিত হইলেও কালপ্রভাবে অবৈষ্ণব স্মার্ত্তাচারের প্রাবল্যে তদীয় অধস্তনগণ কয়েক পুরুষ হইতে স্মার্ত্তশাসনের অনুবর্ত্তী হইয়া সামাজিক সদাচার করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন ।

শ্রীলবৃন্দাবনদাস ঠাকুরের পিতৃকুলের অধিক পরিচয় না পাওয়া গেলেও তিনি রাঢ়ীয় শ্রেণীর ব্রাহ্মণকুলে উদ্ভূত ছিলেন, জানা যায় । মাতৃকুল শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের একান্ত আশ্রিত এবং সর্ব্বপ্রধান গৃহস্থ-বৈষ্ণব বলিয়া, সেই পরিচয়েই তিনি বৈষ্ণবজগতে ও গৌড়ীয় সাহিত্যিক-সমাজে পরিচিত ।

শ্রীনারায়ণীর গর্ভজাত ঠাকুর মহাশয় ভক্তিশাস্ত্রে প্রগাঢ় প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন এবং বৈষ্ণবাচারে অবস্থিত হইয়া বৈষ্ণব-গুরুবর্গের মহিমা প্রচার করিবার জন্য কায়মনোবাক্যে চেষ্টাবিশিষ্ট ছিলেন ।

বৈষ্ণববিদ্বেষী স্মার্ত্তসমাজ শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর প্রতি বিদ্বেষপরবশ হইয়া শ্রীনিত্যানন্দদাস শ্রীবৃন্দাবনদাসঠাকুরের প্রতি নিতান্ত অবজ্ঞাপ্রকাশপূর্ব্বক তাঁহাকে বৈষ্ণববিরোধী স্মার্ত্তসমাজের উন্নত চূড়ায় স্থান দেন নাই । ছলনামূলে তাঁহার কুলগত কুৎসা-প্রচারাদি-মুখে নানা অসৎকথার অবতারণা পর্যন্তও করিতে ক্রটি করেন নাই ।

শ্রীগৌরসুন্দরের নবদ্বীপ পরিহারের কিয়ৎকাল পূর্ব্বে শ্রীঠাকুর মহাশয়ের মাতা নারায়ণী চারি বৎসর বয়সের বালিকা মাত্র । সেই সময় তিনি শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের স্নেহ-দৃষ্টিতে সম্বর্দ্ধিতা ছিলেন । পরবর্ত্তীসময়ে তিনি শ্রীমালিনী দেবীর পিত্রালয়ে পতিগৃহ লাভ করিয়া শ্রীল বৃন্দাবনদাসের পৌগণ্ডকাল পর্যন্ত পুত্ররত্নের পালনাদি করিয়াছিলেন । সাময়িক স্মার্ত্তগণের কুহকে পড়িয়া কোন কোন রাঢ়দেশীয় অনভিজ্ঞ প্রাকৃতসাহজিক বৈষ্ণবব্রুবগণ তাঁহাকে তাৎকালিক ব্রাহ্মণ-সমাজ হইতে পৃথক্ বুদ্ধি করেন । প্রকৃত প্রস্তাবে, তিনি প্রকৃত শুদ্ধ ব্রাহ্মণ-সমাজের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া পারমার্থবিরোধী স্মার্ত্তসমাজের অধীনতা স্বীকার করেন নাই । এই মহাত্মার রচিত শ্রীচৈতন্যভাগবত যাঁহারা পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারাই জানেন যে, শ্রীচৈতন্যচন্দ্র-প্রকটিত শুদ্ধভক্তি-ধর্ম্মপ্রচারে ঠাকুর মহাশয় সর্ব্বোত্তম দিক্­পাল । যে সময়ে শ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর পুত্র বলরামের সন্তান মধুসূদনের পুত্র রাধারমণ শান্তিপুরে বাস করিয়া শ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর প্রচারিত পারমার্থিকধর্ম্মের উৎসাদন-মানসে বন্দ্যঘটীয় শ্রীহরিহর ভট্টাচার্য্য-পুত্রের আনুগত্য স্বীকার করেন এবং যে সময়ে শ্রীবীরচন্দ্রপ্রভুর পুত্রপ্রতিম শিষ্যত্রয় স্মার্ত্তশাসনের করাল কবলে নিগৃহীত হইয়া পঞ্চোপাস্যের অন্যতম ত্রিপুরাসুন্দরীকে শ্রীশ্যামসুন্দর বিগ্রহের সম-সিংহাসনে রাখিতে বাধ্য হন এবং রাঢ়ীয় শ্রেণীস্থ সামাজিক বিধি-অনুসারে বারেন্দ্রের সহিত গঙ্গাঠাকুরাণীর যৌনসম্বন্ধকে রাঢ়ীয় শ্রেণীতে গঙ্গোপধ্যায়-কুলে পরিণত করিবার কথা আলোচিত হয়, সেই সময় শ্রীউদ্ধারণঠাকুর প্রভৃতিকে দীক্ষা-বিধান-দ্বারা দৈক্ষ্যসাবিত্র্যব্রাহ্মণকুলে গ্রহণ-প্রভৃতি বিচারের প্রতিকূল চেষ্টাসমূহ শ্রীবৃন্দাবনদাস ঠাকুর মহাশয়ের বৈষ্ণব-সমাজের প্রতিষ্ঠা-সংবর্দ্ধনে নানাপ্রকার প্রতিবন্ধকতা করিয়াছিল । তথাপি গৌড়ীয়-সাহিত্যিক-সূর্য্য শ্রীনিত্যানন্দৈকপ্রাণ গৌরভক্তাগ্রণী ঠাকুর মহাশয়কে শ্রীচৈতন্যভাগবতে সত্যকথা লিপিবদ্ধ করিতে নিরস্ত করিতে সমর্থ হয় নাই । যাঁহারা শ্রীচৈতন্যভাগবত বিশেষ মনোযোগের সহিত পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা শ্রীঠাকুর মহাশয়ের কথিত নিরস্তকুহক সত্য হইতে বিপথগামী হইতে পারেন না ।

শ্রীল ঠাকুরের শ্রীচৈতন্যভাগবতের বিভিন্ন স্থানে ভক্তি-সিদ্ধান্তের অপূর্ব্ব সামাজিক মীমাংসা স্বর্ণাক্ষরে খচিত আছে । শ্রীগুরুদেব নিত্যানন্দে তাঁহার-সেবাপ্রবৃত্তি অতুলনীয়া । সমগ্র জগৎ, ভারতবর্ষ, গৌড়দেশ, শ্রীনবদ্বীপধাম প্রভৃতির কোন বিদ্বন্মগুলী বা তাৎকালিক সমাজ তাঁহার কেশ স্পর্শ করিতে সমর্থ হয় নাই । পরবর্ত্তিকালে তাঁহার প্রতি আক্রমণ করিবার প্রবল চেষ্টাকল্পে তাঁহার ব্যক্তিগত কুল ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁহার প্রসন্নচিত্তত্বের প্রতি কটাক্ষ করিতে দ্বিধা করেন নাই ।

শ্রীঠাকুর মহাশয়ের সর্ব্বসদ্­গুণাবলীকে আক্রমণ করিবার জন্য কদর্য্যস্বভাব লোকের অভাব নাই । এই বৈষ্ণব-বিদ্বেষিভাব পোষণ করিয়া কেহ কেহ বলেন যে, শ্রীবৃন্দাবনদাস ঠাকুর মহাশয় ও তাঁহার নিত্যদাসগণ অবৈষ্ণবের প্রতি নিতান্ত বিতৃষ্ণা প্রকাশ করিয়া শ্রীগৌরপ্রচারিত সহিষ্ণুতা ধর্ম্মের আদর্শে ও ‘তৃণাদপি সুনীচ’ ধর্ম্মের সৌন্দর্য্যে অনভিজ্ঞ লোকের প্রীতি আকর্ষণ করিতে অসমর্থ হইয়াছেন । শ্রীবৃন্দাবনদাসগণ তদুত্তরে বললেন যে, এইরূপ সমালোচনা করিতে গিয়া তাদৃশ কদর্যস্বভাব ভক্তিবিরোধি-জনগণ সাহিত্যিকের বেশে নৈতিকের পীঠে আরোহণপূর্ব্বক যে লোকপ্রতারণাকার্য্যে বিরুদ্ধভাব পোষণ করেন, তাহা তাহাদের দুর্ভাগ্যের পরিচয়মাত্র । সুকৃতির অভাব হইলেই এই প্রকার গুরুবৈষ্ণবের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করিবার দুঃসাহসে প্রবৃত্তি হয় । বিশ্বজনীন সার্ব্বভৌমিক প্রেমধর্ম্মের সহিত অপ্রীতিকর বিরোধ-ধর্ম্মের সমন্বয়-প্রয়াস হইতেই সৎসাম্প্রদায়িকের প্রতি অবিবেচক সমন্বয়বাদী যে কুতর্ক উপস্থাপিত করেন, তাহা নিতান্ত অযৌক্তিক ও মৎসরতামূলে উদ্ভূত । শ্রীঠাকুর মহাশয়ের কায়মনোবাক্যে গুরুনিত্যানন্দ-সেবায় সম্পূর্ণভাবে বিভাবিত, সুতরাং তাঁহার অনুষ্ঠানাবলীতে দোষারোপ করিবার সামর্থ্যভার সাহিত্যিককে বা অনভিজ্ঞ নীতিবাদীকে শ্রীচৈতন্যচন্দ্র ন্যস্ত করেন নাই । এই সকল সমালোচক যে কালে জাগতিক ষড়্ রিপুর আধারে যথেচ্ছাচার নৃত্য হইতে বিরত হইবেন, সেই সময়ই তাঁহারা শ্রীঠাকুর মহাশয়কে শ্রীগৌড়ীয়গণের একমাত্র গুরুদেব বলিয়া জানিতে পারিবেন এবং স্ব-স্ব-গুর্ব্বপরাধ-জন্য অনুতপ্ত হইবেন ।

শ্রীচৈতন্যভাগবতের লিখন-প্রণালী প্রাঞ্জল ও অত্যন্ত হদয়গ্রাহী । শ্রীল হরিদাস ঠাকুরের চরিত্র-বর্ণনে ; শ্রীগৌরাঙ্গদেবের প্রকটকালীয় সামাজিক অবস্থা-বর্ণনে ; ভোগিপাল, যোগিপাল ও মহীপাল প্রভৃতির গীতাদির সাহিত্যিক স্থান-নির্দ্দেশে ; তাৎকালিক ব্রাহ্মণগণের ‘কালে ভদ্রে পুণ্ডরীকাক্ষ’ প্রভৃতি নামগ্রহণ-বর্ণনে ; শ্রীগৌরসুন্দরের ঐশ্বর্য্য ও মহিমা প্রভৃতি অঙ্কনে শ্রীঠাকুর মহাশয় যেরূপ কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহাতে শ্রীগৌড়ীয়সাহিত্যের সৌন্দর্য্যদ্রষ্টৃগণ সাহিত্যমন্দিরে প্রবেশার্থিগণও গৌড়মণ্ডলের অধিবাসিগণের মায়িক ভোগবৃত্তি ব্যতীত বৈকুণ্ঠের সাহিত্যগত বিচিত্রতা লক্ষ্য করিবার সুযোগ পাইবেন । গৌড়ীয়গণ কেবল গৌড়দেশবাসী নহেন, তাঁহারা গৌড়ীয়ভাষার সাহায্যে নিত্য গোলোকে অবস্থিত মুক্ত পরিকরগণের ভাষায়ও নৈপুণ্য লাভ করিয়া আপনাদিগকে সেশ্বর গৌড়ীয় বলিয়া জানিতে পারিবেন ।

শ্রীঠাকুর মহাশয়ের কথা আমাদিগের পূর্ব্বগুরুদেব শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী যাহা বলিয়াছেন, তাহা তাঁহার ভাষায় উদ্ধৃত করিয়া বক্তব্য শেষ করিলাম :—

“ওরে মূঢ় লোক, শুন চৈতন্যমঙ্গল ।
চৈতন্য-মহিমা যাতে জানিবে সকল ॥
কৃষ্ণলীলা ভাগবতে কহে বেদব্যাস ।
চৈতন্যলীলার ব্যাস—বৃন্দাবনদাস ॥
বৃন্দাবনদাস কৈল চৈতন্যমঙ্গল ।
যাঁহার শ্রবণে নাশে সর্ব্ব অমঙ্গল ॥
চৈতন্য-নিতাইর যা’তে জানিয়ে মহিমা ।
যা’তে জানি কৃষ্ণভক্তি-সিদ্ধান্তের সীমা ॥
ভাগবতে যত ভক্তিসিদ্ধান্তের সার ।
লিখিয়াছেন জানি’ করিয়া উদ্ধার ॥
চৈতন্যমঙ্গল শুনে যদি পাষণ্ডী, যবন ।
সেই মহা-বৈষ্ণব হয় ততক্ষণ ॥
মনুষ্যে রচিতে নারে ঐছে গ্রন্থ ধন্য ।
বৃন্দাবনদাস-মুখে বক্তা শ্রীচৈতন্য ॥
বৃন্দাবনদাস-পদে কোটি নমস্কার ।
ঐছে গ্রন্থ করি’ তিঁহো তারিলা সংসার ॥
নারায়ণী—চৈতন্যের উচ্ছিষ্ট-ভাজন ।
তাঁ’র গর্ভে জন্মিলা শ্রীদাস বৃন্দাবন ॥
তাঁ’র কি অদ্ভুত চৈতন্যচরিত-বর্ণন ।
যাহার শ্রবণে শুদ্ধ কৈল ত্রিভুবন ॥
বৃন্দাবনদাস কৈল চৈতন্যমঙ্গল ।
তাহাতে চৈতন্যলীলা বর্ণিল সকল ॥
সূত্র করি’ সব লীলা করিল গ্রন্থন ।
পাছে বিস্তারিয়া তাহার কৈল বিবরণ ॥
বিস্তার দেখিয়া কিছু সঙ্কোচ হৈল মন ।
সূত্রধৃত কোন লীলা না কৈল বর্ণন ॥
নিত্যানন্দ-লীলা-বর্ণনে হইল আবেশ ।
চৈতন্যের শেষ লীলা রহিল অবশেষ ॥
বৃন্দাবনদাসের পাদপদ্ম করি’ ধ্যান ।
তাঁ’র আজ্ঞা লৈয়া লিখি যাহাতে কল্যাণ ॥
চৈতন্যলীলাতে ব্যাস—বৃন্দাবনদাস ।
তাঁ’র কৃপা বিনা অন্যে না হয় প্রকাশ ॥”

(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আদি ৮ম পঃ)

“বৃন্দাবনদাস—নারায়ণীর নন্দন ।
চৈতন্যমঙ্গল যিঁহো করিল রচন ॥
ভাগবতে কৃষ্ণলীলা বর্ণিলা বেদব্যাস ।
চৈতন্য লীলাতে ব্যাস—বৃন্দাবনদাস ॥

(ঐ আদি ১১শ পঃ)

চৈতন্যলীলার ব্যাস—দাস বৃন্দবান ।
মধুর করিয়া লীলা করিলা রচন ॥

(ঐ আদি ১৩শ পঃ)

চৈতন্যলীলার ব্যাস—দাস বৃন্দাবন ।
তাঁ’র আজ্ঞায় করোঁ তাঁ’র উচ্ছিষ্ট চর্ব্বণ ॥
ভক্তি করি’ শিরে ধরি’ তাঁহার চরণ ।
শেষ-লীলার সূত্র এবে করিয়ে বর্ণন ॥

(ঐ মধ্য ১ম পঃ)

সহজে বিচিত্র মধুর চৈতন্য-বিহার ।
বৃন্দাবনদাস-মুখে অমৃতের ধার ॥
এ সকল লীলা শ্রীদাস বৃন্দাবন ।
বিস্তারি’ বর্ণিয়াছেন উত্তম বর্ণন ॥
অতএব তাহা বর্ণিলে হয় পুনরুক্তি ।
দম্ভ করি’ বর্ণি যদি নাহি তৈছে শক্তি ॥
চৈতন্যমঙ্গলে যাহা করিল বর্ণন ।
সূত্ররূপে সেই লীলা করিয়ে সূচন ॥
তাঁ’র সূত্রে আছে তিঁহ না কৈল বর্ণন ।
যথা কথঞ্চিৎ করি সে লীলা কথন ॥
অতএব তাঁ’র পায়ে করি নমস্কার ।
তাঁ’র পায় অপরাধ না হইক আমার ॥

(ঐ মধ্য ৪র্থ পঃ)

বৃন্দাবনদাস প্রথম যে লীলা বর্ণিল ।
সেই সব লীলার আমি সূত্রমাত্র কৈল ॥
তাঁ’র ত্যক্ত ‘অবশেষ’ সংক্ষেপে কহিল ।
লীলার বাহুল্যে গ্রন্থ তথাপি বাড়িল ॥
নিত্যানন্দ-কৃপাপাত্র—বৃন্দাবনদাস ।
চৈতন্যলীলায় তেঁহো হয়ে আদিব্যাস ॥
তাঁর আগে যদ্যপি সব লীলার ভাণ্ডার ।
তথাপি অল্প বর্ণিয়া ছাড়িলেন আর ॥
যে কিছু বর্ণিলুঁ, সেহ সংক্ষেপ করিয়া ।
লিখিতে না পারেন তবু রাখিয়াছেন লিখিয়া ॥
চৈতন্যমঙ্গলে তেঁহো লিখিয়াছে স্থানে স্থানে ।
সেই বচন শুন সেই রপম-প্রমাণে ॥
সংক্ষেপে কহিলুঁ বিস্তার না যায় কথনে ।
বিস্তারিয়া বেদব্যাস করিলা বর্ণনে ॥
চৈতন্যমঙ্গলে ইহা লিখিয়াছে স্থানে স্থানে ।
সত্য কহেন আগে ব্যাস করিলা বর্ণনে ॥
চৈতন্যলীলামৃত-সিন্ধু—দুগ্ধাব্ধি সমান ।
তৃষ্ণানুরূপ ঝারী ভরি’ তিঁহো কৈলা পান ॥
তাঁ’র ঝারী-শেষামৃত কিছু মোরে দিলা ।
ততেকে ভরিল পেট তৃষ্ণা মোর গেলা ॥”

(ঐ অন্ত্য ২০শ পঃ)

 


 

← Main page-এ ফিরে
← গ্রন্থাগারে ফিরে

 


শ্রীনবদ্বীপধাম
মাহাত্ম্য-মুক্তা-মালা


অনন্তশ্রীবিভূষিত ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংসকুলচূড়ামণি বিশ্ববরেণ্য জগদ্­গুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের পদ্মমুখের হরিকথামৃত


এইগ্রন্থশিরোমণি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিনির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্য এবং তাঁর শ্রীচরণের তৃপ্তির জন্য তাঁর অহৈতুক কৃপায় শ্রীচৈতন্য-সারস্বত মঠ হইতে প্রকাশিত হয় শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শুভার্বিভাব তিথিতে শ্রীগৌরাব্দ ৫৩৪, বঙ্গাব্দ ১৪২৬, খৃষ্টাব্দ মার্চ্চ ২০২০ ।


বৃক্ষসম ক্ষমাগুণ করবি সাধন । প্রতিহিংসা ত্যজি আন্যে করবি পালন ॥ জীবন-নির্ব্বাহে আনে উদ্বেগ না দিবে । পর-উপকারে নিজ-সুখ পাসরিবে ॥